Templates by BIGtheme NET
আজ- শনিবার, ১৭ অগাস্ট, ২০১৯ :: ২ ভাদ্র ১৪২৬ :: সময়- ১১ : ৩১ অপরাহ্ন
Home / খোলা কলাম / ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’

‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’

প্রভাষ আমিন 

তাসলিমা বেগম রেণুকে পিটিয়ে হত্যার ভিডিওটি থেকে আমি কিছুতেই বেরুতে পারছি না। পুরো ভিডিওটি দেখিনি। যতটুকু দেখেছি, সেটাই আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কয়েকশ মানুষ মিলে একজন নিরীহ নারীকে পিটিয়ে মারছে! গ্রামে-গঞ্জে নয়, খোদ ঢাকায় এই ঘটনা ঘটেছে। এত মানুষের মধ্যে একজন ‘মানুষ’ ছিলেন না– যার বিবেক আছে, মানবতা আছে, ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায় বিবেচনার বোধ আছে। কেউ একজন সাহস করে এগিয়ে গিয়ে বললেন না, এই নারীকে আর মেরো না। আগে দেখো সে কে, তার দোষ আছে কিনা। আর দোষ থাকলেও তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হোক। আমার কাছে সবচেয়ে নিষ্ঠুর লেগেছে, পুরো হত্যার ঘটনাটি ভিডিও করতে কিছু মানুষের প্রাণান্তকর চেষ্টা। সবচেয়ে কাছ থেকে, সবচেয়ে ভালো ফুটেজ যেন পাওয়া যায়; সে জন্য রীতিমতো ধাক্কাধাক্কি করে অনেকে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। যে ক’জনের হাতে মোবাইল ছিল, সে ক’জনও যদি চেষ্টা করতেন; তাহলেও হয়তো এই একা মাকে বাঁচানো যেতো। এখন আমরা চোখের জলে ফেসবুক ভাসিয়ে ফেলছি, তখন এমন একজনও কি সেখানে ছিলেন না? আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সেদিন রেণুকে দুয়েক ঘা দিয়েছেন বা অন্তত ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন; এমন কেউও হয়তো এখন ফেসবুকে মানবতাবাদী সেজে বিশাল স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। ফেসবুক এখন এক বিশাল মুখোশ। মুখটা যত কদাকার, মুখোশটা ততই ঝলমলে। বাস্তবে নিষ্ঠুর মানুষটিও বিশাল মানবতাবাদী।

এবার গণপিটুনির প্রথম শিকার কিন্তু তাসলিমা বেগম রেণু নন। ‘পদ্মা সেতুতে এক লাখ মাথা লাগবে’—এই গুজবে শুরুর পর আরও একাধিক মানুষ গণপিটুনির শিকার হয়েছেন বা মারা গেছেন। গণপিটুনি আমাদের অনেক পুরনো রোগ। গণপিটুনি আসলে আমাদের এক ধরনের ‘বিনোদন’। যাদের অংশ নেওয়ার সাহস নেই, সুযোগ পেলে তারা অন্তত চোখের সুখ মেটাতে চান। রেণু হত্যার ঘটনায় অজ্ঞাত ৪/৫ শ জনকে আসামি করে মামলা হয়েছে। এই লেখা পর্যন্ত ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমি দাবি করছি, ভিডিও দেখে দেখে ঘটনাস্থলে উপস্থিত প্রত্যেককে যেন গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হয়। উপস্থিত প্রত্যেকে রেণু হত্যার জন্য দায়ী।

এবার এখন পর্যন্ত গণপিটুনিতে ৮ জনকে হত্যা করা হলেও আমরা সবাই শুধু রেণু হত্যার বিচার চাইছি। তার জন্য চোখের জল ফেলছি। বাকি ৭ জনের নামও আমরা কেউ

জানি না, আমিও না। কেন? বরাবরই যে কোনও ঘটনা আমাদের যত কাছে ঘটবে, ভিক্টিমের সঙ্গে আমাদের নৈকট্য যত বেশি হবে; আমাদের শোকের মাত্রাও তত বেশি হবে। তাসলিমা বেগম রেণু মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর চার বছরের শিশু তুবাকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে থাকতেন রেণু। তিনি উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাইমারি স্কুলে গিয়েছিলেন সন্তানকে সেখানে ভর্তির খোঁজ নিতে। তার মানে একদম আমাদের চেনা চরিত্র। সন্তানকে বাসায় রেখে মা স্কুলে গেছেন, মায়ের ফেরার আশায় অবুঝ সন্তান বসে আছে। এই ছোট ছোট আবেগ আমাদের ছুঁয়ে যায়। তাই রেণুকে নিয়ে সবার এত হাহাকার। আরও একটি কারণ আছে—ভিডিও। আমরা এখন আর ভিডিও না হলে কিছু বিশ্বাস করি না। ভিডিও না দেখলে আমাদের বিবেক জাগ্রত হয় না। আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, ভিডিও পাওয়া না গেলে রেণু হত্যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এত হইচই হতো না। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় না হলে গণমাধ্যমেও তেমন স্পেস পেতো না। আস্তে করে হারিয়ে যেতো। যেমন গেছে, আরও অনেক গণপিটুনির ঘটনা। তবে আমি শুধু রেণু হত্যা নয়; এবার ছেলেধরা গুজব ছড়ানোর পর প্রত্যেকটি গণপিটুনির ঘটনার বিচার চাইছি। প্রত্যেকটি ঘটনা যেন সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হয়, দায়ী প্রত্যেককে যেন গ্রেফতার করা হয়। ভিডিও না থাকলে তোলপাড় হবে না, তোলপাড় না হলে বিচার হবে না; এই প্রবণতা আইনের শাসনের মারাত্মক পরিপন্থী।

‘পদ্মা সেতুতে এক লাখ মাথা লাগবে’—এই গুজবকে পুঁজি করে দেশজুড়ে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। সঙ্গে যোগ হয়েছে, বিদ্যুৎ না থাকার গুজব। যদিও বাস্তবতার সঙ্গে এই গুজবের কোনই সম্পর্ক নেই। পদ্মা সেতুর কাজ চলছে স্বাভাবিক গতিতে।

বিদ্যুৎ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক। কিন্তু গুজব থেমে নেই। কোনও সেতু নির্মাণ করতে মানুষের মাথা লাগে, একুশ শতকে ডিজিটাল বাংলাদেশে এই গুজব বিশ্বাস করাও এক ধরনের অপরাধ। তবে, আমার এটাকে ঠিক নির্দোষ গুজব মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, কোনও একটি মহল সংগঠিত উপায়ে গুজব ছড়াচ্ছে এবং সেই চেষ্টায় তারা বেশ সফল। তবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক যখন বলেন, ‘গণপিটুনি নিছক কোনও দুর্ঘটনা নয়। এটা বিএনপি-জামায়াতের একটি নিখুঁত পরিকল্পনা বা কৌশল। দেশকে অস্থিতিশীল করতে তারা এটা করতে পারে।’ বা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যখন বলেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় গুজবের ফ্যাক্টরি। গণপিটুনির গুজবেও দলটি জড়িত’। আমার খুবই কানে লাগে। নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে আওয়ামী লীগ নেতারা কিছু হলেই বিএনপি জামায়াতের ঘাড়ে দায় দিয়ে পার পেতে চান। এটা আসলে এক ধরনের ভয়, এক ধরনের অসুখ। সুযোগ পেলে বিএনপি-জামায়াত নিশ্চয়ই এমন কিছু বা এরচেয়ে খারাপ কিছু করতো। যারা গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীকে হত্যার চেষ্টা করতে পারে, তাদের পক্ষে সবই সম্ভব। কিন্তু এক যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি এখন আছে নিজেদের অস্তিত্বের সংকটে। মাত্র ৬টি আসন নিয়ে সংসদে তারা তিন নম্বর দল। দলটির চেয়ারপারসন কারাগারে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন লন্ডনে। জামায়াতের অবস্থা আরও করুণ। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাদের শীর্ষ নেতাদের প্রায় সবার ফাঁসি হয়ে গেছে বা বিচার চলছে। দলে ভাঙনও ধরেছে। গুজব ছড়িয়ে বা যে কোনও উপায়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার সাধ হয়তো বিএনপি-জামাতের আছে, কিন্তু সাধ্য কতটা আছে; সেটা নিয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। এত কিছুর পর বিএনপি-জামায়াত যদি সারাদেশে গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির ঘটনা ঘটাতে পারে; তাহলে সেটাকে সরকারের বড় ব্যর্থতা হিসেবেই মানতে হবে। আগে গুজব ছড়াতো মুখে মুখে; এখন দ্রুতগতিতে ছড়ায় ডিজিটাল মাধ্যমে। তো সরকারের এতসব নেটওয়ার্ক, গোয়েন্দা, ডিজিটাল এক্সপার্টরা কী করলেন; গুজব ঠেকাতে পারলেন না কেন? আর গুজব ঠেকাতে যদি নাই পারলেন, গণপিটুনি ঠেকাতে পারলেন না কেন? নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা পুলিশ এখন নিরীহ সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে পারছে না কেন? আর বিএনপি-জামায়াতই যদি করে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ না এনে, সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণসহ ব্যবস্থা নিন।

১২ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে এবং ‘দৌড়ের ওপর’ থাকা বিএনপি-জামায়াতের ওপর দায় চাপানোর আগে সরকারের উচিত নিজেদের ব্যর্থতাগুলো পর্যালোচনা করা। যদি বিএনপি-জামায়াত এই গুজব ছড়িয়েও থাকে, মানুষ সরকারের কথা বিশ্বাস না করে, তাদের কথা বিশ্বাস করলো কেন? দেশ বা সমাজ যখন আলগা হয়ে যায়, তখন মানুষ সহজেই যে কোনও গুজবে বিশ্বাস করে। যেমন অসুস্থ হলে আমাদের সাধারণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়। তাই আগে সমাজের অসুখটা সারাতে হবে। সাধারণ মানুষকে আস্থায় নিতে হবে, যেন তারা কোনও গুজবে বিশ্বাস না করে।

স্বাভাবিক তথ্যপ্রবাহ যখন বিঘ্নিত হয়, গণমাধ্যমের ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাস যখন কমে যায়; তখনই তারা গুজবে কান পাতে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আশ্রয় খোঁজে। গণপিটুনির মধ্যে এক ধরনের নিষ্ঠুরতা আছে, ক্ষোভ আছে, ক্রোধ আছে। সরকারি দলের নেতাদের বলছি, বিএনপি-জামায়াত জুজুর পেছনে না দৌড়ে মানুষের ক্রোধের কারণ অনুসন্ধান করুন। হতে পারে ভোট দিতে না পারার, কথা বলতে না পারার, প্রতিবাদ করতে না পারার ক্ষোভ জমে জমে এই তীব্র ক্রোধে পরিণত হয়েছে। মানুষ যখন কাউকে পিটুনি দেয়, তখন হয়তো সেই বঞ্চনার স্মৃতি তাকে আরও নিষ্ঠুর করে তোলে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সুশাসন বা আইনের শাসন না থাকা। ক্রসফায়ার বা গুম যখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে যায়, তখন বিচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ড এক ধরনের সামাজিক বৈধতা পেয়ে যায়। মানুষ আইন হাতে তুলে নেয়াটাকে আর অপরাধ মনে করে না।

আমি গণপিটুনির মূল দায় দেবো বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে। ২০১১ সালে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশি গ্রামে ‘ডাকাত সন্দেহে’ গণপিটুনিতে ছয় ছাত্রকে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু ঘটনার আট বছরেও বিচারকাজ শেষ হয়নি। এ ঘটনায় ৬০ আসামির সবাই জামিনে আছেন। ২০১১ সালের ২৭ জুলাই নোয়াখালীতে শামসুদ্দিন মিলনকে পুলিশ উন্মত্ত জনতার হাতে তুলে দিয়েছিল। পুলিশের সামনেই লোকজন মনের সুখে পিটিয়ে মেরেছিল মিলনকে। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তোলপাড় তোলা ঘটনার বিচারের আপডেট জানেন? আট বছরে মাত্র চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, তাও সেই চার্জশিটে অভিযুক্ত চার পুলিশ সদস্য, যারা মিলনকে জনতার হাতে ছেড়ে দিয়েছিল; তাদের নাম নেই। এই যদি হয় বিচারের হাল। আপনি যদি জানেন, কাউকে পিটিয়ে মারলেও আপনার বিচার হবে না, আপনি গণপিটুনিতে অংশ নিতে দ্বিধা করবেন না। যদি আপনি জানেন, অপরাধীকে পুলিশে তুলে দিলেও তার বিচার হবে না। আপনি আইন হাতে তুলে নিতে প্ররোচিত হবেন।

আপনি মুখে যতই বলুন, গণপিটুনির নামে মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হলে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইনের শাসন, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। অন্যের কাঁধে দায় না চাপিয়ে সরকারকে নিজেদের দিকে তাকাতে হবে, খুঁতগুলো খুজে বের করতে হবে, সেগুলো বন্ধ করতে হবে। মানুষ যেন সরকারের ওপর পুরো আস্থা রাখতে পারে, সরকারের কথা যেন বিশ্বাস করে, আইনের ওপর ভরসা রাখে; সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ
[email protected]

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful