Today: 24 Jun 2017 - 09:28:17 am

৩০ বছরে ৬৫ লাখ কিউসেক পানি কম দিয়েছে ভারত

Published on Thursday, March 23, 2017 at 8:37 am

নজরুল মৃধা: শুষ্ক মৌসুমে গত ৩০ বছরে ভারত তিস্তা দিয়ে নামা ৬৫ লাখ কিউসেক পানি থেকে বঞ্চিত করেছে বাংলাদেশকে।

শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজে প্রতিদিন পানির প্রয়োজন কমপক্ষে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক, সেখানে পানি পাওয়া গেছে ৩শ থেকে সর্বোচ্চ ৭শ কিউসেক। প্রতিবছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুম ধরা হয়। শুষ্ক মৌসুমে ভারত এই পরিমাণ পানি কম দিয়েছে বাংলাদেশকে। এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফরে তিস্তাচুক্তি না হওয়ার আশঙ্কায় এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো কর্মকর্তাই তিস্তা বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছেন না।

পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, তিস্তার ডালিয়া পয়েন্ট থেকে উজানে গজলডোবা নামক স্থানে ভারত ১৯৮৭ সালে বাঁধ নির্মাণ করে তিস্তার পানির স্বাভাবিক গতিপথ রোধ করে। এর পর থেকে তিস্তা অববাহিকায় নেমে আসে ঘোর অমানিশা। শুষ্ক মৌসুমে পানির জন্য হাহাকার ওঠে। নদীর স্বাভাবিক গতি ঠিক রাখতে প্রতিদিন এ সময় পানির দরকার ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কিউসেক; কিন্তু সেখানে পানি পাওয়া যায় ৫ ভাগের একভাগ। এই ৩ মাসে পানির প্রয়োজন পড়ে গড়ে আড়াই লাখ কিউসেক। গত ৩০ বছরে তিস্তায় পানি পাওয়ার কথা ছিল ৭৫ লাখ ৬০ হাজার কিউসেক। সেই পরিসংখ্যান মতে গত ৩০ বছরে ভারত ৬৬ লাখ কিউসেকেরও বেশি পানি আমাদের কম দিয়েছে। আবার বর্ষা মৌসুমে তিস্তার পানি ছেড়ে দিয়ে আমাদের দুকূল ভাসায় ভারত। এ সময় পানির প্রবাহ থাকে প্রায় ১ লাখ কিউসেক। এসব পরিসংখ্যান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পানি উন্নয়ন বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা দিয়েছেন।

জানা গেছে, তিস্তার পানি নিয়ে ২০০৫ সালে সর্বশেষ যৌথ নদী কমিশনের (জিআরসি) মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এর পরে ২০০৬ সালে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও ভারত সরকারের আগ্রহ না থাকার কারণে বৈঠকটি হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বৈঠকের প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময় এক বৈঠকে উভয় দেশের মধ্যে তিস্তাচুক্তি সম্পাদনের সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের অন্তর্বর্তীকালীন তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করার কথা ছিল। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে নয়াদিল্লিতে যৌথ নদী কমিশনের (জিআরসি) সর্বোচ্চ পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়। বৈঠকে তিস্তাচুক্তি ছাড়াও অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নদীর ভাঙন রোধসহ নদীর পানির ব্যবস্থা সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সান্ত¡না ছাড়া কিছুই জোটেনি বাংলাদেশের ভাগ্যে। তিস্তা নিয়ে এ পর্যন্ত কোনো চুক্তি হয়নি। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আসন্ন ভারত সফর ঘিরে তিস্তাপারের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। তবে চুক্তি সম্পূর্ণভাবে ভারত সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। অথচ পানি প্রাপ্তির ওপর তিস্তা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডালিয়া পয়েন্টের দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা গত ৩০ বছরে ৬৫ লাখ কিউসেকের বেশি পানি কম পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জানান, ২০০০ সাল থেকে তিস্তায় পানিসংকট প্রকট আকার ধারণ করে। শুষ্ক মৌসুমে কখনো কখনো ১০০ কিউসেকের কম পানি পাওয়া গেছে।

তিস্তাবেষ্টিত রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মমিনুর রহমান জানান, প্রধানমন্ত্রীর ভরত সফর ঘিরে আমরা স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি। তিস্তাপারের মানুষ আশা করছে এবার হয়তো ভারত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিয়ে এই অঞ্চলকে মরুকরণ থেকে রক্ষা করবে।

উল্লেখ্য, ১৯৪৫ সালের গোড়ার দিকে তিস্তা নদীর পানি সেচ প্রকল্পে ব্যবহারের প্রথম পরিকল্পনা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর বাংলাদেশ ও ভারত আলাদাভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেয়। ১৯৬০ সালে বিষয়টি নিয়ে প্রথম সম্ভাবনা সমীক্ষা যাচাই হয়। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে সমীক্ষা শেষে প্রতিবেদন দেওয়া হয়; কিন্তু নানা জটিলতায় পাকিস্তান আমলে প্রকল্পটি মাঠে গড়ায়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রকল্পটি আবার বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় এক লাখ ৫৪ হাজার হেক্টর জমি সেচ-চাষের আওতায় আনার মহাপরিকল্পনা করা হয়। ১৯৮০ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তিস্তা ব্যারাজ উদ্বোধনের পর প্রকল্পের প্রথম ধাপে ৫৪ হাজার হেক্টর জমি সেচের আওতায় আনা হয়। পরে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমলে এটির কার্যক্রম শুরু হয়; কিন্তু ১৯৮৭ সালে ভারত গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে নেওয়ায় বাংলাদেশের প্রকল্পটি এখন অস্তিত্বসংকটে পড়েছে।

মতামত