Templates by BIGtheme NET
আজ- শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২০ :: ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ :: সময়- ২ : ০১ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / শৈশবের রংপুর।। আনিসুল হক

শৈশবের রংপুর।। আনিসুল হক

এই পৃথিবীতে একটা স্থান ছিল, সবচেয়ে সুন্দর, নির্জন, করুণ। তারচেয়ে সুন্দর কোনো মনুষ্যবাসস্থান এই বিশ্বমণ্ডলে ছিল না। লালকুঠির লাল রঙের খিলান অলিন্দ বড় বড় লোহার গেট ডানে রেখে তুমি বামের পিচঢালা চিকন রাস্তা দিয়ে হেঁটে কিংবা রিকশায় যেতে থাকো। প্রতিটা বাড়ির সামনে অনেকটা খোলা জায়গা। প্রতিটা বাড়ির সামনে বাগান। সেইসব বাগানে ঝাউগাছ দিয়ে বাড়ির নাম লেখা। বাড়ির বেড়াও নানা ধরনের ঝাউগাছ দিয়ে বানানো। বাগানের মধ্যখান দিয়ে তিনকোনা করে ইটে সাজানো পথ পেরিয়ে তারপর বাড়ির পিড়িলি। প্রতিটা বাড়ির বারান্দা উঁচু। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হবে বারান্দায়। সিঁড়ির দু ধারে শান বাঁধানো বেঞ্চ। লাল কিংবা ইস্পাতের রঙের। সিমেন্টর স্তম্ভগুলো কাজ করা। তারওপরে টিনে ছাওয়া বারান্দা। সেই টিনে নকশাকাটা। জাফরিকাঁটা। প্রতিটা দেয়াল রঙিন। কেউ কেউ আবার বাড়ির গেটে দেয়ালে পাথর বসিয়ে বসিয়ে নকশা করেছেন। কারো কারো বাড়ির সামনে পুকুর। কারো বা জোড়াপুকুর। পুকুরের পাড়ে বাড়ি। একটা বাড়িও নেই, যার টিনের ছাদ কড়িবর্গায় নকশাকাটা নয়। কোনো কোনো বাড়িঘর কাঁচাও ছিল। কিন্তু তাদেরও বাড়ির সামনে যত্নগড়া বাগান। ঘরের মেঝেটা পাকা। বাড়ির উঠানে সিমেন্টের সোফা, গোলটেবিল। আর গোলাপের ঝাড়। একেকটা বাড়ির চেয়ে আরেকটা বাড়ি যেন বেশি সুন্দর। আমাদের কটকিপাড়ার চেয়ে সুন্দর মুন্সিপাড়া, মুন্সিপাড়ার চেয়ে সুন্দর সেনপাড়া, সেনপাড়ার চেয়ে সুন্দর কামালকাচনা! প্রতিটা বাড়ি যেন একেকটা শিল্পকর্ম, বাড়ির মালিক থাকবেন বলে নয়, সুন্দর একটা শিল্পরচনা করবেন বলে সমস্তটা সৌন্দর্যবোধ উজাড় করে ঢেলে দিয়ে গড়েছেন তাদের বাড়িঘর উঠোন বাগান। প্রতিটা বাড়িতে ছিল নানা রঙের অপরূপবিন্যাস। হয়তো রংপুর নামকরণের সার্থকতা প্রমাণ করার জন্যই।

প্রতিটা বাড়ির সামনে ঝাকড়াগাছ। সন্ধ্যার পর ওই রাস্তায় হাঁটতে গেলে ফুলের গন্ধে নিশ্বাস আটকে যেত। কামিনীগাছের মাথা নেমে এসেছে রাস্তায়, তার মাথার ওপরে কুয়াশা স্তম্ভিত হয়ে আছে, তারওপরে পৌরসভার সাধ্যমতো বিদ্যুতের বাতির হলদেটে আলো থমকে আছে কুয়াশা আর ফুলের ঘ্রাণ মেলে ধরে। ওই কামিনীর নিচ দিয়ে গেলে গন্ধভারি বাতাস দমবন্ধ করে ফেলত। কাঁঠালিচাঁপার বড় বড় পাতা, বড় বড় ফুল দল মেলে আছে। শিউলি ফুলে ছেয়ে আছে পথ। বকুলের দিনে বকুল। বকুল গাছের নিচে সাদা সবুজ হলুদ হয়ে আছে। আমি আর আমার বোন ফুল কুড়াতে যেতাম। বকুলফুল কুড়িয়ে এনে মালা গাঁথতাম।

আর খুব হাভাতে ছিলাম। জঙ্গলের মধ্যে আতাগাছে ফুল ফুটলে সবরিকলার গন্ধে আকুল হতেই হতো। সেই আতাগাছ থেকে আতা পেড়ে এনে চালের বস্তার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখতাম। কদিন পরেই আতা পেকে যেত। পৃথিবীতে পাকা আতার চেয়ে সুস্বাদু ফল তখনও আবিষ্কার হয়নি। আর আদিগন্ত মাঠের শেষে শটিবন। মাঠভরা চোরকাঁটা। তারওপরে মেলা বসত ফড়িংদের। ছোটো। দৌড়াও। ঝাঁপাও। জামগাছের উঁচুজোড়া ডাল আমাদের জিরোবার জায়গা ছিল। খাঁ খাঁ রোদজ্বলা দুপুরে আমরা সেই হাওয়াঘরে জোড়াডালের ওপরে নির্ভার নির্ভয় শুয়ে থাকতাম। আর ছিল মধুতে মধুতে ভরা সাদা সাদা ফুলের জংলিগাছ। আমরা মধুগাছই বলতাম। সেই ফুল তুলে তুলে আমরা গোড়া চুষে মধু খেতাম। পিটিআইয়ের বাগানে একটা মধুজবার গাছও ছিল। ইচ্ছা হলো, ফুল ছেঁড়ো, বৃন্তটা সরিয়ে মুখে দিয়ে একটুখানি চোষো তো, মুখ ভরে গেল মধুতে। মাঠজুড়ে, বিশেষ ঘরে ঘরবাড়ির পেছনের ছায়ান্ধকার জায়গাগুলোয় এক ধরনের গোল গোল পাতা উঠান ছড়িয়ে সবুজ হয়ে থাকত, ওগুলো ছিল টক। যখন ইচ্ছা সেই টকপাতা আমরা চিবিয়ে খেতে পারতাম। আর ছিল কাঁচফল। লাল, ঝকঝকে, তার মধ্যে কালো কালো ডোরা। কোন জ্ঙ্গলে ঢুকে আমরা সেসব কুড়িয়ে আনতাম, পেড়ে আনতাম, মনে পড়ে না, কিন্তু পাটখড়ির ছোট্ট একটা টুকরার ওপরে রেখে মুখ দিয়ে ফুঁ দিলে সেসব লাফিয়ে লাফিয়ে আবার সেই পাটখড়ির মুখেই পড়ত। কী এক মজার খেলা ছিল।

পানিয়াল ফল আনতে আমি আর আমার বোন চলে যেতাম পুজাবাড়ির পেছনের পুকুরের ওইপাড়ে। পানিয়াল ফল হাতের তালুতে নিয়ে গোল গোল করে বেলতে হতো, আর মন্তর পড়তে হতো, আম পাকে বৈশাখে, জাম পাকে… পানিয়াল পাকে… মনে নেই মন্তরটা পুরা।কিছুক্ষণ এই রকম করে বেললেই পানিয়াল পেকে যেত হাতের তালুতেই।

আর ছিল রোদ। বিকালে রোদ বাঁকা হয়ে হলুদ হয়ে শুয়ে থাকত মাঠজুড়ে। গরু শুয়ে আছে অলস ভঙ্গিতে, তার কানের পোকা খুঁটে দিচ্ছে ফিঙে পাখি। সেই মরা রোদের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছে একটা লাল রঙের পালের মতো ক্যানভাসে পসরা সাজিয়ে চুড়ি ফিতার ফেরিওয়ালা। শাড়ির ফেরিওয়ালা নিজে যেতেন ছাতামাথায়, আর তার পেছনে শাড়ির বোঁচকা নিয়ে যেত তার বেতনভুক কর্মচারী। মাঝে মধ্যে আমাদের বারান্দাতে আম্মারা ডেকে নিতেন সেই শাড়িওয়ালাকে। মাদুর (আমরা বলতাম সপ) বিছিয়ে সেই শাড়িগুলো মেলে ধরা হতো একে একে। কতধরনের ফিরিওয়ালা যে হেঁকে হেঁকে যেত, শীতের অন্ধকার হাড় কাঁপানোর ভোরে হাঁকত ভাকা, ভাকা, ভাপা পিঠাওয়ালারা। ঝিমধরা দুপুরে আইসক্রিম। কাঠের বাক্সের ঝাপ বার বার করে সজোরে বন্ধ করে আওয়াজ তুলত ধপধপ। দশ পয়সায় লাল রঙের আইসক্রিম, চারআনায় দুধমালাই। পাপড় জোড়া ১০ পয়সা, সিংগেল ৫ পয়সা। নাটোরের কাঁচাগোল্লাওয়ালা গেলে আমি আব্বাকে ধরতাম। আব্বা কিনে দিতেন। আর চিনির তিলের খাজা। পৃথিবীতে তারচেয়ে সুস্বাদু খাবার তো আর আর তৈরি হলো না। পুরোনো বোতল, ভাঙা লোহার জিনিসের বদলে কটকটি। আবার আম্মারা ডেকচি-পাতিলও কিনতেন। একটা কিছু বাড়তি ছিল না। কোনো কিছু ফেলনা ছিল না। প্রত্যেকটা জিনিস কাজে লাগত।

শুধু একটা জিনিসই ছিল অবারিত। আনন্দ! খেলো! ছোটো। দৌড়াও। পুকুরে ঝাঁপাল পড়ো। গাছে উঠে বাঁদরের মতো গাছচুন্নি খেলো। তিন নম্বর ফুটবলে ধাপের মোড়ে মুচির কাছে নিয়ে গিয়ে ব্লাডারের লিক সারো, আর খেলো। এক হাঁটু ধুলো নিয়ে বাড়ি ফেরো। মাগরেবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে। ভাইবোনে খেলো। ঝগড়া করো। আম্মার পাখার ডাঁটার বাড়ি, স্যান্ডেলের বাড়ি খাও। দুপুরে শোনো অনুরোধের আসর কিংবা গানের ডালি। সন্ধ্যায় সৈনিকভাইদের জন্য অনুষ্ঠান দুর্বার। জীবন সুন্দর! জীবন সত্যিই সুন্দর। শটিবনের ধারে গলা উঁচিয়ে আছে বেজি। জীবন সুন্দর! বেলগাছের ভুতটা সন্ধ্যার পরে বুকে কাঁপন তুলছে। দৌড়ে পার হও জায়গাটা। জীবন সুন্দর। ঘরে মেহমান এলে যাও আটআনার চানাচুর আর আটআনার গোল গোল আজাদ বিস্কুট কিনে আনো দোকান থেকে। মেহমান যাইবামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ো সেই পিরিচদুটোর ওপরে। জীবন সুন্দর। মামা এসেছেন। সঙ্গে পাইনঅ্যাপল বিস্কুটের প্যাকেট। কাগজের টুকরাগুলো প্যাকেটের মুখ থেকে সরিয়ে বিস্কুট বের করে প্রথমে দাঁতে চেঁছে খাও ক্রিমটুকুন। জীবন সুন্দর! লুডো, ক্যারাম, বরিক পাউডার, নোভালজিন ট্যাবলেট, জ্বর হলে সাগু বার্লি। প্লাস্টিকের পেপার বালিশের ওপরে দিয়ে মাথাটা বিছানা থেকে নিচের দিকে ঝুলিয়ে আম্মার অবিরাম মাথায় পানি ঢালা। আর হিতোপদেশ, যাও, পুকুরের পানি ডাকছে, ঝাঁপাল পাড়ো। যাও।

মাগরিবের আজানের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফেরা। টিউবওয়েলের হাতল ঠেলে হাতপা ধোওয়া। আম্মাদের নামাজ পড়া হওয়ার আগেই আমাদের রাতের খাওয়া সারা। লাউয়ের মধ্যে গড়াই মাছ। বড়ি (আমরা বলতাম, বড়া)। ভেজে পেয়াজ-মরিচ দিয়ে ভর্তা। কোনো রাতে শুধুই ডালভর্তা। কোনোদিন পোস্তের দানা। ইলিশ সস্তা হলো তো আব্বা সন্ধ্যায় সাইকেলে ঝুলিয়ে আনলেন আস্ত ইলিশ দুটো। এরপর কয়েকবেলা ইলিশ আর ইলিশ।

তারপর রাত আটটার আগেই ঘুমে কাদা। শীতের দিনে টিনের চালে শিশিরের শব্দ শোনা যেত। জীবন তখন সত্যি সুন্দর ছিল।

লেখক: কবি, লেখক ও সাংবাদিক। তিনি কিশোর আলো পত্রিকার সম্পাদক ও দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful