Templates by BIGtheme NET
আজ- শনিবার, ২৩ মার্চ, ২০১৯ :: ৯ চৈত্র ১৪২৫ :: সময়- ৯ : ১০ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / বিভ্রান্ত জাপা এবং বিচক্ষণ রওশন এরশাদ

বিভ্রান্ত জাপা এবং বিচক্ষণ রওশন এরশাদ

আনিস আলমগীর

আবার আলোচনায় জাতীয় পার্টি। তারা বিগত সংসদে যেমন করে সরকারে ও বিরোধী দলে মিলেমিশে ছিল, সেই স্টাইলে জাতীয় নির্বাচনেও যাচ্ছে। জাপার সঙ্গে আসন বণ্টনে সরকারি দলের ‘আংশিক’ সমঝোতা হয়েছে। তারা ২৯টি আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে আর ১৪৫টি আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, ‘উন্মুক্ত নির্বাচনে মহাজোটের কোনও ক্ষতি হবে না। কারণ, মহাজোটভুক্ত যে প্রার্থী শক্তিশালী, তাকেই সমর্থন দেওয়া হবে। উন্মুক্ত নির্বাচনে পার্টির নেতাকর্মীদের মাঝে উৎসাহ সৃষ্টি হবে।’ আবার বলা হচ্ছে বিএনপি যদি শেষ মুহূর্তে এসেও নির্বাচন বয়কট করে সে কারণে এটা মহাজোটের কৌশল। এসব কথা কতটা যুক্তিসিদ্ধ ভাবার বিষয়।
নির্বাচন এলে জাতীয় পার্টির দিশা থাকে না। দিশা থাকে না এর চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদেরও। কখনও দলটি ভাঙনের শিকার হয়, কখনও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবারও সেসব লক্ষণ সুস্পষ্ট। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে নমিনেশন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দিয়েছেন এরশাদ। বলা হচ্ছে, সরকার এবং রওশন এরশাদ গ্রুপের চাপেই এটা করা হয়েছে। কিন্তু দুই দিন না যেতেই তাকে আবার চেয়ারম্যানের বিশেষ সহকারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এবং হাস্যকরভাবে দলীয় প্যাডে বলা হয়েছে চেয়ারম্যানের পরেই তার স্থান। তিনি দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি। তাহলে দলটির জ্যেষ্ঠ কো-চেয়ারম্যান ও সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং পার্টির কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের অবস্থান কোথায়? মহাসচিবের গুরুত্ব কী?

রাঙাকে এরশাদ ক’দিন টিকতে দেন সেটা নিয়ে এখনই অনেকে সন্দেহ করছেন। কারণ, এর আগে একই রকমভাবে রওশন এরশাদ গ্রুপের চাপে এরশাদ জিয়াউদ্দিন বাবলুকে মহাসচিব করে বেশি দিন রাখেননি। হাওলাদারকে ফিরিয়ে এনেছিলেন তিনি। এবারও হয়তো নির্বাচনের পরে এরশাদ স্বপদে ফিরিয়ে আনবেন হাওলাদারকে।

চিকিৎসার কথা বলে সোমবার ১০ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুর চলে গেছেন এইচ এম এরশাদ। আনপ্রেডিক্টেবল রাজনীতিবিদ এরশাদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। তিনি দলটিতে সকাল-বিকাল নিজের দেওয়া সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেন– এটাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ। শেষ পর্যন্ত মহাজোটের বাইরের ১৪৫ জন জাপা প্রার্থীকে নিয়ে তিনি কোন খেলা খেলেন বলা যায় না। এরশাদ যদি ২০১৪ সালের নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করতেন জাতীয় পার্টি একটি অর্থবহ দলে পরিণত হওয়ার সুযোগ ছিল। মনে হচ্ছে এই দলটির সম্পদও এরশাদ, আবার তার বোঝাও এরশাদ। এরশাদের নানা কেলেঙ্কারি, সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দলটি আজ ছিন্নভিন্ন।

তবে তার বিরুদ্ধে মনজুর হত্যাসহ পুরনো মামলার কারণে এরশাদ নিজের পছন্দমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন– এটাও বলা কঠিন। যে দলই সরকারে আসে তারা তার মামলা জিইয়ে রাখে। রাজনৈতিক মিত্র বানিয়েও কেউ তাকে বিশ্বাস করতে পারছেন না–এটিও একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে এরশাদের চরম দেউলিয়াত্ব। আওয়ামী লীগ তাকে জেল থেকে মুক্ত করেছে কিন্তু তিনি তাদের বিরুদ্ধে গিয়ে যারা তাকে জেলে রেখেছিল সেই বিএনপির সঙ্গে সখ্য গড়েছিলেন ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে। বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে মিলে চারদলীয় জোট শুরু করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের আগে আগে চারদলীয় জোট ছাড়তে হয়েছিল তাকে। এই আছি- এই নেই- স্বভাবের কারণে তাকে নিয়ে সেই যে অবিশ্বাস শুরু তা এখনও থামছে না।

এর বিপরীতে ব্যক্তিগত জীবনে, রাজনৈতিক জীবনে এরশাদের কাছ থেকে নানা অপমান-চাপের শিকার হয়েও বেগম রওশন এরশাদ জাতীয় পার্টিতে তার উজ্জ্বল ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। তার বিচক্ষণ ও সাহসী ভূমিকা শুধু তার দলকে নয়, জাতিকে সমূহ সর্বনাশের হাত থেকে রক্ষা করেছে বিগত দিনে। যদি দশম সংসদ প্রতিষ্ঠা না হতো, দেশের এত উন্নয়ন, অগ্রগতির পথে যাত্রা সম্ভব ছিল না। সম্ভব হতো না যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নও। পুরো বিচার প্রক্রিয়াকে বানচাল করে দিতে চেয়েছিল জামায়াত-শিবির আর বিএনপি। তাই বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে বেগম রওশন এরশাদের ভূমিকা ইতিহাসে মূল্যায়ন হওয়া উচিত।

বিদায়ী সংসদে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে অনেক কটূক্তি হয়েছে। কিন্তু বিরোধী দল মানে সরকারের সবকিছুতে সমালোচনা আর কথায় কথায় সংসদ বর্জন করার যে সংস্কৃতি বিএনপি বিগত দিনে রপ্ত করেছিল, তা কোনও সংসদীয় বিরোধী দলের ভূমিকা হতে পারে না। সংসদ কখনও কুরুক্ষেত্র নয়। এখানে আলোচনা হবে জাতির বর্তমান ভবিষ্যৎ আর দেশের কল্যাণে। একজন উচ্চশিক্ষিত বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে রওশন এরশাদ তার প্রমাণ রেখেছেন।

বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি কখনোই সংসদে তার সঠিক ভূমিকা পালন করেনি। বিএনপি নেত্রী বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে যত কম সময় উপস্থিত ছিলেন তা বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে বিরল। গত দুই দশকের মধ্যে সংসদে সবচেয়ে কম হাজিরের রেকর্ড গড়েছেন খালেদা জিয়া। সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ড অনুসারে, নবম সংসদে ৪১৮ কার্যদিবসের মাত্র ১০ কার্যদিবস হাজির ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি শুরু হওয়া নবম সংসদের নির্ধারিত পাঁচ বছর মেয়াদে বিরোধী দল অনুপস্থিত ছিল ৩৪২ কার্যদিবস, উপস্থিত ছিল মাত্র ৭৬ কার্যদিবস।

সপ্তম সংসদেও মোট ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া হাজির ছিলেন মাত্র ২৮ কার্যদিবস। অন্যদিকে, পঞ্চম সংসদে (১৯৯১-১৯৯৫)বিরোধী দলে থাকা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪০০ কার্যদিবসের ১৩৫টিতে অংশ নেন। অবশ্য সেবার আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করেছিল এবং সে জটিলতায় তারা সংসদে যাননি অনেক দিন। অষ্টম সংসদে (২০০১-২০০৬) শেখ হাসিনা ৩৭৩ কার্য়দিবসের ৪৫টিতে উপস্থিত ছিলেন।

আওয়ামী লীগ বিএনপি দু’দলই সংসদকে অকার্যকর করতে চেয়েছে বিরোধী দলে থাকতে। ‌বিএনপি বড় কোনও ইস্যু ছাড়াই সংসদকে অকার্যকর করতে চেয়েছে বেশি। তাদের সদস্যদের আচরণে প্রমাণ হতো সরকারে নেই এই বিষয়টা হজম করা তাদের পক্ষে কঠিন। কিন্তু গত ৫ বছর সেই ধারাকে পাল্টে দিয়েছে বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির সংসদীয় দল। তারা যেখানে প্রয়োজন সমালোচনা করেছে, যেখানে প্রয়োজন সরকারের প্রশংসা করেছে। পুরোটাই সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে তারা দেশকে এগিয়েছে, সংসদকে কার্যকর করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে শাসনতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম রাখার ব্যাপারে বেগম রওশন এরশাদ বিরাট অবদান রেখেছেন। তার গঠনমূলক রাজনীতির প্রশংসা করতেই হবে।

জাতীয় পার্টির মন্ত্রিসভায় যোগদান নিয়েও নানা কথা হয়েছে। পার্টি প্রধান এইচ এম এরশাদ কমপক্ষে ১০ বার বলেছেন তারা মন্ত্রিসভা ত্যাগ করবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মসিউর রহমান রাঙ্গা, মুজিবুল হক চুন্নু মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেননি। এরশাদ নিজেও মন্ত্রীর পদমর্যাদার প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূতের পদ থেকে পদত্যাগ করেননি।

যারা জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দলে থেকে সরকারেও থাকা নিয়ে নানা সমালোচনা এবং ঠাট্টা করেছেন তারা ব্রিটেনের ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারেন। তখনও আমরা ব্রিটিশের কলোনি ছিলাম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেন যখন অস্তিত্বের মোকাবিলায় ছিল তখন বিরোধীদলীয় নেতা ক্লিমেন্ট এটলি প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী হয়েছিলেন। বিরোধীদলীয় লেবার লিডার ক্লিমেন্ট এটলিকে কনজারভেটিভ দলের প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল তার ডেপুটি প্রাইম মিনিস্টার করেছিলেন। জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় তারাও মন্ত্রিসভায় যেতে দ্বিধা করেননি।

আরেকটি কথা বলা দরকার। ১৯২০ সালে ভারতের জাতীয় নির্বাচনে গান্ধীজির নেতৃত্বে কংগ্রেস নির্বাচন বয়কট করেছে। সে কারণে সমগ্র ভারতে দুইশতাধিক পার্লামেন্ট মেম্বার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বলে কী পার্লামেন্ট রহিত হয়ে গেছে? কারও নির্বাচনে না যাওয়ার যেমন অধিকার আছে, কারও যাওয়ারও অধিকার আছে। কারও ভোট দেওয়ার অধিকার আছে, কারও না দেওয়ারও আছে। তাই বলে যারা ভোট দিতে যাবে তাদের ১৮ জনকে রাস্তায় ধরে হত্যা করা, একজন প্রিজাইডিং অফিসারকে নৃশংসভাবে খুন করা, তিনজন পুলিশকে হত্যা করা কোন অধিকারের মধ্যে পড়ে? ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরে বিএনপি-জামায়াত ৩১৯ জন নিরাপরাধ মানুষ হত্যা করেছে।

২০১৩-১৪ সালে এবং ১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে যে পেট্রোলবোমার আন্দোলন করেছিলেন তাতে জাতির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। নির্বাচনের সময় জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম এরশাদ তার দলীয় প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে ফেলেছিলেন। জাতীয় পার্টির অনেক যোগ্য প্রার্থী এরশাদের নির্দেশে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করায় অনেক স্থানে অনেক অযোগ্য লোককেও দলীয় মনোনয়ন দিতে হয়েছে। সরকারও বেকায়দায় পড়ে তা মেনে নিয়েছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে চার্চিল তার দেশকে বিজয়ী করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী নির্বাচনে তিনি জিততে পারেননি। জনগণ ক্লিমেন্ট এটলিকে তাদের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। লেবাররা ক্ষমতায় এসেছিল। বাংলাদেশে জাতীয় পার্টি যদি ২০১৪ সালে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে লড়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতো, রাজনীতির ইতিহাসও তারা হয়তো বদলে দিতে পারতো। চলতি নির্বাচনেও শক্তিশালী দল হিসেবে আবির্ভূত হতে পারতো। রওশন এরশাদের ভূমিকাটি তখন আরও চোখে পড়তো।

এরশাদের ভূমিকা দেখে জাতীয় পার্টিকে মূল্যায়ন করা কঠিন। কিন্তু রওশন এরশাদকে সম্মানিত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় পার্টির আসন আরও বাড়িয়ে দিতে পারতেন। অবশ্য জাপার কেউ কেউ ১৪ দলের নেতাদের মতো নৌকা মার্কা নিয়ে নির্বাচনে লড়লে আওয়ামী লীগ হয়তো সিট ছেড়ে দিতে স্বস্তি পেতো। এরশাদের যেমন দলীয় প্রার্থীদের সামলানো কঠিন তেমনি আওয়ামী লীগের মতো বড় দলেরও নিজের প্রার্থীদের সামাল দেওয়া কঠিন। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই জোটগত নির্বাচন করতে হবে। নতুবা বড় দলগুলোর আলাদা নির্বাচন করাই উত্তম।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

anisalamgir@gmail.com

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful