Today: 22 Feb 2017 - 11:24:22 pm

বদলে যাচ্ছে রংপুর

Published on Tuesday, November 1, 2016 at 4:20 pm

আফতাব হোসেন
aftabবদলে যাচ্ছে রংপুর। বদলে যাচ্ছে এর আর্থ সামাজিক অবস্থা ; পরিবর্তন ঘটছে মফিজ ও মংগা নামের অপবাদে। দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার। কৃষি নির্ভরতা রংপুর অঞ্চলের হাজার বছরের ঐতিহ্য।

সমতল ভূমির এ অঞ্চল দেশের খাদ্য ভান্ডার বলে পরিচিত। ধান, পাট, তামাক , রেশম , প্রাকৃতিক নীল , সবজি উৎপাদনে এ অঞ্চলের খ্যাতি বিশ্ব জুরে। নদীপথ সচল থাকায় দেশ বিদেশের ব্যবসা- বানিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল দেশের ৫টি পুরাতন জেলার অন্যতম রংপুর। ভূমিকম্পে তিস্তা নদীর গতি পরিবর্তন , প্রাকৃতিক দূর্যোগ , নদী ভাংগন , খরা –বন্যা , ফসল উৎপাদনে ব্যয় বৃদ্ধি , কৃষি পন্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া , আধুনিক কৃষি উৎপাদনে সক্ষমতার অভাব , শিক্ষা , চাকুরী ও ব্যবসা বানিজ্যে পশ্চাৎপদতা এই অঞ্চলে দেখা দেয় নানা টানা পাড়েন । সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় এবং রাজনৈতিক ও সরকারী নানা বৈষম্যের কারণে খাদ্য উদ্বৃত্ত রংপুর অঞ্চলের মানুষ ক্রমাগতভাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা হারায় ।

ফলে দারিদ্রতা , আশ্বিন কার্তিক ও চৈত্র - বৈশাখে কাজ- খাদ্যের অভাব , নগদ অর্থের সংকট বিভিন্ন কারণে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যে নেমে আসে মংগা নামের অভিশাপ । শুরু হয় আর্থিক ও সামাজিক নানা সংকট । জমি হারিয়ে ধিরে ধিরে উচ্চবিত্ত কৃষক মধ্যবিত্ত , মধ্যবিত্ত কৃষক ক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র কৃষক বিত্তহীণ দিনমজুরে পরিনত হতে থাকে । আর শিল্প ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন না হওয়ায় কর্মসংস্থানের অভাবে দারিদ্রতা কমেনি । বরং দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলে দারিদ্রের হার শতকরা দশভাগ বেশি । আর বহির্গমনের হার দেশের অন্য অঞ্চলের চেয়ে শতকরা দশ ভাগ কম । অর্থাৎ দেশের দক্ষিন পূর্বাঞ্চলে ১১ ভাগ হলেও রংপুল অঞ্চলে তা শতকরা ১ ভাগেরও কম । আশার কথা এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটতে শুরু করেছে । দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে বিভাগ, বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি কর্পোরেশন বাস্তবায়িত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, অবকাঠামো, চিত্তবিনোদন, বৈচিত্রময় কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্ততাদের নানা সাফল্যে ফিরে পাচ্ছে হারানো গৌরব।

তিস্তা , ধরলা , ব্রক্ষপুত্র , করতোয়া , সানিয়াজান , দুধকুমোর , পূণর্ভবা , আত্রাই, মানাস , ঘাঘট , যমুনেশ্বরী, আখিরা বিধেীত রংপুর । বিশ্বনন্দিত ভাওয়াইয়া সম্রাট আব্বাস উদ্দিনের স্মৃতিবিজড়িত রংপুর । হযরত আবু বক্কর (রা:) এর ৩৫তম ওয়ারিশ মাওলানা কেরামত আলী জৈনপুরী (রা:) এবং মাহিসওয়ার হযরত শাহ জালাল বোখারী (র:) ও শাহ ইছমাইল গাজীর ’র পূর্ণভূমি রংপুর ঐতিহাসিকভাবেই ঐতিহ্যবাহী । উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহিয়সী নারী বেগম রোকেয়া ও মধ্যযুগের সাধক কবি হেয়াত মামুদের অনন্য সৃষ্টিকর্ম , “কোথায় স্বর্গ কোথায় নড়ক কে বলে তা বহুদুর” - খ্যাত কবি ফজলল করিম এর সৃষ্টিধন্য রংপুর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের যেমন পীঠোস্থান তেমনি আন্দোলন সংগ্রামেরও সূতিকাগার ।

এই রংপুর থেকেই উপমহাদেশে কৃষক প্রজা ও সন্নাস বিদ্রোহ সংগঠিত হয় । জয়দূর্গা দেবী চেীধুরানী ,নবাব নূরুল উদ্দিন , ভবানী পাঠক , প্রজাহিতৈষী রাজা শিবচন্দ্র , দয়াশিল , নবাব ওয়ালিদাদ খানের নাম আজও চিরভাস্বর হয়ে আছে ইতিহাসে । সমাজ সংস্কারক রাজা রামমোহনের নামও ইতিহাসে সমোজ্জল রয়েছে । নীল বিদ্রোহ , তেভাগা আন্দোলন , সিপাহী বিপ্লব ,গাজী ও সন্নাস বিদ্রোহ , যুগান্তর - স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউও আছড়ে পড়েছিল রংপুরে । শুধু তাই নয় পলাশী যুদ্ধোত্তর আজাদী সংগ্রাম এবং ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের মানুষের রয়েছে সৌর্য - বীর্যের গেীরবগাঁথা অনন্য ইতিহাস । এই রংপুরেই কীর্তিমান , প্রতিভাবান ও প্রজ্ঞাবান অনেক মানুষ জন্মে ছিলেন , এ মাটি ধন্য তাঁদের সুকীর্তির জন্য। এ মাটির সন্তান চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন , বিচারপতি আবু সাদাত মো: সায়েম- যিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন । নগরীর গুপ্তপাড়ার মেধাবী দু সন্তান ড: প্রতুল চন্দ্র গুপ্ত ও গোপাল সেন ; প্রথম জন ভারতের বিশ্ব ভারতী ও অন্যজন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পদ অলংকৃত করার গৌরব অর্জন করে ছিলেন । বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনায় যুক্ত ছিলেন শালবনের মোহিনী মোহন ভট্রাচার্য । ইতিহাস খ্যাত ক্ষুদিরামের ফাঁসির মামলার উকিল ছিলেন এই শালবনের সতীশচন্দ্র চক্রবর্তী ।

পীরগাছার ইটাকুমারীর যাদবেশ্বর তর্করতœ সংস্কৃত শাস্ত্রে পন্ডিত ও ব্যকরণবিদ ছিলেন । নাট্য ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মাহিগঞ্জের রবি মৈত্র, নলডাঙ্গার তুলশি লাহিড়ী ও মুন্সিপাড়ার কাজী মো: ইলিয়াস এবং বাড়ি বাড়ি বই দিয়ে খাতুনিয়া সার্কুলেটিং লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করে বেগম রোকেয়ার পরে যিনি অবদান রেখে অমর হয়েছেন তিনিও মুন্সিপাড়ার কৃতি মানুষ মৌলানা খেরাজ আলী । পরমানু চিকিৎসা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় ও পরমানু বিজ্ঞানে অবদান রাখায় চির অমর হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রয়াত স্বামী রংপুরের গর্ব ড: এম ওয়াজেদ মিয়া । সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হিসেবে রংপুরের মানুষের ঋণ শোধে রয়েছেন সজীব ।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায় , সুপ্রাচীনকাল থেকেই রংপুরের রয়েছে গৌরবগাঁথা সমৃদ্ধ ইতিহাস । প্রাচীন যুগ , মধ্যযুগ বিশেষত ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গ বিজয় (১২০৩) , সম্রাট আওরঙ্গজেব থেকে নবাব মুর্শীদ কুলি খান (১৭২২) , নবাব আলীবর্দি খাঁ (১৭৪০) থেকে সিরাজদ্দৌলার পতন (১৭৫৭) , পলাশী যুদ্ধোত্তর আজাদী সংগ্রাম - ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ ভারত বিভাগ, বৃটিশ শাসন , পাকিস্থানী বর্বর শোষন থেকে ৭১’র মহান স্বাধীনতা , ভাষা আন্দোলন থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ সুদীর্ঘ সময়ে রংপুরের মানুষের বীরত্বগাঁথা বিরল ইতিহাস ঐতিহাসিকভাবে রক্তস্নাত ‘ অর্জন’ ।

এক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার , আসামের গোয়ালপাড়া , ভুটানের সংকোশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল রংপুর (চার্লস পার্লিং তখন কালেক্টর ছিলেন )। ১৭৭২ সালে ভারত উপমহাদেশে পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের ১৯টি জেলার মধ্যে অন্যতম এবং পূর্ববঙ্গের ৫টি জেলার ১টি ছিল রংপুর (ওয়ারেন হেষ্টিংসের সময়কালে )। ১৭৮৭ সালে প্রাদেশিক সরকারের দেওয়ান শাসিত ২৮ জেলা পূন: বিন্যাস করে যে ১৪টি জেলা গঠিত হয় তখন পূর্ববঙ্গের ৬টি জেলার একটি হিসেবে রংপুর জেলার কার্যক্রম পরিচালিত হয় ।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রাচীন যুগ ও মধ্যযুগীয় বিভিন্ন শাসনামল - খেন , পাল , গুপ্ত , পুন্ডু, প্রাগজ্যোতিষ , কামরূপ রাজ্য থেকে বখতিয়ার খিলজীর বঙ্গবিজয় , বারভূঁইয়া , মোঘল শাসনামল পর্যন্ত কৃষি নির্ভরতা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের মূল উপজীব্য ছিল সনাতন পদ্ধতির । নবাব ও সুলতানী শাসনামল এবং মোঘল থেকে বৃটিশ আধিপত্য বিস্তার পর্যন্ত জমিদার প্রথা ছিল কোচ-মোঘল রাজস্ব ব্যবস্থায় শাসিত আদি সামন্ত প্রথা । এসব কারণে রংপুরের মানুষের মানষিকতায় জমিদারি স্বভাব , উদারতা , আরাম প্রিয়তা ,ভোগ বিলাস , অতিথি পরায়ণ, খাদ্য ও সাংস্কৃতিক প্রিয়তা , চাকুরী - ব্যবসা বিমূখতা এ সময়ের অর্থনীতি ও জনজীবনের কর্মকান্ড বিশ্লেষনে এ অঞ্চলের বৈষম্য, শোষন , বঞ্চনার বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে ।

বাংলাদেশেই নয় পৃথিবীর বিরল কয়েকটি পণ্য রংপুর অঞ্চলের পরিচিতি ও বৈশিষ্ঠ্যে বিশেষত্ব এনেছে । এর মধ্যে লাপাশাক , সেঁদল , শিলবিলাতি আলু , হাড়িভাঙ্গা আম ও শতরঞ্চি । যা দেশ - বিদেশে সুখ্যাতি ছড়িয়েছে। একই ভাবে এই রংপুর তথা রঙ্গপুরেই প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় । ছাপাখানার প্রচলনও শুরু এখান থেকেই। কুন্ডি জমিদার কালীচন্দ্র রায় চেীধূরীর পৃষ্টপোষকতায় পালিচড়া থেকে গুরুচরণ রায়ের সম্পাদনায় ১৮৪৭ সালে‘ রঙ্গপুর বার্তাবহ’ নামে দেশে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশিত হয় । এটি ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা , প্রকাশ হতো প্রতি মঙ্গলবার । এই রংপুরের মুন্সিপাড়ার কৃতি সন্তান মাহমুদ হোসেন সাংবাদিকতায় দেশ বিদেশে সুনাম অর্জন করেন। তিনি পাকিস্থানের বিখ্যাত ডন পত্রিকার সম্পাদক ছাড়াও ভারত- পাকিস্থানের বিভিন্ন পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ দ্বায়িত্ব সুনামের সাথে পালন করে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছেন। মিঠাপুকুরের রাণীপুকুরের আখতারুল আলম ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম ছাত্র যিনি দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক সহ বিভিন্ন পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন । লুব্ধক নামে কলাম লেখার জন্য বিখ্যাত হয়েছিলেন এবং বিজ্ঞান না কোরআন গ্রন্থ রচনা ও পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ গ্রন্থ সম্পাদনা করে রংপুরের সংগ্রামী মানুষের বিরল ইতিহাস তুলে ধরেছেন । রাষ্ট্রদূত হিসেবেও তিনি সুখ্যাতি অর্জন করেছেন ।

এই রংপুরের গংগাচড়ার গর্বিত সন্তান ইত্তেফাকের চীফ ফটোগ্রাফার আফতাব আহম্মেদ আলোকচিত্রের বর্নিল কারুকার্যে পেয়েছেন একুশে পদক । মোনাজাত উদ্দিনও মরোনোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন । নাট্যকার , সাহিত্যিক অধ্যাপক নূরুল ইসলামও একুশে পদক পেয়ে আমাদের গর্বিত করেছেন । এ ছাড়া নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ , আমিনুল ইসলাম , আবু সাদেক পেয়ারা,আব্দুল মজিদ সাংবাদিকতায় অনুজদের আদর্শ হয়ে আছেন । মহান মুক্তিযুদ্ধে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে রংপুরের রয়েছে গৌরবগাঁথা বিরল দৃষ্টান্ত । মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে সে সময় ৩টি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল । একটি শেখ মণির সম্পাদনায় আর ২টি রংপুরের দুই সম্পাদকের সম্পাদনায় প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছিল । একটি সাপ্তাহিক রণাঙ্গন আর অন্যটি সাপ্তাহিক সোনার বাংলা । একটির সম্পাদক ও প্রকাশক খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, অন্যটির ফুলু সরকার । সবচেয়ে রূঢ় বাস্তবতা হলো -এ ২টি পত্রিকা বিতরণ করতে গিয়ে ২ জন সাংবাদিকের আত্মোৎসর্গ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা । একজন খন্দকার বদিউজ্জামান রাজারহাটের নজিমখাঁয় রাজাকারদের রোষানলে পড়ে জীবন দিয়েছেন , অন্যজন নূরুল ইসলাম ঢালী পাক সেনাক্যাম্পে নির্যাতনের পর লাহিড়ীর হাট বধ্যভূমিতে গুলি করে হত্যা করা হয় । এদের পরিবার স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও পায়নি যথাযোগ্য মর্যাদা । তবে কুড়িগ্রাম জেলা ও রাজারহাট উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে নজিম নজিমখাঁ স্কুলের পাশে কয়েক বছর আগে খন্দকার বদিউজ্জামান কবরটি তার পরিবারের সম্মতিতে পাকা করে সংরক্ষন করা হয়েছে।

ভাষা আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের মানুষের বিরোচিত ইতিহাস বিশ্বখ্যাত । ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলনে রংপুরের ছাত্র জনতা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে । ঢাকায় গুলিতে হত্যাকান্ডে রংপুরে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে । ইপিআরের গুলিতে ৩ ছাত্রসহ অনেকে আহত হয় । দমননীতি উপেক্ষা করে চলে মিছিল - বিক্ষোভ । ভাষার দাবিতে এই আন্দোলনে ছাত্র নেতাদের সাথে কারমাইকেল কলেজের ৩জন অধ্যাপকও যুক্ত ছিলেন । তাঁরা হলেন বাংলা বিভাগের জসিম উদ্দিন , দর্শন বিভাগের কলিম উদ্দিন মন্ডল ও অর্থনীতি বিভাগের গোলাম আযম । অনেক ছাত্র নেতার সাথে কারমাইকেল কলেজের ২জন অধ্যাপকও কারাবরণ করেন । ১৯৫৭ সালে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে কাঁদা মাটি দিয়ে প্রথম শহীদ মিনার স্থাপন করা হয় । ১৯৭১ এ স্বাধীনতার উষালগ্নে কৈলাশরঞ্জন স্কুলের ৭ম শ্রেণীর ছাত্র শংখু সমজদারের অকাতরে জীবনদান মুক্তিযুদ্ধে নতুন প্রাণ সঞ্চার করে । ৩রা মার্চে হরতালের মিছিলে অবাঙ্গালীর গুলিতে প্রাণ হারায় ১২ বছরের এই শিশু । সেই স্বাধীনতার প্রথম শহীদ । ২৫ মার্চে কালরাত্রিতে দেশব্যাপি অপারেশন সার্চ লাইট ভয়াল হত্যাযঞ্জ শুরু হলেও রংপুরে তা ঘটেছে একদিন আগে । দেশব্যাপি স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর আগেরদিন ২৪ মার্চ দামোদরপুরে ঘটে এক লোমহর্ষক ঘটনা । পাক আর্মির লেফটেন্যান্ট আব্বাস ও কয়েকজন সেনা সদস্য বাঙ্গালী ড্রাইভার চালিত গাড়ি নিয়ে ঐ গ্রামে খাদ্য সংগ্রহে গেলে তাদের উপর আক্রমন করে সংঘবদ্ধ জনতা । শাহেদ কসাই গাড়িতে আকস্মিক লাফিয়ে ওঠে এবং এলএমজি ছিনিয়ে নিয়ে বল্লমের আঘাতে ক্যাপ্টেনকে হত্যা করে । এ ঘটনায় ৩ সেনা সদস্য আহত হয় । এ দিন রণভূমি রঙ্গপুরে যে অবিস্মরনীয় ঘটনা ঘটে তাঁর খেসারত দেয় গনেশপুরের বাসিন্দারা । ঐ গ্রাম জালিয়ে দেয় পাক সেনারা ।

২৮শে মার্চ রংপুরে ঘটে বিশ্বের বিরল ঐতিহাসিক ঘটনা । সাধারন দেশীয় লাঠি- বল্লম, তীর - ধনুক নিয়ে আধুনিক মারনাস্ত্র ট্যাংক- কামান , মেশিনগানের বিরুদ্ধে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও এক দু:সাহসী ঘটনা । বিভিন্ন গ্রাম থেকে হাজার মানুষ ক্যান্টমেন্ট আক্রমণে অংশ নেয় । এতে সহ¯্রাধিক মানুষ নির্মমভাবে প্রান হারায় । এ আন্দোলনের অন্যতম নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম গোলাপ অল্পদিন আগে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেও কালের স্বাক্ষী হিসেবে এখনও বেঁচে আছেন শাহ আব্দুর রাজ্জাক,শেখ আমজাদ হোসেন ও মজিবর মাষ্টার । দেশের ৩ হাজার বধ্যভূমির মধ্যে রংপুরেই রয়েছে ১৮টি । এর অনেকগুলো এখনো রয়েছে অযতেœ - অবহেলায় । এসবে এ অঞ্চলের শিক্ষাবিদ , চিকিৎসক , আইনজীবি , রাজনৈতিক বিশিষ্ঠ্য জনদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । বিভিন্ন নির্যাতন কেন্দ্রে নারী-পুরুষদের নির্যাতন করে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় । টাউন হল নির্যাতন কেন্দ্রের অন্যতম স্বাক্ষী বাহারকাচনা তকেয়ার পাড়ের বিরাঙ্গণা মনসুরা । সংবাদকর্মীদের প্রচেষ্টায় শংখুর মা দীপালি সমজদার স্বাধীনতার ৪১ বছরে পেয়েছে বাড়ির দলিল,বিরাঙ্গনা মনসুরা পেয়েছে ৪৫ বছরে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি, পেয়েছে আধা পাকা বাড়ি, শাহেদ কসাই ও শংখুসহ ৩রা মার্চে শহীদদের নামে সড়কের নামকরণ হয়েছে,শাহেদ কসাইর কবর হয়েছে পাকা, স্ত্রীর ভিটায় উঠেছে আধা পাকা ঘর।

কৃষি নির্ভর রংপুর অঞ্চল উদ্বৃত্ত ফসল ও সমতল উর্বর ভূমির জন্য সুপ্রসিদ্ধ । ধান, পাট, তামাক , রেশম প্রভৃতি অর্থকরি ফসলের জন্য প্রাচীন কাল থেকে রংপুর অঞ্চল সমৃদ্ধ। এখান থেকে ১৫০ কোটি টাকার উন্নত মানের বার্লি তামাক বিদেশে রপ্তানী হয় । তবে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যগত নিয়ন্ত্রণের কারনে তামাক চাষ কমছে । বাড়ছে আলুর চাষ । দেশের সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন এলাকা হিসেবে ইতোমধ্যে রংপুরের সুনাম ছড়িয়েছে । তবে অপরিকল্পিত চাষ , চাহিদার চেয়ে উৎপাদন বেশি , ক্রেতা,সংরক্ষন ও বাজার সমস্যায় মূল্য বিপর্যয়ে কখনও রাস্তায় নামে কৃষক । যদিও সরকারী ও বেসরকারী উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হয় কিন্তু স্থায়ী ভাবে এর সংরক্ষন এবং বহুমূখী ব্যবহার বিশেষত আলু প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে না ওঠায় এক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা কাটেনি । হিমাগার শিল্প , ব্যবসায়ী ও চাষীরা এখনও রয়েছে ঝুঁকিতে । কৃষি পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে লোকসান গুনলে উৎপাদনে তার প্রভাব পড়ে । মূলত এ অঞ্চলের কৃষকদের মধ্যে যে পণ্যের মূল্য পায় সে দিকে ঝোঁকার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় । তবে কৃষি গবেষনার অগ্রগতিতে স্বল্প জীবনকালের খরা-বন্যা সহি¯œু বিভিন্ন উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনে এক সময়ের মৌসুমি কর্মাভাব , খাদ্যাভাব ও মঙ্গার প্রকোপ তেমন না থাকলেও নদী ভাঙ্গন , প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব বিদ্যমান থাকায় সারা দেশের চেয়ে এখানে দারিদ্যের হার তুলনামূলক বেশি ও মাথা পিচু আয় কম ।

এ ছাড়া কৃষির প্রতি বেশি মাত্রায় নির্ভরশীলতা , কৃষি পণ্যের ন্যয্য মূল্য না পাওয়া, শিল্পায়ন সমস্যা ,দেশ বিদেশে কর্মসংস্থানের সমস্যা নানা কারনে স্থায়ীভাবে দারিদ্র বিমোচন সমন্বিত হচ্ছে না । যদিও খাদ্য উৎপাদন অনেক বেড়েছে , অকৃষি খাতে কর্মসংস্থান কিছুটা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার পরেও এ অঞ্চলের কৃষকের ভাগ্যের আশানারূপ পরিবর্তন ঘটে নি। বরং এক শ্রেনীর মধ্যস্বত্তভোগী ফটকা বানিজ্যিক মোটাতাজাকরন অস্বাভাবিক হওয়ায় সামাজিক স্থিতিশীলতা ও আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে বৈষম্য ও নেতিবাচক প্রভাব বাড়ছে । তবে অতীত ঐতিহ্যের ধারাবাহিতকা হ্রাস ও কোন কোন ক্ষেত্র পরিবর্তিত হলেও নতুন নতুন সম্ভাবনা রংপুর অঞ্চলকে আবারো সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে নিচ্ছে । যেমন ৬০ বছর পরে হলেও রংপুরে বেগম রোকেয়ার নামে বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে ।

৮ জেলার দেড় কোটি মানুষের প্রত্যাশিত বিভাগ হয়েছে । অনেক পরে রংপুরে না হয়ে দিনাজপুরে শিক্ষাবোর্ড হয়েছে। অবশেষে ২০৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সিটি কর্পোরেশন হয়েছে । মেট্রোপলিটন সিটি গড়ার কাজও এগুচ্ছে । উদ্বৃত্ত ধান - চাল বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে , আলু ,সবজী , পাট, হাড়িভাঙ্গা আম ,প্রাকৃতিক নীল ডায়িং পণ্য ও শতরঞ্চি বিদেশে রপ্তানী বাড়ছে । ক্ষুদ্র পাটকল স্থাপনে কর্মসংস্থান বাড়ছে , পাটের সূতা , বস্তা , ব্যাগ সীমিত আকারে রপ্তানী হচ্ছে । বিদেশে পুরুষের পাশাপাশি স্বল্প পরিসরে নারী শ্রমিক বিদেশী কর্মসংস্থানে যোগ দেয়ায় রেমিটেন্স আয়ে কিছুটা হলেও সুযোগ তৈরী হয়েছে , দেখা দিয়েছে নতুন সম্ভাবনা । গরূ মোটাতাজাকরণে নিরব বিপ্লব ঘটছে । তিস্তাসহ এ অঞ্চলের অভিন্ন নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করায় বৃহৎ তিস্তা সেচ প্রকল্প অকার্যকর হওয়ায় নদীর নাব্যতা কমছে, কমছে ভূ গর্ভস্থ পানির স্তর, মাটিতে কমছে খনিজ পদার্থের হার। মাছ উৎপাদনে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি বাড়লেও আমিষের চাহিদা পূরণে ক্ষুদ্র খামারীরা দুগ্ধ উৎপাদনে সাফল্য অর্জন করেছে । দেশের ৫০ ভাগ উৎপাদিত আমিষের ২৫ ভাগ চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখছে রংপুরের গাভী পালনকারী ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীরা। মশলা ও ডাল জাতীয় ফসল বহূমূখীকরণে কাগুজে পরিকল্পনা এবং বরাদ্দ থাকলেও আশানারুপ বাস্তবায়ন না হলেও ফুল , আম, লিচু , বাউকূল , ভূট্ট্রা ,হস্ত-কুটির শিল্প পণ্য উৎপাদন বাড়ছে , বাড়ছে পরিবেশ সম্মত জৈব বালাই নাশকের ব্যবহারে বিষমুক্ত ফসলের চাষ ।

বিভিন্ন নদী চরাঞ্চলে বাড়ছে ভুমিহীনদের কুমড়ো,তুলা ও নদীর পানিতে ভাসমান সব্জি চাষ। পুষ্টির জন্য জিংক সমৃদ্ধ ধান চাষ,গঙ্গাচড়ার হাবু বেনারসী পল্লিতেও নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। গড়ে উঠছে ছোট ছোট মাছ ও পশু খাদ্যের মিল কারখানা। অবকাঠামোর ক্ষেত্রে নগরীর ৪ লেন সড়ক, তিস্তা সড়ক সেতু ও ২য় তিস্তা সেতু, ব্যাবসা বানিজ্য ও শিল্প প্রসারে আশার সৃষ্টি করেছে। এমডিজি গোল বিশেষত মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমছে। সবচেয়ে দরিদ্র এই এলাকা পুষ্টির ক্ষেত্রে এ অঞ্চলের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তবে অপরিকল্পিত নগরায়নে কৃষি জমি কমছে,ইট ভাটায় উর্বর টপ সয়েলের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ঘটছে ফসল হানি, বাড়ছে পরিবেশ দূষণ। ইতিহাস খ্যাত এ অঞ্চলের অগ্রগতির পরিক্রমায় রংপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিসি প্রফেসর ড: লুৎফর রহমান , প্রথম বিভাগীয় কমিশনার জসিম উদ্দিন আহম্মেদ এবং প্রথম সিটি মেয়র মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দিন আহম্মেদ ঝন্টু’ ও প্রথম ডিআইজি বিনয় কৃষ্ঞ বালা, সিটি কর্পোরেশনের প্রথম প্রশাসক কাজী হাসান আহমেদ ও জেলা পরিষদের প্রথম নারী প্রশাসক হিসেবে এডভোকেট রেজিনা বেগমের নাম হয়েছে ইতিহাসের অংশ ।
ক্রীড়া ক্ষেত্রেও রংপুরের রয়েছে সোনালী অতীত । স্থানীয় খেলা হাডুডু কাবাডি ছাড়াও ফুটবল , ভলিবল , টেবিল টেনিস ,

ব্যান্ডমিন্টন , হ্যান্ডবল , কুস্তি, এ্যাথলেটিক্স , ক্রিকেটে এ অঞ্চলের খেলোয়াড়রা অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করছেন । ১৯৩২ সালের পূর্বে তাজহাট ক্লাব, এরপর টাউন ক্লাব এবং ১৯৫৪ সালে জেলা ক্রীড়া সংস্থা গঠিত হলে ক্রীড়া ক্ষেত্রে সূবর্ণ সময় অতিহাহিত হয় । জেলার অনেক কৃতি খেলোয়াড় দেশ - বিদেশে রংপুরের সুনাম ছড়িয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন । নিভৃত গ্রাম পালিচড়ার নয়াপুকুর নারী ফুটবল দলের সুনাম এখন পৃথিবী জুড়ে।

আফগান কাবুলিওয়ালা , ইরানীরা , আতর-সুরমা বিক্রেতারা , ছাতার কারিগররা এখন এ অঞ্চলে না এলেও বহুজাতিক কোম্পানী, দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা উন্নয়ন সহায়তায় কাজ করায় আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে । তবে খনিজ সম্পদ উত্তোলনে নিরূৎসাহ বিশেষত খালাশপীরসহ কয়লা খনির কয়লা উত্তোলনে চক্রান্ত শেষ না হওয়ায় সম্ভাবনার শতভাগ সুযোগ কাজে লাগছে না । গ্যাস সরবরাহ ,কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন , স্থল বন্দর,রেল ও সড়ক যোগাযোগ- অবকাঠামো উন্নয়ন কাংখিত না হওয়ায় বিনিয়োগ সম্ভাবনা বাড়ছেনা , বাড়ছেনা প্রত্যাশিত শিল্পায়ন । তবে এ অঞ্চলে যে ঐতিহাসিক নিদর্শন ও পর্যটন সম্ভাবনা রয়েছে তার উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ালে পর্যটক আকর্ষন সম্ভব হলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় সম্ভব ।

রংপুরে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের মধ্যে ১৮৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর জিলা স্কুল , ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর পাবলিক লাইব্রেরী দেশে ৪টি স্থাপনার একটি ও বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবে প্রতিষ্ঠিত রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ বৃটিশ স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন প্রতœ সম্পদ, মোঘল স্থাপত্য নিদর্শন মাওলানা কেরামত আলী মসজিদ , ইন্দো-স্যাসানিয় স্থাপত্য শৈলীর রংপুর টাউন হল দেশে এই ভবনও মাত্র ৪টি , ১৯১৮ সালে বৃটিশ গভর্নর টমাস ডেভিড ব্যারন কারমাইকেলের প্রচেষ্টায় তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয় এ অঞ্চলের শেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ কারমাইকেল কলেজ । এখানে রয়েছে ক্যান্সার নিরসনের ঔষধি গাছ কাইজেলিয়া যা উপমহাদেশে বিরল। তাজহাট জমিদারবাড়ি বর্তমানে রংপুর যাদুঘর । সুদুর পাঞ্জাব থেকে গোপাল লাল এর পূর্বপুরূষ রংপুরের মাহিগঞ্জে টুপি বা তাজে হীরা - মানিক , জহরত সংযুক্ত করে ব্যবসা করায় স্থানটি তাজহাট নাম হয় ।

অনেক অর্থবৃত্তের অধিকারী এই ব্যবসায়ী জমিদারী পত্তন নেয়ায় তাজহাট জমিদার নামে সুপরিচিত হন । তিনি দৃষ্টিনন্দন রাজপ্রাসাদ নির্মান করেন যা আজও পর্যটকদের মোহিত করে । বর্তমানে যা যাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থী ও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখায় তাজহাট রাজার নামে জিএল রায় হোস্টেল , ক্রীড়া ও আথর্- সামাজিক ক্ষেত্রে অবদানের জন্য গোবিন্দ লাল গোল্ডকাপ ও জিএল রায় রোড স্মৃতি বহন করে। এ ছাড়া ডিমলার রাজা জানকি বল্লব সেন যিনি প্রথম পৌরসভার চেয়ারম্যান হয়ে নিজ বাগান বাড়িতে প্রতিষ্টিত করেন রংপুর পৌরসভা যেখানে এখন সিটি কর্পোরেশন স্থাপিত , যিনি মাতা শ্যামাসুন্দরীর নামে নগরকে জলাবদ্ধতা ও পীড়ার আকর থেকে রক্ষা করতে শ্যামাসুন্দরী খাল কেটে চির অমর হয়েছেন ।

এ ছাড়া ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জেলা পরিষদ , বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দ - যেখানে গড়ে ওঠেছে স্মৃতিকেন্দ্র। ইখতিয়ার উদ্দিন বখতিয়ার খিলজীর স্মৃতি বিজড়িত খাসবাগ , বখতিয়ারপুর , শতরঞ্চি শিল্প ও ক্যান্টমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনের নিশবেতগঞ্জ, টেপা , বামনডাঙ্গা , মস্থনা জমিদারবাড়ি , ডিমলা কালি মন্দির , ধর্মসভা , পীরগঞ্জে রাজা নীলাম্বরের কাঁটাদুয়ার , নূরুলদীনের জন্মভূমি মিঠাপুকুরের ফুলচৌকি ,পীরগাছার ইটাকুমারী রাজবাড়ি- ১৭৮৩ সালের প্রজাবিদ্রোহের সূতিকাগার , কল্যাণীর নব্দীগঞ্জ, নাপাইচন্ডি -দেবীচৌধুরাণীর সাথে বৃটিশ যুদ্ধে তাঁর মৃত্যুস্থান ,কাউনিয়ার ভূতছড়ায় বৃটিশের সাথে যুদ্ধ ও দেবী চৌধুরানীর পিত্রালয় শিবু কুন্ঠিরাম, হারাগাছের ধুমনদী যেথানে পরিখা খুড়ে অবস্থান ও যুদ্ধপরিচালনা করেছেন ভবানী পাঠকÑ দেবী চৌধুরানী সেই ঐতিহাসিক ধুমেরকুঠি অন্যদা নগরের সন্ন্যাসীর মঠ, উলিপুরের বজড়া, ডালিয়া-দোয়ানিতে দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা সেচ প্রকল্প , পাটগ্রামে তিনবিঘা করিডোর,তিস্তা সড়ক সেতু,সিটি চিকলীপার্ক,ঘাঘট নদীর উপর বিনোদন পার্ক প্রয়াস, এসব স্থানে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তুললে পর্যটকদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার উন্মোচিত হবে । বিভাগীয় ষ্টেডিয়াম,অডিটরিয়াম,শহীদ মিনার,মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স,সুইমিং পুল,চিত্তবিনোদনের পার্ক, প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল,কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পাঞ্চল,২য় বিসিক শিল্প নগরী,আইটি পার্ক ও কৃষি যন্ত্রাংশের কারখানা এবং সার ও সিমেন্ট কারখানা গড়ে তোলা সম্ভব হলে হারানো ঐতিহ্য ফিরে আসবে , ঘুরে দাঁড়াবে দেশের প্রাচীন জনপদ ; রঙ্গরসে ভরপুর - সম্ভাবনাময় রংপুর ।

আফতাব হোসেন:, সাংবাদিক , প্রতিনিধি বৈশাখী টিভি , কলাম লেখক , সংবাদ বিশ্লেষক , সাংস্কৃতিক কর্মি ।

মতামত