Today: 27 Jun 2017 - 11:23:35 am

রংপুরের যতো বধ্যভূমি ( পর্ব ০৮)

Published on Monday, March 20, 2017 at 9:06 am

মুক্তিযুদ্ধে নয় মাস সারাদেশে যখন পাকিস্তানি সৈন্যরা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, তখন উত্তরের জেলা রংপুরের শান্তিপ্রিয় অথচ বিপ্লবী মানুষেরাও রক্ষা পায়নি। রংপুরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক বধ্যভূমি। সংস্কার ও সংরক্ষণে অবহেলার কারণে নিশ্চিহ্ন হতে বসেছে এই বধ্যভূমিগুলো। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে রংপুরের বধ্যভূমি নিয়ে উত্তরবাংলা ডটকম এর বিশেষ আয়োজন “রংপুরের যতো বধ্যভূমি” শিরোনামে আজকে প্রকাশিত হলো  ৮ম পর্ব। লিখেছেন রিয়াদ আনোয়ার শুভ:

সাহেবগঞ্জ গণহত্যা :

sahebgonj bodhovumiশনিবার, পহেলা মে ১৯৭১ সাল। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। এই দিনেও মানব সভ্যতার ইতিহাসের বর্বরোতম ও নৃশংস গণহত্যার নজির সৃষ্টিকারী পাকিস্তান হানাদার বাহিনী তাদের নির্মম হত্যাকাণ্ড থেকে পিছুপা হয়নি। সেদিন ঠিক দুপুর বেলা ৩ টা আর্মি ট্রাক সাহেবগঞ্জ এলাকায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আশে পাশের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উঠে। কিন্তু কোন কিছু না করেই আর্মি ট্রাক তিনটি রংপুর শহরের দিকে চলে যায়। এলাকাবাসীর মধ্যে খানিকটা স্বস্তি হয়তো ফিরে এসেছিল। কিন্তু তা মিলিয়ে যেতে বেশীক্ষণ সময় লাগেনি। মধ্যরাতে পুরো এলাকা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তখন হঠাৎ করে একটানা গুলির শব্দে জেগে ওঠে আশপাশের মানুষ, প্রাণভয়ে ঝাড় জঙ্গলে যে যেখানে পারে লুকিয়ে থাকে সেই রাতে। গুলি শেষ হবার প্রায় ১ ঘণ্টা পর চার পাঁচটি আর্মির গাড়ি চারদিকে সার্চ লাইটের আলো জ্বেলে নিরীক্ষণ করে চলে যায়। আশপাশের মানুষের আতংকের সেই দুঃসহ রাত যেন শেষ হতে চায় না।

বেলা ওঠার আগেই ক’জন সাহসী মানুষ একপা-দু’পা করে এগুতে থাকেন সাহেবগঞ্জ হাটের দিকে। খুঁজে পান না কিছুই। অবশেষে আরো এগুতে থাকেন উত্তর দিকে। হঠাৎ নজরে আসে পাকা সড়কের দক্ষিণ দিকে মাটি কাটা গর্তে পড়ে আছে একগাদা রক্তে ভেজা লাশ। লাশগুলো ছিল সামান্য মাটিচাপা দেয়া। একজন-দু’জন করে একত্রিত হলেন অনেকেই, সাহস করে লাশের ওপর দেয়া মাটি সরালেন তাঁরা। আঁতকে উঠলেন সবাই লাশগুলো দেখে। সব লাশই ছিল পেছনের দিকে হাত বাঁধা এবং একই রশি দিয়ে পেঁচানো। সবার পরনেই সেনাবাহিনীর পোশাক। জমাট বাঁধা রক্তে পড়ে থাকা লাশগুলো যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করলেন তাঁরা। কিন্তু কাফন পরানো সম্ভব হলো না। ভয়াবহ সেই সময়েও গ্রামবাসীরা নির্ভয় হবার কারণ হলো তখন রংপুর জেলায় একমাত্র পুরো তপোধন ইউনিয়ন ছিল রাজাকারমুক্ত। এলাকার বহু ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক এমনকি একজন ভিক্ষুকের ছেলেও যোগ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধে। তাই জীবনের ঝুঁকি নিতে ভয় পেলো না গ্রামবাসী।

আশে পাশের লোক জন মিলে জানাজা পড়লেন। জানাজায় ইমামতি করলেন তকেয়ার পাড় এলাকার ছবির উদ্দিন মুন্সী। মুন্সী সাহেব ভয়ডরহীন মানুষ। তাঁর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক যোগ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। জানাজা শেষে ১৯ জন বীর বাঙালি সৈনিককে কবর দিলেন একই সঙ্গে। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য জীবন দেয়া এই সব বাঙালি সৈনিকদের সবার পরিচয় জানা যায়নি। তবে একজনের পকেটে একটা চিঠি পাওয়া গিয়েছিল। চিঠি থেকে জানা যায় এই বীর শহীদের নাম মেজর আকবর। বাড়ি ময়মনসিংহ।

একাত্তরের ০২ মে কবরস্থ করা বাঙ্গালী সৈনিকরা আজও শায়িত আছেন সাবেক তপোধন ইউনিয়নের বীরচরণ মৌজায়। স্বাধীনতার পর এলাকাবাসী নিজেদের উদ্যোগে এ বধ্যভূমিটি দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখেন। স্বাধীনতার ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও সাহেবগঞ্জ বধ্যভূমিতে শহীদ এই সব বীর সৈনিকদের সম্পর্কে কোনো খোঁজ খবর নেয়া হয়নি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোনো কর্মকর্তা আজ অবধি পরিদর্শন করেননি এলাকাটি। অথচ, দীর্ঘ দিন ধরেই রংপুরের গণমানুষের দাবী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস ও শত শহীদের আত্মবলিদানের যে স্মৃতিগুলো এখনও অবশিষ্ট রয়েছে সেই সব সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। জেলার প্রতিটি বধ্যভূমিতে একটি করে কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হোক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই সত্যি যে, এই বধ্যভূমি সংরক্ষণের কোন কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হলো না আজও। ঐ রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় দেয়াল দিয়ে ঘিরে রাখা কবরগুলো নিশ্চয়ই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়না পথচারীদের। কিন্তু ক'জনই বা জানে এই করবে কারা শায়িত আছেন? বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম! তাই সরকারীভাবে এখনই উদ্যোগ না নেয়া হলে হয়তো আগামী প্রজন্ম জানতেই পারবে না আমাদের জন্য একটা স্বাধীন মাতৃভূমি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে এই জায়গাতে কেমন পৈশাচিকতার শিকার হয়েছিলেন তাদের পূর্বসূরিরা।

সাহেবগঞ্জ বধ্যভূমির অবস্থান : রংপুর শহর থেকে হারাগাছ যাওয়ার পথে সাবেক তপোধন ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জে এই বধ্যভূমির অবস্থান। মৌজার নাম বীরচরণ। জমির পরিমাণ ০.০১ একর, দাগ নম্বর - ৯১২, খতিয়ান নম্বর - ১৩৯। ব্যক্তি মালিকানাধীন এই জমির মালিক হলেন মরহুম জসীম উদ্দিনের পুত্র মোঃ আযম আলী ও মোঃ আজাহার আলী।

মতামত