Today: 29 Jun 2017 - 03:10:14 pm

একজন কিংবদন্তি: শহীদ মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মুখতার ইলাহী

Published on Sunday, May 14, 2017 at 11:15 am

রিয়াদ আনোয়ার শুভ

২১ বছরের এক টগবগে তরুণ চিনু, ১৯৭০-৭১ সালের সেই উত্তাল দিনগুলিতে কারমাইকেল কলেজ এবং রংপুর শহরে মুক্তিকামী ছাত্র জনতার অকুতোভয় নেতা। উত্তরবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কারমাইকেল কলেজ ছাত্র সংসদের সেই সময়ের নির্বাচিত ভিপি। হ্যাঁ, বলছি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ খোন্দকার মুখতার ইলাহী ওরফে চিনু'র কথা। স্বাধীনতার আন্দোলনের উত্তাল সেই দিনগুলিতে রংপুরে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা।

শহীদ মুখতার ইলাহী ১৯৪৯ সালের ২৯ মার্চ জন্ম গ্রহণ করেন। পিতা খোন্দকার দাঁদ ইলাহী, মাতা মরিয়ম খানম। আদি নিবাস মাগুরা জেলায় হলেও খোন্দকার দাঁদ ইলাহী সরকারী চাকুরী সূত্রে রংপুরে বসতি স্থাপন করেন। রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় তাঁদের বাসা। দাঁদ ইলাহী উত্তর বাংলার জেলাগুলোতে শিক্ষা বিস্তারে অবদান রাখেন তিনি। রেঞ্জ স্কুল পরিদর্শক হিসেবে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। সরকারী চাকুরী থেকে অবসর গ্রহণ করলেও পরে তিনি কেরামতিয়া উচ্চ বিদ্যালয় এবং মাহীগঞ্জ আফানউল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। দাঁদ ইলাহীর সাত পুত্র ও তিন কন্যার মধ্যে মুখতার ইলাহী ছিলেন চতুর্থ পুত্র।

কারমাইকেল কলেজ থেকে আইএ পাশ করে মুখতার ইলাহী একই কলেজে ইংরেজি বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ছিলেন অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্র। শহীদ মুখতার ইলাহী ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। অত্যন্ত স্বভাব কবি ও সুবক্তা হিসেবে তিনি ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে তাঁর ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়তা। শুধু কারমাইকেল কলেজ নয় তিনি ছিলেন সারা শহরের ছাত্র সমাজের প্রিয় নেতা। ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবেই কারমাইকেল কলেজের ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। বড় ভাই খোন্দকার মুশতাক ইলাহীও ১৯৬৬-৬৭ সালে কারমাইকেল কলেজের ভিপি ছিলেন।

একাত্তরের তেসরা মার্চ রংপুরের মানুষ অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠেছিলো জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রতিবাদে। মিছিলে মিছিলে মুখরিত রংপুরের রাজপথে সেদিন জাতির স্বাধীনতার জন্য প্রথম জীবন উৎসর্গ করেছিলেন শহীদ কিশোর শহীদ শংকু সমঝদার। রংপুর শহরে সেদিন আবুল কালাম আজাদ ও ওমর আলী নামে আরও দুই জন শহীদ হন। শুরু হয় রংপুর অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতার সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম দিকেই মুখতার ইলাহী রংপুরের এক বন্দুকের দোকান থেকে প্রাথমিক অস্ত্র সংগ্রহ করেন এবং ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ধাপ হাজী পাড়া এলাকার যুবকদের সংগঠিত করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ২৮ মার্চ সারা বিশ্বকে হতবাক করে দিয়ে তীর-ধনুক, বাঁশের লাঠি, দা, কুড়াল নিয়ে রংপুরের বীর জনতার ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে। অপর দিকে ক্যান্টনমেন্টের দক্ষিণের রাস্তা বরাবর ১৪-১৫ টি জিপে বসানো মেশিনগান দিয়ে অবিরাম গুলিবর্ষণ করে পাক বাহিনী। অসম সেই লড়াইয়ে সেদিন পাক বাহিনীর ছোঁড়া মেশিন গানের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন আনুমানিক প্রায় দুই শতাধিক লোক। হায়েনার দল নিহত ও আহতদের একত্রিত করে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়।

এই ঘটনার পর পরই মুখতার ইলাহী উপলব্ধি করেন, এখন সময় সম্মুখ সমরের। তাই তিনি প্রশিক্ষণের জন্য তাঁর বাহিনীসহ ভারতের পশ্চিম বঙ্গের কুচবিহারে চলে যান। সেই সময় কুচবিহারের সাহেবগঞ্জ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। বিএলএফ (মুজিব বাহিনী) এর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল এখানে। সাহেবগঞ্জে গেরিলা যোদ্ধা হিসেবে প্রশিক্ষণ শেষে তিনি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। সাংগঠনিক প্রতিভা ও দক্ষতার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রংপুর শহরে সংঘবদ্ধ করেন মুক্তিযোদ্ধাদের। ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন হাজী পাড়া এলাকা ছিল তাঁর অন্যতম কর্মক্ষেত্র। হাজী পাড়া ও আশেপাশের গ্রামের যুবকদের সংগঠিত করে গড়ে তোলেন একটি ঝটিকা গেরিলা বাহিনী। স্থানীয় যুবক মতিন, মাহাবুবার, মান্নান প্রমুখের সহায়তায় হাজী পাড়ায় স্থাপন করেন একটি স্থায়ী গেরিলা ঘাঁটি। গেরিলা সদস্যদের দুইটি দলকে তিনি কুচবিহারের সাহেবগঞ্জে নিয়ে যান প্রশিক্ষণের জন্য। যারা প্রশিক্ষণ শেষে ফিরে এসে রংপুর শহরে বেশ কয়েকটি আক্রমণ পরিচালনা করেন সাফল্যের সাথে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় মডার্ন সিনেমা হলকে (বর্তমান টাউন হল) পাক হানাদার বাহিনী বানিয়েছিল “গণ নির্যাতন কেন্দ্র”। বৃহত্তর রংপুরের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনা হতো নিরপরাধ মুক্তিকামী বাঙ্গালী মানুষজনকে। যাদের একটি বড় অংশ ছিল কম বয়সী নারী। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ধরে আনা সেই সব নারীদের উপরে দিনের পর দিন চলতো পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস এই টাউন হলে চলেছে মানুষ রুপি হায়েনাদের নজিরবিহীন গণ ধর্ষণ, গণ নির্যাতন আর গণ হত্যা। মুখতার এলাহি আগস্ট মাসের দিকে এই গণ নির্যাতন কেন্দ্রে হামলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তৈরী করেন একটি বিশেষ গেরিলা গ্রুপ। সাহেবগঞ্জ প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের অস্ত্রাগার ইন চার্জ ও তাঁর বড় ভাই মঞ্জুর ইলাহীর সাথে আলোচনা করে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আক্রমণ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। এরই অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে অস্ত্রসজ্জিত একটি অগ্রবর্তী দলকে মুখতার ইলাহী রংপুরে প্রেরণ করেন। অপর একটি ক্ষুদ্র দলসহ অস্ত্রশস্ত্র ও রসদ নিয়ে ১৯৭১ সালের ০৮ নভেম্বর সাহেবগঞ্জ থেকে লালমনিরহাট হয়ে রংপুরের দিকে রওনা হন। রাত হয়ে যাবার কারণে লালমনিরহাট জেলার বড় বাড়ির কাছে আইড় খামার নামক এলাকায় যাত্রা বিরতি করতে হয় এই ক্ষুদ্র দলটিকে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পাক হানাদার বাহিনীকে এই তাঁদের অবস্থানের কথা জানিয়ে দেয় জনৈক দালাল।

১৯৭১ সালের ০৯ নভেম্বর রংপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক শোকাবহ দিন। এদিন ভোরের দিকে দালাল মারফৎ খবর পেয়ে বিপুল সংখ্যক (প্রায় ৪০০) সৈন্য নিয়ে পাক হানাদার বাহিনী আইড় খামার গ্রামটি ঘিরে ফেলে। মুখতার ইলাহীর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সাহসিকতার সাথে হানাদারদের মোকাবেলা করেন। কিন্তু সংখ্যায় কম থাকার কারণে অসম সেই লড়াইয়ে তাঁদের পক্ষে জয়ী হওয়া সম্ভব হয়নি। মুখতার ইলাহী ও অজ্ঞাত পরিচয় এক বালক মুক্তিযোদ্ধাসহ পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তাঁদেরসহ মোট ৫৪ জন মুক্তিকামী জনতাকে নির্মম ভাবে হত্যা করে হানাদার বাহিনী। পরে গ্রামবাসী আইড় খামার ডাক বাংলো (এখন প্রাইমারী স্কুল) প্রাঙ্গণে তাঁদের সমাহিত করেন। এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের মাত্র একমাসের মাথায় খোন্দকার মুখতার ইলাহীর "মুজিব বাহিনী" ও অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধা দল মুক্ত করেন রংপুর শহর। মুখতার ইলাহিসহ লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয় মাতৃভূমি। বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে অবস্থান করে নেয় বাংলাদেশ।

স্বাধীনতার পরে রংপুর পৌরসভার উদ্যোগে বীর মুক্তিযোদ্ধা খোন্দকার মুখতার ইলাহী স্মরণে রংপুর শহরের প্রধান সড়কের নামকরণ করে “শহীদ মুখতার ইলাহী সরণী’’। পরে প্রধান সড়কের জেলা প্রশাসকের বাসভবন থেকে রাজা রামমোহন রায় মার্কেট পর্যন্ত অংশের নাম করণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের অপর বীর শহীদ ইয়াকুব মাহফুজ আলী (জররেজ ভাই) স্মরণে শহীদ জররেজ সরণী এবং রামমোহন মার্কেট থেকে শাপলা চত্বর পর্যন্ত অংশের না থেকে যায় শহীদ মুখতার ইলাহী সরণী।

কিন্তু এটা অত্যন্ত লজ্জা ও হতাশাজনক যে, এতো দিনেও আমরা এই নাম বলতে অভ্যস্ত হইনি। আমরা আজও ষ্টেশন রোড বলে থাকি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাইন বোর্ডেও লেখা হয় ষ্টেশন রোড। একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা যিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে আমাদেরকে পাইয়ে দিয়েছেন একটি লাল সবুজের পতাকা, ৫৫ হাজার বর্গমাইল ভূমির মালিকা, একটা স্বাধীন দেশ; তাঁর নামে নামকরণকৃত সড়কের নাম বলতে আমরা এখনও অভ্যস্ত হইনি। এর থেকে লজ্জার আর কি হতে পারে?? তাই আসুন, এই মুহূর্ত থেকে নিজেরা এই শহীদের স্মরণে নামকরণকৃত সড়কের অফিসিয়াল নাম বলতে অভ্যস্ত হই, অন্যদের উৎসাহিত করি।

তবে আশার কথা এই যে, রংপুরের গণমানুষের দাবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে এই বীর শহীদের আত্মত্যাগের স্মৃতি ধরে রাখতে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলের নামকরণ করা হয়েছে শহীদ মুখতার ইলাহি হল।

কৃতজ্ঞতা : বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুজিব বাহিনীর রংপুর জেলার অধিনায়ক প্রয়াত মুকুল মোস্তাফিজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত রফিকুল ইসলাম গোলাপ, বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ্‌ এমদাদুল হক।

মতামত