Today: 20 Jul 2017 - 10:36:37 pm

আসুন, দেখুন রংপুরের রং-রূপ

Published on Sunday, June 25, 2017 at 5:25 pm

আরিফুল হক

উত্তরবঙ্গের জনপদ রংপুরে রয়েছে রং আর রূপের মেলা। শহর থেকে একটু দূরে যান। যানজট-জলজট একদম নেই। নেই ধোঁয়া, ধুলো, হইহুল্লোড়। চারদিকে গাছগাছালিছাওয়া সবুজের মায়া। মেঠো পথে ঘুঘুর ডাক, পাখির কলতান। প্রকৃতি কী শান্ত, স্নিগ্ধ! লম্বা শ্বাস টানলে বুকভরা টাটকা বাতাস। রয়েছে ছুটি কাটানোর প্রাণজুড়ানো আমেজ।

এই হচ্ছে নারী জাগরণের পথিকৃৎ বেগম রোকেয়ার রংপুর। কৃষক-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের নূরলদীনের রংপুর। সেই রংপুর আর এখনকার রংপুরকে মিলিয়ে দেখুন। ভালো লাগবে। খুঁজে পাবেন জ্বলজ্বলে ইতিহাস। জানা-আজানা অনেক গল্পের সঙ্গে মিলে যাবে। আপনি যা ভাবছেন, হয়তোবা এমন বিষয়টিও পেয়ে যেতে পারেন। কালের বিবর্তন হয়েছে। পথ-ঘাট-প্রান্তর বদলে গেছে। তাই বলে প্রাচীন পুরাকীর্তি তো মুছে যায়নি। বরং অনেক নতুন অধ্যায় সূচিত হয়েছে। হয়েছে অনেক পরিবর্তন। বদলে গেছে জীবনচিত্র। এবারের ঈদে পরিবারসহ রংপুরকে ঘিরে উত্তরবঙ্গ ঘুরে বেড়াতে চলে আসুন।

শিশু-কিশোরসহ সন্তানদের বিনোদনের কথা ভাবছেন? সব বয়সী মানুষের চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর সঙ্গে ইতিহাসকেও মেলাতে পারবেন। পাঠ্যবইয়ে পড়েছেন, কিন্তু দেখা হয়নি চক্ষু মেলিয়া। এবার দেখুন দুচোখ ভরে।

দেখুন, মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার বসতভিটার স্মৃতিচিহ্ন, যেখান থেকে এই মহীয়সী নারী আলো ছড়িয়েছেন। শহরের তাজহাটে অনিন্দ্যসুন্দর প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন জমিদারবাড়িটি ঘুরে আসুন। সে বাড়ির সিঁড়ি শ্বেতপাথরের, যা ইতালি থেকে আনা হয়েছিল। সিঁড়িটি নিচতলা থেকে দোতলা পর্যন্ত উঠে গেছে। বর্তমানে এটি জাদুঘর।

এবার একটু ভিন্ন ধরনের বিনোদন পেতে ছুটে চলুন পাগলা পীর গঞ্জিপুর এলাকায় ভিন্ন জগতে। সত্যিই যেন আলাদা জগৎ। রয়েছে আজব গুহা। সবারই ভালো লাগবে। বিরাট এলাকাজুড়ে গাছের ছায়ায় ঘেরা এ বিনোদন স্পট। কী নেই সেখানে? সৌরজগৎকে জানতে দেশের প্রথম প্ল্যানেটারিয়াম রয়েছে এখানে। রয়েছে তাজমহল, মস্কোর ঘণ্টা, আইফেল টাওয়ার, চীনের প্রাচীর। ট্রেন রয়েছে। রয়েছে উড়োজাহাজ। শিশুদের বিনোদনেরও কমতি নেই। দিনভর হইহুল্লোড়ে মেতে উঠতে পারেন। ক্লান্তি আসবে না। নিরিবিলি সময় কাটাতে এখানে আবাসনসুবিধাও রয়েছে।

শহরের নিসবেতগঞ্জে ঘাঘট নদের তীর ঘেঁষে রয়েছে সেনাবাহিনী দ্বারা পরিচালিত ‘প্রয়াস’ বিনোদন পার্ক। পাখির কিচিরমিচির শব্দের খেলাও কানে বাজবে। ইচ্ছে হলে পানিতে ভেসে বেড়াতে পারেন পালতোলা বা ডিঙি নৌকায়। এই পার্কের পাশেই রয়েছে ‘রক্তগৌরব’ নামের স্মৃতিস্তম্ভ। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ অঞ্চলের জনগণ লাঠিসোঁটা, তির-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে অনেকে নিহত হন। তাঁদের স্মৃতির উদ্দেশে এখানে এই স্মৃতিস্তম্ভটি নির্মিত হয়েছে। এটিও একনজর দেখে নিতে পারেন।

শহরের মধ্যে রয়েছে চিকলি লেক। আর এই লেকের ধারে গড়ে তোলা হয়েছে বিনোদন পার্ক। সেখানে বিভিন্ন রাইডে চড়ে লেকের সৌন্দর্য্য উপভোগ করুন। সেই সঙ্গে রংপুর চিড়িয়াখানায় পশুপাখিও দেখতে ভুলবেন না।

কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কলকাতা থেকে এসে মঞ্চনাটক করে গেছেন রংপুর টাউন হলে। এই হলটিও দর্শন দিতে ভুলবেন না। ইতিহাসের সাক্ষী দুটি প্রাচীন বিদ্যাপীঠ কারমাইকেল কলেজ ও রংপুর জিলা স্কুলের দিগন্তজোড়া খোলা মাঠে ঘুরে বেড়ালে মনটা জুড়িয়ে যাবে।

এবার ছুটে চলুন এমন স্থানে, যা ইতিহাসের অমর সাক্ষী হয়ে আছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় রংপুর অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল রংপুরের মিঠাপুকুরের ফুলচৌকি গ্রাম। পলাশীর যুদ্ধের পর যে বীরপুরুষ রংপুর অঞ্চলকে ঘিরে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন অব্যাহত রেখেছিলেন, তিনি নুরউদ্দিন বাকের জঙ্গ। কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের সেই নূরলদীনই হলো নুরউদ্দিন বাকের জঙ্গ। ফুলচৌকি গ্রামে তাঁর র্কীর্তি আজও বহমান। ঐতিহাসিক সেই ফুলচৌকি গ্রাম ঘুরে যেতে ভুলবেন না। এর পাশের এলাকা পীরগঞ্জে রাজা নীলাম্বরের জলমহাল এলাকাও ঘুরতে পারেন।

ইতিহাসের আরেক অধ্যায় বঙ্গবিজয়ী ইখতিয়ার উদ্দীন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি তিব্বত অভিযানে রংপুরে একটি এলাকায় রাত্রিযাপন করার কারণে তারই নামানুসারে গ্রামের নাম হয়েছে বখতিয়ারপুর, যা রংপুর শহরের পাশার অবস্থিত। এখানে পদধূলি দিতে ভুলবেন না।

রংপুরে বেড়াতে বেড়াতে সময় হাতে থাকলে এবার এখান থেকেই দিনে দিনে ঘুরে আসতে পারেন দিনাজপুরের রামসাগর দিঘি, কান্তজিউ মন্দির, রাজবাড়ী। নীলফামারীর নীলসাগর ও তিস্তা ব্যারেজ। আরও একটু উত্তরে গিয়ে দেশের একেবারে শেষ প্রান্ত তেঁতুলিয়া।

খবর- দৈনিক প্রথম আলো।