Today: 23 May 2017 - 12:56:12 pm

উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বারে হচ্ছে সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল

Published on Thursday, May 4, 2017 at 10:46 am

 ডেস্ক: উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার খ্যাত সিরাজগঞ্জে দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম পাশে এক হাজার ১০০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলটি।

দেশের বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠিত ১১ উদ্যোক্তা কম্পানি এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্বপ্ন সারথি। মোট জমির মধ্যে এক হাজার ৪১ একরের ব্যবস্থা করেছে সরকার। বাকি ৫৯ একর জমি নিজেদের উদ্যোগে কেনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ১১ উদ্যোক্তা কম্পানি। এখন চলছে সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ভূমি উন্নয়নের কাজ। সমীক্ষা আর মাস্টার প্ল্যান তৈরির জন্য জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যে চারটি কম্পানি অংশগ্রহণ করেছে, এখন চলছে তার বাছাই প্রক্রিয়া। এই চারটির মধ্যে একটি কম্পানিকে কাজ দেওয়া হবে। জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন। জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৯৭ কোটি টাকা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মাধ্যমে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে বুঝিয়ে দিয়েছে ১১ উদ্যোক্তা কম্পানি। আগামী জুনের মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপূরণের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘বেসরকারিভাবে এখন পর্যন্ত ১৩টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পোশাক-বস্ত্রসহ বিভিন্ন খাতের ১১ উদ্যোক্তা কম্পানি সিরাজগঞ্জে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার আগ্রহ দেখিয়েছে। এটি নিয়ে হবে ১৪টি। বেসরকারিভাবে এটি হবে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অঞ্চল। ’

পবন চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হলে পুরো উত্তরবঙ্গের আর্থসামাজিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন আসবে। সেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের সুবিধা আছে। সড়ক, রেল ও নৌ সুবিধাও ভালো। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল হবে আদর্শ।   যে ১১টি উদ্যোক্তা কম্পানি যৌথভাবে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে তারা হলো মিড এশিয়া, রাইজিং গ্রুপ, মাহমুদ গ্রুপ, বাংলাভিশন গ্রুপ, প্রভিটা গ্রুপ, রাতুল গ্রুপ, স্কয়ার ইলেকট্রনিকস, প্যারাগন সিড, টেক্সটাউন গ্রুপ বাংলাদেশ, মানামি ফ্যাশন লিমিটেড এবং চেঞ্জ বাংলাদেশ। ১১টি উদ্যোক্তা কম্পানির যৌথভাবে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়নে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে পোশাকশিল্প, বস্ত্রশিল্প, ওষুধ, চামড়া, বিশ্বমানের ট্রেড হাউস, অটোমোবাইল, আইটি শিল্প ও কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াকরণ কারখানা গড়ে তোলা হবে।

জানতে চাইলে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিচালক শেখ মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে পরিকল্পিত একটি সবুজ শিল্প। উত্তরবঙ্গের মানুষকে আমরা আর নদী পার হতে দেব না। তাদের ঢাকায় যেতে হবে না কাজের আশায়। কর্মসংস্থান হবে এই শিল্প অঞ্চলে। পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে। ’ আগামী চার বছরের মধ্যে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা গড়ে তুলে সেখান থেকে পণ্য উত্পাদন শুরু হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র বলছে, প্রস্তাবিত সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় প্রথমে বিশ্বব্যাংক আগ্রহ দেখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি খাতের জমি দেখে ও নদী ভাঙনের অজুহাত দেখিয়ে সংস্থাটি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করতে সম্মত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তি খাতের ১১ উদ্যোক্তা ওই স্থানে অর্থনৈতিক অঞ্চল করার আগ্রহ দেখালে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়। বেজা সূত্র বলছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমীক্ষা ও মাস্টার প্ল্যানের কাজ শেষ হলে ১১ উদ্যোক্তা কম্পানিকে প্রাথমিক লাইসেন্স দেওয়া হবে। বেজার দেওয়া সব শর্ত পূরণ হলে তারপর দেওয়া হবে চূড়ান্ত লাইসেন্স।

উদ্যোক্তারা বলছে, উত্তরবঙ্গের গেটওয়ে বলা হয় সিরাজগঞ্জকে। ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্ব বিবেচনায় সেখানে গড়ে উঠেছিল নৌ বন্দর ও রেল সংযোগ। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু সেতু করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর উত্তরবঙ্গের ১৬টি জেলায় মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা যে হারে উন্নতির আশা করা হয়েছিল, সেভাবে হয়ে ওঠেনি। উদ্যোক্তারা আশা করছে, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হলে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ মনোয়ার হোসেন আরো বলেন, ‘আমরা চাই প্রাণের ঢাকার ওপর চাপ কমাতে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ঢাকার ওপর চাপ কমাতে মানুষকে গ্রামে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। আমরা সেই কাজটি করতে চাই। ’

সিরাজগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আগ্রহ কেন তৈরি হলো জানতে চাইলে একাধিক উদ্যোক্তা জানিয়েছে, সেখানে নদীপথ আছে। সড়ক ও রেল সংযোগও ভালো। সেখানে গ্যাস-বিদ্যুতের সুবিধা আছে। বিনিয়োগ করার জন্য সিরাজগঞ্জ আদর্শ জায়গা। সেখানে বিনিয়োগ করতে এরই মধ্যে দেশি-বিদেশি অনেক বড় বড় কম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে। এনার্জিপ্যাক, স্পিনিং কম্পানি, ওষুধ কম্পানিসহ বেশ কয়েকটি কম্পানি বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। আগামী জানুয়ারির মধ্যে ভূমি উন্নয়নের কাজ শেষ হবে বলে জানিয়েছে উদ্যোক্তারা।

উদ্যোক্তারা বলছে, বাংলাদেশে গত এক দশকে শিল্প ও সেবা খাতে ব্যাপক বিকাশ ঘটলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে কৃষি খাত এখনো প্রধান পেশা। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সামপ্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল এবং সবজি নষ্ট হয়ে যায় সঠিক প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে। শীতকালে দেশে নানা জাতের সবজি ও ফল উত্পাদিত হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি না থাকায় সেই পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। লোকসান গুনতে হয়। এ কারণে অনেকে কৃষির ওপর আস্থা হারিয়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে। কৃষকদের কথা মাথায় রেখে সিরাজগঞ্জ অর্থনৈতিক অঞ্চলে আম, আলু, ভুট্টাসহ কৃষি ও খাদ্যজাত পণ্যের প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা থাকবে। দুগ্ধ ও তাঁতশিল্পের জন্যও পরিকল্পনা রয়েছে। একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন রয়েছে উল্লেখ করে শেখ মনোয়ার বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটি হবে সবুজ ও পরিবেশবান্ধব। কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধানগার নির্মাণে ৩০০ কোটি টাকা খরচ হবে। আড়াইশ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে খরচ হবে এক হাজার ৬০০ কোটি থেকে দুই হাজার কোটি টাকা। বাকি টাকা অভ্যন্তরীণ রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন ইউটিলিটি সেবা পেতে খরচ হবে।

মতামত