Today: 22 Feb 2017 - 11:20:03 pm

পঞ্চগড়ে পর্যটকদের মূল আকর্ষণ রকস মিউজিয়াম

Published on Tuesday, November 8, 2016 at 7:18 am

roks-musiডেস্ক: রকস মিউজিয়াম বা পাথরের জাদুঘর। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের ক্যাম্পাসের ভেতরে এই জাদুঘরের অবস্থান। শুধু বাংলাদেশে নয় এশিয়ার মধ্যে এ রকস পাথরের জাদুঘর আর দ্বিতীয়টি নেই। তাই তো জেলার বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের মূল আকর্ষণ পঞ্চগড়ে রকস মিউজিয়াম বা পাথরের জাদুঘর।

দর্শনার্থীদের চাপে কর্তৃপক্ষকে বন্ধের দিনও কলেজ ক্যাম্পাস খোলা রাখতে হয়। কলেজের প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকলেই মাঠের একপাশে নজরে আসবে বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় পাথর যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এসব পাথরের আকৃতিও ভিন্ন। কিছু পাথরে বিভিন্ন ধরনের সাংকেতিক চিহ্ন আঁকা রয়েছে। কলেজের দক্ষিণ অংশের দেয়াল বরাবর দ্বিতল ভবনের এই জাদুঘরের ভেতর থরে থরে সাজানো রয়েছে হরেক রকমের পাথর। সে সঙ্গে রয়েছে প্রাচীনকালের মানুষের ব্যবহার্য্য বিভিন্ন জিনিসপত্র। নদী থেকে পাওয়া বিশালাকার দু’টি নৌকাও ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে জাদুঘরের ঠিক মাঝখানে।

সুত্রে প্রকাশ, ১৯৯৭ সালে কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হক ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে তোলেন ব্যতিক্রমী এই জাদুঘরটি। এ অঞ্চলের ভূখন্ডের বয়স নির্ণয়, ভূ-বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান, প্রাগৈতিহাসিক কালের নমুনা সংগ্রহ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং পুরাতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করার জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক এ জাদুঘরটি স্থাপন করা হয়েছে।

আদিকাল থেকেই হিমালয় থেকে বয়ে আসা বিভিন্ন নদীর কারণে এ জেলার ভূগর্ভের অল্প গভীরে রয়েছে প্রচুর নুড়ি পাথর। আর মাটির অনেক গভীরে রয়েছে প্রাচীন যুগের শিলাস্তর। মাটির গভীর থেকে পাথর তুলতে গিয়ে বেরিয়ে আসে প্রাচীন যুগের এই প্রস্তুর খন্ড। এই শিলাস্তর সংগ্রহ করে কালানুক্রমিকভাবে গড়ে তোলা হয়েছে রকস মিউজিয়াম বা পাথরের জাদুঘর।

জাদুঘরের অভ্যন্তরীণ গ্যালারীতে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতি, রঙ ও বৈশিষ্ট্যের আগ্নেয়শিলা, পাললিক শিলা ও নুড়ি পাথর, সিলিকা নুড়ি ও সিলিকা বালি, হলুদ ও গাঢ় হলুদ বালি, কাঁচবালি, খনিজবালি, সাদা মাটি, তরঙ্গায়িত চ্যাপ্টা পাথর, লাইমস্টোন, পলি ও কুমোর মাটিসহ কঠিন শিলা। এছাড়াও অন্য গ্যালারিতে একটি জাতিতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাও স্থাপন করা হয়েছে। এতে রয়েছে পঞ্চগড় অঞ্চলের আদিবাসী, উপজাতিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র এব্ং নদীর নিচে ও ভূগর্ভে প্রাপ্ত অশ্মীভূত কাঠ, তিনশ’ থেকে ২ হাজার বছরের পুরনো ইমারতের ইট, পাথরের মূর্তি এবং পোড়ামাটির নকশা।

উন্মুক্ত গ্যালারিতে রয়েছে বিশাল আকৃতির বেলে পাথর, গ্রানাইট পাথর, কোয়ার্জাহিট, ব্যাসল্ট, শেল, মার্বেলসহ বিভিন্ন নামের ও বর্ণের শিলা, সিলিকায়িত কাঠ বা গাছ থেকে পাথর , নকশা করা অলংকৃত খিলান ও স্লাব পাথর, বিভিন্ন রেখা, লেখা ও চিত্রাঙ্কিত শিলা এবং ধূসর ও কালো রঙের কাদা।

এখানে রয়েছে দু’টি নৌকা। একটিমাত্র শালগাছ কেটে এই বিশাল আকারের নৌকা দু’টি তৈরি করা হয়েছে। নৌকার দৈর্ঘ্য ২২ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর বয়স প্রায় তিনশ’ বছর।

এ ধরনের নৌকা প্রাচীনকালের আদিবাসীরা প্রশান্ত মহাসাগরের দীপপুঞ্জে ব্যবহার করতো বলে সংশিষ্টরা ধারণা করছেন। পঞ্চগড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগৃহীত কয়েকটি বিশালাকৃতি পাথরে নিয়মিত পূজা নিবেদন করা হতো। কয়েকটি পাথর সম্পর্কে প্রচলিত ছিল অলৌকিক কাহিনী। একটি পাথরের নামে স্থানের নামেই ছিল ‘পাথর ঠাকুর’। বড় বড় বেশ কয়েকটি পাথর সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ছিল খুব ভীতি। পাথর মানুষকে স্বপ্ন দেখিয়েছে, কথা বলেছন, প্রচলিত ছিল এমন জনশ্রুতিও। রকস মিউজিয়ামে রক্ষিত কোনো কোনো পাথরে রয়েছে নান্দনিক কারুকাজ। একটি পাথরে খোদিত রয়েছে ‘তীর-ধনুক’ ও দেবীর চোখের চিত্র। একটিতে খোদিত রয়েছে শ্রী শব্দটি অন্য একটি পাথরে খোদাই করা আছে একটি তিব্বতি চাইনিজ বর্ণমালা।

একটি পাঁচফুট লম্বা কোয়ার্জাইট পাথর স্থাপিত হয়েছিল সম্ভবত কোনো সমাধিক্ষেত্রে। পাথরগুলোর বৈশিষ্ট্যগুলো বিশ্লেষণ করে অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন-পার্শ্ববর্তী দার্জিলিংয়ের সমকালে পঞ্চগড় অঞ্চলেও নব্য প্রস্তর যুগের সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ ভালোভাবেই বিস্তার লাভ করেছিল।

বাংলাদেশে এখনও প্রত্ন ঐতিহাসিক ও প্রস্তর যুগের হাতিয়ার ও উপকরণ খুব বেশি একটা পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধান অব্যাহত রাখলে পঞ্চগড় জেলায় হয়তো প্রস্তর যুগের প্রত্ন বস্তু আবিস্কৃত হতে পারে।

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক কানাই লাল কুন্ডু বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে এটি একটি ব্যতিক্রমি জাদুঘর। প্রাচীনকালের অনেক পাথরের সংগ্রহ রয়েছে এই জাদুঘরে। সকলের জন্য উন্মুক্ত এই জাদুঘর দেখতে দেশ-বিদেশ থেকে লোকজন আসছে। অনুসন্ধান চালালে এ জেলার মাটির নিচ থেকে আরও পাথর বের করে আনা সম্ভব।

মতামত