Templates by BIGtheme NET
আজ- বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২০ :: ৬ কার্তিক ১৪২৭ :: সময়- ৭ : ৪৩ পুর্বাহ্ন
Home / ইতিহাস ও ঐতিহ্য / ভক্তের সান্নিধ্যে ভগবান পথে নেমেছেন আজ

ভক্তের সান্নিধ্যে ভগবান পথে নেমেছেন আজ

roth jatraতাপস রায় : ছেলেবেলায় নৌকায় রথের মেলায় যেতাম। গ্রামের খাল-বিল তখন বর্ষার নতুন জলে টইটম্বুর। সেই জলের পথ পাড়ি দিয়ে মাথায় বৃষ্টি নিয়ে যখন মন্দিরের আঙিনায় পৌঁছতাম তখন চারপাশ লোকে লোকারণ্য। ছোট হওয়ায় রথের রশি ধরার সুযোগ পেতাম না, যদি ভিড়ের মধ্যে রথের চাকা পায়ের ওপর উঠে যায়! আবার রথের ওপর থেকে পূজারির ছুড়ে দেয়া কলাও ধরতে পারতাম না। লাফিয়ে উঠে হাত বাড়ানোর আগেই বড়দের হাত কলার নাগাল পেয়ে যেত। সুতরাং আমার আর ‘রথ দেখা কলা বেচা’ কোনোটাই হতো না। এতে মন খারাপ হতো বৈকি! কিন্তু সে আর কতক্ষণ? ফেরার পথে ঠাকুমা যখন হাতে কলাপাতায় মোড়ানো সিঁদুর দেয়া কলা আর লটকন ধরিয়ে দিতেন মুহূর্তেই মন ভালো হয়ে যেত। আহা! লটকন আর এই আষাঢ়ের বৃষ্টি ছাড়া এই উৎসব যেন পূর্ণতা পায় না। কারণ রথ হবে অথচ জগন্নাথদেব ভক্তকূলকে আশীর্বাদবৃষ্টিতে ভেজাবেন না এমনটা দেখেছি বলে মনে পড়ে না।

সেই বয়সে রথযাত্রার চেয়ে রথের মেলার আলাদা আকর্ষণ ছিল বৈকি। বড়দের দেখতাম এক বছর তারা অপেক্ষা করে থাকতেনি এই মেলার জন্য। না, শুধু নিতাই কাকা, সুবল দাদারা নয়; মহসীন কাকা, খোরশেদ কাকা, আলম কাকা, সাত্তার ভাইকেও দেখতাম রথের মেলার জন্য অপেক্ষা করতে। অর্থাৎ সেকালে রথের মেলার সার্বজনীন একটা রূপ ছিল। সেই ধুমধাম, সেই আনন্দের ঘনঘটা এখনও বর্তমান। ‘লোকারণ্য মহা ধুমধাম, ভক্তরা লুটায়ে পথে করিছে প্রণাম’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেখা রথযাত্রার এই রূপ আমি এখনও দেখতে পাই। 

রথযাত্রা উৎসবের কেন্দ্রস্থল পুরী হলেও এর মূল ভিত্তি বৃন্দাবন। কথিত আছে বোন সুভদ্রা বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসার ইচ্ছা প্রকাশ করলে কৃষ্ণ, বলরাম এদিন তাকে রথে চড়িয়ে দ্বারকা নিয়ে আসেন। আবার এমনও শোনা যায়, মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের মল্লযুদ্ধের আমন্ত্রণে এদিন শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম রথে চড়ে মথুরার পথে যাত্রা করেন। জনশ্রুতি যাই হোক, প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়ায় যে রথযাত্রা পালিত হয় সেখানে রথে আমরা ভগবান শ্রীকৃষ্ণেরই আরেক রূপ জগন্নাথকে দেখতে পাই।
 
রথযাত্রা শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম একটি লীলা। সেই লীলা স্মরণ করে ভক্তরা আজও পুরীর জগন্নাথদেবের মন্দির থেকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা জগন্নাথদেবকে রথে টেনে বৃন্দাবনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেন। সেই থেকে এই ধর্মীয় উৎসবের শুরু। লন্ডন, প্যারিস, নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, সিডনি, কলকাতাসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়। আমাদের দেশের গ্রাম বাংলাতেও যে খুব ঘটা করে এই আনন্দ আয়োজন করা হয় তা আগেই বলেছি। রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে এখনও বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসে। মেলা চলে ফিরতি রথযাত্রা উৎসব পর্যন্ত। যেহেতু রথযাত্রা বর্ষাকালে হয় সুতরাং এই উৎসবের সঙ্গে বৃষ্টির স্মৃতি জড়িত। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে এই বিশ্বাস এখনও বৃষ্টিস্নাত সবুজ পাতার মতোই সজীব যে, রথের দিন বৃষ্টি হবেই। সেই বৃষ্টিতে ভিজে রথের মেলায় যাওয়া একটু অন্যরকম অনুভূতি তৈরি করে বৈকি। 

ভক্তদের অনেকেই রথযাত্রায় এসে জগন্নাথদেবের বিশেষ রূপ দেখে কৌতূহলী হন। এর পেছনেও রয়েছে একাধিক জনশ্রুতি। বিশেষ করে পুরীর সুবিশাল মন্দিরে তার অধিষ্ঠান নিয়েও রয়েছে একাধিক কাহিনি। তবে প্রাচীণ ধর্মীয় গ্রন্থ থেকে যতদূর জানা যায়, বহু বছর আগে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন নামে এক রাজা ছিলেন। ধর্মপ্রাণ শাসক হিসেবে তার সুপরিচিতি ছিল। তিনি একবার মন্দির তৈরি করে তাতে বিগ্রহ স্থাপন নিয়ে সংশয়ে পড়েন। তখন তিনি স্বপ্নাবস্থায় নীলাচল পাহাড়ের এক গুহায় নীলমাধবকে দেখেন। অনেক কষ্টে তিনি নীলমাধবকে খুঁজে বের করেন। নীলমাধবকে পেয়ে রাজা এতটাই গর্বিত হলেন যে, অহঙ্কারে তার পা আর মাটিতেই পড়তে চায় না। কিন্তু এই অহঙ্কারই রাজার কাল হলো। নীলমাধব অন্তর্হিত হলেন। নীলমাধবকে পেয়ে হারিয়ে ফেলায় রাজা শোকে কাতর হয়ে প্রার্থনায় বসলেন। খুব দ্রুতই প্রার্থনার ফল মিলল। তিনি স্বপ্নে আদেশ পেলেন, সমুদ্রতীরে এক কাঠের গুঁড়ি পড়ে আছে তাই দিয়ে নীলমাধবের বিগ্রহ তৈরি করার। খোঁজ করে কাঠের গুঁড়ি পাওয়া গেল সত্য কিন্তু তা দিয়ে বিগ্রহ তৈরি করা তো দূরে থাক কেউ তাতে আঁচড়ও দিতে পারল না। রাজা পুনরায় প্রার্থনায় বসলেন। 

হঠাৎ একদিন রাজদরবারে এক কাঠমিস্ত্রির আবির্ভাব হলো। সে নীলমাধবের বিগ্রহ করে দিতে রাজি হলো বটে কিন্তু সঙ্গে দুটি শর্তও জুড়ে দিল। প্রথম শর্ত, সে স্বাধীনভাবে কাজ করবে। দ্বিতীয় শর্ত, কাজ করার সময় ২১ দিন কেউ তাকে বিরক্ত করতে পারবে না।

রাজা শর্তে রাজি হলেন। কঠোর গোপনীয়তার আশ্বাস পেয়ে কাজ শুরু হলো। কিন্তু ১৫ দিনের দিন রাজা আর কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারলেন না। কারণ কাঠমিস্ত্রির স্নান নেই, খাওয়া নেই, ঘরের দরজা বন্ধ। সেই বন্ধ দরজায় কান পাতলেও কিছু শোনা যায় না; রহস্যময় মিস্ত্রি কী করছে কে জানে? রাজা শর্ত ভুলে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করলেন। কাঠমিস্ত্রিরূপে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হলেন। ঘরে পড়ে রইল জগন্নাথ, বলরাম আর সুভদ্রার অসম্পূর্ণ মূর্তি। হস্তপদহীন এই মূর্তিগুলো আজও আমরা পুরীর মন্দিরে দেখতে পাই। এবং এগুলো দিয়েই রাজা অবশেষে মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

শ্রীকৃষ্ণের এই অপার লীলার অন্তর্নীহিত তাৎপর্য মোটামুটি এরকম- ভক্তের মধ্যেই ভগবান বেঁচে থাকেন। ভক্তের জন্য তার হৃদয়ে ব্যাকুলতার শেষ নেই। ভগবানের সেই ভক্ত বিকারগ্রস্ত রূপ দেখে নারদ মুনি শ্রীকৃষ্ণের কাছে প্রার্থনা করে বলেছিলেন, হে ভগবান, আপনার এই রূপ যেন জগৎবাসীর কাছে প্রকাশ পায়। তখন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দারুব্রহ্ম (জগন্নাথ) রূপে পুরীতে প্রকাশ পাবেন বলে নারদকে আশ্বস্ত করেন। রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের মাধ্যমেই পুরীর মন্দিরে স্বয়ং জগন্নাথ চিরজাগ্রত হয়ে আছেন।

রথযাত্রা প্রাচীণ ধর্মীয় উৎসব। তবে প্রায় পাঁচশ’ বছর আগে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যের কারণে পুরীর রথযাত্রা একটি বিশেষ মাত্রা লাভ করে। ধামরাইয়ের রথযাত্রা যেমন এ দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা পায়, তেমনি ভারতবাসীর কাছে পুরীর রথযাত্রা আলাদা আকর্ষণ তৈরি করে। লাখ লাখ ভক্ত পরিবেষ্টিত হয়ে রথে করে জগন্নাথদেব এদিন পুরী থেকে গুণ্ডিচার পথে যাত্রা করেন। সাত দিন পর তারা আবার ফিরে আসেন মূল মন্দিরে। এই ফিরে আসাকে বলা হয় উল্টো রথ। 

রথযাত্রা যেহেতু শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম লীলা। তাই এই উৎসবে অংশগ্রহণ করার অর্থ হলো, সরাসরি শ্রীকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসা। যারা মন্দিরে আসেন না তাদের জন্য ভগবান নিজেই পথে বের হন। ভক্তের সন্ধানে তাকে আরো কাছে পেতে, তার সান্নিধ্যে আসতে ভগবানের এই ব্যাকুলতা রথযাত্রার আরেক মাহাত্ম্য।   

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful