Today: 23 May 2017 - 12:58:57 pm

মানুষের ধর্ম: রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা।।। ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য

Published on Tuesday, May 16, 2017 at 9:57 am

‘মানুষের ধর্ম’ নামে রবীন্দ্রনাথের একটি গ্রন্থ রয়েছে। যেটি ১৯৩৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। আমার আলোচনা আমি রবীন্দ্রনাথের ‘শিশুতীর্থ’ নামক একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে সম্প্রসারিত করতে চাই, যার মধ্যদিয়ে আমার উপস্থাপিত আলোচনার যে শিরোনাম অর্থাৎ ‘মানুষের ধর্ম: রবীন্দ্রনাথ ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’ বিষয়টির কিছুটা আলোকপাত করা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস।

‘শিশুতীর্থ’ রবীন্দ্রনাথের দীর্ঘ কবিতা এবং নিঃসন্দেহে বলা যায় যে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলির মধ্যে একটি। কবিতার বিষয়বস্তু অনুসন্ধানের আগে ‘শিশুতীর্থ’ লেখার কালে কবি মানসের পরিচয় জেনে নেওয়া প্রসঙ্গিক হবে বলে আশাকরি। ১৯৩০-এ, যে বছর ‘শিশুতীর্থ’ লেখা হয়, সে বছর রবীন্দ্রনাথ ইউরোপ সফর করেন। (প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের ‘রবীন্দ্রজীবনী’ পাঠে আমরা জানতে পারি) এই ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল দুটি, এক অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে হিবার্ট বক্তৃতা প্রদান এবং দুই তাঁর ছবির প্রদর্শনী।

এ ছাড়া আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে সেটি হচ্ছে আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাক্ষাৎ। রবীন্দ্রনাথ হিবার্ট বক্তৃতা (১৯, ২১ ও ২৬ মে) যে বিষয়ে দিয়েছিলেন সেটি হল `The Religion of Man’ যা পরে ‘মানুষের ধর্ম’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছিল। এর মাঝে ২৪ মে ‘কোয়েকারদের’ বার্ষিক সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। ‘সোসাইট অব ফ্রেন্ডেস’-এর সদস্যদের সাধারণ মানুষ অবজ্ঞাভরে ‘কোয়েকার’ বলত। ১৭শ শতাব্দীর মধ্যভাগে ইংরেজ ধর্মনেতা জর্জফক্স (১৬২৪-৯১) ‘সোসাইট অব ফ্রেন্ডেস’ প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা শান্তিবাদী ও পরোপকারী। কোয়েকারদের ২২৬ বছরের ইতিহাসে নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরের কাউকে তারা বক্তৃতা দেবার জন্য আমন্ত্রণ জানায় নি। সে ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথই প্রথম। শান্তিবাদী এই সম্প্রদায় ব্রিটেনের সঙ্গে ভারতের যে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব তা শান্তির পথে সমাধানের উপায় খুঁজছিল। একারণেই তারা ভারতের কথা শোনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। এই সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীর দুঃখের কারণ কী সে বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি সেখানে বলেছিলেন,“ যন্ত্ররাজ্যে হৃদয়ের স্থান নাই, গবর্মেন্ট যন্ত্র চালিত। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে লোক এত বেদনা সহিতেছে, তাহার কারণ যন্ত্রচালিত গবর্মেন্ট নৈব্যক্তিক, হৃদয়হীন”। বক্তৃতার এক পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, `Life creates, machine constructs’- জীবন সৃষ্টি করে যন্ত্র তৈরী করে। রবীন্দ্রনাথ মনে করেন যন্ত্র যখন মানুষকে সাহায্য করে তখনই সে সার্থক। তাঁর মতে অজ্ঞানকে দূর করার ক্ষেত্রেই বিজ্ঞানের সার্থকতা। যন্ত্র ও বিজ্ঞানের অপবিত্র মিলনই পৃথিবীতে দুঃখ নিয়ে আসে। মানুষ ‘নেশন’-এর দোহাই দিয়ে কিছু করলে বা বললে তখন সে এক মূর্তি ধারণ করে, কিন্তু `I belive in individuals in the west; for on no account can I afford to lose my faith in man.’
কোয়েকার সম্মেলনের পরেরদিন রবীন্দ্রনাথ ম্যানচেস্টার কলেজের উপাসনালয়ে `Night and Morning’ শিরোনামে একটি ভাষণ দেন, যা পরে `Religion of Man’ গ্রন্থের পরিশিষ্টে ছাপা হয়। ২৬ মে হিবার্ট বক্তৃতামালার শেষ বক্তৃতাটি দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিশ্রামের জন্য এলমহার্স্ট-এর বাড়িতে চলে আসেন এবং এখান থেকে তিনি Spectator পত্রিকার জন্য একটি পত্র-প্রবন্ধ প্রেরণ করেন। এই প্রবন্ধেও তিনি ভারতবাসীর বর্তমান দুরবস্থার কথা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘য়ুরোপ সদাশয়তা প্রকাশ করিয়া তাঁহার সভ্যতা প্রদর্শনের জন্য এশিয়াতে যান নাই। অহমিকা ও ক্ষমতা প্রকাশের অসীম ক্ষেত্র অন্বেষণে গিয়াছিলেন। কিন্তু এশিয়া কখনোই ইহা স্বীকার করিবে না যে, মনুষ্যত্ববিহীন শক্তি বিজ্ঞানের সাহায্যে চিরদিনের জন্য সাফল্য লাভ করিবে।’

এরপর ১৪ জুলাই রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের আমন্ত্রণে অমিয় চক্রবর্তীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর গ্রামের বাড়িতে যান। আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন (দ্রঃ বিশ্বভারতী পত্রিকা, শ্রাবণ-আশ্বিন ১৩৬২, পৃঃ ৬৫-৬৬, অনুবাদ কানাই সামন্ত) ।
গত বৎসরের (১৯৩০) গ্রীষ্মে আবার যখন জার্মানিতে যাই (১৯৩০-এ আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দ্বিতীয়বার দেখা হয়। প্রথমবার দুজনের সাক্ষাৎ হয় ১৯২৬-এ), বার্লিনের অদূরে (কাপুথ) Kaputh- এ আইনস্টাইনের নিজের বাড়িতে গিয়ে দেখা করার আমন্ত্রণ পেলাম। ‘দুদিন’ আগে অক্সফোর্ডে হিবার্ট বক্তৃতামালায় যা বলেছিলাম, আর Religion of Man নাম দিয়ে পুস্তকের আকারে গ্রথিত করতে তখন ব্যস্ত ছিলাম, সেই ভাবনায় আমার মন তখন ভরপুর। আইনস্টাইনের সঙ্গে আলাপের সুত্রপাতেই বুঝলাম যে তিনি ধরে নিয়েছেন, ‘আমার বিশ্ব’ মানবিক ধ্যান ধারণা দিয়ে সীমাবদ্ধ বিশ্ব। এদিকে তাঁর দৃঢ় প্রতীতি এই যে মনবুদ্ধির নাগালের বাইরেও আছে এক সত্য। আমার বিশ্বাস, ব্যষ্টিমানব ঐক্যসূত্রে বাঁধা সেই দিব্য মানবের সঙ্গে যিনি আমাদের অন্তরে, আবার বাইরেও। অনন্তের ভূমিকায় বিরাজিত মানুষ, সেই অনন্ত মূলতই মানবিক।

১৯৩০-এ আইনস্টাইন ও রবীন্দ্রনাথের কথপোকথনটি অনুলিখন করেছিলেন অমিয় চক্রবর্তী। Religion of Man গ্রন্থের পরিশিষ্টরূপে এই কথপোকথনটি ছাপা হয়েছে। সংলাপের কিছু অংশ উদ্ধারযোগ্য।

আইনস্টাইন : বিশ্বব্রহ্মা-ের প্রকৃতি নিয়ে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা রয়েছে। একটা বলে বিশ্ব হল ঐক্যসঙ্গতি যা মনুষ্যত্বের উপর নির্ভর করে আছে। আর অন্য মতে বিশ্ব হল এমন এক বাস্তবতা যা মানব সম্পর্ক-নিরপেক্ষ, স্বধীন, দাঁড়িয়ে আছে।

রবীন্দ্রনাথ: এই বিশ্ব তো মানুষেরই পৃথিবী। বিজ্ঞানদৃষ্টি দিয়ে যদি একে দেখতেই হয়, তো যিনি দেখবেন সেই মানুষটিকেও তা হলে বিজ্ঞানচিন্তা সম্পন্ন হতে হবে। তার মানে, আমাদের বাদ দিয়ে আলাদা কোন বিশ্বের অস্তিত্ব নেই; এ হল আপেক্ষিক বিশ্ব, এ যে কতখানি বাস্তব তা নির্ভর করছে আমাদের চৈতন্যের উপর।

আ: তা হলে, বলুন সত্য বা সৌন্দর্য, এ-সবও মানবসম্পর্ক-নিরপেক্ষ স্বাধীন নয়?

র: নয়ই তো।

আ: ধরা যাক, মানুষ বলে কোনো কিছুই আর নেই, তখনওকি এই সন্ধ্যা তারা এমনই সুন্দর দেখাবে না?

র: না।

আ: সৌন্দর্যের ধারণার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আমি একমত; তবে, সত্যের ক্ষেত্রে আপনার কথা আমি মানতে পারছি না।

র: কেন পারছেন না? সত্যও তো মানুষের ভিতর দিয়েই প্রকাশিত হবে।
আ: পিথাগোরাসের যুক্তি আমি মান্য করি যে সত্যের অস্তিত্ব মানুষের সম্পর্কনিরপেক্ষ ব্যাপার।

র: পরম সত্য তো ব্যক্তিমানুষের ধ্যানের বাইরে ধরা দেয় না, সে অনুভব তো ভাষায় অবর্ণনীয়।

আ: বাস্তবতা তো যা অস্তি, তাই; মনের মানা না মানার বাইরে স্বাধীন তার অস্তিত্ব। ধরা যাক, এই বাড়িতে জনপ্রাণী নেই, তার পরেও ঐ যে টেবিলটি সেটি একই রকমই থাকছে। টেবিল হল সেটাই যা আমাদের চৈতন্যের কোথাও কোনোখানে তার অস্তিত্ব জানিয়ে দিচ্ছে।

র: হ্যাঁ, ব্যক্তিমনের স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির বাইরে স্বাধীনভাবে সে থাকছে ঠিকই, কিন্তু তা বলে সে বিশ্ব মানবের বাইরে থাকছেÑ এমন নয়।

আ: বাড়িতে কেউ না থাকলেও টেবিলটা থাকছে, কিন্তু আপনার দৃষ্টিতে এর কোনো বৈধতা নেই, কেননা আমাদের চৈতন্য-বহির্ভূতভাবে ঐ টেবিলের অস্তিত্বকে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারছি না। মনুষ্যত্ববোধের বাইরে সত্যের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিকোন ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাচ্ছে না, প্রমাণ করে দেখিয়ে দেয়াও সম্ভব নয়, তবে এ হল এক ধরনের বিশ্বাস যা আমরা সবাই লালন করি, এমনকি আদিম লোকজনও এর বাইরে পড়বে না। সত্যের উপরে আমরা অতিমানবীয় objectivity আরোপ করে থাকি। আমাদে অস্তিত্ব নিরপেক্ষভাবে এবং মানসসম্পর্করহিতভাবে এই যে স্বাধীন অস্তিত্ব রয়েছে বাস্তবের, এর যে ঠিক কী অর্থ আমরা বুঝিয়ে বলতে পারব না, অথচ আমাদের জন্য তা জরুরি, অপরিহার্য।

র: যেভাবেই বলুন-না কেন, ব্যাপারটা আদতেই হচ্ছেÑমনুষ্যত্ববোধের সঙ্গে সম্পূর্ণত সম্পর্কশূন্য কোনো সত্য যদি কোথাও থেকেও থাকে, তো আমাদের কাছে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। (‘রবীন্দ্রনাথ : মানবের তীর্থযাত্রা’, দিনযাপনের ভূগলে রবীন্দ্রনাথ, হায়াৎ মামুদ, পৃ: ৪২-৪৩)

এই রাত্রেই ম্যুনিকে ফিরে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন `The child’।

একটু তলিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে, হিবার্ট বক্তৃতার বিষয়বস্তু (The Religion of Man’), কোয়েকারদের বার্ষিক সম্মেলন, Spectator পত্রিকার পত্র-প্রবন্ধ, আইনস্টাইনের সঙ্গে সংলাপ সবকিছুর মূলেই রয়েছে মানুষ সম্পর্কিত ভাবনার একটি যোগসূত্র। কখনো মানুষের স্বরূপ অনুসন্ধান, কখনো মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন আবার কখনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিষ্পেষণে মনবতার অবমাননার কথা। হিবার্ট বক্তৃতামালায় উঠে এসেছে রবীন্দ্রনাথের মানুষ সম্পর্কিত ভাবনার কথা। মানুষের স্বরূপ উন্মোচনই এই বক্তৃতার বিষয়বস্তু। তিনি এখানে মানুষের মহত্বকেই প্রকাশ করতে চেয়েছেন। মনুষ্যত্ব কী, মানুষের ধর্ম কী এই ব্যাখ্যাই রবীন্দ্রনাথ নানাভাবে, নানা উদাহরণের সাহায্যে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বলেছেন, “যা আমাদের ত্যাগের দিকে, তপস্যার দিকে নিয়ে যায় তাকেই বলি মনুষ্যত্ব, মানুষের ধর্ম।” তাঁর মতে,

ইতিহাসে দেখা যায়, মানুষের আত্মোপলব্ধি বাহির থেকে অন্তরের দিকে আপনিই গিয়েছে, যে অন্তরের দিকে তাঁর বিশ্বজনীনতা, যেখানে বস্তুর বেড়া পেরিয়ে সে পৌঁচেছে বিশ্বমানসলোকে। যে লোকে তার বাণী, তার শ্রী, তার মুক্তি।

মানুষের চলার ঐতিহাসিকতা বিশ্লেষণ করে তাঁর মনে হয়েছে তা,‘ঐক্যের দিকে প্রসারিত।’ সত্যলাভ ব্যক্তিস্বার্থের গ-ীর মাঝে যে সম্ভব নয় সে কথাও রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট করেছেন এই ভাবে,“যে মানুষ আপনার আত্মার মধ্যে অন্যের আত্মাকে ও অন্যের আত্মার মধ্যে আপনার আত্মাকে জানে সেই জানে সত্যকে।” তাঁর মতে, ‘ সে (মানুষ) শুধু ব্যক্তিগত মানুষ নয়, সে বিশ্বগত মানুষের একাত্ম।’ ‘...বিশ্বগত কর্মের দ্বারা সে হবে বিশ্বকর্মা।’ ব্যক্তিগণ্ডি অতিক্রম করাই যে মানুষের মূল লক্ষ্য এবং মানুষের ধর্ম সে কথাই রবীন্দ্রনাথ বলতে চেয়েছেন। তাঁর কাছে মানুষ ‘চিরপথিক’। মানুষের চলা বিশ্বমানবের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য। এই চলা, “দুর্গম পথের ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণতার দিকে, অসত্যের থেকে সত্যের দিকে, অন্ধকার থেকে জ্যোতির দিকে, মৃত্যু থেকে অমৃতের দিকে, দুঃখের মধ্যদিয়ে, তপস্যার মধ্যদিয়ে।” কিন্তু এই ‘চিরপথিক’-এর মাঝে, “ক্লান্ত হয়ে যারা পথ ছেড়ে পাকা করে ঘর বেঁধেছে তারা আপন সমাধিঘর রচনা করেছে। মানুষ যথার্থই অনাগরিক। জন্তুরা পেয়েছে বাসা, মানুষ পেয়েছে পথ। মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যাঁরা তাঁরা পথনির্মাতা, পথপ্রদর্শক।”

আইনস্টাইনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যখন সাক্ষাৎ করেন তখন তাঁর মন ÔThe Religion of Man’-এর ‘ভাবনায় ভরপুর’। আইনস্টাইন ধরেই নিয়েছিলেন রবীন্দ্রবিশ্ব ‘মানবিক ধ্যানধারণা দিয়ে সীমাবদ্ধ বিশ্ব।’ এই সংলাপে রবীন্দ্রনাথ খুব দৃঢ় ভাবেই বলতে পেরেছিলেন,‘এই বিশ্ব তো মানুষেরই পৃথিবী’। ‘মানব সম্পর্ক-নিরপেক্ষ’ কোন কিছুই নয়। সবকিছুই মানুষ দ্বারা উপলব্ধ ও প্রমাণিত, তা সে সত্যই হোক আর সুন্দরই হোক। আর এই মানুষ রবীন্দ্রচিন্তনজাত ‘চিরপথিক’ ‘বিশ্বমানব’। এই সংলাপের ছয় বছর পর, ১৯৩৬-এ, রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘আমি’ কবিতাটি। সেখানেও উঠে এলো আইনস্টাইনকে বলা মানুষ সম্পর্কিত তাঁর ভাবনার বিষয়টি। কবিতার শুরুতেই লিখলেন-

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,
চুনি উঠল রাঙা হয়ে।
আমি চোখ মেললুম আকাশে,
জ্বলে উঠল আলো
পূবে পশ্চিমে।
গোলাপের দিকে তাকিয়ে বললুম ‘সুন্দর’
সুন্দর হল সে।
‘The child’   কবিতার মর্মবাণীর মাঝে গাঁথা রয়েছে মানুষ সম্পর্কিত রবীন্দ্রদর্শনের মূল সুর। যে দর্শন শুধু বেদ, উপনিষদ দিয়ে জারিত নয় বরং অনেকটাই বাংলার লোকদর্শনের সারবস্তুকে স্পর্শ করে গঠিত। বলা যায় বঙ্গ দর্শনের ভিত্তিভূমির উপর রবীন্দ্রনাথ মানুষ সম্পর্কিত তাঁর ভাবনাকে নির্মাণ করেছেন।

‘The child’ -এর অনুবাদ ‘শিশুতীর্থ’ পাঠে বোঝা যায় যে, রবীন্দ্রনাথ মানবসভ্যতা বিকাশের ঐতিহাসিক রূপটি উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তিনি ‘মানুষের ধর্ম’ গ্রন্থে যে মানবজাতিকে ‘চিরপথিক’ রূপে আখ্যা দিয়েছেন সেই পথিকদের চলা ‘দুর্গমের ভিতর দিয়ে পরিপূর্ণতার দিকে’, অসত্য থেকে সত্যে, অন্ধকার থেকে আলোতে, মৃত্যু থেকে অমৃতে সেই ‘চিরপথিক’-এর কথাই উঠে এসেছে ‘শিশুতীর্থে’। এই কবিতার শুরুতেই আছে ‘রাত কত হল’ বলে এক আর্তনাদময় প্রশ্ন। রাত্রির ভয়াবহতার মাঝে একদল মানুষ যারা ‘ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মত ইতস্তত ঘুরে বেড়াচ্ছে।’ নিজেদের মাঝে অবিশ্বাস, হানাহানি, মানবতার চরম অবমাননার এক ভয়ঙ্কর চিত্র। অন্ধকার আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসারও শক্তি এইসব মানুষেরা অনুভব করে না। ‘মানবকে মহান বলে জেনো’ Ñ বলে কেউ যখন তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে মানবিকতার স্তরে উন্নীত করতে চায়, মানবিক মর্যদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তারা শোনে না এবং বোঝেও না, বলে, ‘পশুশক্তি আদ্যাশক্তি’, ‘পশুই শাশ্বত’। কিন্তু মানুষ চিরকাল পশুত্বের মাঝে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে পারে না। তাকে তার মানবিক মর্যাদায় পৌঁছাতে হয়। এই পৌঁছানোর জন্যই তাকে ‘চিরপথিক’ হয়ে যাত্রা করতে হয় ‘সার্থকতার তীর্থে’। রবীন্দ্রনাথ ‘শিশুতীর্থে’ দিখিয়েছেন এই যাত্রায়-

যাত্রীরা চারিদিক থেকে বেরিয়ে পড়ল
সমুদ্র পেরিয়ে, পর্বত ডিঙিয়ে, পথহীন প্রান্তর উত্তীর্ণ হয়ে
এল নীলনদীর দেশ থেকে, গঙ্গার তীর থেকে,
তিব্বতের হিমমজ্জিত অধিত্যকা থেকে,
প্রাকাররক্ষিত নগরের সিংহদ্বার দিয়ে,
লতাজালজটিল অরণ্যে পথ কেটে।
এই যাত্রায় আছে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ। যাদের মাঝে
কেউ আসে পায়ে হেঁটে, কেউ উটে, কেউ ঘোড়ায়, কেউ হাতিতে,
কেউ রথে চীনাংশুকের পতাকা উড়িয়ে।

এই যাত্রীদলের মাঝে রয়েছে ‘নানা ধর্মের পূজারি’, রাজা, ‘ছিন্নকন্থা প’রে’ ভিক্ষু, ‘রাজ-অমাত্যের দল’, ‘জ্ঞানগরিমা ও বয়সের ভারে মন্থর অধ্যাপক’, তাকে ‘ঠেলে দিয়ে চলে চটুলগতি বিদ্যার্থী যুবক’, মা, কুমারী, বধু, ‘বেশ্যাও চলেছে সেই সঙ্গে’-

চলেছে পঙ্গু খঞ্জ অন্ধ আতুর,
আর সাধুবেশী ধর্মব্যবসায়ী
দেবতাকে হাটে হাটে বিক্রয় করা যাদের জীবিকা।

বিভিন্ন শ্রেণির এই মানুষ বেরিয়ে পড়েছে মানবজাতির ‘সার্থকতার তীর্থে’ পৌঁছানোর জন্য। এই সার্থকতার তীর্থ মানব সভ্যতা বিকাশের চরম স্থান। যা ব্যষ্টি নয় সমষ্টির সংগ্রাম এবং দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার দ্বারাই অর্জন সম্ভব।

এই দীর্ঘ কবিতায় রবীন্দ্রনাথ এক দীর্ঘযাত্রার ইতিহাস আমাদের সামনে মেলে ধরেছেন। কবিতার শেষ অধ্যায়ে দেখা যায় এই চলমান মানুষের স্রোত দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্যদিয়ে যেখানে এসে পৌঁছালো সেখানে

মা বসে আছেন তৃণশয্যায়, কোলে তাঁর শিশু,
ঊষার কোলে যেন শুকতারা।
দ্বারপ্রান্তে প্রতীক্ষাপরায়ণ সূর্যরশ্মি শিশুর মাথায় এসে পড়ল।
কবি দিল আপন বীণার তারে ঝংকার, গান উঠল আকাশে-
‘জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের!’

এই জনস্রোত, যেখানে রয়েছে ‘রাজা এবং ভিক্ষু, সাধু এবং পাপী, জ্ঞানী এবং মূঢ়’, সম্মিলিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল, ‘জয় হোক মানুষের, ওই নবজাতকের, ওই চিরজীবিতের!’ মানুষের জয়কে প্রতিষ্ঠিত করাই মানবসভ্যতার চরম লক্ষ্য, যে লক্ষ অর্জিত হয় মানবজাতির সম্মিলিত চলার মধ্যদিয়েই। এখানে নবজাতকের উপস্থিতি এ কারণেই যে নবজাতকই তো মানবসভ্যতার সমস্ত সম্ভাবনার আধার।

সমকালীন দেশীয় অথবা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ‘শিশুতীর্থ’ আমাদের চেতনাকে কতটা আন্দোলিত করতে পারে সে বিষয়টিও ভেবে দেখা যেতে পারে। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের মাঝে বিশ্বের প্রায় সব স্থানেই আজ মানবতা বিপর্যস্ত। ভোগবাদী সংস্কৃতির লোলুপতায় মানুষের মানবিক বোধ হারিয়ে যেতে বসেছে। ‘ইতিহাসের ছেঁড়া পাতার মত’ প্রতিটি মানুষ তার ঠিকানা থেকে ছিটকে যাচ্ছে। মানুষের চলার কোন সুমহান লক্ষ্য নেই। আর চলাবেন যিনি সেই মহৎপ্রাণ, মানবপ্রাণ নেতাও নেই। যিনি ছিলেন, ‘সংশয়ে তাকে আমরা অস্বীকার করেছি,/ ক্রোধে তাকে আমরা হনন করেছি’ কিন্তু প্রেমে তাকে আমরা গ্রহণ করিনি। এই সংকটাবর্তের মাঝে ‘শিশুতীর্থের’ বিষয়বস্তুর উপলব্ধি আমাদের জাতীয় জীবনে অনিবার্য হয়ে দেখা দেয়। অমানবিকতার চর্চার কালে রবীন্দ্রনাথের মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার মহৎ এই কবিতা অবশ্যই আমাদের পাঠ্য।

(২৫শে বৈশাখ, ১৪২৪ বঙ্গাব্দ রংপুর জেলা প্রশাসন আয়েজিত রবীন্দ্রনাথের ১৫৬তম জন্মবার্ষিকীতে পঠিত প্রবন্ধ)

সহায়ক গ্রন্থ:
রবীন্দ্র-রচনাবলী, বিশ্বভারতী, ষোড়শ ও বিংশ খণ্ড।
রবীন্দ্রজীবনী তৃতীয় খণ্ড, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।
শিশুতর্থি ঞযব পযরষফ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্র শতাব্দী জয়ন্তী সমিতি।
দিনযাপনের ভূগোলে রবীন্দ্রনাথ, হায়াৎ মামুদ।
রবীন্দ্রনাথ: অভিন্ন ভাবনার ভিন্ন উপস্থাপন, ড. শাশ্বত ভটাচার্য

লেখক: কলেজ শিক্ষক, সহ-সভাপতি উদীচী কেন্দ্রিয় সংসদ, সম্পাদক- উত্তরবাংলা ডটকম।

মতামত