Templates by BIGtheme NET
আজ- মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২০ :: ১২ কার্তিক ১৪২৭ :: সময়- ৪ : ১৩ পুর্বাহ্ন
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / কোচ জাতির পরিচয়

কোচ জাতির পরিচয়

খগেন্দ্র হাজং

kochনৃ-বিজ্ঞানী বুকানন হ্যামিল্টন, হডসন, ই.এ. গেইট প্রমুখের মতে “কোচেরা বৃহত্তর মঙ্গোলীয় নর গোষ্ঠীর বোডো শাখাভুক্ত একটি অন্যতম জাতি”। বহু সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে “কোচেরা মঙ্গোলীয় মহা গোষ্ঠীর তিব্বতীয় বর্মণ শাখা ভুক্ত অন্যতম জাত”। রেভারেন্ট এনঞ্জেলস এর মতে “বোডো, কোচ, মেছ, ধীমাল, ফুলগরিয়া, ডিমাসা, লালুং, গাড়ো, হাজং, জন-জাতিরা বৃহত্তর আদি কাছারী জাতির বংশধর। গ্রীক পরিব্রাজক টলেমি খ্রীষ্ট জন্মের দ্বিতীয় দশকে প্রাগ-জ্যোতিষপুর (কামরূপ) অঞ্চলে বোডো, কোচ, গাড়ো হাজং, মেছ, ডিমাসা, লালুং, রাভা, কাছারী- এই রূপ ৯টি জন-জাতির বসবাসের কথা উল্লেখ করেছেন। এ সমস্ত নৃ-বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন তথ্য ও তত্ত্বের ভিত্তিতে যথার্থভাবে বলা যায়, আসামের বৃহত্তর বোডো ভাষাভাষীর বংশাতিবংশের শাখা-প্রশাখার পৃথক পৃথক কোম বা জল বা Tribe হচ্ছে কোচ, কাছারী, মেছ, মান্দাই, বর্মন, রাজবংশী গাড়ো, হাজং ইত্যাদি জাতি গোষ্ঠীর লোকেরা। কোচেরা মঙ্গোলীয়, বোডো, কিংবা তিব্বতীয় বর্মন শাখাভুক্ত যাই হোক না কেন, তারা যে এই উপমহাদেশের প্রাচীনতম ইতিহাস সমৃদ্ধ জাত ও জাতি তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কোচ কোনো নির্দিষ্ট কোম বা Tribe -এর নাম নয়। অনেকগুলো কোমের সমষ্টির নাম নৃ-তত্ত্বের ভাষায় সমামেল বা confederacy of Tribes । কোচদের গোত্র বা নিকনী প্রথা, মহিলাদের সামাজিক শ্রম যেমন মাছ ধরা, লাকড়ী সংগ্রহ করা, কৃষিকাজ করা, রোয়ালাগা, ধান কাটা ও দৈহিক গঠন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির মাঝেই গাড়ো, হাজং, বানাই, কাছারী ও মেছ আদিবাসীর অবিকল মিল খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ তারা ভিন্ন শাখার ভিন্ন জাত বা জাতি। নৃ-বিজ্ঞানী রিজলী ও ডাল্টন প্রমুখের মতে-কোচেরা দ্রাবিড় গোষ্ঠী ভুক্ত। এর কারণ হিসাবে বলা যা, উনারা কোচ ও রাজবংশীদের অভিন্ন মনে করেছেন। আসলে কোচ ও রাজবংশীদের একই দৃষ্টিতে দেখার কারণে এমন সমস্যার উদ্ভব হয়েছে। অতীতে কেবলমাত্র নৃ-বিজ্ঞানীদের মধ্যে কোচ ও রাজবংশীদের নিয়ে বির্তকের সৃষ্টি হয়েছে বিষয়টি এমন নয়, তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারও এক অর্থনৈতিক নির্দেশ জারী করে বির্তকের জন্ম দিয়েছিল। ব্রিটিশ সরকারের ধারণা হলো, যেহেতু রাজবংশীরা কোচদের সমতুল্য- সেহেতু তাদেরকে কোচদের সাথে একীভূত করে গননা করতে হবে। তৎপ্রেক্ষিতে ১৮৮১ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কোচও রাজবংশীদের একীভূত করে গননা করার আদেশ প্রদান করেন। ব্রিটিশ সরকারের এই নির্দেশ বা আদেশ কোচ ও রাজবংশীরা মেনে নেয়নি। শুরু হয় তীব্র আন্দোরন। ফলে ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার কোচ ও রাজবংশীদের আলাদাভাবে সনাক্ত ও গননা করার স্বীকৃতি জানালে সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। সরকারি পরিভাষায় বাংলাদেশের কোচেরা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তালিকা ভুক্ত হলেও আসামে কোচেরা প্রধান একটি হিন্দুবর্ণ বা জাতি। আসামে কোচেরা সর্বপ্রথম সনাতন ধর্ম (হিন্দু) গ্রহণ করলেও অদ্যাবধি তাদের পুরানা ঐতিহ্য-প্রথা, রীতিনীতি, সামাজিক আচার অনুষ্ঠানকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে একান্ত নিজস্ব ধ্যান ধারণায়। ধর্ম কখনো কোন জাতির প্রথা রীতিনীতি আচার অনুষ্ঠানের বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়না- এ বিষয়টি ভারতে তো বটেই, বাংলাদেশের কোচেরাও তার জলন্ত উদাহরণ। জনসংখ্যার প্রতিবেদন ও পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে বিশেষত: বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের কোচেরা একটি ক্রমহ্রাসমান জাতি। এর কারণ হিসাবে বলা যায় উত্তরবঙ্গের কোচেরা ক্রমাগতভাবে রাজবংশীর পরিচয়ের অন্তরালে নিজেদেরকে বিলীন করে দিচ্ছে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে অবস্থাটা সম্পূর্ণ উল্টো। আসামে কোচেরাই ক্রমবর্ধমান জাতি। কারণ সেখানকার কাছারী, লালুং, মিকির ইত্যাদি আদিবাসী থেকে সনাতন ধর্মে দিক্ষীতরা কোচ সমাজে আশ্রিত। বক্ষমান আলোচ্য বৃহত্তর ময়মনসিংহের কোচেরা অতি অবশ্যই মঙ্গোলীয় বোডো গোষ্ঠীভুক্ত আসামী কোচদের সাক্ষাত বংশধর। এ কথা যথার্থভাবে বলা যায়। সময়ের পরিক্রমায় এই বংশের কোচেরাই বৃহত্তর ময়মনসিংহের গাড়ো পাহাড়ের পাদদেশে উত্তর ভাগে ঝিনাইগাতী, নালীতাবাড়ী ও শ্রীর্বদি থানার বিভিন্ন ২০টি গ্রামে প্রায় ৫ হাজারের মতো কোচ সম্প্রদায় বসবাস করে। পাশাপাশি দক্ষিণভাগে কোচদের অন্যান্য জল বা কোম বা ট্রাইব যেমন, বর্মন, মান্দাই, বংশী, বানাই প্রভৃতি জনসংখ্যা যোগ করলে তাদের জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫ গুণ। বাংলাদেশের বমর্ন, মান্দাই, বানাই, বংশী এসব শাখার আদিবাসীরা কোচ সমামেল মূল স্রোতধারার অন্তর্ভুক্ত হলেও শেরপুরের কোচদের ধারণা বা বিশ্বাস তারাই এখনো কোচদের আদি পরিচয় ও ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। একই সাথে তারা আরো বিশ্বাস করে যে, তাদের আদি নিবাস আসামের হাজো অঞ্চল এবং হাজো অঞ্চলে বসবাসকালে তাদের মধ্যে কোনো দল কিংবা উপদল ছিলনা। প্রাচীন ইতিহাসেও তাদের ধারণার সত্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীন ইতিহাস জানা যায়, কোচগণ মূলতঃ চীনের হেওয়াংহো নদীর অববাহিকা থেকে প্রথমে তিব্বতে, পরে হিমালয়ের মালব রাজ্যে, সেখান থেকে উন্নত জীবন জীবিকার সন্ধ্যানে রাজ্যে (কামরূপ) প্রবেশ করেন। কামরূপে বহু বছর অবস্থানের পর দক্ষিণ পশ্চিম কোচ বিহার রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বহুযুগ আগে গাড়োরাও তিব্বত ত্যাগ করে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশের পর প্রাচীন কোচ বিহার স্থানেই তাদের প্রথম বসতি গড়ে তুলেছিল। এবং সেখানে তারা অন্ততঃ পক্ষে চারশ” বছর কাল পর্যন্ত বসবাস করেছিল বলে গাড়ো লোক কাহিনীতে পাওয়া যায়। একইভাবে হাজং লোকশ্রুতি অনুযায়ী চীনের হেওয়াং হো নদীর অববাহিকা থেকে প্রথমে তিব্বত, তিব্বত থেকে অবন্তিনগর (মালব) অবন্তিনগর থেকে প্রাগ জ্যোতিষপুর (গৌহাট্টি) বা হাজোনগর, (কামরূপ) হাজোনগর থেকে গাড়ো পাহাড়ের কড়ই বাড়ী, বারো হাজারী, এবং বারো হাজারী থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা, শেরপুর, ও পূর্বে সুনামগঞ্জ দক্ষিণে ভাওয়াল জয়দেবপুর, পশ্চিমে রংপুর, দিনাজপুর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আরেক ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ১৪৯৬ খ্রীষ্টাব্দে বিশ্বসিংহ (বিনু বা বিশু) অভীষ্ট সিদ্ধিলাভ করত এবং অবিলম্বে কামেতেশ্বর উপাধি ধারণ করে নিজেকে কামরূপের রাজ বলে ঘোষণা করেন। কাহারো মতো মহারাজ বিশ্বসিংহ শিব ও দূর্গার উপাসনা করতেন। কেহবা বলেন কালীচন্দ্র ভট্টাচার্য এক ব্রাক্ষণের নিকট তিনি শাস্ত্র হতে শৈব ধর্মে দীক্ষিত হয়েছিলেন।  পাশ্চত্য পন্ডিতগণের মতে বিশ্ব সিংহ রাজ্যভার গ্রহণের পর কোচগণ হিন্দু ধর্মগ্রহণ করেছিলেন। সনাতন ধর্ম গ্রহণের পর বিশ্বসিংহ সনাতন ধর্মের প্রতি প্রবল আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং রাজ্য পরিষদ বর্গ ও রাজ্যের অন্যান্য প্রজাদেরকে ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি সমূহ বর্জন করে আর্য হিন্দু হওয়ার জন্য বলপ্রয়োগ করতেন। ইহাতে কেহ অস্বীকৃতি জানালে তাদের উপর কঠোর অত্যাচার ও নির্যাতন করা হতো। ফলে ওই সময় কোচদের বাঁচার দুইটি উপায় ছিল। (এক) নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষা ও সামাজিকতা বর্জন করে আর্য হিন্দু হওয়া (দুই) নয়ত বনে জংগলে পালিয়ে অথবা আত্মগোপনে থেকে নিজ ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিকতা রক্ষা করা। যার নিজ ধর্ম, সংস্কৃতি ও ভাষাকে রক্ষা করার জন্য অবিচল নিষ্ঠাবান ছিলেন, তাদেরই একটা বৃহৎ অংশ পলায়নরত মহন্ত নামক কোচ সর্দারের নেতৃত্বে ১৪৯৬ খ্রীস্টাব্দে কামতা (কামরূপ) হতে মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম অংশে কড়ইবাড়ী, পূঁচিমারীতে এসে বসতি স্থাপন করেন। হাজং রাজা কশ্যপ বর্মন তখনও তৎস্থল অর্থাৎ বারো হাজারী পরগনায় রাজ্য শাসন করিতেছিলেন। এদিকে মহন্ত কোচ বারোহাজারী পরগণায় বসতি স্থাপনের পর অধিক শক্তি অর্জনের জন্য আসাম থেকে আরো অধিক হারে কোচদের ডেকে এনে তার বসতি এলাকায় বসবাসের সুযোগ করে দেয়। তখন মহন্ত কোচের জনবল ও শক্তি দু”টোই ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। এক সময় সুযোগ বুঝে অতি সহজে কশ্যপ বর্মনকে পরাজিত করে মহন্তকোচ বারো হাজারী পুনরায় দখল করে নেয়। মহন্ত কোচ বারো হাজারী কড়ই বাড়িতে মহেন্দ্র নাম ধারণ করে রাজত্ব করতে থাকেন। বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের “মহেন্দ্রগঞ্জ” থানাটি তার নামানুসারে পরিচিত লাভ করে। মহেন্দ্র কোচের মৃত্যুর পর তার  দুই ছেলে হুমান্ত ও ধুমান্ত কোচ রাজত্ব করেন। এই উপ মহাদেশে মোঘল রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে মহেন্দ্র কোচের রাজ্য সীমানা উত্তরে কামরূপ রাজ্য, দক্ষিণে বিক্রমপুর, পশ্চিমে রংপুর দিনাজপুর, পূর্বে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আরেকটি ইতিহাসে জানা যায় ১৪১২ খ্রী. দলিপা সামন্ত নামে এক কোচ সর্দার দশ কাহনিয়া পরগানায় রাজত্ব করতো। তার রাজ্য সীমানা উত্তরে গারো পাহাড়, কড়উ বাড়ী, পুঁটিমারী, বারো হাজারী, দক্ষিণে ব্রক্ষপুত্র  নদ, পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। রাজধানী ছিল গড়জরীপা। গড়জরীপা স্থানটি শেরপুর জেলার ৭ মাইল উত্তরে শালুয়ার বন্দ নামক স্থানে অবস্থিত। ১৮৯৭ সাল পর্যন্ত দলিপার এই দুর্গ প্রায় অক্ষত ছিল। কিন্তু বাংলা ১৩০৪ সালে ভীষণ ভূমিকম্পের কবলে পড়ে এই গড় ও পরিখাগুলো বহু ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। দূর্গটি ১১”শ একর জমির উপর পর পর ৭টি মাটির সুউচ্চ প্রাচীর দ্বারা পরিবেস্টীত ছিল। কোচদের আরেক লোক কাহিনীতে জানা যায় যে, কোচেরা নিজেদেরকে কোচ বিহারের রাজা নৃপতি নারায়ণ এবং চিলা রায়ের বংশধর বলে পরিচয় দেয়। তাদের বিশ্বাস তাদের আদি নিবাস ছিল উদয় গিরি নামক স্থানে। তারপর উদয়গিরি স্থান ত্যাগ করে প্রথমে কামরূপে বসতি স্থাপন করে। কামরূপের হাজো অঞ্চলে তারা বহু বছর বসবাস করে।

তখন ক্ষত্রিয় নিধনকারী পরশুরামের ভয়ে হাজো অঞ্চলের কোচেরা হাজো নগর ত্যাগ করে মেঘালয়ের পশ্চিমে বারো হাজারীতে এসে আশ্রয় নেয়। আরেক লোক কাহিনীতে পাওয়া যায়- কোচদের ধারণা ও বিশ্বাস তাদের আদি পিতা রাজা হাজো প্রথমে বড়বোন মুকদীকে বিয়ে করেন, মুকদী মারা গেলে তার ছোট বোন কুন্তীকে বিয়ে করেন। ওই হাজো রাজার বংশাতিবংশ বর্তমান বাংলাদেশে বসবাসরত সকল কোচ সম্প্রদায়। কারণ হাজো বংশের লোকেরাই অর্থাৎ কোচেরাই পরশুরামের ভয়ে হাজো অঞ্চল ত্যাগ করেন। হাজো অঞ্চল ত্যাগ করে প্রথমে সোনাপুর তারপর তিতিলী হাচেং (তেতুলবালি) স্থানে অবস্থান করেন। তিতিলী হাচেং জায়গায় জীবন ধারণ কষ্টসাধ্য হওয়ায় সে স্থান ত্যাগ করে, খাসী পাহাড়ের কুসুমবালা নামক স্থানে কিছু দিনের জন্য বসবাস করেন। সেখান থেকে কোচেরা গারো পাহাড়ে প্রবেশ করেন। এবং রং জেং নামক স্থানে কিছুদিন অবস্থান করেন। রংজেং ত্যাগ করে বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম সমভূমি জায়গায় অবস্থান করেন। সেখানেই কোচদের এক পরাক্রমশালী নেতার নেতৃত্বে একটি কোচ রাজ্য গড়ে ওঠে। সেই রাজ্যটি পরবর্তীতে কোচ বিহার নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রাচীন কালে কোচ বিহারের নাম ছিল বধুপুর। পরবর্তীতে কোচ বিহার থেকেই বিভিন্ন সময় কোচেরা নানা দিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয় মূল কোচের বিভিন্ন দল শেরপুর ও ময়মনসিংহে কোচ, ভাওয়ার জয়দেবপুর ও গাজীপুরে বর্মন, মান্দাই, বংশী, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জে হাজং, বানাই, ইত্যাদি নাম ধারণ করে বসবাস করতে থাকে। সে কারণে ইতিহাসে কোচেরা বিরাট স্থান দখল করে আছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে জেলার প্রায় সকল ইতিহাস ও কীর্তিচিহ্নের সংগে কোচদের স্মৃতি অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। যেমন, ময়মনসিংহের পশ্চিমাংশর যোগী গোফা, ফলদা, নালুয়া, নরিল্লা, সুসং দুর্গাপুর প্রভৃতি স্থানের সকল অট্টলিকা, দেবালয় ও মঠ ইত্যাদি পুরার্কীতি ও ঐতিহাসিক স্থান একান্তভাবেই কোচ রাজাদের সাথে জড়িত। এছাড়া শেরপুরের ঝিনাইগাতী নদীর তীরে রাজা হরিশচন্দ্র বা ভগীরথের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ধন বাড়ীতে ধনপৎ রাজার কীর্তি চিহ্ন, বানার নদীর তীরে আনু হাদিতে আনু রাজার পরিখা ও বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ঘাটাইলের হোড় রাজার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, রাজ গোলা বাড়ীতে, রাজা যশোধরের বাড়ির জমকালোচিহ্ন ইত্যাদি এককালের ময়মনসিংহবাসী কোচদের ব্যাপক প্রভাব, প্রতিপত্তি ও রাজ্য শাসনের সাক্ষ্য বহন করে। তারপরেও ময়মনসিংহ অঞ্চলের অসংখ্য গ্রাম, গঞ্জ ও বিশালাকার পরিত্যক্ত দীঘি-পুকুর ও পরিত্যক্ত জন বসতির সংগে কোচদের নাম ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ময়মনসিংহের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সম্পদ ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকায় প্রচুর মাত্রায় কোচদের নাম ও ইতিহাস উল্লেখ পাওয়া যায়।  খন্ডখন্ড ভাবেও পৌরাণিক গ্রন্থে বহু কোচ শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। যেমন যোগীনিতন্ত্রম, পিঠমালা, ব্রক্ষবৈর্বত পুরান, বায়ু, মৎস, হরিবংশ, ব্রক্ষান্ড, মহাভারত-এ সমস্ত গ্রন্থে কোচ শব্দ পাওয়া যায়। যোগীনি শাস্ত্রে উল্লেখ আছে ক্ষত্রীয় নিধনকারী পরশু রামের ভয়ে যে সকল ক্ষত্রগণ সংকোচ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন, সেই সংকোচ থেকে “কোচ” শব্দের উৎপত্তি। কোচবিহার ইতিহাসেও কোচ আদিবাসীদের বিক্ষিপ্তভাবে তথ্য জানা যায়। নেত্রকোণা জেলার মদনপুরের মদন কোচকে বশীভূত করেই হযরত শাহ সুলতান রুমী মদনপুরে নিজের প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়েছিলেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী মদনা কোচের দুই বোন নন্দীনী ও চান্দিনী নামে দু”টো রাজ্য ছিল। যথাক্রমে নন্দীপুর ও চন্দনকান্দিতে। এ দু”টো স্থানের নামটিও দুই বোনের নামের অনুসারে হয়েছিল। গৌরীপুরের বোকাই কোচ বা বোকাই নগরের বোকাই কোচ এবং গড়জরীপার দলিপ কোচ সে তো রীতিমত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ভাষাচার্য গ্রীয়ার্সন সাহেব কোচদের ৬টি শাখা বা  দলের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো যথাক্রমে ১. সাতপারি, ২. চাপ্রা, ৩. দশগাইয়া বা বানাই, ৪. তিনটিকিয়া ৫. হরিগাইয়া, ৬. ওয়ানাং। আসামের লোকগণনা প্রতিবেদনে ৬টি শাখার বা দলের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিবেদনে কিন্তু হরিগাইয়া ও সাত পাইরাকে অভিন্ন বলা হয়েছে। এছাড়া মিঃ স্টেপল্টন সাহেব কোচদের আরও ২টি “দিয়াগা” ও “মারগান”  শাখার কথা উল্লেখ করেছেন। দুইটি শাখা বা দলের কথা যোগ করলে শাখার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮টি। এছাড়াও কুনপানি, সাথারি, মাসান্তি ইত্যাদির শাখার উল্লেখ পাওয়া য়ায়। সংখ্যা ৮ কিংবা ১১ যাই হোক না কেন কোচ সম্প্রদায় যে অনেকগুলো শাখা বা দলে বিভক্ত তাতে সন্দেহ নেই। অপরদিকে প্রতিটি শাখা বা দল আসলে আলাদা আলাদা কোনো বা ট্রাইব তাতেও সন্দেহের অবকাশ নেই। কোচদের এ সমস্ত শাখাগুলো গারো শাখার অনুরূপ যাহা হিন্দু বর্ণাশ্রম সমাজের নিরিখে এক একটি স্বতন্ত্র জাত বা বর্ণ। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়: বানাইরা কোচদের একটি শাখা হয়েও স্বতন্ত্র কোম বা জাত। এ সমস্ত শাখাগুলোকে কোচেরা ভাগ বলে অভিহিত করে। আবার প্রত্যেক শাখা বা ভাগের রয়েছে অনেকগুলো করে গোত্র। এ সমস্ত গোত্রগুলোকে কোচেরা হাজংদের মত নিকনী বলে অভিহিত করে। কোচদের এই রূপ গোত্র বা নিকনীর সংখ্যা প্রায় শতাধিক। এখানে কিছু সংখ্যক নিকনীর নাম উল্লেখ করা হলো-

১. কামা, ২. রানজে, ৩. মাজি, ৪. কারে, ৫. পিড়া, ৬. বালা, ৭. হানসুর দাহেং, ৯. দলফা, ১০. রাংসা, ১১. কারো ১২. বাসার ১৩. গিরি ১৪.স্কু ১৫. দাসু ১৬. কাশ্যপ ১৭. মেথুন ১৮. স্নাল ১৯. চিসিম ২. নাফাক ২১. রিচিল ২২. দফো ২৩. চিরান ২৪. হাজং ২৫. আ রেং ২৬. বক ২৭. নাবরা ২৮. তারেকোনা ২৯. বেতাছিং ৩০. ওয়ানং ৩১. দাংগু ৩২. জাজার ৩৩. কাংক্যালা ৩৪. দংচা ৩৫. হাছুনপাড়া ৩৬. দাহাপাড়া ৩৭. হাক্রা ৩৮. বানাই ৩৯. দাম্বুক ৪০. লং ক্রে ৪১. চিকু ৪২. তাকু ৪৩. তিকুমান্দা ৪৪. বান্দা ৪৫. তি ঘাউ ৪৬. কা দ্রাং ৪৭. হাচাম ৪৮. মুরং ৪৯. হাকক ৫০. নাবা ইত্যাদি। কোচদের মধ্যে সত্রোতে বা একই নিকনীতে বিবাহ নিষিদ্ধ। তাছাড়া নিকনীর বাইরেও চাচাত, মামাত, মেসতুত, ভাই বোনদের মদ্যে বিহা নিষিদ্ধ। কোচেরা বর্তমানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা মেনে চললেও ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকল সন্তান মায়ের নিকনীভুক্ত হয়। এই বিধানটি হাজংদের নিকনী প্রথা এবং গাড়োদের মাচং বিধানের মতই কার্যকর। তবে এ ব্যবস্থার মধ্যে একটা সুষ্ঠ বৈপরীত্য বিদ্যমান। কেননা একই সংগে মায়ের নিকনী ভুক্ত এবং পিতৃ সম্পত্তির অধিকারী পুত্র হলে প্রত্যেক পুরুষেরই সম্পত্তির মালিকানা এক নিকনী থেকে অন্য নিকনীতে চলে যায়। তাই কোচদের পিতৃতান্ত্রিকতার উত্তরণের প্রথম দিকে প্রত্যেক ছেলেদেরকে শাশুড়ীর বাড়িতে ঘরজামাই হিসাবে আসতে হতো। মাত্র ৭০ বছর পূর্বকালেও ঘরজামাই প্রথা তিন টিকিয়া কোচ সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে কোচদের মধ্যে নিকনী প্রথা কেবল বিবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং ঘরজামাই প্রথা ব্যাপকভাবে নিহিত। তবে বিবাহকালে যৌতুক দিয়ে কন্যা বিবাহ দেওয়া এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বলতে গেলে এ প্রথা উত্তর উত্তর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বুকানন হ্যামিল্টন বলেছেন- “মাত্র একশত বছর পূর্বপর্যন্ত গারো পাহাড়ের পানি কোচদের মধ্যে পুরো মাতৃতান্ত্রিকতার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।” কোচ সমাজ বা কোচ সম্প্রদায়ের মধ্যে তিন টিকিয়া কোচেরা অন্যান্য কোচদের তুলনায় সামাজিক মর্যা দায় সর্ব নিম্ন বলে ধারণা করা হয়। অথচ তিনটিকিয়া কোচেরাই তাদের আদি পরিচয়ের সামাজিক বিধি বিধান, ভাষা, সংস্কৃতি প্রথা রীতিনীতি অদ্যাবধি বিরূপ পরিস্থিতিতেও বহন করে চলেছে। তাদের কেন তিনটিকিয়া কোচ বলা হয়। তার ব্যাখা হলো এই- পূর্বে তারা তিন টুকরা কাপড় শরীরে জড়িয়ে পরিধান করতো। প্রথমত : এরা গারোদের মত এক টুকরা কাপড় হাঁটুর নিম্নভাগ থেকে কোমর পর্যন্ত প্যাঁচিয়ে পরে। দ্বিতীয় আরেক টুকরা কাপড় বক্ষস্থল থেকে কোমর পর্যন্ত প্যাঁচিয়ে রাখে। তৃতীয় আরেক টুকরা কাপড় মাথায় ঘোমটার মত ঢেকে রাখে। ভাষা বিশেষজ্ঞরা গোয়ালপাড়া ও ঢাকার কোচদের ভাষার কয়েকটি নমুনা পর্যা লোচনা করে কোচদের ভাষাকে বাংলা অথবা অসমীয়া ভাষার সংমিশ্রণ বলে মত প্রকাশ করেছিলেন। মেজর প্লে-ফেয়ার গারোদের আত্তং ও রুগা উপভাষার সাথ তিনটিকিয়া কোচ ভাষার সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছিলেন। তবে পরবর্তী গবেষণায় কোচদের স্বতন্ত্র ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিন্তু কোচদের আলাদা অথবা স্বতন্ত্র ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। কোচদের ভাষাকে কেই কেই গারো ভাষার সাক্ষাত সহোদরা বলে মনে করেন। এ বিষয়ে একটি লোকশ্রুতি রয়েছে। সোমেশ্বরী উপত্যকার গারো লোকশ্রুতি অনুযায়ী দেশ ত্যাগী ১২টি কোচ পরিবারের সংগে গারো পাহাড়ের সিজু অঞ্চলের গারোদের বৈবাহিক সংমিশ্রণের ফলে আত্তং গারোদের উদ্ভব। সেকারণে আত্তং গারো দলের কথ্য ভাষার সংগে কোচ ভাষার অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মেন আত্তং গারোরা ভাতকে “মাই” বলে। তদ্রুপ কোচেরাও ভাতকে “মাই” বলে। এরূপ বহু শব্দ রয়েছে যা আত্তং ও কোচ ভাষার সাথে মিলে যায়।

 লেখক : কার্যকরী সভাপতি, আদিবাসী ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful