Today: 24 Jun 2017 - 09:34:07 am

নারী নির্যাতন ও পুরুষ নির্যাতন

Published on Thursday, April 20, 2017 at 4:26 pm

বিথী হক

যারা নারী নির্যাতন আর পুরুষ নির্যাতনকে এক কাতারে ফেলে পুরুষ নির্যাতনের ভয়াবহতা জাহির করতে চান তারা মুক্তাকে চেনেন? ময়মনসিংহের আব্দুল মালেকের কন্যা মুক্তা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে যে প্রেম করে সবার অমতে এক ‘ভ্যাগাবন্ডকে’ বিয়ে করেছিল। আজ তার কোলে এক বছরের পুত্রশিশু।

মহিলা আইনজীবী সমিতির অফিসে বসে অঝোরে কাঁদছিল মুক্তা। একটা মেয়ে কাঁদছে সঙ্গে একটি শিশু, দেখলেই যে কেউ ধাক্কা খাওয়ার কথা। সবুজ বোরখা-হিজাবে আপাদমস্তক ঢাকা মুক্তা কিছুক্ষণ পরপর চোখ মুছছিল। যৌতুকের জন্য মুক্তাকে মেরে যে ‘ভ্যাগাবন্ড’ তক্তা বানিয়ে ঘর থেকে বের করে দেয়, পরেরদিন সে মুক্তাকেই তার বাপের বাড়ি থেকে ফিরিয়ে এনে ভাত রাঁধতে বসায়। মুক্তা মুখে আঁচল চেপে ফোঁপাতে ফোঁপাতে স্বামীর পাতে ভাত বেড়ে দিয়ে বাচ্চাকে ঘুম পাড়ায়। খাওয়া শেষ হলে স্বামীদের পূর্ণ-উদ্যমে মুক্তাকে পেটাতে থাকে যৌতুক ছাড়া কেন ঘরে ফিরেছে অপরাধের অভিযোগে। সুন্দরী মুক্তা কি তবে অন্য পুরুষের সঙ্গে ভেগে যাওয়ার চিন্তাই ছিল তাই বাপের বাড়ি গিয়ে টাকার কথা তোলেনি! এবারে আরো ফুঁপিয়ে উঠলে কণ্ঠনালীর ভেতর হাত দিয়ে আলজিভ পর্যন্ত গিয়ে জিভ ধরে টান মারে। মুক্তার আর কাঁদা হয়ে ওঠে না। দেড় বছর এমন অমানবিক অত্যাচার সয়ে যখন থানায় গেলো তখন তার শ্বাশুড়ি থানায় রান্না করে বলে পুলিশ জিডি বা মামলা কিছুই নিতে চায় না।

এই যে নারী নির্যাতন নিয়ে সোচ্চার হওয়া, নারীদের নিয়ে কাজ করা, নারী-অধিকার আন্দোলনকে প্রকৃত অর্থেই আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করা; এগুলো কিন্তু খুব আধুনিক ফ্যাশনের অংশ নয়। তারপরেও নারী নির্যাতন নিয়ে কাজ করতে গেলেই কটকটে হলদে বা টিয়া রঙের শার্ট পরা বাস কন্ডাক্টর থেকে থুতনিতে দাঁড়ি রাখা, হাতে-বুকে ট্যাটুওয়ালা দামি অফিসার পুরুষরা যখন দাঁত চেপে চেপে বলেন- ‘ম্যাডাম, পুরুষ নির্যাতন নিয়ে তো কিছুই বলেন না। আপনারা নারীবাদীরা বড্ড একপেশে হয়ে যাচ্ছেন!’ আমার তখন জানতে ইচ্ছে করে শপিং এর জন্য বউ সারাদিন চিল্লা-পাল্লা করে সোফা-আলমারি মাথায় তুলে রাখার মতো ঘটনা আর মুক্তার মতো নারীদের নারী হয়ে ওঠার আগেই নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনাকে এক করার মতো বা পার্থক্য করার মতো ম্যাচিওরিটি কি সত্যিই তাদের আসেনি?

পুরুষ নির্যাতন বলে অবশ্যই একটা টার্ম আছে, পুরুষ নির্যাতনও নিশ্চয়ই সমাজের আরেকপিঠে ঘটছে। কিন্তু এই পুরুষ নির্যাতন কিন্তু পুরুষরা চাইলেই থামিয়ে দিতে পারেন, আপনাদের তথা পুরুষদের পক্ষে পুরো সমাজ। আপনাদের মাথায় তুলে রেখেছে স্বয়ং একটি সমাজ ব্যবস্থা। কিন্তু নারীরা তো চাইলেই তাদের ওপর হওয়া অত্যাচার বন্ধ করতে পারেন না। হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে এ দেশে খুব শক্ত-পোক্ত নারী নির্যাতন আইন আছে। কিন্তু জানেন কি শতকরা কতভাগ নারী এই আইনের সহায়তায় স্বাভাবিক-সুন্দর জীবন পান? জানেন, এই আইনের আশ্রয় নিতে হলে নারীকে কতদিন ধরে সকলের কাছে হেনস্তা হতে হয়! আদালত, পাড়া-পড়শি, টাকা-পয়সা সবকিছু নিজের কোমরে গুঁজে রেখে এই আইনের ছাদের নিচে যাওয়ার জন্য নারীর যতখানি শক্তি-সামর্থ্য থাকা দরকার তা এ দেশের নারীদের আছে কিনা? জানেন?

এই আইনটি যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়ার কারণে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলেই যে কোনও নারী হুট করে পুরুষের গলায় গামছা বেঁধে আইনকে কাজে লাগিয়ে টেনে-হিঁচড়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারে, তার দায় নিশ্চয়ই আইনের নয়। এই আইনকে অপ্রয়োজনীয় ও একপেশে প্রমাণ করতেই আপনারা ‘পুরুষ নির্যাতন’ আইনের জন্য ঘরের দরজা জানালা বন্ধ করে ঘরের ভেতর বসে আছেন। আপনারাই কোনও না কোনও পুরুষ নারীকে সামনে রেখে নিজেরা তার পিঠ ঠেলে আরেক পুরুষকে কোনঠাসা করতে এই আইনের অপব্যবহার করেন। তারপর দিনশেষে আপনারাই বিচার দেন দেশে পুরুষ নির্যাতন আইন কেন হয় না? কেন পুরুষদের নিয়ে নারীদের কোন চিৎকার-চেঁচামেচি করতে দেখা যায় না?

পুরুষদের জন্য যারা আলাদা আইন চান তারা বউয়ের হাতে কতবার মার খেয়েছেন বলতে পারবেন? গায়ে কয়টা বেতের দাগ আছে গুনে দেখাতে পারবেন? মুক্তার কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল নয়, আপনার চার-ইঞ্চি চুল বউ আপনার থেকে টাকা পায়নি বলে কতবার পিঠের ছাল তুলে ছেঁটে কদম ছাঁট দিয়ে ফেলেছে বলতে পারবেন? তারপরও পুরুষ নির্যাতন আইনের জন্য আপনারা ঘরে ঘরে বউ বা শ্বাশুড়ির হাতে মার খাচ্ছেন তা নিন্দনীয়। অথচ এমন নির্যাতন হলে আপনি কিন্তু আজ রাতটা বসার ঘরে ঘুমিয়ে সকালেই থানায় গিয়ে মামলা করতে পারেন।

ঘর থেকে বেরোনোর সময় জবাবদিহিতার দরকার পড়বে না থানায় যেতে। আপনার গায়ের কোন কোন স্পর্শকাতর অংশে বউ কিভাবে মেরেছে তা জানতে চাওয়ারও কথা নয়। আপনাকে বউ সংসার চালানোর জন্য টাকা দেয় না সে কথা বউকে বলতে গেলেই মার দেয় তা আপনি অকপটে বলতে পারেন। মাঝ রাতে বাচ্চা ঘুম থেকে জেগে কাঁদতে থাকলে আপনার চুলের মুঠি ধরে ঘর থেকে বউ আপনাকে বের করে দেয় এ কথা শুনলেই তো বেচারা পুলিশ কেঁদে ফেলবে। তারপর জিডির পরে আপনাকে মামলা চালানোর জন্যও বাপ বা শ্বশুর বা বউয়ের কাছ থেকে টাকা পাবেন না এমন চিন্তা করতে হয় না। ২/৪ বছর মামলা চললেও আপনার কোনও সমস্যা নাই, আপনি মামলা করেছেন বলে আপনার বিয়ে হবে না এমন সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়।

এতকিছুর পরেও যখন আপনারা বলেন পুরুষরা নির্যাতিত এবং তাদের জন্য কোনও আইন নেই তখন মনে হয় নারী-নির্যাতনকেই আপনারা হালকা করে দেখছেন। নারীকে প্রতিপক্ষ ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারছেন না। আপনাদের চোখ বন্ধ অনন্তকাল ধরে বিবেকের সঠিক ব্যবহার না করায় জং ধরে গেছে সেখানেও। তাই পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিকভাবে অবহেলিত নিরাশ্রয় এবং পিছিয়ে পড়া শারীরিক গঠনে ভিন্ন এক শ্রেণির মানুষের দুঃখ-যন্ত্রণা আর রক্তাক্ত ছিন্ন-ভিন্ন মন-শরীরকে আপনারা দেখতে পান না। কখনোই পাবেন না। আপনার বোনটি মার খেয়ে আপনার ঘরে আশ্রয় নিলে ‘স্বামীর ঘরই মেয়েদের আসল ঠিকানা’ বলে যতদিন তাকে স্বামীর ঘরে ফিরতে বাধ্য করবেন ততদিন পুরুষ নির্যাতন আইনের প্রয়োজন ফুরাবে না। মুক্তার মতো মেয়েদের কপালেও মার ছাড়া কিছু জুটবে না। একটু বিবেক খরচা করলেই যে সমাধান পথের ধারে গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত তা আজীবন তালাবন্ধ প্রকোষ্ঠে মরচে ধরে পড়ে থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক

মতামত