Templates by BIGtheme NET
আজ- বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২০ :: ১৪ কার্তিক ১৪২৭ :: সময়- ৪ : ৪৩ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / মেঠো পথের গ্রামে লক্ষ টাকার ঘুষের পা

মেঠো পথের গ্রামে লক্ষ টাকার ঘুষের পা

মহিউদ্দিন মখদুমী

gush takaমফস্বল সাংবাদিক তাই পথে পথে হাঁটি। বিষয়টা কঠিন তবু সহজ করে দেখি। শিক্ষার ব্যাপক প্রসারে দেশের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোর অবকাঠামো,আসবাবপত্র সরবরাহ করেছে সরকার। এ গুলো সংরক্ষন ও শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সেবার জন্য দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগ প্রদান করা হচ্ছে। অধিকাংশ সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মেঠোপথের গ্রামের ভিতর। কিন্তু অবিশ্বাস্য হলে ও সত্য সেখানেও দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে ঘুষ বানিজ্যের প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে।

মেঠোপথের গ্রামে প্রবেশ করেছে লক্ষ টাকার ঘুষের পা। এই পায়ের চাপায় পিষ্ট হচ্ছে কর্মচঞ্চল চাষী। ছেলের চাকরী হবে এই আশায় জমি কিংবা সুদের উপর লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে ঘুষ দিচ্ছেন একজন প্রান্তিক চাষী। কোন কোন বিদ্যালয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অর্ধশিক্ষিত চৌকষ সভাপতিদের দ্বারা সাংবাদিকরা লাঞ্চিত হচ্ছেন।

সরেজমিনে গিয়ে শুনেছি এরপর নিজ চোখে দেখেছি একটি সত্য গল্প। এর চিত্রায়ন। কলাকুশলী ও রঙ্গিন মঞ্চ। গল্পটির নায়ক ৫০ উর্ধ্ব তফসির আলী। তিনি একজন প্রান্তিক চাষী। জমি আছে যতটুকু থাকলে জীবন চলে যায়। তার এক মাত্র ছেলেকে অনেক চেষ্টার পর ও পড়াশোনা করাতে পারেনি। ইচ্ছে ছিল ছেলে শিক্ষিত হবে । চাকরী করবে। তা না হওয়ায় নিজের সাথে সংসারী কাজ করাচ্ছেন। ছেলেটা স্বাক্ষর শিখেছে বিয়ের প্রয়োজনে। বিয়ে রেজিষ্টারীতে কনে পক্ষ যাতে বলতে না পারে বর নিজের স্বাক্ষর জানে না। আজ ভুলতে বসেছে সেই স্বাক্ষরটাও।

তফসির আলী সন্ধ্যায় সাত লক্ষ টাকা সুদের উপর নেবার জন্য এক মহাজনের বাড়ীতে গেছেন। মহাজন তো অবাক শান্তি প্রিয় কঠোর সংসারী তফসির আলীর হঠাৎ সাত লক্ষ টাকার প্রয়োজন হলো কেন? সাত লক্ষ টাকা সুদের উপর নিলে শোধ করবে কী ভাবে? বাড়ী ভিটা ও যতটুকু জমি আছে তা বিক্রি করলে এর ডবল হবে। কিন্তু সাত লক্ষ টাকা কী করবেন তফসির আলী। সরল ভাবে তফসির আলী তাকে জানালেন, তার একমাত্র ছেলের চাকরী হবে গ্রামের সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিয়ন পদে। এজন্য সাত লক্ষ টাকা লাগবে। হোক পিয়ন পদ তবু তো চাকরী। ছেলেটা অন্য ছেলেদের মতো প্যান্ট সার্ট পড়বে। মাসে মাসে বেতন পাবে। জমিতে কাজ করার চেয়ে এ তো অনেক ভাল।

রংপুর জেলার তারাগঞ্জ উপজেলায় ১২টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরমধ্যে নিয়োগ স্থাগিত করা হয়েছে সুরঙ্গের বাজার ও সয়ার কাজী পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় দু‘টির নিয়োগ প্রক্রিয়া। চাকনা,মানবমঙ্গন, রহিমাপুর, দোহাজারী, বাছুরবান্ধা ,বানিয়াপাড়া, কোরানী পাড়া, কাশিয়া বাড়ী ,হাড়িয়ারকুঠি ,কাংলাচড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ১০টি বিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া চলছে। একটি পদের জন্য গড়ে আবেদন পড়েছে প্রায় চারটি।

স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের সমন্বয়ে প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই বোর্ড সকল প্রার্থীদের মধ্যে তিনজন প্রার্থীকে যাচাইবাছাইয়ের মাধ্যমে মনোনীত করবেন। এরপর তারা মনোনীত তিন প্রার্থীর নাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার দপ্তরে মুখ বন্ধ খামের মাধ্যমে জমা দেবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকতা একটি স্থানীয় উচ্চ প্রার্থী বাছাই বোর্ডের মাধ্যমে ঐ তিন প্রার্থীর মধ্যে যোগ্যতার ভিত্তিতে একজনকে নিয়োগ প্রদানের সুপারিশ করবেন।

এ ভাবেই উপজেলার ১০টি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। প্রশ্ন হলো তাহলে নিয়োগ বানিজ্য কিংবা ঘুষ প্রদানের ব্যাপারটা কী ভাবে আসে? এই প্রশ্নটি মাথায় রেখে গত কয়েকদিন আগে এক স্বজনের অনুরোধে সরেজমিনে তারাগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগের প্রাথমিক বাছাই প্রক্রিয়া দেখতে গিয়েছিলাম। প্রার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষিত। বি,এ পাশ কিংবা অধ্যায়নরত। চাকরী প্রয়োজন তাই শিক্ষাগত যোগ্যতা লুকিয়েছে। অধিকাংশ এসএসসি পাশ। অষ্টম শ্রেনী পাশের সংখ্যা ও কম নয়। “ক” লিখতে কলম ভাঙ্গে এমন প্রার্থী ও আছে। চাকরী প্রয়োজন তাই ম্যানেজ করেছে অষ্টম শ্রেনী পাশের সনদ। বিদ্যালয়ের মাঠে প্রার্থীদের স্বজনদের প্রচন্ড ভীড়। স্থানীয় গ্রাম্য পুলিশ শৃংঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। প্রাথমিক বাছাইয়ের ভাইভা হচ্ছে। প্রার্থীরা ভাইভা দিতে যাচ্ছে আবার হাসি মুখে ফিরে আসছে। সুন্দর ভাইভা হচ্ছে। নিশ্চয়ই যোগ্যরাই প্রাথমিক বাছাইয়ে সুযোগ পাবে। নিয়োগ বানিজ্য কিংবা ঘুষ প্রদানের ব্যাপারটা তাহলে কী ভাবে হচ্ছে? জানার আগ্রহে নেমে পড়লাম অনুসন্ধানে।

অনেকের সাথে গোপনে কথা বলে জানা গেল, বাছুরবান্ধা ও কোরানী পাড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী কাম নৈশ্য প্রহরী নিয়োগের আগেই বানিজ্য হয়েছে ২২ লক্ষ টাকা। নিয়োগ প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে ক্ষমতা শেষ হবার আগেই সরিয়ে দেয়া হয়েছে বিদ্যালয়ের সভাপতিকে। চাকনা ,মানবমঙ্গন ,রহিমাপুর, দোহাজারী, বানিয়াপাড়া ,কাশিয়াবাড়ী ,হাড়িয়ারকুঠি ,কাংলাচড়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বিদ্যালয় কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক আগে থেকেই নিজেদের প্রার্থীদের কাছ থেকে পাঁচ থেকে সাত লক্ষ টাকা ঘুষ নিয়েছেন। শুধু একজন নয় তিনজন প্রার্থীর কাছ থেকে ঘুষ নেবার গল্পটা এ রকম। প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই বোর্ডে থাকা স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি নিয়োগের শতভাগ প্রতিশ্রুতি দিয়ে একজন প্রার্থীর কাছে ঘুষ নিয়েছেন, স্কুলের প্রধান শিক্ষক অন্য একজন প্রার্থীর এবং প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই বোর্ডে থাকা সহকারী শিক্ষকও অন্য আর একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দানের কথা বলে ঘুষ নিয়েছেন। এই ঘুষ গ্রহনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়েছে ঐ তিনজনের তিন মাথার চমকপ্রদ বুদ্ধি ও সমন্বয়ে। প্রশ্ন হলো তিনজনকে প্রাথমিক ভাবে বাছাই করা হলেও নিয়োগ পাবে একজন। অথচ ঘুষ নেয়া হয়েছে তিনজন প্রার্থীর কাছ থেকে। নিয়োগের প্রধান কাজ করবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার একটি স্থানীয় উচ্চ প্রার্থী বাছাই বোর্ড। সেখানে ঘুষ যাবে কোন মাধ্যমে। কী ভাবে?(আমরা জানি, দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে বগুড়া ও রাজশাহী জেলার দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠন হয়েছিল পরে তাদের শোকজ করা হয়েছিল।

সম্প্রতি কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী উপজেলায় নিয়োগ বানিজ্যের অভিযোগে দপ্তরী কাম নৈশ-প্রহরী নিয়োগ স্থানীয় এমপি ও উপজেলা চেয়ারম্যানের নির্দেশে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ১৬ জনের নিয়োগ বাতিল করে পূণঃরায় পরীক্ষা গ্রহনের নির্দেশ দিয়েছেন)। স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কোন ফোন কিংবা লবিংয়ের তোয়াক্কা না করে তারাগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকতার স্থানীয় উচ্চ প্রার্থী বাছাই বোর্ড যে একজন প্রার্থীকে নিয়োগদানের সুপারিশ করবে তার কাছ থেকে আগে নেয়া ঘুষ রেখে দিয়ে বাকী দুই প্রার্থীর টাকা ফেরত দেবেন তারা (স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও একজন সহকারী শিক্ষকের সমন্বয়ে প্রাথমিক প্রার্থী বাছাই বোর্ড সদস্য)।

তফসির আলীর মতো পিতারা তাদের সন্তানের পিয়ন পদে চাকরীর জন্য জমিজমা বিক্রি কিংবা সুদের উপর টাকা নিয়ে এই প্রতিযোগীতায় টিকে থাকতে দৌড় শুরু করেছেন। এই ফাঁকে লাভবান হচ্ছেন বিদ্যালয় ম্যানেজিং কমিটির অর্ধশিক্ষিত চৌকষ সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক। আমরা দূর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি। মিছিলে শ্লোগান তুলি তরুনরা রুখবে দূর্নীতি। মেঠোপথের গ্রামে একটি পিয়ন পদের জন্য যে টাকার লড়াই চলছে তা থামাবে কে? কে বন্ধ করবে এই অনিয়ম। বিষয়টা কঠিন তবু সহজ এভাবে সম্পন্ন করা যেত। যে দপ্তরী কাম নৈশ প্রহরী নিয়োগে সকল প্রক্রিয়া স্থানীয় পর্যায়ে না করে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষার মাধ্যমে চুড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ ও নিয়োগদান। তাহলে হয়তো মেঠোপথের গ্রামে বসবাসরত একজন চাষী তার সন্তানের পিয়নের চাকরীর জন্য সাত লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে চাইতো না। মেঠোপথের একটি গ্রামে ঘুষ শব্দটা আলোচিত হতো না।কর্তপক্ষ সেদিকে নজর দেবেন কী ?

লেখক: সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful