Today: 26 Mar 2017 - 01:21:00 pm

যার জন্ম মানেই স্বাধীনতা

Published on Friday, March 17, 2017 at 9:09 pm

আফরিন নুসরাত

একজন মা যেদিন জানতে পারেন কোনও মানব শিশু তার মধ্যে বেড়ে উঠছে সেই দিন থেকেই অনাগত সেই শিশুর জন্য বাঙাল দেশের নারীরা ছোট ছোট কাঁথার ভেতরে স্নেহ, মমতা, ভালোবাসার যে আঁকিবুঁকি করে তা পুরো পরিবারটিকেই সুখের ভেলায় ভাসিয়ে রাখে পুরোটা সময় জুড়েই।

সায়েরা বেগম আর শেখ লুৎফর রহমানের পরিবারটিও একই সুতোয় গাঁথা গ্রাম বাঙলার একটি চিরায়িত পরিবারের প্রতীক।  ১৭ মার্চ ১৯২০ সালে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি ছোট গ্রাম ‘টুঙ্গিপাড়ায়’ ইতিহাসের মহেন্দ্রক্ষণে শেখ মুজিব নামের শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই যে আযান ধ্বনিত হয়েছিল, তা ছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গড়ার গোড়াপত্তনের সূচনাধ্বনি।  সেইদিনই বাংলা ভূখণ্ড স্বাধীনতার অলৌকিক সেই প্রজ্ঞাগুলো নিজের করে নিয়েছিল।  মা সায়েরা বেগম আর বাবা লুৎফর রহমানের সেই খুশির ভেলায় সেদিন ভেসেছিল স্বাধীনতাকামী বাঙালি পূর্বপুরুষদের আকাঙ্ক্ষা।

সেই দিন থেকেই দেবশিশুটি পথ চলেছিল বাংলাদেশকে পৃথিবীর মানচিত্রে জায়গা করে দেওয়ার ব্রত নিয়ে।  আমি খুব করে মনে করি, পৃথিবীতে অতি অসাধারণ কিছু মানুষের জন্ম হয় যারা কোনও গোত্র অথবা জাতিকে সভ্যতার ইতিহাসে অমর করে রাখে।  ‘শেখ মুজিব’ ছিলেন বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা।  জীর্ণশীর্ণ একটি জাতিকে তিনি শুধু একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্নই দেখাননি; তাদের ঐক্যবদ্ধ করে একটি স্বাধীনরাষ্ট্র তিনি যেভাবে আমাদের উপহার দিয়েছিলেন, সে বিষয় নিয়ে লিখতে গেলে হাজার শব্দে তার সূচনা লেখাও সম্ভব হবে না।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের প্রতিটা দিন যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাবো যে, এক অলৌকিক ছন্দে প্রতিটা বিষয় বাঙালির মুক্তির সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে জড়িত।  কেউ যদি বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাস রচনা করতে চান,  তাহলে তাকে অবশ্যই বঙ্গবন্ধুর জীবনী বলতে এবং লিখতে হবে।  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে পূর্ব পাকিস্তান গঠনের বাস্তবতা, ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট, পূর্ব পাকিস্তানের সামরিকজান্তার বিরুদ্ধে আন্দোলন, ঐতিহাসিক ছয়দফা দাবি, ৭০-এর নির্বাচন এবং সবশেষে ৭১-এর ৭ মার্চের সেই ভাষণ, যে মহাকাব্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার চূড়ান্ত স্বাদ এনে দিয়েছেন যেন এক মধুর মিশ্রণের বিক্রিয়া!

‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ প্রতিশব্দের মতো ওতপ্রতভাবে জড়িয়ে আছে একটি অপরটির সঙ্গে।  কোনোভাবেই আমরা দুটি বিষয়কে আলাদা করে ভাবতে পারি না।  অথচ অতীতে আমরা দেখেছি একটি মহল যারা বাংলাদেশকে কখনও মেনে নিতে পারেনি।  যে কারণে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বঙ্গবন্ধুর সুনিবিড় ছায়া থেকেও নতুন প্রজন্মকে আড়াল করে রেখেছিলেন খুব সুক্ষ্ম, সুচতুরভাবে।  ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে পাঠ্যবই, সব জায়গায় যাতে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারিত না হয়, সেই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে।  কিসের এত ভয় ছিল বেঁচে না থাকা এই মানুষটাকে নিয়ে? কারণ সেইসব পাকিপ্রেমীরা জানতো যে, ‘বাংলাদেশ’ যার প্রতিশব্দ, তাকে কখনই শারীরিকভাবে সরিয়ে দিলেও, বাঙালির আত্মা থেকে আলাদা করা যাবে না।

জাতির পিতার জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত থেকে যে পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা আমরা পেতে পারি, সেই শিক্ষায় যেকোনও মানুষ দীক্ষিত হলে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার জন্য তেমন প্রযোজ্য নাও হতে পারে বলে আমার বিশ্বাস।  স্বাধীনতার পরে একটি দেশকে বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে যে কূটনৈতিক কৌশল, নতুন একটি সিভিল সার্ভিস, প্রতিরক্ষাবাহিনী গঠন করা, দ্রুততম সময়ে সংবিধান প্রণয়ন, মানুষকে উজাড় করে ভালোবাসা, সব কিছুতেই শিক্ষার যে বিপুল ভাণ্ডার রয়েছে, তা শুধু বাংলাদেশ নয় আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভূক্ত হতে পারে।  এমনকি বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে খুন হওয়া, তারপর তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার যে অপচেষ্টা, অলৌকিক ভাবে বেঁচে যাওয়া তার দুই কন্যাকে দেশের মাটিতে আসতে না দেওয়া, তাদের ওপর বারবার হামলা করা সব কিছুতেই কিছু ম্যাসেজ রয়েছে, যা শিক্ষণীয়।  বাংলাদেশের মানুষের প্রতি তার যে অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসা ছিল, তাতে তিনি কোনোদিন ভাবতেও পারেননি যে, বাঙালি তার সাথে বেঈমানি করতে পারে।  রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তি হয়েও তার জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাধারণের মতো।  কেউ তার জীবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হলে, তিনি হেসে উড়িয়ে দিতেন।  ‘স্বাধীন বাংলায় সবাই তার ভাই, আত্মার আত্মীয়; কে তার ক্ষতি করবে’- এই ছিল বঙ্গবন্ধুর বদ্ধমূল ধারণা।  দেশের মানুষের প্রতি তার এই অগাধ এবং দৃঢ় ভালোবাসার সুযোগ নিয়েছিল পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা! তারপরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা।

সেই বৃহৎ পরিসরের আলোচনায় না গিয়ে খুব সহজভাবে যদি বিশ্লেষণ করি, তাহলে বুঝতে পারবো যে, একটা ব্যাপারে খুনিরা খুব ভালোভাবেই জানতো, শুধুমাত্র তাকে স্বপরিবারে নিঃশেষ করলেই চলবে না, সেইসাথে ‘শেখ মুজিব’ নামটাকেই ইতিহাস থেকে মুছে ফেলতে হবে।  পাকিস্তানের এদেশীয় দোসররা এও জানতো যে, শেখ মুজিব নামটাই এদেশের মানুষকে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের সমন্বয়ের যে রেখাচিত্র তিনি এঁকে দিয়েছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনের জন্য তা বারবার মনে করিয়ে দেবে।  স্বাধীন বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তান বানানোর যে স্বপ্ন ঘাতকরা দেখেছিলো, তা কখনই পূরণ হবে না যদি না শেখ মুজিব নামটা প্রজন্মের মাঝে বেঁচে থাকে।  কারণ বাংলাদেশ মানেই শেখ মুজিব আর শেখ মুজিব মানেই বাংলাদেশ।  ‘ছাত্রত্বে, নেতৃত্বে, পিতৃত্বে’- তিনি আছেন জড়িয়ে-ছড়িয়ে এই বাংলার দশদিগন্তে।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুর নিজের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ছাড়া এই মহান ব্যক্তিত্বকে পুরোপুরি জানা বা চেনার জন্য কোনও পূর্ণাঙ্গ রচিত পাঠ্যবই আমাদের নেই; নেই কোনও মহৎ চলচ্চিত্রও।  শ্রদ্ধেয় আব্দুল গাফফার চৌধুরী রচিত ‘পলাশী থেকে ধানমণ্ডিতে’ খণ্ডিতভাবে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের চিত্রটিই তুলে ধরা হয়েছে, যা সীমাবদ্ধ প্রচারণার জন্য বাংলাদেশের কতজন তা জানে, সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।  দলীয় এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে ‘বাংলাদেশ লিজেন্ড’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের  জীবনের কথাগুলো সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে আমরা যদি চারিদিকে ছড়িয়ে দিতে পারি, তাহলে আমার বিশ্বাস স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বাংলাদেশকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্র করছে, তা কখনোই হালে পানি পাবে না।  ‘বঙ্গবন্ধু ও  বাংলাদেশ’ জড়াজড়ি করে একই সুতোয় গাঁথা থাকবে আজীবন।

দিনপঞ্জিকার পাতায় আজ ১৭ মার্চ।  ‘মুজিবপ্রেমী’ এই হৃদয় থেকে দুটো পার্থিব প্রার্থণা করবো যা সবার প্রতি, এমনকি আমার নিজের প্রতিও।  আমরা নিজেদের যারা বঙ্গবন্ধুর অনুসারী বলে দাবি করি, আমরা সবাই যেন বঙ্গবন্ধুকে আমাদের প্রাত্যাহিক জীবনের ব্যবহার বা আচরণের দৈন্যতা-হীনতা দিয়ে ছোট না করি।  ব্যক্তিগতভাবে আমি আজকের এই দিনে মহান এই নেতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং সালাম জ্ঞাপন করছি।  পরপারে শান্তিতে থাকুন; আমরা আছি আপনার সোনার বাংলার অতন্দ্র পাহারাদার হয়ে...

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মতামত