Today: 25 Jun 2017 - 04:30:11 am

কালীগঞ্জে প্লাস্টিক বোতলের বাড়ী, উৎসুক মানুষের ভিড়

Published on Tuesday, May 9, 2017 at 12:56 am

নিয়াজ আহমেদ সিপন,লালমনিরহাট।
ঢাকা শহরের চার তালা বাড়িটি বিক্রয় করে গ্রামে ফিরে বানিয়েছেন প্লাস্টিকের বোতলের বাড়ি। গ্রামের ছোট ছোট দোকান থেকে কিনেছেন নানা ধারণের প্লাস্টিকের বোতল। আর সেই বোতলের বাড়ি তৈরী করে এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন এক দম্পতি। ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেছেন দু’জনে। তাদের স্বপ্ন ছিলো পরিবেশ বান্ধব একটি বাড়ি তৈরি করবেন। তবে সেই দম্পতি শহর ছেড়ে গ্রামে বাড়ি করলেন কেন ? এমন প্রশ্নে স্ত্রী আসমা বেগম বলেন, প্রত্যন্ত গ্রামের চারদিকে সবুজ বনানী আর ফসলের মাঠ। এমন দৃশ্য শহরে কোথায় পাওয়া যেত না। আমার জন্ম,শৈশব,কৈশোর-বড় হওয়া সব কিছু শহরে। গ্রামের কোলাহল মুক্ত চারদিকের পরিবেশ,সবুজ মাঠ আমাকে শিশুকাল থেকে টানছে।
লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চন্দ্রপুরের নওদাবাস গ্রামের আব্দুল বারী মোক্তারের ছেলে রাশেদুল আলম গ্রামের একটি স্থানীয় স্কুল থেকে এসএসসি,এইচএসসি পাশের পর ঢাকার শেখ বোরহান উদ্দিন পোস্ট গ্রাজুয়েট বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানে অনার্স মাস্টার্স করেন। পড়াশুনা কালে ওই কলেজের ছাত্রী ও ঢাকার নবাব কাটরার নিমতলীর আফসার উদ্দিনের মেয়েকে বিয়ে করেন। এর পরে দুজনেই ওই কলেজে পার্ট টাইম অধ্যাপনা করেন প্রায় ৮ বছর। তাদের একটাই স্বপ্ন ছিল পরিবেশ বান্ধব একটি বাড়ি তেরী করা। প্লাস্টিকের বোতলে তৈরি বাড়ি পুরো গ্রাম বানানোর পরিকল্পনা দম্পতি রাশেদুল ও আছমার। অবশেষে প্লাস্টিকের বোতলে বালি ভরে দেয়াল তৈরিতে তাঁরা সফল হন।
সোমবার সরজমিনে দেখা গেছে, একদিকে বোতলে বালি ভরানোর কাজ চলছে। প্লান পরিকল্পনা অনুযায়ী বাড়ির ফাউন্ডেশন, ভিত্তি স্থাপন,নিলটন পুরো কাজই সহযোগিতা করছে স্থানীয় শ্রমজীবি ও রাজমিস্ত্রিরা। মহিলা,পূরুষ শ্রমিকরা বোতলে বালি ভরাটের কাজ করেছে। স্থানীয় রাজমিস্ত্রি বালি ভর্তি বোতল দিয়ে দেয়াল তৈরি করছে। বোতলের বাড়ি দেখার জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসছে। স্কুল কলেজের ছেলে মেয়েরা আসছে দলে দলে। যতই দিন যাচ্ছে ,উৎসুক্য মানুয়ের ভীড় বাড়ছে। প্রত্যন্ত গ্রামের এই বাড়িটি খোঁজে বের করতে এখন আর বেগ পেতে হয়না। ‘বোতলের বাড়ি যাব’ বললেই মানুষ রাস্তা দেখিয়ে দেয়।
প্রথমের দিকে এটাকে পাগলামী বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ভাইয়েরা,আতœীয় স্বজনরা সবাই এর বিরোধীতা করেছেন। কিন্তু, রাশেদুলকে দমাতে পারেনি। সে একাই বিভিন্ন এলাকা থেকে বোতল সংগ্রহ করে। ভাংড়ীর দোকানে দোকানে খোঁজে খোঁজে সে সংগ্রহ করে তার প্রয়োজন মত ৪০মনের বেশী প্লাস্টিকের বোতল । গত ফেব্রæয়ারি ১ তারিখ তাদের ‘ম্যারেজ ডে’ছিল। অই দিনটি বেচে নেয় শুভ দিন হিসেবে। শুরু করেন স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণের কাজ ।
‘ইকো হাউস’ বোতলের বাড়ি সম্পর্কে আসমা জানান, ফেলে দেয়া প্লাস্টিক বোতল খুব সহজে সংগ্রহ করা যায়। একটি মাঝারি বোতল সাধারনতঃ ১০ইঞ্চি,এর ব্যাস সাড়ে ৩ইঞ্চি । অর্থাৎ একটি ইটের সমান। একটি ইটের দাম পড়ে ১০ টাকা। আর একটি বোতল ক্রয়,বালু ভরা সবমিলে ৩ টাকার উর্ধে নয়। ইটে আর বোতলে সিমেন্ট ব্যবহার প্রায় সমান। এতে ব্যয় সাশ্রয় অর্ধেকের বেশী। বোতলের বাড়ি ৮মাত্রা ভূমিকম্প সহনীয়। বালু সাধারনতঃ গরম বা ঠান্ডা দ্রæত চুষে নেয়। যে কারনে গরমের সময় ঠান্ডা রাখে এবং ঠান্ডার সময় গরম রাখে। বাংলাদেশের ৮০ ভাগ মানুষ কাঁচা ঘর বাড়িতে বসবাস করে। বাঁশ,কাঠ,টিনের বেড়া দিতে যে টাকার দরকার,তা’দিয়ে নিজেরাই ইচ্ছা করলে প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে পাকা দেয়াল নির্মাণ করতে পারবে। প্রতি বছর খুটি দিতে হয়। ঝড় বাদলের ভয়তো আছেই। তাছারা নির্মাণের প্রচলিত উপাদানের তুলনায় প্লাস্টিকের বোতলের দাম অনেক কম। তাই একটি বাড়ির ৬টি রুম করতে খরচ হচ্ছে মাত্র ৪ লক্ষ টাকা।
রাশেদুল বলেন, তিন মাস আগে শুরু করেছি বোতলের বাড়ির কাজ । তখন এলাকার সবাই বলেছে অনেক কিছু তবে এখন সবাই দেখতে আসে। এমনকি অনেকেই বাড়ি তৈরী করতে আগ্রহী হচ্ছে।

কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী পারভেজ নেওয়াজ খান বলেন, প্লাসটিকের বোতল দিয়ে তৈরী বাড়ি পরিবেশ বান্ধব হলেও এটি ব্যবহারের আগে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন হওয়া উচিত। তিনি আশাবাদ জানিয়ে বলেন, দরিদ্র মানুষদের কাছে এ ধরনের বাড়ি মডেল হিসেবে কাজ করবে। রাশেদুল দম্পতির বোতল হাউজের সাথে প্রকৌশলগত দিক সমন্বয় করলে এটি আরো নিরাপদ ও টেকসই হবে বলে তিনি আরও জানান

 

মতামত