Templates by BIGtheme NET
আজ- বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০ :: ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ :: সময়- ৯ : ০৫ পুর্বাহ্ন
Home / শিল্প ও সাহিত্য / ‘বিদ্রোহী’ : নজরুলের দ্রোহ-প্রকৃতি ও শান্তি-সূত্র

‘বিদ্রোহী’ : নজরুলের দ্রোহ-প্রকৃতি ও শান্তি-সূত্র

গৌরাঙ্গ মোহান্ত
Nazrulএকদা বাজেয়াপ্ত-প্রায় ‘বিদ্রোহী’-র অভ্যুদয় বাংলা সাহিত্যে আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এক রাতের শেষ প্রহরে পেন্সিলে ‘বিদ্রোহী’ লিখিত হয় বলে মুজফফর আহমদ তাঁর ‘কাজী নজরুল ইসলাম: স্মৃতিকথা’-য় উল্লেখ করেন। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) ‘বিদ্রোহী’ ‘বিজলী’ পত্রিকায় প্রথম মুদ্রিত হয়। এ কবিতা পত্রিকা বা ‘অগ্নিবীণা’ (১৯২২) কাব্যে প্রকাশিত হবার পূর্বেই কাজী নজরুল ইসলাম গল্পকার, কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রুশ বিপ্লব, প্রথম মহাযুদ্ধ, বৃটিশ শাসন ও সাম্রাজ্যবাদ, খেলাফত আন্দোলন, জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড, অসহযোগ আন্দোলন, আইরিশ স্বাধীনতা প্রভৃতি রাজনৈতিক ঘটনাবলি নজরুলমানসকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিলো। নজরুল ‘নবযুগ’ পত্রিকায় কিছু ক্ষুরধার প্রবন্ধ লিখে প্রতিক্রিয়াও ব্যক্ত করেছিলেন। ‘বিদ্রোহী’-র পূর্বে ‘শাত-ইল-আরব’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘মোহররম’, ‘কোরবানী’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্-দহম্’, ‘আনোয়ার’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য কবিতা প্রকাশ করে কবি ‘বিদ্রোহী’-র অনিবার্য স্ফুরণ-ক্ষেত্রকে উর্বর করে তুলেছিলেন।

‘বিদ্রোহী’ পাঠক-প্রিয়, তেজোময় কবিতা। ‘বিজলী’-তে প্রকাশিত অবয়বের সাথে কাব্যে সংকলিত ‘বিদ্রোহী’-আদলের কিছুটা বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। ‘অগ্নিবীণা’-য় কবিতাটির ষষ্ঠ স্তবক পরিমার্জিত এবং আদি দশম স্তবক বিসর্জিত। এগারো স্তবকবিশিষ্ট কবিতাটির ১-২, ৪৯ এবং ১২৮-১৩৩ সংখ্যক পঙক্তি অধিকাংশ শিক্ষিত বাঙালির স্থায়ী স্মৃতিকোষে সঞ্চিত শিল্পসম্পদ। হিন্দু, মুসলিম, গ্রিক পুরাণাশ্রিত চিত্রকল্পের পৌন:পুনিক ব্যবহারে কবিতাটি প্রতীকধর্মী হয়ে উঠলেও এটির বক্তব্য দুরূহ নয়। বিশেষত কবিতার বীর সত্তা কিংবা উত্তম পুরুষের চারিত্র্য নির্ণয়ের সাথে সাথেই কবিতাটি হয়ে ওঠে সহজবোধ্য। ‘বিদ্রোহী’-র প্রথম স্তবক (১-২৫ পঙক্তি) এর প্রথমাংশ বীর সত্তার উত্থান বা তুঙ্গিমাকে ঘোষণা করে। এ স্তবকের দ্বিতীয়াংশে উত্তম পুরুষের বিনাশী বৈশিষ্ট্যের প্রসঙ্গ উচ্চারিত হয়েছে। দ্বিতীয় স্তবক (২৬-৪১ পঙক্তি) উত্তম পুরুষের ছন্দশীল, সর্ববন্ধনমুক্ত, ভয়ংকর স্বভাব উন্মোচন করে। তৃতীয় স্তবক(৪২-৫৩ পঙক্তি) উত্তম পুরুষের পরস্পর বিরোধী, শক্তিধর দ্বৈত সত্তার অস্তিত্ব প্রকাশ করে। চতুর্থ স্তবক (৫৪-৬৮ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে একমাত্র প্রণম্য ও স্বেচ্ছাচারী সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করে। পঞ্চম স্তবক (৬৯-৮৬ পঙক্তি) উত্তম পুরুষের অমেয় প্রেমশক্তির পরিচয় দান করে। ষষ্ঠ স্তবক (৮৭-১০০ পঙক্তি) উত্তম পুরুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত চৈতন্য-দীপ্ত, গতিময় মানব সত্তার মহিমা কীর্তন করে। সপ্তম স্তবক (১০১-১০৮ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে পরমাত্মার সঙ্গীতময় বাহন হিসেবে চিহ্নিত করে। অষ্টম স্তবক(১০৯-১১৫ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে প্লাবক ও ধ্বংসক হিসেবে চিহ্নিত করে। নবম স্তবক (১১৬-১২৩ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে ঈশ্বরীয় শক্তির আধার রূপে ব্যক্ত করে। দশম স্তবক (১২৪-১৩৩ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে শান্তি, স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিবেদিত যোদ্ধা হিসেবে রূপায়ণ করে। একাদশ স্তবক (১৩৪-১৩৯ পঙক্তি) উত্তম পুরুষকে ঈশ্বরের ঊর্ধ্বে স্থান দিয়ে তার সাম্য-বিধায়ী মাহাত্ম্য প্রচার করে। বিদ্রোহী কবিতায় ব্যবহৃত চিত্রকল্প প্রধানত বিবৃতিধর্মী। কবিতাটির চিত্রকল্প কল্পনার গহন প্রদেশে পরিব্যাপ্ত থাকলে অথবা মনোবিকলনকে উন্মোচন করলে অনুধাবনের জন্য দুরূহ হয়ে পড়তো।

সাহিত্যকে নজরুল লেখকের ‘প্রাণের সত্য অভিব্যক্তি’ রূপে গ্রহণ করেন। ফলত ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় ব্যাপ্ত দ্রোহিতার স্বরূপ কবির অন্তর্লীন দ্রোহ-প্রকৃতির সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম খানকে লিখিত পত্রে নজরুল জানিয়েছেন, ‘আমি বিদ্রোহ করেছি – বিদ্রোহের গান গেয়েছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অত্যাচারের বিরুদ্ধে – যা মিথ্যা, কলুষিত, পুরাতন, পচা – সেই মিথ্যা সনাতনের বিরুদ্ধে, ধর্মের নামে ভণ্ডামী ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে’। কবি ‘আঘাতের পর নির্মম আঘাত হেনে পচা পুরাতনকে’ পাতিত করতে চেয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন ‘সব জমি গুঁড়িয়ে পিষে ফেলতে হবে, তবে তো ফলবে তাতে, পরিপূর্ণ নবজীবনের পরিপুষ্ট ফসল’। রাষ্ট্রে, সমাজে, ধর্মে ‘ষোল আনা ঘুণ’ প্রত্যক্ষ করে তিনি উচ্চারণ করেন, ‘আজ প্রলয়ের দেবতা ধ্বংসের নেশায় যতই মত্ত হন ততই মঙ্গল। আজ রুষে আসুক কালবৈশাখীর উন্মাদ ঝঞ্ঝা রক্ত-পাথারের অবারিত স্রোতে অযুত ফণা বিস্তার করে, আজ সব অগ্নিবাণ নাগ-নাগিণী বিপুল উল্লাসে বিচরণ করুক। এই প্রলয়-পয়োধিজলে মিথ্যার সৌধশীর্ষ ডুবে থাক। তবেই আবার অনন্ত জীবনের সহস্র দলের উপর বেদ-উদ্ধারণ নারায়ণের আবির্ভাব হবে।’

রবীন্দ্রনাথের আলোক-প্রাখর্যে উত্তপ্ত থেকেও উদ্ভাবিত মাত্রাবৃত্ত মুক্তক ছন্দে ও দু:সাহসী অনুভব-রঞ্জিত শব্দে ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় নজরুল যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেন তা নজরুলমানস মিনিয়েচার হিসেবে গ্রহণযোগ্য। ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যের ‘এস বিদ্রোহী তরুণ তাপস আত্মশক্তি-বুদ্ধ বীর,/ আনো উলঙ্গ সত্য-কৃপাণ বিজলী-ঝলক ন্যায়-অসির’; ‘ভাঙার গান’ কাব্যের ‘বল রে বন্য হিংস্র বীর,/ দু:শাসনের চাই রুধির’; ‘নতুন চাঁদ’ কাব্যের ‘আনো অনন্ত-বিস্তৃত প্রাণ, বিপুল প্রবাহ, গতি,/ কূলের আবর্জনা ভেসে গেলে হবে না কাহারও ক্ষতি’ প্রভৃতি পঙক্তিমালায় ‘বিদ্রোহী’-চৈতন্যের প্রভাব লক্ষ করা যায়। ‘বিদ্রোহী’ এক অমোঘ যুদ্ধমন্ত্র – জীবনে, সমাজে, রাষ্ট্রে, বিশ্বে অধিকার, সাম্য, সুবিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এ কবিতা প্রবল উদ্দীপনা-সঞ্চারক। এর পঠন, শ্রবণ বা নৃত্যায়ন আমাদের রোমাঞ্চিত ও উদ্বোধিত করে। আমরা কবিতার বাণীকে অন্তর্গত বোধের সঙ্গে গ্রন্থিত করি এবং শুভ অঙ্গীকারকে শানিয়ে নেবার সুযোগ পাই।

‘বিদ্রোহী’ কবিতায় আবেগের অকৃত্রিম উন্মাদনা প্রতিভাসিত হওয়ায় সৃষ্টি হিসেবে এটি অনন্য ও অননুকরণীয়। নজরুলকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য গোলাম মোস্তফা ‘সওগাত’ (১৩২৮, ফাল্গুন সংখ্যা) পত্রিকায় প্রকাশ করেন দীর্ঘ কবিতা, ‘নিয়ন্ত্রিত’। এর প্রথম চরণগুলো নিম্নরূপ:
ওগো ‘বিদ্রোহী’ বীর!
সংযত কর, সংহত কর উন্নত তব শির।
বিদ্রোহী ? – শুনে হাসি পায়!
‘বাঁধন হারা’র কাঁদন কাঁদিয়া বিদ্রোহী হতে সাধ যায় ?
সে কি সাজে রে পাগল, সাজে তোর ?
আপনার পায়ে দাঁড়াবার মত কতটুকু তোর আছে জোর ?

‘বিদ্রোহী’ সত্তার জন্য নজরুলকে তিরস্কার করা হলেও তিনি ‘বিদ্রোহী’ অভিধায় প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠেন। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি পাঠ করে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘যৌবন’ শীর্ষক যে কবিতা রচনা করেন তার কয়েকটি পঙক্তি নিম্নরূপ:
আমি হুঙ্কারি চলি, চলি নাকো চুপে চুপে,
বিঘ্ন-বিপদ পদতলে আমি দলি।
উল্কা আলেয়া এরাই তুলনা মোর –
প্রকৃতি আমার তবু না প্রকাশ হয়
আমি যৌবন আমি উন্মন ঘোর –
ছুটিব, মরিব, লভিব নিত্য জয়।

এ কবিতায় সংহত ছন্দের লালিত্য রয়েছে, নজরুলী আবেগের অকপট উদ্ভাস নেই। এভাবে লক্ষ করা যায় নজরুলের বিদ্রোহাত্মক ভাবসম্পদ আত্তীকরণ একান্তই দুরূহ।

‘বিদ্রোহী’ কবিতা নজরুলের জীবনদর্শন নিষিক্ত। ‘বাঙলা সাহিত্যে মুসলমান’ প্রবন্ধে নজরুল উল্লেখ করেন, ‘সাহিত্যিক নিজের কথা নিজের ব্যথা দিয়া বিশ্বের কথা বলিবেন, বিশ্বের ব্যথায় ছোঁওয়া দিবেন।’ তাঁর এই কাব্যদর্শন ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় স্ফুরিত হয়েছে বলে কবিতাটি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। পরাধীন স্বদেশের মুক্তি ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার অন্তর্গত অভীপ্সা পোষণ করলেও কবি বিশ্বমানবতার জয়গান গেয়েছেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতায়। কবি বিদ্রোহী সত্তাকে ‘বিশ্ব-তোরণে বৈজয়ন্তী, মানব-বিজয়-কেতন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ সত্তা বিশ্বজগৎ জুড়ে ‘বিদ্রোহ-বাহী’। বিশ্বকে নিঃক্ষত্রিয় করে কিংবা ‘অধীন বিশ্ব’-কে উৎখাত করে তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ। সমগ্র জগতের অত্যাচারিতের বেদনা হৃদয়ে ধারণ করে কবি উচ্চারণ করেন –

মহা-বিদ্রোহী রণ-কান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত,
যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে-বাতাসে ধ্বনিবে না,
অত্যাচারীর খড়্গ কৃপাণ ভীম রণ-ভূমে রণিবে না –
বিদ্রোহী রণ-কান্ত
আমি সেই দিন হব শান্ত।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার মানবিক অনুষঙ্গের জন্য এর বৈশ্বিক আবেদন ও অক্ষয়ত্ব নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful