Templates by BIGtheme NET
আজ- রবিবার, ২০ অগাস্ট, ২০১৭ :: ৫ ভাদ্র ১৪২৪ :: সময়- ২ : ০১ অপরাহ্ন
Home / খোলা কলাম / জননেতার ঘরেফেরা

জননেতার ঘরেফেরা

এ কে এম শাহনাওয়াজ
হাজার বছর বাঙালির রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তারিখের সংযোজন ঘটেছে। এসব তারিখ বীরত্বগাথা বা শোকাবহ ইতিহাসের সাক্ষী। বাঙালির ইতিহাসে এবং ভবিষ্যৎ ইতিহাস রক্ষায় এই তারিখগুলো অনেক বেশি মূল্য ধারণ করে আসছে। ভবিষ্যৎ ইতিহাস নির্মাণেও এসব তারিখ ইতিহাসবিদদের কাছে বিশেষ মূল্য নিয়ে উপস্থিত হবে। ১০ জানুয়ারি তেমনই ইতিহাসের পথ মাড়িয়ে আসা এক উজ্জ্বল তারিখের নাম। যে তারিখটি আমাদের ইতিহাসে সংযোজিত হয়েছিল ১৯৭২-এ। বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদিন পাকিস্তানের মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে এসেছিলেন প্রিয় স্বদেশে। দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনে তিনি বাঙালিকে একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস তার শারীরিক উপস্থিতি না থাকলেও মুক্তিপাগল বাঙালিকে সার্বক্ষণিক উদ্বুদ্ধ-উজ্জীবিত করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেশ শত্রুমুক্ত করে নেতার জন্য স্বদেশভূমি প্রস্তুত রেখেছিল এদেশের মানুষ। সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই দিনের পর দিন প্রার্থনা করেছে প্রিয়নেতা শত্রুর কবল থেকে যাতে ফিরে আসতে পারেন। কূটনৈতিক তৎপরতাও চলে।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ছিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার। সেই স্বপ্ন পূরণের একটি সুযোগ পেয়েছিলেন ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের পর। গণআন্দোলনের তোড়ে পাকিস্তানের লৌহমানব আইয়ুব খান ভেসে গিয়েছিলেন। নিরেট সামরিক ব্যক্তিত্ব ইয়াহিয়া খান রাজদণ্ড হাতে নিয়ে বিপাকে তখন। টগবগ করছে পূর্ব পাকিস্তান। তিনি স্থিতিশীলতা আনবেন কেমন করে! এসময় লক্ষ্য পূরণের কূটচিন্তা নিয়ে এগিয়ে এলেন ভুট্টো। বাঙালিকে আন্দোলন থেকে সরিয়ে নির্বাচনমুখী করার জন্য ১৯৭০-এর নির্বাচন ঘোষণা করালেন। ভুট্টোর ধারণা ছিল পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সিট পেলেও দুই পাকিস্তান মিলে অন্যান্য দলের সঙ্গে কোয়ালিশন করে তিনিই হবেন প্রধানমন্ত্রী; কিন্তু বাঙালির দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ তখন পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে। আর অশেষ নির্ভরতা বঙ্গবন্ধুর ওপর। আওয়ামী লীগের মধ্য দিয়ে বাঙালি তার স্বপ্ন পূরণ করতে চায়। তাই নির্বাচনে অবিশ্বাস্য সমর্থনে আওয়ামী লীগ শুধু পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান দলই নয়, সমগ্র পাকিস্তানের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হল। এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার একক দাবিদার বঙ্গবন্ধু।

বাঙালির হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা কল্পনা করতে পারেনি পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা। এক ভয়ংকর সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নেয় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিকে নিশ্চিহ্ন করে নিষ্কণ্টক করতে চায় নিজেদের পথচলা। এই ছক থেকেই গোপন ষড়যন্ত্রে ‘অপারেশন সার্চলাইটে’র প্রস্তুতি নেয়। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী শুরু করে গণহত্যা। ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে। তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে।

বঙ্গবন্ধুর কায়িক অনুপস্থিতির পরও তার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল; কিছুসংখ্যক পাকিস্তানের তাঁবেদার দালাল ছাড়া দল-মত নির্বিশেষে সব বাঙালি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকলেও বঙ্গবন্ধুর প্রেরণা গোটা ৯ মাসই উজ্জীবিত রেখেছে বাংলার মুক্তিপাগল মানুষকে। বাঙালি তাকে ধারণ করেছে গোটা যুদ্ধকালীন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রতি রাতে ‘বজ্রকণ্ঠ’ নামে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অংশবিশেষ প্রচার করত। বাঙালি কান পেতে থাকত বজ্রকণ্ঠ শোনার জন্য। এর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অস্তিত্ব অনুভব করত। অনুপ্রেরণা লাভ করত।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশজুড়ে নানি, দাদি আর মায়েরা বঙ্গবন্ধু যাতে শত্রু শিবিরে নিরাপদে থাকেন, এর জন্য প্রায়ই রোজা রাখতেন। সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবাই প্রার্থনা করতেন। এমন জনপ্রিয়তা কম নেতারই ভাগ্যে জোটে। এমন একজন নেতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস সবসময়ই তাই অবিস্মরণীয়।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন জুলফিকার আলী ভুট্টো। বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাঙালির ওপর চালানো গণহত্যা এবং বঙ্গবন্ধুকে বন্দি ও হত্যা ষড়যন্ত্রের নীলনকশার নায়ক ভুট্টো বাধ্য হন বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। তিনি নিজে একটি চার্টার্ড বিমানে উঠিয়ে দিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তায় লেখেন ‘পাখি উড়ে গেছে’। ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি নিউজউইকে প্রকাশিত নিবন্ধে জানা যায়, ভুট্টো কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রাওয়ালপিন্ডি বিমানবন্দরে যান এবং তাকে একটি চার্টার্ড বিমানে উঠিয়ে দেন। পরে লন্ডন ও নয়াদিল্লি হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন জনগণের নেতা।

জনগণের ভালোবাসায় সিক্ত বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে আর এক নজর দেখতে ১০ জানুয়ারি লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল বিমানবন্দর আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডাররা যার যার যোদ্ধাদল নিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়েছিল ময়দানে। একজন প্রকৃত জননেতা, মাটি ও মানুষের নেতার এত ভালোবাসা পাওয়ার ভাগ্য খুব কম ব্যক্তিরই হয়ে থাকে। বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন দিবসের স্মৃতিচারণের মূল্য এখানেই। যখন নষ্ট রাজনীতি বঙ্গবন্ধুকে জননেতার বদলে দলীয় নেতা বানিয়ে ফেলে, আবার কেউ এমন একজন নেতাকে প্রজন্মের সামনে খাটো করার অপপ্রয়াস চালায়, তখন প্রয়োজন পরে ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়া।

স্বাধীন বাংলাদেশে বাঙালির স্বাধীনতা যারা চায়নি, তেমন দেশী-বিদেশী চক্রের ষড়যন্ত্র থেমে থাকেনি। তাই মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর স্বাধীন বাংলাদেশে মার্কিন-পাকিস্তান-সৌদি লবি প্রতিশোধের নেশায় মত্ত হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর সফল নেতৃত্ব তাদের ভীত করে তুলেছিল।

বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা স্বাধীন দেশেও ছিল আকাশচুম্বী। বাংলাদেশ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে শক্ত পায়ে দাঁড়াতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়বে। পাকিস্তানের চেষ্টা ছিল বাংলাদেশে তাদের সেবাদাস ধর্মীয় দলগুলোর মাধ্যমে নৈরাজ্য তৈরি করে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে অজনপ্রিয় করে তোলা। এই লক্ষ্যে তারা অনেক দূর অগ্রসরও হয়েছিল। আওয়ামী লীগের ভেতরে ভাগাড়ের শকুন খোঁজার চেষ্টা হল। মোশতাকের মতো শকুন পেতেও দেরি হল না। এরা বুঝেছিল প্রো-মার্কিনি আর প্রো-পাকিস্তানি প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে হলে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে সমূলে বিনাশ করতে হবে। কারণ বাংলার মানুষের হৃদয় থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভালোবাসা মুছে ফেলা কঠিন। এভাবেই ১৫ আগস্টের কালরাত্রের নীলনকশা তৈরি হল। সেনাবাহিনীর ভেতর পাকিস্তানপন্থী শকুন পেতে দেরি হল না। এক চরম বীভৎসতায় এরা সপরিবারে জাতির জনককে হত্যা করল।

জিয়াউর রহমানের মতো একজন মুক্তিযোদ্ধা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর থেকে তৈরি করলেন বিএনপি নামের রাজনৈতিক দল। অল্পদিনের মধ্যে এই মুক্তিযোদ্ধার পাকিস্তানপ্রীতি স্পষ্ট হতে থাকল। মুক্তিযুদ্ধের অমোঘ স্লোগান ‘জয়বাংলা’ নির্বাসিত হল। চাপিয়ে দেয়া হল ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদে’র আলোকে ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। মুক্তিযুদ্ধের সময়ের দেশাত্মবোধক গণসঙ্গীত, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুকে জড়িয়ে যেসব গান ছিল তা সুচতুরভাবে নির্বাসিত করা হল রেডিও টেলিভিশন থেকে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনৈতিক দল আর পাকিস্তানপন্থীদের বিএনপি সরকারের সহযোগী করা হতে থাকল। এভাবে পাকিস্তান লবির জয়জয়কার স্পষ্ট হতে থাকল জিয়াউর রহমানের বিএনপি সরকারের মধ্য দিয়ে।

জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর খালেদা জিয়ার নেতৃত্বকালে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী পাকিস্তানি দোসর জামায়াতে ইসলামী প্রবলভাবে গ্রাস করল বিএনপিকে। খালেদা জিয়া অদূরদর্শী চিন্তায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশীদার বানিয়ে দিল জামায়াতকে। এসময় থেকে প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুকে নিষ্প্রভ করে দেয়ার প্রকল্প হাতে নিল জামায়াত-বিএনপি। পাঠ্যপুস্তক থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি উঠিয়ে দেয়া হল। বিএনপিতে যোগ দেয়া মৌ-লোভী নেতা- যারা ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলতেন, এবার তারা নিজেদের হীন মানসিকতায় জনগণের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে শুধু বললেন শেখ মুজিবুর রহমান।

এই প্রশ্নটি প্রায়ই ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা করে থাকে। আমি তাদের ফিরিয়ে নেই ইতিহাসে। বলি, ‘জননেত্রী’ আর ‘দেশনেত্রী’ দলীয় উপাধি। এগুলো যত খুশি দলীয় নেতা, কর্মী, সমর্থকরা উচ্চারণ করুক- তাতে বাধা নেই। জনগণ এসব উপাধি উচ্চারণ না করতে চাইলে কোনো অন্যায় হবে না; কিন্তু ‘বঙ্গবন্ধু’ উচ্চারণ করার দায় রয়েছে। কারণ কোনো দল তাদের নেতাকে এই উপাধি দেয়নি। ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের শক্তিতে আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে আসেন এই জননেতা। তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। লাখ লাখ মানুষের জনসমুদ্র সেখানে। শেখ মুজিব ভাষণ দেয়ার আগে ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ জনগণের কাছে প্রস্তাব রাখেন। বাঙালির নেতা- বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম করার দায়ে যিনি জীবন উৎসর্গ করতে পিছপা হননি, তিনিই বাঙালির প্রকৃত বন্ধু। তাই আজ থেকে আমরা আমাদের মহান নেতাকে বঙ্গবন্ধু বলতে চাই। এই প্রস্তাব লাখ লাখ জনতা করতালি দিয়ে সমর্থন করেছিল। এ কারণে ‘বঙ্গবন্ধু’ জনগণের দেয়া উপাধি। তাই আজ যারা সংকীর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলা এড়িয়ে চলেন, তারা অবশ্যই জনবিচ্ছিন্ন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি জনগণের রায় আর ভালোবাসাকে অস্বীকার করেন- অমর্যাদা করেন।

১০ জানুয়ারির তর্পণ এসব সত্য বারবার ফিরিয়ে আনে দৃশ্যপটে। আমরা মনে করি, নষ্ট রাজনীতির ঘেরাটোপে যারা বন্দি তাদের ইতিহাসের কাছে- সত্যের কাছে ফিরে আসা উচিত। না হলে জনগণের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবেন তারা।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful