Templates by BIGtheme NET
আজ- মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর, ২০১৭ :: ৯ কার্তিক ১৪২৪ :: সময়- ১২ : ৫৪ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’

বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকা ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’

রিদওয়ান আক্রাম

রংপুরের এক জমিদারের হাত  ধরে বাংলাদেশের প্রথম পত্রিকাটি আলোর মুখ দেখে। জনগণের পক্ষে কথা বলাসহ এটি সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিত।

ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।   প্রায় ১০ বছর টিকে ছিল পত্রিকাটি। ভারতবর্ষে সিপাহি বিদ্রোহের সময় এটি বন্ধ হয়ে যায়।

বাংলাদেশের প্রথম বাংলা পত্রিকাটি কিন্তু ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়নি। এমনকি ঢাকার আশপাশের এলাকা থেকেও নয়। আজকের রাজধানী ঢাকা থেকে প্রায় তিন শ কিলোমিটার দূরে রংপুর জেলা থেকে বের হয়েছিল ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ নামের পত্রিকাটি। প্রকাশের সময়কাল ১৮৪৭ সালের আগস্ট মাস আর ১২৫৪ বঙ্গাব্দের ভাদ্র মাস। সমসাময়িক পত্রিকার প্রকাশের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এটিও প্রকাশনার উদ্যোগ ব্যক্তিগত। আর সেটি কুণ্ডী পরগনার জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর। রুদ্রদেব চৌধুরীর তৃতীয় পুত্র রাজকিশোর রায় চৌধুরীর কনিষ্ঠ পুত্র কালীচন্দ্র কুণ্ডীর জমিদার পরিবারের এক খ্যাতনামা ব্যক্তি। সে সময় রংপুর জেলায় তিনি নারী শিক্ষার অগ্রদূত ছিলেন। নিজ গ্রাম গোপালপুরে প্রথম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ পরিবারের শিক্ষিত মেয়েকে সে স্কুলে শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ করেন। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন রংপুরে নারী শিক্ষা টেক্সট বুক প্রবর্তনের উদ্যোক্তা। এমন ব্যক্তির কাছ থেকে পত্রিকা প্রকাশের আশা করাটা স্বাভাবিকই বলা যেতে পারে।

‘বার্ত্তাবহ যন্ত্র’ নামের ছাপাখানাটাও বসান নিজেদের গ্রাম গোপালপুরেই। এটি পূর্ববঙ্গ বা বাংলাদেশের প্রথম মুদ্রণ যন্ত্রও বটে। এ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন গুরুচরণ রায়। রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক শ্রী সুরেন্দ্র চন্দ্র রায় চৌধুরী নিজের এক লেখায় পত্রিকাটি সম্পর্কে কিছু তথ্য উল্লেখ করেন, “…পরম বিদ্যোৎসাহী কবি কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর যত্নে বার্ত্তাবহের পুষ্টিসাধন হয়। এ পত্রিকার প্রথম সম্পাদক গুরুচরণ শর্ম্মা রায়, পরে সম্পাদকত্ব গ্রহণ করেছিলেন নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন নামেমাত্র সম্পাদক। পত্রিকাটির সম্পাদনার পুরো দায়িত্ব পালন করতেন কুণ্ডী বিদ্যালয়ের পণ্ডিত ভীমলোচন সান্ন্যাল এবং কবি কালীচন্দ্র রায় চৌধুরী। ”

সমকালীন রংপুরের আর্থসামাজিক এও রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’ এক দর্পণের ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং গোড়া রংপুর সমাজকে সমালোচনার মাধ্যমে নারী শিক্ষার প্রাধান্য তুলে ধরাই ছিল এ পত্রিকার অন্যতম ভূমিকা। শিক্ষিত মেয়েদের স্বামীর দীর্ঘজীবন হতো না এমন একটি কুসংস্কার তৎকালীন রংপুরে প্রচলিত থাকায় একজন লেখাপড়া জানা বা অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মেয়েকে সে সময়ে বিবাহ করা খুবই বিপজ্জনক বলে মনে হতো। কালীচন্দ্র রঙ্গপুর বার্ত্তাবহের মাধ্যমে সে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বহু প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। নারীর ‘সতীত্ব ও পতিব্রতা’-এর ওপর এক প্রবন্ধ লেখার জন্য তিনি রঙ্গপুর বার্ত্তাবহে ৫০ টাকার এক পুরস্কারও ঘোষণা করেন। পরে ১৮৫২ সালে তিনি নিজেই ‘পতিব্রতোপাখ্যান’ নামে একখানা বইও প্রকাশ করেন।

পত্রিকা প্রকাশ, লেখকদের আর্থিক অনুদন প্রদান ছাড়াও কালীচন্দ্র নিজে একজন কবিও ছিলেন। ‘বন্ধু লিখিত’ ‘বসন্ত দর্পণ’ নামে কবিতার কয়েক পর্ব তিনি রঙ্গপুর বার্ত্তাবহতে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন। এ ছাড়া তাঁর ছাপাখানায় দুখানা গ্রন্থ ‘স্বভাব দর্পণ’ ও ‘প্রেমরসষ্টক’ প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্থ দুখানার কোনো কপি না থাকায় লেখকের নাম জানা সম্ভব হয়নি। সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য তিনি নিজ নামে রৌপ্য পদক চালু করেন, পরে যা রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদের মাধ্যমে দেওয়া হতো।

কালীচন্দ্র রায় চৌধুরী যত দিন (১৮৫৪ সাল পর্যন্ত) বেঁচে ছিলেন তিনি রঙ্গপুর বার্ত্তাবহের সম্পূর্ণ ব্যয় নির্বাহ করেন। তবে পত্রিকাটির দ্বিতীয় সম্পাদক নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়ের এক লেখায় মনে হয় গুরুচরণ শর্ম্মা রায় একই সঙ্গে রঙ্গপুর বার্ত্তাবহের সম্পাদক এবং মালিকও ছিলেন। কেননা সংবাদ প্রভাকরে (১৮ সেপ্টেম্বর, ১৮৫১) প্রকাশিত এক সংবাদে স্বয়ং নীলাম্বর মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, “…সহযোগি ভ্রাতাদিগকে এবং করুণাপূর্ণ গ্রাহক মহোদয়গণকে যথাবিহিত অভিবাদন পূর্ব্বক আমি অদ্য রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ পত্রের সম্পাদকীয় আসন গ্রহণ করিলাম। …অধুনা বার্ত্তাবহ প্রকাশের বিলম্বের কারণ বক্তব্য। এই পত্রের পূর্ব্ব সম্পাদক গুরুচরণ রায় গত ৩ ভাদ্র (১২৫৮) সোমবার দিবস পরলোক গমন করাতে তাঁহার বিধবা স্ত্রী শ্রীযুতা ভাগীরথী দেবী বার্ত্তাবহ যন্ত্রের তাবৎ বস্তু ও দেনা পাওনা ইত্যাদি সমুদয় আমার স্থানে বিক্রয় করেন, কিন্তু সে সম্বাদ এলাকার মাজিষ্ট্রেট সাহেবকে না দিয়া তত্যন্ত্রের কর্ম্ম পরিচালন করা অবিধি হয় বিবেচনায় তাঁহার নিকটে দরখাস্ত করিয়া হুকুম বাহির করিতে প্রবৃত্ত হই, আর তাহা করিতেই তিন সপ্তাহ কাল অতীত হইয়া গিয়াছে। শ্রীযুত নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়। ”

এই সংবাদের ভিত্তিতে অনুমান করে নেওয়া যেতে পারে কুণ্ডী পরগনার জমিদার কালীচন্দ্র রায় চৌধুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় রঙ্গপুর বার্ত্তাবহের শুরু হলেও মালিক ছিলেন অন্যরা। হতে পারে সেসময়কার সরকারি ঝামেলা থেকে দূরে থাকতে মালিক পরিচয় থেকে নিজেকে দূরে রেখেছিলেন জমিদার কালীচন্দ্র। কেননা এই পত্রিকায় ‘রংপুরের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে লেখা সারগর্ভ নিবন্ধাদি প্রকাশিত হতো। এ ছাড়া এ পত্রিকায় প্রকাশ পেত স্থানীয় অভাব-অভিযোগ এবং স্থানীয় সরকারি কর্মচারীদের দুষ্কর্ম ইত্যাদির সংবাদাদি। ’ সরকারি নথিতে পত্রিকাটির বিষয়বস্তু লেখা হয়েছিল—‘a weekly paper of news and extracts’।

প্রথম চার বছর গুরুচরণ রায়ের সম্পাদনাতেই বের হয় ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ’। এরপর তিনি মারা গেলে ১৮৫১ সালে পত্রিকাটির নতুন মালিক ও সম্পাদক হন নীলাম্বর মুখোপাধ্যায়।

প্রতি মঙ্গলবার প্রকাশিত হতো রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ। পত্রিকাটির প্রচার সংখ্যা ছিল এক শ। বার্ষিক চাঁদার হার ছিল ৬ রুপি। তবে আগাম দিলে ৪ রুপি।

প্রায় ১০ বছর চলার পর পত্রিকাটির প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যায়। ১৮৫৭ সালের ১৩ জুন তৎকালীন ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড ক্যানিং ১৫ নম্বর আইন জারি করে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেন। এ আইনে বলা হয়েছিল, ‘রাজ অনুমতি ছাড়া কোন ছাপাখানা স্থাপন করলে কিংবা রাজ অভিমতের বিরুদ্ধে সংবাদপত্র বা পুস্তকে কোন মত প্রকাশ করলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং ২ বছরের অনধিক কারাবাস। ’ সে সময় ভারতবর্ষজুড়ে দেশি সিপাহিদের বিদ্রোহ চলছিল। এ অবস্থায় যেন বাংলাভাষী পত্রিকাগুলো বিদ্রোহের পক্ষে কোনো জনমত গড়ে তুলতে না পারে সে জন্য এই আইন চালু করেন লর্ড ক্যানিং।

রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সেই সংবাদও ছেপেছিল ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৭ আগস্ট, ১৮৫৭), ‘শ্রাবণ ১২৬৮। … ছাপাযন্ত্রের স্বাধীনতা নাশক আইন প্রচার হইবার রঙ্গপুর বার্ত্তাবহ পত্র উঠিয়া যায়। ’

পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবার তিন বছর পর ছাপাখানাটি কিনে নেন কাকিনার জমিদার শম্ভুচন্দ্র রায়চৌধুরী। ১৮৬০ সালের এপ্রিল মাসে (বৈশাখ, ১২৬৭) তিনি ‘রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ’ নামে একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ করা শুরু করেন। এর সম্পাদক ছিলেন মধুসূদন ভট্টাচার্য। একটু দেরি হলেও সেই খবর দিয়েছিল ‘সংবাদ প্রভাকর’ (১৮ মে, ১৮৬০), ‘জিলা রঙ্গপুর কাকিনীয়া ভূগোলক বাটীর জমিদার শ্রীযুক্ত বাবু শম্ভুচন্দ্র রায়চৌধুরীর সাহায্যে ১২৬৭ সালের বৈশাখ মাস অবধি দিক্প্রকাশ নামে এক খানি সাপ্তাহিক সমাচার পত্র প্রচার হইতে আরম্ভ হইয়াছে। আমরা উহার এক খণ্ড প্রাপ্ত হইয়াছি। ’

লেখক : সাংবাদিক

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful