Templates by BIGtheme NET
আজ- সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ :: ৮ আশ্বিন ১৪২৬ :: সময়- ৯ : ২৮ অপরাহ্ন
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / বাংলা ভাষার সার্বজনীন ব্যবহার দেখে যেতে চান ভাষা সৈনিক আনিসুল হক পেয়ারা

বাংলা ভাষার সার্বজনীন ব্যবহার দেখে যেতে চান ভাষা সৈনিক আনিসুল হক পেয়ারা

মমিনুল ইসলাম রিপন: ১৯৪৭ এর মধ্য আগস্টে দ্বিজাতি তত্বের ভিত্তিতে জন্ম হয়েছিলো ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের। দীর্ঘ সময়ের লাঞ্চনা-বঞ্চনা থেকে মুক্তির পর বাঙালিরা স্বপ্ন দেখেছিল শান্তিতে দিন কাটবে। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম প্রদেশে ভাগ হওয়া পাকিস্তানে সৃষ্টি হয় গলা চেপে ধরার শাসন ব্যবস্থা। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি বাঙালি জাতীয়তাবোধে বিশ্বাসী পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর চালিয়েছিল অন্যায় ও বৈষম্যমূলক আচরণ।
বাংলা ভাষাভাষীদের দাবিয়ে রাখতে উর্দূকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছিল শাসক গোষ্ঠী। ১৯৪৮ সালের ফেব্রæয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণ দিতে গিয়ে জিন্নাহর বলেছিলেন- ‘উর্দু একমাত্র উর্দূই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’। তার এই ভাষণে সাথে সাথেই উপস্থিত ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ শুরু করেন। সেইদিন থেকেই শুরু হয় ভাষার জন্য আন্দোলন। এ আন্দোলন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে। রংপুরেও একই সময় থেকে দানা বাঁধে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ২২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্ররা।
বাংলা ও বাঙালির প্রতি যে অন্যায়-বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু করেছিল পাকিস্তানের শাসক শ্রেণি, ভাষা আন্দোলন ছিল তারই একটি প্রবল প্রতিবাদি আন্দোলন। ১৯৫২ সালের সেই একুশে ফেব্রয়ারি থেকেই ক্রমে ক্রমে ধাবিত হয়েছিল মুক্তির সংগ্রাম তথা স্বাধীনতার আন্দোলন। রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে সারাদেশ যখন উত্তাল সেসময় বসে ছিল না রংপুরের দামাল ছেলেরাও। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তারা রাজপথে মিছিল-মিটিং সমাবেশ করে জানিয়েছিল তীব্র প্রতিবাদ।
১৯৫২’র স্লোগান মুখর ভাষা আন্দোলনের সেই দিনগুলো নিয়ে এখনো কাঁদায় ভাষা সৈনিক মীর আনিসুল হক পেয়ারকে। তাঁর এ কান্না বাংলা ভাষার ব্যবহার, বিকৃতি আর উচ্চারণে বর্তমান প্রজন্মের অবহেলা দেখে। বাংলাকে সর্বক্ষেত্রে সার্বজনীন ভাষা হিসেবে দেখে যেতে চান এই ভাষা সৈনিক। এই প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই ৬৭ বছর আগের ভাষা সংগ্রামের স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা জানান রংপুরের ভাষা সৈনিক মীর আনিসুল হক পেয়ারা।
রংপুরের মানুষের কাছে সদা হাস্যোজ্জ্বল এই ভাষা সৈনিকের মুখে এখন আর হাসি নেই। তিনি গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনার মারাত্বক আহত হন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হবার পর থেকে বাসায় শয্যাশয়ী হয়ে পড়ে আছেন তিনি।
আনিসুল হক পেয়ারা জানান, রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে মিছিলে যাওয়ার জন্য রংপুর জিলা স্কুল থেকে তাকে বের করে দেয়া হয়। পরে আদর্শ স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে ১৯৫২ সালে কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন। ওই সময় কারমাইকেল কলেজের তৎকালীন অবাঙালি অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন না। ছাত্রদের মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে দিতেন না উর্দূভাষী এই অধ্যক্ষ। কোথাও কোনো পোস্টার কিংবা দেয়াল লিখন দেখলেই ছিঁড়ে বা মুছে ফেলার নির্দেশ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখাতেন। কিন্তু ছাত্রদের কোনভাবেই দমাতে পারেনি কলেজ প্রশাসন।
১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন। আগুন ঝড়া ফাগুনের এই দিনটি ছিল ১৯৫২ একুশে ফেব্রæয়ারি। সেদিন ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলের ওপর ১৪৪ ধারা জারি করেছিল শাসক গোষ্ঠী। পুলিশের বেরিকেড ভেঙে ১৪৪ ধারা জারি উপেক্ষা সেই দিন রাজপথে মেনেছিল ভাষার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা। কিন্তু পুলিশ তাদের ছাড় দেয়নি। মিছিলের ওপর বৃষ্টির মতো চলে গুলি বর্ষণ। নিথর দেহ পড়ে থাকে পিচঢালা রাজপথে। ফাগুনের বিকেলটা হয় ভাষার জন্য বাঙালীর রক্তঝড়া বিকেল। এই খবর সন্ধ্যার দিকে ছড়িয়ে পড়ে রংপুরে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ এর প্রতিবাদে এবং বাংলার রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাত থেকেই সংঘবদ্ধ হতে থাকে।
তিনি জানান, পরের দিন ২২ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভা শেষে মিছিল নিয়ে শহরের দিকে এগুতে থাকেন ছাত্র জনতা। মিছিলটি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পার হয়ে তেঁতুল তলার কাছাকাছি এলেই পুলিশ মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে উদ্যত হয় । সেসময় পুলিশি বাঁধা উপক্ষো করেই ছাত্র-জনতার স্লোগান মুখরিত প্রতিবাদের মিছিলের শহরের ভিতরে পৌঁছে যায়। সেদিন পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জের কাছে মাথা নত করেনি প্রতিবাদি ছাত্র-জনতার অদম্য সাহস আর দৃঢ়তা।
স্বেচ্ছাসেবি সংগঠনের অনুপ্রেরণা মীর আনিসুল হক পেয়ারা। তার নেতৃত্বে অনেক সংগঠন দাঁড়িয়েছে শক্তভাবে। দক্ষ সংগঠক হিসেবেও রয়েছে তার পরিচিতি। স্কাউটিংয়ের প্রসার ও মানব সেবায় তার রয়েছে অসামান্য অবদান। স্কাউটিংয়ের সাথে জড়িতদের অনেকেই তাকে নানা ভাই বলে ডাকেন।
আনিসুল হক পেয়ারা বলেন, ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার কারণে ৫২’র পরে তার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। একপর্যায়ে আত্মগোপনে চযোই। একারণে ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারি নি। পরে ১৯৫৫ সালে পরীক্ষাকে অংশ দিতে হয়। ১৯৫৬ সালে আবার তাকে পলাতক হতে হয়। তার মতো অনেকেই পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।
দীর্ঘ ছয় মাসের মতো শয্যাশয়ী এই ভাষা সৈনিক তার সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বার্তা২৪.কমকে বলেন, রংপুরে ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো কারমাইকেল কলেজ। আন্দোলনে তখন নেতৃত্ব দিতেন মতিউর রহমান, আলতাব হোসেন, মোহাম্মদ আফজাল, আজিজুর রহমান, সুফী মোতাহার হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, শাহ আবদুর রাজ্জাক, আশরাফ হোসেন বড়দা, শামসুল হুদা, শাহ আবদুল বারী, শাহ তবিবর রহমান প্রধানসহ অনেকে। যাদের অনেকই আজ বেঁচে নেই। আর যারা আছেন, তাদের খোঁজ কেউ রাখেন না। শুধু ভাষার মাস এলেই খোঁজ পড়ে আমাদের।
কাঁদামাটি দিয়ে শহীদ মিনার তৈরির স্মৃতি তুলে ধরেন মীর আনিসুল হক পেয়ারা। তিনি জানান, ১৯৫২ পরবর্তী একুশ ফেব্রæয়ারি স্মরণে শহীদ দিবস উদযাপনে আমরা শহীদ মিনার তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করি। ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রæয়ারি ঐক্যবদ্ধ তৎপরাতয় এক রাতের শ্রমে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে কাঁদামাটি দিয়ে তৈরি হয় প্রথম শহীদ মিনার। সেই কাঁদামাটির শহীদ মিনার আজো স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনা সদস্যরা শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। স্বাধীনতার পর ওই জায়গাতেই নতুন করে শহীদ মিনারটি নির্মিত করা হয়।
মীর আনিসুল হক পেয়ারা ১৯৬১ সালে মাহিগঞ্জ আফান উল্ল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলনের সময় জেল খাটেন দুই মাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন সাহসী এই মানুষ।
তেরাশি বছর বয়সে এসে এখনো শুদ্ধ বাংলার ব্যবহার সহ নতুন প্রজন্মের কাছে ভাষার গুরুত্ব জানানোর স্বপ্ন আঁকছেন মীর আনিসুল হক পেয়ারা। ১৯৩৬ সালের ১৩ ফেব্রæয়ারিতে জন্ম নেয়া এই মানুষটি একাধারে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান, ৭১’র মহান মুক্তিযুদ্ধে অকুতোভয় সৈনিকের পরিচয় দিয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রাজনীতি, স্কাউট সংগঠন আর উন্নয়ন আন্দোলনে সবসময় রংপুরের মানুষের সাথে ছিলেন তিনি।
মীর আনিসুল হক পেয়ারার পাঁচ সন্তানের মধ্যে চার মেয়ে ও একজন ছেলে। স্ত্রী নূরজাহান বেগম ২০১৪ সালে মারা গেছেন। ছেলে-মেয়ের সবারই বিয়ে হয়েছে। এদের মধ্যে বড় মেয়ে ইফফেতারা বিনতে আনিস লুবনা রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, দ্বিতীয় মেয়ে ইসমেত আরা বিনতে আনিস লুমা বেসরকারি ইন্সুরেন্স কোম্পানীতে কর্মরত, ছেলে মীর ইফতেখারুল হক পল্লব ব্যবসা করছেন। আর বাকি দুই মেয়ের মধ্যে শামীম আরা সুলতানা রাজশাহীর চারঘাটে সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ছোট মেয়ে শাহিনা সুলতানা রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।
বর্তমানে পরিবারের অন্যদের পাশাপাশি অসুস্থ শ্বশুড়ের সেবা যন্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন ছেলের বউ রাবেয়া খাতুন শিল্পী। তিনি জানান, এ মাসে রংপুর ও কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা শয্যাশয়ী আনিসুল হক পেয়ারার খোঁজখবর নিতে বাসায় এসেছিলেন।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful