Templates by BIGtheme NET
আজ- সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২০ :: ২৯ আষাঢ় ১৪২৭ :: সময়- ১২ : ১২ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / কামাল লোহানী: একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

কামাল লোহানী: একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর

ড. শাশ্বত ভট্টাচার্য

ভাষা সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাতিঘর, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর প্রাক্তন সভাপতি কামাল লোহানী আজ (২০ জুন সকাল দশটায়) আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। আমার সঙ্গে শেষ দেখা সাত/ আট মাস আগে উদীচীর কেন্দ্রীয় কমিটিরি মিটিং এ। কেমন আছেন লোহানী ভাই? ভালো আছি দাদা ( দাদা ছাড়া নাম ধরে কখনোই লোহানী ভাই আমাকে ডাকেন নি), চোখটা একটু সমস্যা করছে। তখন চোখে একটু কম দেখতেন। গ্লুকমা ছিলো। একদিন বলেছিলেন আপনার বইটা পড়তে পারি নি। এখন একদমই পড়তে পারছি না। লোহানী ভাইয়ের শুধু চোখের সমস্যা ছিলো না । পরের দিকে অনেক রোগেই ভুগতেন। কিন্তু কাউকে বুঝতে দিতেন না। সদা হাস্যজ্জ্বল, বিনয়ী, দীর্ঘদেহী, সাদাপাজামা আর পাঞ্জাবি পরিহিত এই মানুষটি যখন বক্তব্য রাখতেন তখন আগুন ঝরত প্রতিটি কথায়। আমরা উদ্দীপ্ত হতাম। যুক্তিপূর্ণ তাঁর প্রতিটি শাণিত শব্দ প্রতিটি কর্মী ভাইবোনদের উদ্দীপ্ত করতো মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণের লড়াইয়ে। বাংলাদেশের সব গণতান্ত্রিক, মৌলবাদ বিরোধী সংগ্রামে সাংস্কৃতিক কর্মীদের বিরাট ভূমিকা রয়েছে। কামাল লোহানী ছিলেন সেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বাতিঘর। একটি জাতির মেরুদণ্ড নির্মাণের কারিগর ছিলেন কামাল লোহানী। এখন মেরুদণ্ড বিক্রী, আপোশকামীতা এবং চাটুকারীতার কাল, এই কালে কামাল লোহানীর মতো মানুষের ভীষণ অভাব।

কামাল লোহানী হিসেবে পরিচিত হলেও পুরো নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী। ১৯৩৪ সালের ২৬ জুন সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার খান সনতলা গ্রামে তার জন্ম। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী। কামাল লোহানী সাংবাদিকতা দিয়ে পেশাজীবন শুরু করলেও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন সবসময়। এদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন।

মাকে হারান মাত্র সাত বছর বয়সে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে চলে আসেন পাবনায়। পাবনা জিলা স্কুল থেকে ভাষা আন্দোলনের বছরে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। এ সময় তিনি যুক্ত হন রাজনীতিতে। যোগ দেন পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে। পাবনায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে উঠা আন্দোলন যোগ দেন। এরই মধ্যে পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি। যুক্ত হন রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চায়।

১৯৫৩ সালে পাবনার তৎকালীন জিন্নাহ্ পার্কে (বর্তমান স্টেডিয়াম) মুসলিম লীগ কাউন্সিলে নুরুল আমিনের আগমনের প্রতিবাদ করায় প্রথম গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে কাজ করায় আবারও গ্রেফতার হন তিনি।

১৯৫৫ সালের জুলাই মাসে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পরে ঢাকা চলে আসেন কামাল লোহানী। চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর সহযোগিতায় ওই বছরই দৈনিক মিল্লাত পত্রিকা দিয়ে কর্মজীবন শুরু হয় তার। একই বছর তিনি ন্যাপে যোগ দিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারি হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান তিনি।

ঢাকার আসার পরেই নাচের প্রতি আগ্রহ জন্মে কামাল লোহানীর। বুলবুল ললিতকলা একাডেমির হয়ে কামাল লোহানী তার নৃত্যগুরু জি এ মান্নানের ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ প্রযোজনায় অংশ নেন তিনি। পাকিস্তান সাংস্কৃতিক দলের হয়ে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে তিনি যান। এরই ফাঁকে তিনি চাকরি করেন দৈনিক ‘আজাদ’, দৈনিক ‘সংবাদ’, ‘পূর্বদেশে’। ১৯৬০ সালে সৈয়দা দীপ্তি রানীকে বিয়ে করেন । ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী পালনে সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে তার ছিল দৃঢ় ভূমিকা। শতবর্ষ পালনের আয়োজনে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে তিনি বজ্রসেনের ভূমিকায় অংশ নিয়ে প্রশংসিত হন৷ ১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী ‘ছায়ানট’র সাধারণ সম্পাদক হন৷ সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’ নামে সাংস্কৃতিক সংগঠন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় কামাল লোহানী স্বাধীন বাংলা বেতারের সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দায়িত্ব নেন ঢাকা বেতারের৷ দায়িত্ব নেয়ার পর বিধ্বস্ত বেতারকে পুনর্গঠনে মনযোগী হন৷ ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন উপলক্ষে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন কামাল লোহানী। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুর কলকাতা সফর উপলক্ষে দমদম বিমানবন্দরেও ধারাবিবরণী দিয়েছিলেন তিনি।

বেতারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ১৯৭৩ সালে সাংবাদিকতায় ফিরে এসে যোগ দেন ‘দৈনিক জনপদ’-এ৷ ১৯৭৪ সালে ‘বঙ্গবার্তা’, এরপর ‘দৈনিক বাংলার বাণী’ পত্রিকায় কাজ করেন। সরকার ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্র এ্যানালমেন্ট অধ্যাদেশ জারি করে মাত্র চারটি পত্রিকা ছাড়া সব পত্রিকা প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। নির্মল সেন ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। ফলে চাকরিহীন অবস্থায় ১৯৭৭ সালে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক বার্তা’র নির্বাহী সম্পাদক হন। ১৯৭৮ সালে তাকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হলে ‘দৈনিক বার্তা’ ছেড়ে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটে (পিআইবি) যোগ দেন। প্রকাশনা পরিচালক ও ‘ডেপথনিউজ বাংলাদেশ’ এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার কয়েক মাস পরেই তিনি সেখানকার সহযোগী সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন।

১৯৯১ সালে তিনি প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৬ মাসের মাথায় বিএনপি সরকারের সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় তিনি পিআইবিতে ফিরে আসেন।

২০০৮ সালে দুই বছরের জন্য আবার শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন ৷ বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ছিলেন চার বছর ৷ তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন ৷ এর বাইরেও তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সদস্য৷

কামাল লোহানীর লেখা বইগুলো মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা হারবো না’, ‘সত্যি কথা বলতে কী’, ‘যেন ভুলে না যাই’,, ‘মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’, ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার অহংকার’, ‘এ দেশ আমার গর্ব’, ‘আমাদের সংস্কৃতি ও সংগ্রাম’, ‘লড়াইয়ের গান’, ‘সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও নৃত্যশিল্পের বিস্তার’, ‘দ্রোহে প্রেমে কবিতার মত’ এবং কবিতার বই ‘শব্দের বিদ্রোহ’৷

কামাল লোহানী ২০১৫ সালে সাংবাদিকতায় একুশে পদক লাভ করেন৷ এছাড়াও তিনি কলকাতা পুরসভার দ্বিশতবর্ষ সম্মাননা, প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক সম্মাননা, রাজশাহী লেখক সংঘ সম্মাননা, ক্রান্তি স্মারক, ঋষিজ সম্মাননা ও স্মারক, জাহানারা ইমাম পদকসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন৷

লোহানী ভাই আজ চলে গেলেন কিন্তু রেখে গেলেন তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। যে ইতিহাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস, মানবিক এবং অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি রাষ্ট্রগঠনের সংগ্রামের ইতিহাস। লোহানী ভাইয়ে শুরু করা লড়াই এখনো শেষ হয় নি। শোষণহীন রাষ্ট্রর স্বপ্ন পুরুন হয় নি এখনো। তাই লোহানী ভাইয়ের রেখে যাওয়া সংগ্রামের ঝাণ্ডাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে তাঁরই অনুসারীদের।

লেখক: সম্পাদক উত্তর বংলা ডট কম
সহ-সভাপতি: বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সংসদ

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful