Templates by BIGtheme NET
আজ- রবিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ :: ৭ আশ্বিন ১৪২৬ :: সময়- ৬ : ৫৩ অপরাহ্ন
Home / শিল্প ও সাহিত্য / বই আলোচনা : অভ্যস্ত দিনে অনভ্যাসের গল্প

বই আলোচনা : অভ্যস্ত দিনে অনভ্যাসের গল্প

বায়েজিদ বোস্তামী

তারুণ্যের যে নিরীক্ষা প্রবণতা থাকে সেই পথ পুরোপুরি না মাড়িয়েও অলাত এহ্সান গল্পরাজির ভেতর পাঠককে টেনে নিতে পারেন। ‘অনভ্যাসের দিনে’ এই তরুণ তুর্কির প্রথম গল্পবই। বইয়ের এক ডজন গল্প পাঠককে বহুবর্ণিল চরিত্র, ঘটনা ও বিষয়ের সাথে পরিচয় করায়।

এহ্সানের গল্প বলার ঢঙটি চেনা। একজন গল্পকার যেভাবে বিবিধ ফোঁড়ে, ফাঁসে ও গিঁটে গল্প বুনতে চান, গল্পের সাথে পাঠককে জড়াতে চান সেই চেনা ঢঙটিকেই আত্মস্ত করেছেন তিনি। উৎসর্গপত্রের মায়ের রন্ধন প্রসঙ্গে যে উক্তিটি দেখি, সেটি যে গল্পকার নিজের জন্য একটি আপ্তবাক্য হিসাবে নিয়েছেন, এতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। অর্থাৎ আলগা চটক তথা তেলমশলার প্রতি ঝোঁক তার নেই; চেনা কৌশলেই আস্থা রেখেছেন তিনি। প্রতিটি গল্পই এক প্রকার স্থিরতার মশৃণতা নিয়ে শুরু হয়ে তরতর করে পরিণতির দিকে এগিয়ে যায় তাদের অভীষ্ট দিকে। এরই ফাঁকে গল্পকার তার গল্প বলবার যে তাগিদ, সেই তাগিদের প্রতি দায়িত্বটুকুও সেরে নেন; মানে, বার্তাটি আমাদের মগজে সেঁধিয়ে দেন।

কাদের গল্প শোনাতে চান অলাত? এই প্রশ্নটি তুলে একটি বিস্ময়ের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়। কেননা তার গল্পের চরিত্ররা বিচিত্রমুখী। একটি বা কয়েকটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে তাদের ফেলা যায় না। তার নির্মিতির ভিতরে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে নাগরিক ও গ্রামীণ, কর্পোরেট ও এনজিওবাদী, ক্ষুধার্ত ও আড়তদার, সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ ও আদর্শবাদী চরমপন্থি, মুখ বুজে সব সয়ে যাওয়ায় অভ্যস্ত ও বিপদগ্রস্ত, নিরীহ ছাপোষা, মাতাল, মনোদৈহিক সংকটে থাকা নারী, বন্ধ্যাত্বের বোঝাটানা ও স্বৈরিণী নারী, শেকড় হাতড়ে ফেরা যুবক, ধর্ম ও দারিদ্র্যের যুগল পেষণে পিষ্ট পিতা, কামুক পুরুষ—এইসব বিচিত্র চরিত্রেরা!

এহ্সান কীসের গল্প শোনাতে চান? এক লাইনে এই প্রশ্নের উত্তরও সম্ভব নয়। যে গল্প তার ঝুলি থেকে বইয়ের পাতায় উঠে আসে তার কেন্দ্রে থাকে মানুষ, প্রকৃতির খেয়ালে অসহায় মানুষ, নিয়ত নিজের দুর্ভাগ্যের সাথে লড়ে হিংস্র হয়ে ওঠা মানুষ, ক্ষয়ে যাওয়া সমাজের অন্ধ মানুষ, হঠাৎ সিনা টান করা মানুষ, প্রতারিত মানুষ, আধুনিক-ক্লান্ত পালাতে-চাওয়া মানুষ, শেকড় খুঁজে ফেরা মানুষ, কপট-ফিকিরবাজ মানুষ, কামক্লিষ্ট-ক্ষমতাপিষ্ট মানুষ, ক্ষুধার্ত মানুষ, ক্ষুধাব্যবসায়ী মুনাফাজীবী মানুষ! এইসব মানুষের গভীর ব্যর্থতা, অন্তর্গত অসহায়ত্ব, দারিদ্র্য, ফুঁসে ওঠা, ছুঁড়ে দেওয়া শ্লেষ, লোভ, হিং¯্রতা, অতীত, স্বপ্ন সব কিছুর কথক হয়ে গল্প শোনান তিনি।

তার গল্পের মৌল-প্রবণতা কী? ‘অনভ্যাসের দিনে’র যে বয়ানরাজি সেসব আমাদের এহ্সানের মৌল-প্রবণতাটির একটি স্পষ্ট ধারণা দেয়। গল্পের চরিত্রের অন্তর্গত ও কাঁধে চেপে থাকা সংকটগুলোর উপস্থাপনে যত্নশীল; ব্যক্তি মানুষ বা সামাজিক মানুষ বা রাষ্ট্রের নাগরিক মানুষ—যারই গল্প বলুন না তিনি। তার গল্পের নরনারীরা নিজেদের বেদনা, জটিলতা, হিংস্রতা, চেপে বসা শেকলের ঝন্ঝনানি ইত্যকার দ্বন্দ্ব নিয়ে যেন সময়ের সব সংকট ও স্বপ্নের গল্পগুলো প্যান্ডোরার বাকশোরূপে গচ্ছিত রাখেন নিজের কাছে। কখনো কখনো তিনি সেই বাকশের ডালাটি খুলে আমাদের সংক্রমিত করেন। আমরা মৌরি নামের নারীটির অসহায়ত্বজনিত দেহ-মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার সমব্যথী হই, বাসে ঘটমান ধর্ষণ দেখে অন্ধ হয়ে বসে থাকা পিতাটি—যার কন্যাকে তুলে নিয়া যাওয়া হচ্ছে—তার নির্বিকারত্বের করুণাকর অবস্থাটিতে নিজেকে স্থাপন করি; বা ইঁদুরকলে আটকে পড়া, ছুটিহীন, সবুজের কাছে পালাতে চাওয়া প্রাণটির নিথর দেহ হয়ে কাটা পড়ে থাকি। একধরনের আচ্ছন্নতার ভেতর দিয়ে দৈত্য মানুষের সামনে গা ঝেড়ে দাঁড়িয়ে থাপড়াবার ইচ্ছেটিও প্রকাশ করি—যেমনটা ঘটে ‘শুয়োরটা বলে কী’ গল্পে।

এহ্সানের গল্পে ঘুরেফিরে আসে রাজনীতি। যেহেতু তিনি সক্রিয়ভাবেই রাজনীতি করেছেন এবং  সেই রাজনীতি সচেতনতাকে বহন করেন। যে কারণে সংসদ ভবন থেকে সাপ বেরনোর কথা শুনি তার গল্পে। জলপাই রঙের উর্দিমুখের বিশেষ প্রিয় ‘ব্লাডি সিভিলিয়ান’ শব্দবন্ধ চাবুক কষে। শেকড় সন্ধানে ফেরা যুবকটি যে ভূতের মুখোমুখি হয়, তাকেও ঔপনিবেশিক প্রভুদের নির্মমতা, তাদের ভাগ করে দেওয়া ছেঁড়াদেশের গল্প বলতে শোনা যান। আসেন নেতাজি সুভাষ বসুও। একজন কামুক, দীর্ঘদিন যৌনতার-স্বাদ বঞ্চিত, ব্যগ্র-উদগ্র প্রবাসী তাজউদ্দীন ও তার বিশ্বস্ত যৌনসঙ্গী বউ হালিমার গল্প অনুমিত ছক পাল্টে শেষাবধি ক্ষমতা চর্চার কেন্দ্র-পরিধি জুড়ে যে পচন—সেটির ভাষ্য হয়ে ওঠে। ক্ষমতার একচ্ছত্রতা মানুষের যে কোন দুর্ভোগ নিয়ে আসতে পারে, তারই ছবি আঁকা হয় দারুন কৌতুকের ভেতর দিয়ে। ক্ষুধার্ত সামচেল সরিষা বেচতে গিয়ে তার ভাত গিলে খাওয়া আড়তদারের রক্তের দাগ লেগে থাকা নোটের স্মৃতি নিয়ে বাড়ি ফেরে। রক্তচোষা আড়তদার-মজুদদারদের বিরুদ্ধে চরমপন্থার অবস্থান নেওয়া বিলুপ্ত প্রায় নক্সালাইট-মাওবাদীদের কাজ যে সেটি, আমরা সহজেই তা বুঝতে পারি। এই শ্বাসরুদ্ধকর সময়ের সমাজ ও রাষ্ট্রের ক্ষমতাচর্চার রাজনীতির বয়ান খোলাখুলিই দিয়েছেন এহ্সান।

ফ্ল্যাপ থেকে জানা যায়, ‘এহ্সান যা লিখতে চান, যেভাবে লিখতে চান কবিতায় সেটা ঠিকঠাক করা যাচ্ছিল না বলেই গল্পের আশ্রয় নিয়েছেন।’ এখানে বোধহয় উৎসর্গপত্রে পিতার বয়ানে কৃষক ও গরুর স্বাস্থ্য বাবদে যে উদ্ধৃতি লেখক আমাদের জানান, তার প্রাসঙ্গিকতাটিকেও আমলে নেওয়া যায়। গল্পকার এহ্সান কবিতাকার এহ্সানকে অবদমিত করে গল্পের স্বাস্থ্যের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। তার গল্পের ডিটেইল একজন কবির সহায়তা পান। প্রায়শই মতো-শোভিত (পীড়িতও কি!) বাক্যের মুখোমুখি হই আমরা। কিছু বাক্য রীতিমতো চমৎকৃত করে। ঠিক এ কারণেই হয়তো তার গল্প নির্মেদ নয়; একটি বিলম্বিত লয়ে ধীরে বয়ে যায়, বাতাস কেটে-কেটে। কবি এহ্সান গল্পগুলোর নামকরণেও যে বাগড়া দিয়েছেন সেটা গল্পের শিরোনামগুলো পাঠে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নারী চরিত্রের কাব্যিক বর্ণনায় প্রায়শই বঙ্কিমকে মনে করান তিনি।

পাঠককে খুঁটিনাটি তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে এহ্সানের জানাশোনা ও ইনপুট করবার দক্ষতা রীতিমতো ঈর্ষণীয়। লোক-মিথকে জাদুবাস্তবতার টেকনিকে উপস্থাপনকালে সাবলীলভাবে তিনি যে বিস্তারিত বর্ণনা দেন, নিতান্ত নাগরিক পাঠকও লোক-মিথের আকার-প্রকারের ধারণাটি বুঝে উঠতে বিশেষ বেগ পান না।

বইয়ে বানান-বিভ্রাট অল্পই চোখে পড়ে। যদিও একটি গল্পের শিরোনামে ‘প্রায়শ্চিত্ত’ শব্দটির ভুল বানান দৃষ্টিকটু ঠেকেছে। ‘অনভ্যাসের দিনে’ আমাদের অভ্যস্ত দিনেরই গল্প আদতে, কিন্তু অস্বস্তিকর। এই অভ্যস্ত দিনে অনভ্যাসের গল্পগুলো বহুল ও বহুমাত্রিক পাঠ পাবে আশা করি।

 অনভ্যাসের দিনে

অলাত এহ্সান

প্রকৃতি প্রকাশন, মূল্য : ২২০ টাকা,

পৃষ্ঠা : ২২০, প্রকাশ : বইমেলা ২০১৮,

আইএসবিএন : ৯৭৮-৯৮৪-৯২০৪৯-৩-০

 বায়েজিদ বোস্তামী : কবি, গদ্যকার, ভ্রামণিক। কাব্য : পাপের পুরান, মনদুয়ার প্রকাশন ’১৯।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful