Templates by BIGtheme NET
আজ- মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭ :: ৯ কার্তিক ১৪২৪ :: সময়- ১২ : ৫৮ পুর্বাহ্ন
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / শংকু ভিলা

শংকু ভিলা

আফতাব হোসেন

জিএল রায় রোডের কামাল কাছনায় লাইটপোষ্টে আটকানো শংকুু স্বরনী সাইনবোর্ডটি হেলে-উল্টে পড়ায় ভালো করে চোখেই পড়ে না। একটু এগিয়ে গেলে গুপ্তপাড়ার পূর্ব উত্তরের শেষ মাথায় ছোট্ট একটি টিন শেড দেয়ালে লেখা শংকু ভিলা।

টিনের ভাঙ্গা দরজা ঠেলে ভিতরে গেলে উচু নিচু এবরো থেবরো ইট মাটি খোয়ার অসমতল আঙ্গিনা। সামনে ছোট বারান্দা। পুরোনো আধ ভাঙ্গা দরজা। ছোট দুটি কক্ষ। একটিতে থাকে বড় ছেলে ৫৮ বছরের খিলিপান বিক্রেতা কুমারেশ, তার স্ত্রী কণকলতা , তার ছেলে তন্ময়। পাশের কক্ষে দুটি ছোট বিছানা, একটিতে থাকেন অসুস্থ ও অসহায় বৃদ্ধা দীপালি। অন্যটিতে থাকে কুমারেশের ছোট ছেলে কর্ণ। বৃদ্ধার পুরো নাম দীপালি সমাজদার। পৈত্রিক নিবাস ভারতের হুগলি জেলায়। বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক কুলকেশ ভট্টাচার্য।

রংপুরের ডিমলা কালী মন্দিরের পুরোহিত সতীশ ভট্টাচার্যের সাথে পরিচয় ঘটে যশোরের নড়াইল গ্রামের সন্তোষ সমাজদারের। সখ্যতা থাকায় তিনিও পুজা ও ভোগ রান্নার কাজে যুক্ত হন ডিমলা কালী মন্দিরে। এই কাজে পরিচিতির প্রসারে কয়েক বছর পর কুড়িগ্রামের উলিপুরের অনন্তপুর বাগুয়া জমিদার বাড়িতে পুরোহিত হিসেবে নিয়োজিত হন সন্তোশ সমাজদার। সতীশ ভট্টাচার্যের মেয়ে রাণী লেখাপড়া করতো অনন্তপুরে সন্তোষ সমাজদারের কাছে। আত্মীয়তার সুবাদে রাণীর কাছে হুগলী থেকে আসেন দীপালি। এখানেই এক পর্যায়ে পরিনয় সুত্রে আবদ্ধ হন দীপালি সন্তোষ সমাজদারের সাথে। কিছুদিন সেখানে কাটিয়ে চলে আসেন রংপুরে। স্বামী সন্তোষ সমাজদার পুরোহিত ও ভোগ রান্নার কাজে ব্যস্ত থাকেন অনন্তপুরে।

ছোট্ট সেই কক্ষটিতে একটি ফ্রেমে বড় একটি ছবি। সেই ছবিতে সস্ত্রীক সন্তোষ-দীপালি, কুমারেশ, মেয়ে ঝর্ণা ও ছোট ছেলে শংকু। অন্য একক ছবিটি শুধুই শংকুর। সেই ছবির দিকে অপলক নেত্রে অনুক্ষন চেয়ে আছেন ৮০ বছরের বৃদ্ধা মা দীপালি। হাত ও কোমরে ব্যাথা ভগ্ন শরীর নিয়ে অনেকক্ষন দাড়িয়ে থাকা দেখে ছোট নাতি কর্ণের হাতের ছোয়ায় ফিরে তাকায় বৃদ্ধা। ততক্ষনে কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফোটা ফোটা জল। কয়েক ফোটা নোনা জল নাতির গায়েও পড়ে। সে বুঝতে পারছে না তার দাদি অশ্রুসিক্ত কেন? জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর না পেয়ে নির্বাক দাদিকে হাত ধরে বিছানায় নিয়ে যায়। শুয়ে পড়ে দাদি নাতি। নাতির মাথায় হাত বুলায় আর দাদি বলে, তুইতো ক্লাস ফোরে পড়িস-আর দুই ক্লাস পড়লেই সিক্স, আর সিক্সে উঠলেই আমার ভয়! কিসের ভয়? নাতির উৎসুক জিজ্ঞাসা-দাদির চোখ তখনো চিকচিক করছে। যেন মরা নদীর বালুচর। অশ্রু সজল বৃদ্ধা বলে, সে এক অনেক বড় ঘটনা। তুই বুঝবি না। নাছোর নাতির নানা প্রশ্ন না বুঝলে শুনি, শুনতে শুনতে একদিনতো বুজবো। বেদনার সমুদ্রজলে ভেজে দাদি ও নাতি। ১৯৭১ সালের ভয়াল সেই স্মৃতিচারণে উঠে আসে বিভীষিকাময় লোমহর্ষক হারানো দিনের কথা।

৩রা মার্চ, ১৯৭১ সাল। তখন গুপ্তপাড়ায় থাকতো শংকুর পরিবার। সকাল ৯ টা ১০ টা হবে। ঘরেই লেখা পড়া করছিল শংকু। হঠাৎ বাইরে হৈ চৈ, শোরগোল, মিছিলের শব্দ। কৈলাশ রঞ্জন স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র শংকু। সেই স্কুলের শিক্ষক শাহী সহ অনেক ছাত্র শিক্ষক রাজনৈতিক নেতাকর্মীর শ্লোগানে উত্তাল, পড়া ছেড়ে পাশের আলীর দোকানের ঝাপের লাঠি নিয়ে দৌড় দেয় শংকু। পিছে পিছে দৌড়ে গিয়েও নাগাল না পেয়ে ফিরে আসে তার মা দীপালি। সংসারের কাজে সময় কখন দুপুর হয়েছে বুঝতে পারেনি শংকুর মা। দুপুরের খাওয়া নিয়ে মায়ের অপেক্ষা। ঘরে না ফেরায় দুঃচিন্তায় আচ্ছন্ন মা, বাইরে পাড়ার লোকজনের কানাঘুষা ও ফিসফাসে সন্দেহ বাড়ে তার; একে ওকে জিজ্ঞেস করে অনেক পরে জানতে পারে গুলিবিদ্ধ শংকুকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেছে মুসলিম নামে এক লোক। বেহুশ মা ছুটে যায় সদরে, সাথে হাজারো মানুষ। হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে শংকু, ভালো আছে সান্তনায় কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করে হাসপাতালে। তখন মিছিলে মিছিলে উত্তাল রংপুর।

কর্ণ তার দাদিকে হাসপাতালে শংকুর কি হলো তা জানার জন্য উদগ্রীব হয়। দাদির স্নেহ কমল, অশ্রুসিক্ত তবুও চোখে মুখে গৌরবের আভা বলেন, সেই উত্তাল তেসরা মার্চের শোকাবহ অবিস্বরণীয় ঘটনার কথা-পাক সরকার জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলে বঙ্গবন্ধু সারা দেশে হরতাল পালনের নির্দেশ দেন। হরতালের মিছিল কাচারী বাজার থেকে প্রেসক্লাব হয়ে যায় তেতুলতলা অভিমুখে। ষ্টেশনের অদুরে আলমনগরে ঘোড়া পীরের মাজারের কাছে মিছিলে এক বিহারীর বাড়ি থেকে গুলি বর্ষিত হয়। শংকু উর্দু লেখা একটি সাইনবোর্ড নামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে হাসপাতালে নেয়া হলেও দেখতে পাইনি আমি। এমনকি অনেক রাতে পুলিশের গাড়িতে শংকুর লাশ এলেও দেখতে দেয়া হয়নি আমায়। পরে দখিগঞ্জ শ্মশানে তাকে দাহ করা হয়।
শংকু গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর শহরময় ছিলো উত্তেজনা। বিক্ষোভ, অগ্নি সংযোগ ও মিছিলের শ্লোগানে শহর ছিলো উত্তপ্ত। প্রশাসন কারফিউ জারি করে। মিলিটিরির গাড়ীর শব্দে শহরময় আতংক বিরাজ করে। কারফিউ ভঙ্গ করে রাস্তায় নামে জনতার ঢল। বাঙ্গালীদের দোকানে লুটপাট চালায় অবাঙ্গালীরা। বাঙ্গালী অবাঙ্গালী সংঘর্ষ বাঁধে। এ সময় বাটার গলিতে রংপুর কলেজের ছাত্র আবুল কালাম আজাদ গুলিতে ও দেওয়ানবাড়ি রোডে সরকারী কর্মচারী ওমর আলী ছুরিকাঘাতে মারা যায়। গুলিতে আহত হয় গুপ্তপাড়ার শরিফুল ও রংপুর কলেজের ছাত্র নেতা মোহাম্মদ আলী। তারাও কিছুদিন পর হাসপাতালে মারা যায়। ওই দিন শুধু শংকুই নয় আরও ১৫ জন আহত হয়েছিলো, তাদের কারোরই খোজ রাখেনি কেউ। পায়নি কোনো স্বীকৃতি, কোনো প্রতিদান, দাদির এই আক্ষেপে নাতির উত্তর-তাহলে স্বজন হারারা কাঁদবে কতকাল?

নাতির জানার আরো ইচ্ছা, কাকু দেশের জন্য প্রাণ দেওয়ায় তুমি কি অখুশি? বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মত দাদির জবাব-” দেশের স্বাধীনতার জন্য প্রথম রক্ত বিন্দু দিয়েছে আমার শংকু। এতে আমি গর্বিত”। আমার সন্তান দেশের মানুষের মুক্তির জন্য জীবণ উৎসর্গ করেছে ঠিকই, কিন্তু তার বিনিময়ে আমরা কি পেলাম? কোনো স্বীকৃতি না কোনো সম্মান ? তোর বাপ অসুস্থ, পানের দোকান করে সংসার চলে না, মাসে ৩ হাজার টাকার ঔষধ লাগে, তোদের লেখাপড়া, ভরণ পোষণ, তোর মায়ের সামান্য পিয়নের চাকরির বেতন দিয়ে কি চলে ? এই বয়সে এখনো মানুষের সাহায্য নিয়ে আমার চিকিৎসা ও তোদের মুখে অন্ন জোগাই। তাহলে এই রক্ত দান ও আত্মোৎসর্গের কি মুল্য ?

দাদি নাতির এই গল্প একবারেই অল্প নয়, নয় মুল্যহীন নিরার্থক। সে কথা বোঝে কর্ণের মা, কুমারেশের স্ত্রী। পাশের কক্ষ থেকে এসে চোখের জল মুছে দিয়ে সান্তনা দেয় বৃদ্ধা শ্বাশুড়িকে। সেও জানে ওই দিন শংকুর মতো আবুল কালাম, ওমর আলী, শরিফুল, মোহাম্মদ আলীও দেশের জন্য প্রাণ দেয়। এরকম হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে এই দেশ। কিন্তু শহীদের নামে স্বরণী হলেও আজ তা শুধুই স্মৃতি। কণকলতার কথা শেষ না হতেই প্রেসক্লাবের ফুটপাতে পান দোকান শেষে ঘরে ফেরে কুমারেশ। বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও পুত্রের ক্ষোভের কথা ঘরে ঢুকতেই শুনতে পায়। তাদের করুণ আর্তি শুনে আক্ষেপ করে বলে, শুধু আমরাই নই, শরিফুলের ভাই মন্টু মিয়া, ওমর আলীর সন্তানেরাও কিছুই পায়নি। শুধু বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ২ হাজার টাকা ও একটি সনদ ছাড়া আর কিছুই পায়নি তারা। কেউ খোজ রাখেনি তাদের। কুমারেশের কথায় ক্ষিপ্ত হয়ে বৃদ্ধা বলে ওঠেন,”৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণে শংকু সহ রংপুরে হত্যার কথা স্বীকৃত হয়েছে। তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী, এই শহীদ পরিবারদের কি কেউ দেখার নেই ? শুধু ১৬ই ডিসেম্বর ও ২৬ শে মার্চ এলে লেখালেখি, মিডিয়ায় খবর আর সংবর্ধনায় কি পেট ভরে ? বুকের ধন হারাদের বেদনা লাঘব হয়?”

কিছুটা প্রাপ্তির সুরে কুমারেশ বলে, আজকে যে বাড়িটাতে থাকছো, সেই বাড়িটাতো সরকারের দেয়া, ক্ষুব্ধ মা দীপালি অনেকটা ক্ষিপ্ত হয়েই কথার জবাব দেয়- বলে, ৭৩ সালে মুজিব সরকারের আমলে একটি বাড়ি ৭৫ টাকা ভাড়ায় আমাদের দেয়। দুই বছর পর তার ভাড়া বাড়িয়ে ১শ ৫০ টাকা করা হয়। সেটাতো শহীদ পরিবার হিসেবে বিনামুল্যে দেয়া উচিত ছিল। কুমারেশ বলে, এরশাদ সরকারের আমলে তো ৫ শহীদ পরিবারকে ৫ টি বাড়ি দেয়া হয়। সে হিসেবে ১২ শতক জমি সহ টিনশেড বাড়িটি শংকু ভিলা নামে আমরা পেয়েছি। বৃদ্ধা মা বলে উঠে, এমনি তো দেয়নি, ৭৫ হাজার টাকা সেলামির বিনিময়ে বাৎসরিক ৩ হাজার টাকা করে শোধ দিতে হয়েছে। কয়েক কিস্তি বাকি থাকায় সুদ আসলে ১ লাখ টাকা নিয়েছে। তার পরও বাড়ির দলিল পেতে লেগেছে ৪০ বছর। তাও প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘরে ঘরে ঘুরেছি কত বছর-সহজে কি দলিল পেয়েছি ? ৯৭ সাল থেকে সদরে, ডিসি অফিসে, পত্রিকায় প্রতিবেদনে সাংবাদিকদের সহায়তায় অবশেষে ২০১২ সালে টাউন হলে দলিল দেয় তখনকার ডিসি। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও আমার আশা পূরণ হয়নি। শংকু শিশুদের খুব ভালোবাসতো। আমার ইচ্ছা ছিল তার নামে একটি সংগীত বিদ্যালয় ও আর্ট স্কুল প্রতিষ্ঠার! কিন্তু বেঁচে থাকতে তা দেখে যেতে না পারার দুঃখ কোথায় রাখি ? আমি মরে গেলেও এই দুঃখ ঘুচবে না।

আজ ১৬ই ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস, চারিদিক থেকে ভেসে আসে বিজয় মিছিল, বিজয়ের নানা গান। নগরীর পায়রা চত্তরে স্মৃতিসৌধে শংকু সহ ২০ শহীদের প্রতিকৃতিতে ফুল দেয় শত মানুষ, ফুল দেয় শংকুর মা সহ পরিবারের সবাই। স্মৃতি সৌধে খুদিত অমর বাণীর কথা স্বরন করিয়ে মাকে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করে পুত্র কুমারেশ-‘‘এই শহীদের মুখ মনে কর, আমাদের মুক্তি দিতেই তারা অসময়ে বিদায় নিয়েছে”। তখনো ভেসে আসছে সংগীতের মূর্চ্ছনা-‘‘সবকটি জানালা খুলে দাওনা ওরা আসবে, চুপি চুপি————–।’’

লেখক: সাংবাদিক

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful