Today: 20 Jul 2017 - 10:36:07 pm

সন্তান কেন পরীক্ষার কারাগারে?

Published on Sunday, July 16, 2017 at 5:03 pm

তুষার আবদুল্লাহ

মেয়ের পরীক্ষা চলছে। প্রাক নির্বাচনি পরীক্ষা। মেয়ে এবং তার বন্ধুদের প্রস্তুতি ভালো। তারপরও তারা উদ্বিগ্ন ছিল পরীক্ষার আগে থেকে। পরীক্ষা নিয়ে উদ্বেগ আমাদেরও ছিল। তবে আমাদের এবং সন্তানদের উদ্বেগের কারণ এক নয়।পরীক্ষার প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার আগে পর্যন্ত, আমাদের উৎকণ্ঠা থাকতো- সিলেবাস অনুসারে পাঠ্যবইয়ের যতোটুকু পড়েছি, তা থেকে ‘কমন’ পড়বে কিনা? যে কয়টি প্রশ্ন আসবে তার সবগুলো ঠিকঠাক মতো উত্তর দিয়ে শেষ করতে পারবো তো? কোনও একটি বিষয়ে প্রস্তুতি খুব ভালো না থাকলে চেষ্টা করেছি পাসমার্ক অর্থাৎ তেত্রিশ তুলে আনতে। যে বিষয়ে দুর্বল ছিলাম, তার ঘাটতি মেটাতাম অন্যান্য বিষয়ে ভালো নম্বর তুলে। ফলে গড়পড়তা ফলাফল ভালো হতো।পরীক্ষা নিয়ে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হতে হতো না। কিন্তু এখন আমাদের সন্তানদের মধ্যে পরীক্ষা ‘ফোবিয়া’ দেখা দিয়েছে। কারণ দুটি- এক, পাঠ্যক্রম; দুই, পরীক্ষা পদ্ধতি।

পাঠ্যক্রমে একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকে সন্তানদের জ্ঞানের সমুদ্রে আমরা ছুঁড়ে দিচ্ছি। প্রথম শ্রেণিতে তাদের ইংরেজি ব্যাকরণ সবক নিতে হবে। গদ্য-পদ্য-বিজ্ঞানের জ্ঞান মস্তিষ্কে নিতে হবে। ওপরের দিকে উঠতে উঠতে তাদের ঝাঁপ দিতে হচ্ছে মহাসমুদ্রে। গণিতের সৃজনশীল প্রশ্ন কেমন হবে, এনিয়ে শিক্ষক –শিক্ষার্থী উভয়ের ধারণা এখনও স্বচ্ছ নয়। পাঠ্যসূচির বাইরে থেকে যা (un seen) বলে পরিচিত, তার কোনও সীমা-পরিসীমা নেই। ফলে পাঠ্যসূচির অকুল সাগরে ভাসছে আমাদের সন্তানেরা। তারা যদি ৬২টি গদ্য-পদ্য পড়ে, পাঠ্যবইয়ের গণিত-জ্যামিতি শেষ করেও পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখে, তাদের পাঠ থেকে কিছুই আসেনি, তখন তাদের বিপর্যস্ত না হয়ে উপায়?

আমাদের পূর্বসুরী এবং আমরা যারা সীমারেখা টানা পাঠ্যসূচির মধ্যে লেখাপড়া শেষ করেছি, তাদের অনেকেই দেশসেরা কেবল নয়, জগত সেরা হয়েছেন। তাদের শিক্ষাজীবন শুধু পাঠ্যসূচির মধ্যে সীমিত ছিল না। তারা বিচ্যুত ছিলেন না মাতৃভূমি, পৃথিবীর ইতিহাস-সংস্কৃতি থেকে। লেখাপড়া ছাড়াও আরো অনেক সৃজনশীল ও সাংগঠনিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু আমরা আমাদের সন্তানদের ফলাফলের দাস বানিয়ে ফেলেছি। পাঠ্যসূচি এমন করেছি যেন তারা বই-খাতার ওপর থেকে মুখ তুলতে না পারে। কোচিংয়ের কারাগারে পুরে দিয়েছি ফলাফলের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে। সত্যিই আমরা আমাদের সন্তানদের পরীক্ষা ও অসীম সিলেবাসে বন্দি করে ফেলেছি। এই পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা পদ্ধতি মেধার বিকাশ যে করছে না তা প্রমাণিত। শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ দিয়ে তাদের চিন্তা সক্ষমতা কমিয়ে ফেলা হচ্ছে। সর্বোপরি আমরা সন্তানদের শৈশব ও কৈশোরকে হত্যা করছি।

সংখ্যা নির্ভর বাম্পার ফলাফল মেধার বিকাশ ঘটাচ্ছে না যে তা প্রমাণিত। সৃজনশীল পাঠ্যক্রম এবং পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কারের প্রয়োজন আছে, একথা শিক্ষাবীদরা বলেছেন। তাদের দিক থেকে সংস্কারের দাবিও উঠেছে। কোচিংয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার পরেও, কোচিং সেন্টারগুলো চলছে মহাসমারোহে। আর প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন শিক্ষার দুরারোগ্য কর্কটরোগ। এতো প্রতিবাদ ও সুপারিশের পরেও শিক্ষা বিভাগ থেকে সংস্কারের উদ্যোগ লক্ষ্যণীয় নয়। অথচ প্রতিটি শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং শিক্ষকেরাও স্বস্তিতে নেই চলমান শিক্ষা কাঠামোতে। এই অস্বস্তি কিন্তু স্কুল ডিঙিয়ে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত গড়িয়েছে। ত্রুটিযুক্ত প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে উচ্চ শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত সুযোগ নিতে পারছে না আমাদের সন্তানেরা। কারণ বাড়তি যে পাঠ নিয়ে তারা উচ্চশিক্ষায় গেলো, সেখানে ওই পাঠের সিংহভাগই অপ্রয়োজনীয় বলে প্রমাণিত হচ্ছে এবং পেছনের ধাপগুলোর পাঠ্যসূচির অসম্পূর্ণতাও ধরা পড়ছে।

শিক্ষা নিয়ে যারা ভাবেন, তারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন আমাদের বাংলা মাধ্যমের পাঠ্যক্রম এবং পরীক্ষাপদ্ধতি মোটামুটি ঠিকই ছিল। একমুখী শিক্ষা অনুকরণ করা গেলে ছোটখাটো সংস্কারকে তাকে একটা মানে ধরে রাখা যেতো। কিন্তু বাজারমুখী শিক্ষায় বাংলামাধ্যমের সর্বনাশটা ঘটেছে ইংরেজি মাধ্যমের পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষাপদ্ধতি অনুসরণ করতে গিয়ে। আমাদের সন্তানদের কাঁধে বইয়ের ওজন বাড়তে থাকে ইংরেজি মাধ্যমকে অনুকরণ করেই। তাই শিক্ষা কাঠামোর সংস্কার বা অস্ত্রপচার যাই করা হোক না কেন, সেটা করতে হবে বাংলা-ইংরেজি দুই মাধ্যমেই। আমরা চাই না সামান্য প্রি টেস্ট, মধ্য সাময়িক পরীক্ষার আগের রাতে সন্তানরা আতঙ্কে কেঁদে ওঠুক। পরীক্ষার হল থেকে কেঁদে বের হোক একের পর এক সন্তান। মনে রাখতে হবে সন্তানদের এই আতঙ্ক অশ্রু, অদূরে জাতির সামষ্টিক আফসোসের অশ্রুতে পরিণত হতে পারে।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি