Today: 20 Jul 2017 - 10:37:39 pm

লালমনিরহাটে ১৫টির মধ্যে ১৪টি সিনেমা হল গুদামঘর

Published on Tuesday, July 11, 2017 at 4:29 pm

নিয়াজ আহমেদ সিপন, লালমনিরহাট: যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়েছে বাংলা চলচ্চিত্রের। বদল হয়েছে সিনেমা দশর্কদের রুচি ও চাহিদা। এ কথা মাথায় রেখে সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শেও এসেছে নানান পরিবর্তন। যোগ হয়েছে উন্নত ও আধুনিক প্রযুক্তি। কিন্তু উত্তরের সিনেমা হলের তেমন কোনো পরিবর্তন নেই। দর্শক না থাকার কারেণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলগুলো।

এদের অনেকগুলো এখন তামাক, ধান আর চালের গোডাউন। বর্তমানে লালমনিরহাটের ১৫টি সিনেমা হলের মধ্যে চালু রয়েছে ১টি। সেটিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে।

১০ বছরে এ জেলায় কোন সিনামা হল কোথাও নতুন করে চালু হয়নি। হল মালিকরা ভবনগুলো ভেঙে ফেলে বহুতল বিপণীবিতান গড়ে তুলছেন। তারা বলছেন, মানসম্মত চলচ্চিত্রের অভাবে দর্শকরা হল বিমুখ হয়ে পড়ছে। আর যদিও মানসম্মত ছবি তৈরী হচ্ছে যন্ত্রপাতির অভাবে ঝকঝকে প্রিন্টের ছবি দেখাতে পারছেন না কেউই। কোটি টাকা খরচ করে ডিজিটাল করলেও তা ভালো ব্যবসা করতে পারছে না বলে এক এক করে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া লালমনিরহাটে তেমন কোন পর্যটন নেই। তাই এক সময় ঈদের ছুটিতে পরিবারসহ ভিড় জমাতো সিনামা হলে। তাও এখন বিলুপ্তির দিকে। বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে এক সময় জেলায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠে ১৫টি সিনেমা হল। তবে দর্শক না থাকার কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যায় অনেকগুলো সিনেমা হল।

লালমনিরহাটের ১৫টি সিনেমা হলের মধ্যে- লালমনিরহাট শহরে আলোরূপা ও উত্তরা, আদীতমারী উপজেলায় বন্ধু, কালীগঞ্জ উপজেলায় তুষার, সীমান্ত, সম্রাট, অন্তরঙ্গ, স্বপ্নবিলাস, উত্তরবঙ্গ ও ঝুমকা; হাতীবান্ধা উপজেলায় বিন্দু, সূচনা ও সঙ্গীতা এবং পাটগ্রাম উপজেলার জেমস্ ও আশ্বীষ। এর মধ্যে চালু রয়েছে শুধু সদরের আলোরুপা সিনেমা হলটি। ৫বছর আগে জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী উত্তরা সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে গেছে। এটি এখন গুদামঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জেলার সবচেয়ে সিনেমা হল বেশি ছিল কালীগঞ্জ উপজেলায়। এখন সেখানে একটিও নেই।

সিনেমার যাত্রা শুরু হলে পরিবারসহ সিনেমা দেখতে যেতেন দর্শকরা। ‘কমলার বনবাস’ ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ‘স্বপ্নের ঠিকানা, আর মান্নার ছবি হলেতো কোথাই নেই, ‘বাবা মাস্তান, ‘মাথা নষ্ট, ‘এক স্বামী দুই বধূ, ‘কষ্ট, ‘রস্তম এসব সিনেমার নাম শুনলেই ছুটে চলে যেতেন সিনেমা হলে। ওই সময় বাণিজ্যিকভাবে সিনেমা হলগুলো অনেকটা এগিয়ে যায়। আর তখন সহপরিবার সিনেমা দেখতেন একসাথে। এছাড়া ঈদ-পূজাসহ উৎসবগুলোতে দর্শকের ঢল নামতো। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি গতানুগতিক সিনেমা। তা ছাড়া আছে অশ্লীলতার অভিযোগও। তাই কিছু হল এখন খাদ্যশস্যের গুদাম, আর কিছু আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।

ভারতের জিৎ এর ‘বস্-২ ও বাংলাদেশের কিং খান শাকিব খানের ‘নবাব’ মুক্তি পেয়েছে। র্দীঘদিন থেকে কিছু পুরাতন ছবি চালিয়ে আসছে জেলা শহরের একমাত্র সিনেমা হল আলোরূপা। সিনেমা হলের মালিক আলমগীর হোসেন এবার এনেছেন ‘নবাব’ সিনেমাটি।

তিনি বলেন, “১০ বছর আগে আমি মূল মালিক রফিকুল ইসলামের কাছে ভাড়া নিয়ে চালাচ্ছি সিনেমা হলটি। কিন্তু সব সময় এর বাণিজ্যিক অবস্থা মন্দা গেছে। নবাব সিনেমা আসার পর কিছুটা ব্যবসা ভালো করেছি। এরকম সিনেমা তৈরী হলে আবার সিনেমা হলে দিকে ফিরে আসবে বলে আমি আশা করি। তবে সিনেমা হলে ছবি চলার পরে সবার মুঠোফোনে এসব ছবি চলে যায়। কপি পেষ্ট হতে থাকে এসব সিনেমা। তখন আর কেউ সিনেমার হলের দিকে আসে না।”

কালীগঞ্জের স্বপ্নবিলাস সিনেমা হলের মালিক স্বপন মিয়া  বলেন, “বাংলাদেশের সিনেমা এখন মানসম্পন্ন নয়। চলচ্চিত্র নির্মাণকারীরা দর্শকদের চাহিদা অনুযায়ী মানসম্পন্ন ছবি তুলে ধরতে পারছে না। ছবিগুলো দর্শকের মননশীল না হওয়ায় তারা এখন হল বিমুখ। নির্মাতা যদি দর্শকের কথা চিন্তা করে ছবি নির্মাণ করেন, তাহলে হয়তো হল বিমুখ দর্শকদের ফিরিয়ে আনা যাবে।”
“গত ঈদে দুটি সিনেমা এসেছে তাও পাইরাসি হয়ে বাজারে কম্পিউটারের দোকানগুলো মোবাইলে দিয়ে দিচ্ছে। তাহলে সিনেমা হলে কোন আসবেন দর্শক?” এমন প্রশ্ন করেন তিনি।

বর্তমানে সিনোমা হলে পাটগুদাম করে তা দিয়ে কোনভাবে সংসার চলছে বলেও জানান তিনি। এক সময় ঝুমকা সিনেমার টিকিট কাউন্টারে কাজ করতেন এমন একজনকে ইজিবাইক চালাতে দেখা গেছে।

সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেককে এখন কাপড় ব্যবসা, ফুচকা ও চটপটির দোকান, ফুটপাতে ডিম বিক্রি করতে দেখা গেছে। অন্যদিকে মালিকরা হলগুলো গুদাম বানিয়ে নানা রকম ব্যবসা করছেন।

বন্ধ হওয়া বিন্দু হলের দারোয়ান রাজু  বলেন, “হল বন্ধ হওয়ায় আমি এখন কাঠমিস্ত্রীর কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছি। সেই পরিবেশ আদৌও কোনোদিন ফিরে আসবে কিনা তা নিয়ে মনে নানা সংশয় দেখা দেয়ায় আমি এই পথে চলে আসি।”

কথা হয় সিনেমা দর্শক রুবেল, আপেল, জামিদুল, জাহিদুল, মঞ্জু, রবিউজ্জামান, রোহানের সঙ্গে। তাদের মতে, অশ্লীলতা হল দর্শক কমে যাওয়ার প্রধান কারণ। তা ছাড়া এই যুগে সিডি, ডিস এন্টেনা, ভিডিও মোবাইল বিভিন্ন প্রযুক্তিতে সিনেমা বেশ সহজলভ্য। সেখানে সহজেই সব দেশের সিনেমা হাতের নাগালে পাওয়া যায়। তাই হলে দর্শক খুব একটা নেই।

তুষার সিনেমা হলের ম্যানেজার মিন্টু মিয়া বলেন, “দর্শকপূর্ণ হলগুলো একসময় খালি হতে হতে বিলুপ্ত হয়ে যাবে তা আমি কখনো ভাবি নাই। কিন্তু সেই বিষয়টার সামনাসামনি দাঁড়ালাম তখন আর ভাবার কিছুই নাই। বর্তমানে বিদ্যৎতের কাজ করে সংসার চলছে।”

বিন্দু হলের মালিক সুমন বলেন, “দর্শকের অভাবে সিনেমা হলটি বন্ধ করতে হয়েছে। তাই এটিকে বর্তমানে গুদাম বানিয়ে ব্যবসা করছি।”

সূচনা হলের মালিক রমজান আলী বলেন, “দিন দিন দর্শক কমতে থাকায় ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছি। বর্তমানে হলটিকে গুদাম বানিয়ে স্টক ব্যবসা করছি।”