Templates by BIGtheme NET
আজ- বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ :: ৫ পৌষ ১৪২৫ :: সময়- ১ : ০৭ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / এমন মানবজনম আর কি হবে…

এমন মানবজনম আর কি হবে…

প্রভাষ আমিন

 রামায়ণ রচনা প্রসঙ্গে মহর্ষি বাল্মীকিকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘সেই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনোভূমি রামের জন্মস্থান, অযোধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।’ আসলেই কবির কল্পনার কোনো সীমা নেই। বিজ্ঞানীদের নিয়ম-সূত্র মেনে গবেষণা করতে হয়। কিন্তু কবি বা লেখক মাথা দিয়ে নয়, লেখেন হৃদয় দিয়ে। মন যা চায়; তাই বলেন, করেন, লেখেন। এই যেমন রোবটের কথা আমরা যতটা সায়েন্সে পড়েছি, তারচেয়ে বেশি পড়েছি সায়েন্স ফিকশনে।

বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশনকে জনপ্রিয় করার কৃতিত্ব দুই ভাইয়ের- হুমায়ূন আহমেদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবাল। একবার এটিএন নিউজের এক টক শো’তে আমার প্রশ্নের জবাবে জাফর ইকবাল বলেছিলেন, তিনি সায়েন্স ফিকশন লেখার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের সূত্র মেনে চলার চেষ্টা করেন। তাই তার সায়েন্স ফিকশনে সায়েন্স বেশি থাকে, ফিকশন কম। কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের সায়েন্স ফিকশনে আবার সায়েন্স কম ফিকশন বেশি। আসলে সায়েন্স ফিকশনে সায়েন্স বেশি থাকবে না ফিকশন; সেটা নির্ভর করে লেখকের ওপর। এটাই তার স্বাধীনতা। এটাই তাকে বিজ্ঞানীদের চেয়ে এগিয়ে রাখে, সময়ের চেয়ে এগিয়ে রাখে।
বিজ্ঞানীর পরিকল্পনার অনেক আগেই লেখকরা কল্পনায় অনেককিছু আবিষ্কার করে ফেলেন। বিমান আবিষ্কারের অনেক আগেই লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি হেলিকপ্টারের ছবি এঁকেছিলেন। বিমানের মত রোবট আবিস্কারেও ভিঞ্চির নাম আসে। ভিঞ্চি ১৪৯৫ সালের কাছাকাছি সময়ে একটি হিউম্যানয়েড রোবটের পরিকল্পনা করেছিলেন বলে ধারনা করা হয়।
আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই, সাহিত্যের ছাত্র। তাই সায়েন্স ফিকশনের রোবটের গল্প পড়ে চমকে যাই, আপ্লুত হই, শঙ্কিত হই। কোনো কোনো সায়েন্স ফিকশনে এমনও লেখা হয়েছে, একসময় রোবটরাই মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আমার কল্পনা অবশ্য অত ওয়াইল্ড নয় কখনোই। আমি বিশ্বাস করি, সৃষ্টি কখনো স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে না। ফ্রাঙ্কেনস্টাইনও কিন্তু ফিকশনের চরিত্র, বাস্তব নয়।
লেখকরা যেমন অনেকদিন ধরেই রোবট কল্পনা করছিলেন, বিজ্ঞানীরাও্ তেমনি। বিশ্বের প্রথম প্রোগ্রামেবল রোবট ইউনিমেট বানানো হয় ১৯৫৪। ১৯৬৬ সালে বানানো শেকি রোবটের কিছুটা বুদ্ধিও ছিল। মানুষের মত করে প্রথম হিউম্যানয়েড রোবট বানানো হয় ২০০০ সালে, যার নাম আসিমো। তবে মানবিয় রোবট বানানোর উৎকর্ষের নাম জিয়া জিয়া। এখন পর্যন্ত জিয়া জিয়াই সবচেয়ে নিখুত রোবট।
তবে সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তুলেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন রোবট সোফিয়া দ্যা হিউম্যানয়েড। সেই ঢেউ লেগেছে বাংলাদেশেও। ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড ২০১৭ উপলক্ষ্যে দু’দিনের ব্যস্ত সফরে লাখো মানুষের মন জয় করেছে সোফিয়া। তবে সোফিয়া আসার আগেই ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টে দুটি লাইন রোবট খাবার পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে আলোচনায় আসে। সোফিয়া এসে রোবট নিয়ে আলোচনায় ঝড় তুলে দেয়।
হংকংয়ের হ্যানসন রোবোটিক্সের বানানো সোফিয়াকে নিয়ে ঝড়টা অবশ্য তুলেছে সৌদি আরব। গত অক্টোবরে সোফিয়া সৌদি আরব সফরে গিয়েছিল। সোফিয়ার কথাবার্তা, চালচলন, স্মার্টনেস ভেঙ্গে দিয়েছে সৌদি আরবের কঠোর রক্ষণশীলতার দেয়াল। এমনিতে নারীরা সৌদি আরবে অবরুদ্ধ থাকলেও সোফিয়াতে তারা এতটাই মুগ্ধ তারা তাকে রীতিমত নাগরিকত্ব দিয়েছে।
সোফিয়া হলো বিশ্বের প্রথম নাগরিকত্ব পাওয়া রোবট। আর সৌদি আরবের মত দেশ নারী রোবটকে নাগরিকত্ব দিয়েছে বলেই এত হইচই। তবে ইদানিং সৌদি আরবেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। নারীরা সেখানে গাড়ি চালানোর অনুমতি পেয়েছে। যুবরাজ সালমান বদলে দিতে চাইছেন সৌদি আরবকে। সোফিয়ার নাগরিকত্ব হয়তো সেই হাওয়ার ফসল।
২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল সোফিয়াকে প্রথম সক্রিয় করা হয়। সেই সোফিয়া বাংলাদেশে এসে প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছে, তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ডিজিটাল ওয়ার্ল্ডের উদ্বোধন দেখেছে। লেজার শো দেখেছে। সাংবাদিকদের সাক্ষাতকার দিয়েছে। সোফিয়ার সেশনে ২ হাজার মানুষের থাকার কথা ছিল। হলের ভেতরে মানুষ ছিল তার কয়েকগুণ বেশি। ‘সুন্দরী’ সোফিয়াকে একনজর দেখতে বঙ্গবন্ধু সম্মেলন কেন্দ্রের ভেতরে-বাইরে রীতিমত মারামারি লাগার দশা। এই সৌভাগ্যবতীকে বাংলাদেশ বিমান দিয়েছে গোল্ড মেম্বারশিপ।
প্রোগ্রাম করে দিলে সোফিয়া মানুষের মত কথা বলতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, চেহারায় নানা অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে পারে। আগে দেখা মানুষ দেখলে চিনতে পারে। কাঁদতে না পারলেও হাসতে পারে। বাংলাদেশে এসে সোফিয়া পড়েছিল জামদানির পোশাক, তাতে ছিল ওড়নাও। গত কদিনে সোফিয়া চলন, বলন, পোশাক, পরিচ্ছদ নিয়ে মাতোয়ারা গণমাধ্যম, সামাজিক মাধ্যম। হুজুগে মেতে উঠতে অভ্যস্ত আমাদের হুজুগের চূড়ান্ত মাত্রাটা দেখিয়ে দিয়ে গেছে সোফিয়া।
রাস্তা-ঘাটে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র একটাই আলোচনা। মানুষ আগায়, আমরা পিছাই। যত দিন যাচ্ছে, বাংলাদেশ যেন ততই রক্ষণশীল হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের হোটেলে ওয়েটারের দায়িত্ব পালন করা দুই রোবটের একটি নারী আকৃতির রোবটকে ওড়না পরাতে হয়েছে। এমনকি সুফিয়ার সফরের আগে কেউ কেউ হুমকি দিয়েছিল, তাকে যেন ওড়না পরানো হয়। তাই হয়েছে।
তবে আমার শঙ্কা ছিল অন্য জায়গায়। কদিন আগে হাইকোর্টের সামনে এক নারী মূর্তি নিয়ে মৌলবাদীরা যা করেছে, তাতে সোফিয়ার সফর নিয়ে ভয় ছিল। মূর্তি নিয়েই যাদের এত আপত্তি, কথা বলা নারী রোবট নিয়ে না জানি কী করে। তবে সৌদি আরব সোফিয়াকে নাগরিকত্ব দিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। সৌদি আরবের চেয়ে বেশি রক্ষণশীল হওয়া তাদের পক্ষে আপাতত সম্ভব নয়।
তারপরও বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন সোফিয়ার সৌদি নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়েছে। পার্টির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, রোবটকে নাগরিকত্ব দেয়া ইসলাম ধর্মের সাথে ঘোর বিরোধী কাজ। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন আল্লাহ তার এবাদত বন্দেগী করার জন্য। আর রোবট এর সৃষ্টিকর্তা হলো ডেভিড হ্যানসন, যিনি একজন মানুষ।
মানুষকে আল্লাহ আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। এই রোবট পরিচালিত হয় একজন মানুষ দ্বারা। মানুষ পরিচালিত হয় একমাত্র আল্লাহর দ্বারা। তাই রোবট কখনো মানব মর্যাদা পেতে পারে না। তাকে এক জায়গায় দাঁড় করানো শেরেক সমতূল্য।
সৌদি সরকার রোবট সুফিয়াকে নাগরিকত্ব প্রদান করে মুসলিম নাগরিকদের হৃদয়ে আঘাত করেছেন। তার নাগরিকত্ব যদি কোন খৃষ্টধর্মাবলম্বী দেশ প্রদান করতো তাহলে বিষয়টি হতো ভিন্ন। কিন্তু একজন মুসলিম প্রধান ও পবিত্র দেশ হিসেবে সৌদি আরব সোফিয়াকে নাগরিত্ব প্রদান করতে পারে না।
‘বিবৃতিতে সোফিয়ার নাগরিকত্ব বাতিল করে আল্লাহর কাছে ক্ষমতা চাইতে সৌদি সরকারের নিকট আবেদন জানানো হয়। সোফিয়া অনেকের অনেক প্রশ্নের জবাব দিয়েছে। চমকে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকেও। শেখ হাসিনার নাতনির নাম যে সোফিয়া, এটা রোবট সোফিয়ার কাছ থেকেই জেনেছি আমরা। তবে তার একটি উত্তর চমকে দিয়েছে আমাকে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে তোমার অভিমত কী? সাংবাদিকদের এই প্রশ্নের জবাবে সোফিয়া যখন বলে, ‘পৃথিবীতে কথা বলার মত আরো অনেক বিষয় আছে। ‘আমি সত্যি চমকে যাই। সোফিয়া তো শুধু বুদ্ধিমতী নয়, দারুণ কৌশলীও। অনেকে আফসোস করছেন, ইশ তাদের স্ত্রীরা যদি সোফিয়ার মত হতো; যে সুন্দরী, স্মার্ট, বুদ্ধিমতী, কৌশলী; কিন্তু সুইচ টিপে যার মুখ বন্ধ রাখা যায় এবং যার কোনো আবদার নেই।
তবে আমি ঘোষণা করছি, যন্ত্রমানবী নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমার সকল আগ্রহ মানুষ নিয়ে; ভালো-মন্দে মেশানো মানুষ, যার শুধু বুদ্ধি থাকবে না, বিবেকও থাকবে; যার মস্তিষ্কের চেয়ে হৃদয় বড় হবে; যে শুধু হাসতে জানে না, কাঁদতেও জানে।
রোবট মানবীর বুদ্ধি যত উৎকর্ষতাই পাক; সে নিশ্চয়ই শিশিরে পা ভেজাতে চাইবে না, নিশ্চয়ই বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ পাবে না। বসন্তের বাতাস নিশ্চয়ই তাকে উদাস করবে না। অকারণে সে হেসে উঠবে না, যুক্তি ছাড়া পাগলের মত ভালোবাসবে না।
আমি জানি বিজ্ঞান যত উৎকর্ষ লাভ করবে, তা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বকেই ঘোষণা করবে। রোবট যত দক্ষই হোক, সে কখনো মানুষ হবে না। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার আনপ্রেডিক্টেটেবিলিটিতে। মানুষ কখন কী করবে, তা বোঝা ভার। মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান। লালন সাঁই গেয়ে গেছেন, ‘এমন মানবজনম আর কি হবে, মন যা করার ত্বরায় করো এই ভবে…’।
প্রভাষ আমিন : সাংবাদিক, কলাম লেখক, বার্তা প্রধান, এটিএন নিউজ।
probhash2000@gmail.com

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful