Today: 23 May 2017 - 12:50:28 pm

বাপকা বেটা

Published on Wednesday, May 17, 2017 at 9:15 am

প্রভাষ আমিন 

 ‘আরে মিয়া, আমার পোলা আকাম করছে তো কি হইছে। জোয়ান পোলা একটু-আধটু তো এসব করবই। আমিও তো করি। আমার যৌবন কি শেষ হয়ে গেছে? আমি এখনও বুড়া হইনি। ধর্ষণ কাকে বলে আসলে আপনারা তা জানেন না। আরে ভাই এমন ফালতু বিষয় নিয়ে হৈচৈ করার কি আছে?’

বনানী ঘটনার মূল হোতা সাফাত আহমেদের পিতা আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিম সাংবাদিকদের এ কথা বলেছেন। তার কথা শোনার পর আমি বুঝতে পারছি, সাফাত কেন ধর্ষক হয়েছে। একেই বলে বাপকা বেটা।

কাঁঠাল গাছে আপনি কখনো আম আশা করতে পারবেন না। এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, এ ঘটনায় সাফাত আহমেদের দায় যতটা, তার বাবার দায় তারচেয়ে কম নয়। পত্রিকায় এমন খবরও এসেছে, ছেলের জন্মদিনে মেয়ে জোগাড় করে দেয়ার ব্যবস্থা দিলদার আহমেদই করেছিলেন।

তাই ধর্ষণের ঘটনায় প্ররোচণার দায়ে তাকে অবশ্যই এ মামলায় আসামী করা যায়। পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী সাফাত আহমেদ পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, প্রতিদিন তার বাবা তাকে পকেট খরচ হিসেবে দুই লাখ টাকা দিতো। এর বেশি লাগলে আপন জুয়েলার্সের কোনো শোরুম থেকে আনিয়ে নিতো।

প্রতিদিন দুই লাখ টাকার পকেট খরচ! বিষয়টা আমার ঠিক বিশ্বাস হয়নি। হতে পারে ভুল, হতে পারে আমার কল্পনার সীমাবদ্ধতা। তবে সাফাত যে অনেক টাকা ওড়াতো, এটা তো নিশ্চিত। বাবা যদি ছেলেকে পকেট খরচ হিসেবে, হিসাব ছাড়া লাখ লাখ টাকা দিতে পারে, তাহলে ছেলে উচ্ছন্নে যাবার দায় অবশ্যই বাবাকে নিতে হবে।

বনানীর ঘটনা আসলে সাধারণ আর দশটা ধর্ষণের ঘটনার মত নয়। এ ঘটনা আসলে উন্মুক্ত করে দিয়েছে বড় এক প্যান্ডোরার বাক্স। সমাজের উঁচু তলায় কী হয়, তার কিছুটা আভাস পাওয়া যায় এ ঘটনায়। সাফাত বড় লোকের ছেলে। পুরান ঢাকায় একটা জনপ্রিয় খাবার আইটেম আছে, যার নাম ‘বড় বাপের পোলারা খায়’।

সাফাতদের কাছে নারী, মদ, ইয়াবা- এসবই নিছক ভোগ্যপণ্য। দুই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করার সময়ও সাফাত এই হুমকি দিয়েছে, তার বাবার অনেক টাকা। স্বর্ণ চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক তাদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের মত ২০ জনকে গায়েব করে দিলেও তাদের কিছু হবে না।

গ্রেপ্তারের পর পুলিশের কাছেও নাকি সাফাত সে রাতের ঘটনা স্বীকার করে বলেছে, এ ধরনের ঘটনায় সে আগেও ঘটিয়েছে। এটাই তাদের বিনোদন। সে আসলে বুঝতেই পারছে না, বনানীর ঘটনায় অপরাধটা কোথায়? এটা নিয়ে কেন এত আলোচনা হচ্ছে, এটাই সে বুঝতে পারছে না।

সাফাত আহমেদ আর তার পিতা দিলদার আহমেদের সমস্যাটা এখানেই। তারা বুঝতেই পারছেন না, অপরাধটা কোথায়। এটাই সবচেয়ে বড় শঙ্কার। তাদের মনোজগতটাই আমাদের কাছে অচেনা। ধর্ষণ করা যে অপরাধ, এটা যে বুঝতে পারছে না। পিতা যখন পুত্রের অপরাধের পক্ষে সাফাই গাইছে, নিজেও নিয়মিত একই ধরনের অপরাধের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করছে।

তখন আমরা বুঝতে পারি, আমাদের সমাজের একটা বড় অংশের মনোজগতে বড় ধরনের উলটপালট ঘটে গেছে। এই সমাজ আমাদের অচেনা। এই সমাজ বাংলাদেশের নয়। সাফাত আহমেদ পুলিশকে জানিয়েছেন, তাদের এ রকম ২০/২২ জন বন্ধুর একটা সার্কেল আছে, যারা নিয়মিত এ ধরনের ঘটনা ঘটায়।

অনেক উঠতি নায়িকা, উঠতি মডেলও নাকি তাদের আড্ডার নিয়মিত সঙ্গী। যাদের নিয়ে তারা দেশে, এমনকি বিদেশেও আসর জমায়। সেই সার্কেলে শিল্পপতিদের পুত্ররা যেমন আছে, আছে রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যরাও।

দেখুন এ ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের একজন সাফাত আহমেদ আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলে। অপর অভিযুক্ত সাদমান সাকিফ রেগনাম গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ জনির ছেলে, নিজেও রেগনাম গ্রুপের পরিচালক। সাদমান সাকিফ আবার ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসানের ব্যবসায়িক পার্টনার।

সাফাতের বন্ধু মাহির হারুন, যিনি সরকারি দলের এমপি বিএইচ হারুনের ছেলে। মাহির হারুন রেইনট্রি হোটেলের পরিচালক, তিনিই ফোন করে সাফাদের নামে হোটেলে রুম বুক করেছিলেন। এমনকি সে রাতে মাহির হারুন কেক নিয়ে গিয়ে বন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে এসেছে।

সে কি জানতো না, তার বন্ধুর চরিত্র কেমন, তার বন্ধু হোটেলে কী করতে পারে। এবার বুঝতে পারছেন তো সার্কেলটা কত উঁচু তলার। বনানীর ঘটনায় সমাজের অবক্ষয়ের দগদগে ক্ষতটা উন্মুক্ত হয়ে গেছে।

কিন্তু গুলশান-বনানীর উঁচুমহলে কী হয়, এটা কি আমাদের সমাজের লোকজন জানতেন না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানতেন না, জনপ্রতিনিধিরা জানতেন না? অবশ্যই জানতেন। শুধু জানতেন তাই নয়, তাদের অনেক পরিবারের তরুণদের এই অন্ধকার জগতে আনাগোণা ছিল বলে শোনা যাচ্ছে।

এই ঘটনায় আরো একজনের দিকে বিশেষ নজর দিন। সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে চিটার হিসেবে পরিচিত হালিম ঢাকায় এসে হয়ে যায় নাঈম আশরাফ। সে একাধিক টিভিতে কাজ করেছে। মিডিয়ায় ঘোরাঘুরিকে পুঁজি করে সে ই-মেকার্স নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে।

ভারতের তৃতীয় শ্রেণির শিল্পীদের ঢাকায় এনে অনুষ্ঠান করেছে। এখন জানা যাচ্ছে, তার মূল পেশা হলো, বড় লোকদের পছন্দের নারী সরবরাহ করা। নাঈম আশরাফ কখনো বাপ দিলদার, কখনো ছেলে সাফাতের চাহিদা মেটাতো।

কাউকে পছন্দ হলে, তাকে আপন জুয়েলার্সের ব্যান্ড অ্যাম্বাসেডার বা মডেল বানানোর টোপ দেয়া হতো। তারপর সুযোগ বুঝে ব্ল্যাকমেইল করা হতো। ব্ল্যাকমেইলের কৌশলটা এখন প্রকাশিত, ভিডিও করে রাখা।

বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক মর্যাদার ভয় দেখিয়ে ভিডিও ফাঁস করার হুমকি দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার কৌশল তো অনেক পুরোনো। অনেক মডেল বা নায়িকাকে নিয়ে বিদেশে ঘুরে আসার গল্পও এখন জানা যাচ্ছে। নাঈম আশরাফ নিশ্চয়ই শুধু দিলদার আহমেদের পারিবারিক সরবরাহকারী ছিলেন না।

কেঁচো খোঁড়া শুরু হয়েছে। নিশ্চয়ই আড়ালে অনেক অজগর বা অ্যানাকোন্ডা লুকিয়ে আছে। নাঈম আশরাফকে ধরা গেলে হয়তো জানা যাবে সেই অন্ধকার জগতের কথা। আমার সন্দেহ নাঈম আশরাফকে আর কখনোই পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়েই। অ্যানাকোন্ডারা নিশ্চয়ই নিজেদের আড়ালে রাখতে নড়াচড়া শুরু করেছে।

এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় ধরা খেয়েছে আপন জুয়েলার্স, রেইনট্রি হোটেল। ঝুঁকিতে আছে রেগনাম গ্রুপ। আরো কত গ্রুপ যে ভয়ে আছে কে জানে। নাঈম আশরাফের মূল ব্যবসাই ছিল প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

এ কারণেই তাকে উঁচুমহলে চলাফেরা করতে হতো। বিভিন্ন প্রভাবশালীদের সাথে তার এবং সাফাত ও সাকিফের ছবি এখন ফেসবুকে ভাইরাল। প্রভাবশালীদের সাথে ছবি তুলে ঘনিষ্ঠতার প্রমাণ দেখানোই নাঈম আশরাফের ব্যবসার পুঁজি।

যাদের সাথে এই তিন কুলাঙ্গারের ছবি, সামাজিকভাবে তাদেরও হেয় করা হচ্ছে। কিন্তু এখানে যাদের সাথে ছবি, সেই সেলিব্রেটি বা রাজনীতিবিদদের অতটা দায় দিতে আমি রাজি নই। এখন সবার হাতেই মোবাইল। সেলিব্রেটি বা প্রভাবশালীদের কাছে পেলে সবাই ছবি তুলতে চায়।

ছবি তুলতে রাজি না হলে বরং সেই তারকা বা রাজনীতিবিদদের নানা কটু কথা শুনতে হয়। তাই ইচ্ছার বিরুদ্ধেও তাদের ছবি তুলতে হয়। তাই যার সাথে ছবি তুলছেন, তাদের মধ্যে কে ভবিষ্যতে ধর্ষণ করবে, তা তো আর তাদের জানার কথা নয়।

তবে সত্যি সত্যি প্রভাবশালীদের কেউ এই দুষ্কৃতকারীদের সহযোগী ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা যেতে পারে। কারা তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করছে, তাদেরও খুঁজে বের করতে হবে। বনানীর ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অপরাধীদের পরিবারের মনোভাব।

সাফাতের বখে যাওয়ার জন্য তার মা তার বাবাকে এবং বাবার অর্থকে দায়ী করেছে। সাফাতের সাবেক স্ত্রী মডেল পিয়াসাও একই কথা বলেছেন। একজন বাবা চান তার সন্তান তার মত বেড়ে উঠুক। দিলদারও ছেলেকে তার মতই বানিয়েছেন।

কিন্তু ভাবুন একবার, আপনার যত হাজার কোটি টাকাই থাকুক, সাফাতের মত একটা ছেলে থাকলে আপনার আর কিছু লাগবে না। আপনার সব স্বর্ণ, সব অর্জন ছাই হয়ে যাবে নিমেষেই। তাই আপনার সন্তানের দিকে খেয়াল রাখুন। সে কোথায় যায়, কী করে, কাদের সাথে মেশে, টাকা দিয়ে করে, কোথায় জন্মদিন করে; সব খোঁজ রাখুন।

সাফাতরা যেন এভাবে বেড়ে উঠতে না পারে, বেড়ে উঠে যেন তারা সমাজকে কলুষিত করতে না পারে।

প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক।
[email protected]

মতামত