Templates by BIGtheme NET
আজ- শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২০ :: ১৭ আশ্বিন ১৪২৭ :: সময়- ১২ : ৩৮ পুর্বাহ্ন
Home / আলোচিত / চির নিদ্রায় শায়িত কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ

চির নিদ্রায় শায়িত কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ

স্টাফ রিপোর্টার: কবি, সাংবাদিক ও ছড়াকার কবি নূরুল ইসলাম কাব্য বিনোদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৭টায় রংপুর নগরীর শালবন বাস ভবন ‘কবি কুঞ্জে’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ১০৫ বছর।

আজ বাদ যোহর বাবুখা হাই স্কুল মাঠে মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা, পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে বিকেল ৩টায় দ্বিতীয় নামাজে জানাজা এবং শালবন কৈশাস রঞ্জন মাঠে অনুষ্ঠিত শেষ নামাজে জানাজা শেষে মিস্ত্রীপাড়া কবর স্থানে তার দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়। পাবলিক লাইব্রেরী মাঠে হাজারো ভক্ত ও শুভার্থী এ কবিকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। কবিকে শ্রদ্ধা জানাতে এসে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন রংপুরের কবি সাহিত্যিাক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনসহ তার হাতে গড়া ছান্দসিক সাহিত্য সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর নেতারা।

মানবদরদী কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদের জম্ম ১৯০৮ সালের ২০ ডিসেম্বর রাত ৮টা ৩০ মিনিটে। রংপুর শহরের প্রসিদ্ধ বাবু খাঁ গ্রামে এক প্রাচীন সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার বাবার নাম আলহাজ্ব মুহাম্মদ আজিবুল¬াহ এবং মায়ের নাম মজিদ উন-নেসা। কাব্যবিনোদের প্রপিতামহ সওদাগর ওয়ালী মুহাম্মদ খাঁন ১৭০০ খ্রীষ্টাব্দে ভারতের পাটনা থেকে ডিঙ্গী নৌকায় ব্যবসা-বাণিজ্য করতে রংপুরে আসেন এবং স্থায়ীভাবে রংপুরেই বসবাস শুরু করেন। তারই মৃত ছেলে মুহাম্মদ বাবুল খাঁনের নামে বর্তমানে বাবু খাঁ গ্রামের নামকরণ করা হয়েছে। শৈশব থেকে তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধা শক্তির অধিকারী ও ধর্মপরায়ন। শৈশবেই তার কাব্যের হাতে খড়ি। তিনি যখন ৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র তখনই তিনি একটি চমৎকার ছড়া লিখেন। ছড়াটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদিত মাসিক ‘গল্পলহরী’র রবীন্দ্র সংখ্যায় ছাপা হয়। ছড়াটি প্রকাশের পর তার সুনাম চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
‘আমার আশা’ পাঠ করে বিখ্যাত সাহিত্যিক ও ভাষা গবেষক ডক্টর সুনীতি কুমার চট্টপাধ্যায় মন্তব্য করে কবিকে লিখেছিলেন, লেখকের ডাবল করে নোবেল নেয়ার আশা পূরণ হওয়া সম্ভব হোক আর না হোক, সময়, সুযোগ এবং সহানূভূতি পেলে তিনি একদিন বাংলা সাহিত্যে অতি উঁচুস্থান অধিকার করতে পারবেন, এ বিষয়ে আমার অনুমাত্র সন্দেহ নেই। এ মন্তব্যটির প্রতিফলন পরবর্তীকালে বাস্তব হয়েছে। সাহিত্যে তিনি অতি উঁচুস্থান দখল করেছেন এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়। ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র থাকাকালীন তিনি রচনা করেন ‘ছোটদের কাব্যে আমপারা।’ কলকাতার ইতিকথা বুক ডিপো থেকে প্রকাশিত হয়েছে তার প্রথম শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ ‘গুলশান।’ যা দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে দ্রুত পঠন হিসেবে এক সময় মনোনিত হয়েছিল। তিনি গুলশান কাব্যগ্রন্থটি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে উৎসর্গ করেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম গুলশান কাব্যগ্রন্থটি পড়ে কাব্যবিনোদকে চিঠি দিয়েছিলেন- ‘তোমার কাব্যগ্রন্থ গুলশান এক নিঃশ্বাসে দশবার পড়েছি। তবুও আমার তৃপ্তি হয়নি। মনে হয় আরো পড়ি।’ কাব্যবিনোদ প্রায়ই বলতেন, আমি চতুর্থ শ্রেণীতে পড়াকালীন হতে লিখছি। এমন কোন দিন নেই যে লিখিনি। আমার শত শত পান্ডুলিপি তেলাপোকা আর উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। এখনো যে সব লেখা আছে তা দিয়ে ৫০০ বই প্রকাশ করা যাবে। কিন্তু সামর্থ না থাকায় তাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত কবির বেশ কটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রুবাইয়েতে নূর, আঞ্চলিক ভাষায় হামার অমপুর, গুলশান (১৯৪৫), পেয়ারা (১৯৫০), শেফালী (১৯৫৮), ইকবাল, নজরুলনামা (১৯৬০) ইত্যাদি।
কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ শুধু ছন্দের জাদুকর ছিলেন না। সাংবাদিক হিসেবেও এক সময় ছিলেন এ অঞ্চলের উজ্জলতম নক্ষত্র। তৎকালীন পাকিস্তান আমলে এপিপি (এসোশিয়েটস প্রেস অব পাকিস্তান) এর রংপুর জেলা প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৪৭ সালে বৃহত্তর রংপুরের সাংবাদিকদের একত্রিত করে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর জেলা সাংবাদিক সমিতি। তিনি ছিলেন ওই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। সাংবাদিকতা জীবনে স্মরণীয় ঘটনা বলতে গিয়ে কাব্যবিনোদ জানিয়েছিলেন, ১৯৫০ সালের প্রথম দিকে এক সকাল বেলা এক বৃদ্ধ এসে তার বাড়িতে কড়া নাড়েন। বৃদ্ধ বলেন, আমি পীরগঞ্জ থেকে এসেছি। আমার ছেলের ফাঁসির আসামি। রাজশাহী জেলে আজ তার ফাঁসি হবে। আপনি সাংবাদিক একটু তদবির করে ছেলের লাশ যেন তাড়াতাড়ি পাই সেই ব্যবস্থা করে দিবেন। বৃদ্ধের কাকুতি-মিনতি শুনে তিনি রংপুর জজ কোর্টে খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পান বৃদ্ধের ছেলে খোদা বকস রংপুর আদালতের ফাঁসি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। পেশকারকে ম্যানেজ করে মামলার নথিপত্র জোগাড় করেন এবং রাজশাহীতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন প্রয়োজনীয় কাগজ পত্রের অভাবে সেদিন খোদা বকসের ফাঁসি হয়নি। তিনি সংবাদটি সেদিনই টেলিগ্রামযোগে এপিপিতে পাঠিয়ে দেন। সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘খোদা বকসের লাশ কোথায়?’ পরদিন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধান প্রধান সবকটি জাতীয় পত্রিকায় প্রধান শিরোনাম হিসেবে সংবাদ ছাপা হয় ‘খোদা বকসের লাশ কোথায়’। সংবাদ প্রকাশের পর সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে।
এদিকে তৎকালীন মন্ত্রী গাইবান্ধার আবুল হোসেনের হস্তক্ষেপে মামলাটি উচ্চ আদালতের মাধ্যমে এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ অনুকম্পায় ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি খোদা বকস মুক্তি পায়। নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ ১৯৫২ সাল পর্যন্ত সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত ছিলেন। সংবাদ সংক্রান্ত একটি মিথ্যে মামলায় তার এক বছরের জেল হয়। তবে উচ্চ আদালতের মাধ্যমে কিছু দিন জেলে থাকার পর মুক্তি লাভ করেন। এর পরেই তিনি মনের দুঃখে সাংবাদিকতা থেকে নিজেকে দুরে সরিয়ে রাখেন। কাব্যবিনোদ প্রায়ই বলতেন তার বয়স যখন ৬/৭ বছর, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা সারা পৃথিবীতে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কিছু কিছু স্মৃতি তার মনে আছে। ১৯১৮ অথবা ১৯২০ সালে রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভয়াভহ ভূমিকম্প হয়েছিল। ভূমিকম্পের সেই স্মৃতিচারণ করতে তিনি প্রায়ই বলতেন, সে সময় রংপুরে ভূপ্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। চোখের সামনে অনেক স্থানের মাটি ফেটে পানি বের হতে দেখেছেন। পুকুরের পানি উপচে পড়েছিল ভূমিকম্পে। আবার অনেক পুকুর পানি শুকিয়ে সমভূমি হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়তো কাব্যবিনোদ টগবগে যুবক। যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব রংপুরে না পড়লেও আতঙ্ক ছিল সব সময়। এ বুঝি কিছু একটা হয়ে যাবে। সবার মাঝে ছিল এ ধরনের নানা দুঃশ্চিন্তা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মরণীয় ঘটনা সর্ম্পকে কাব্যবিনোদ বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে বিশ^স্ত সূত্রে জানতে পারলাম, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু রংপুর শহরের কোন এক অজ্ঞাত স্থানে আত্মগোপন করে অবস্থান করছেন। তার সঙ্গে দেখা করার জন্য বেশ কদিন চেষ্টা করেও দেখা করতে পারিনি। যৌবনের শুরুতেই কাব্যবিনোদ কাজী নজরুল ইসলামের সাহচার্য পেয়ে স্নেহধন্য হয়েছিলেন। একদিন জেদ চেপে গিয়েছিল কলকাতা গিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে দেখা করবেন। যে রকম ভাবা সেই রকম কাজ। কাব্যবিনোদ কলকাতায় এক মামার বাড়িতে গিয়ে উঠলেন। মামাকে সঙ্গে নিয়ে হাজির হলেন কাজী নজরুল ইসলামের অফিসে। সুদূর রংপুর থেকে এসেছেন তার সঙ্গে দেখা করতে শুনে কাব্যবিনোদকে বুকে জড়িয়ে ধরেন কাজী নজরুল। প্রাণভরে আর্শিবাদ দিলেন। বাড়ি ফেরার জন্য ১০টি টাকাও হাতে তুলে দেন সেই সময়। কবি জসিম উদ্দিনের সঙ্গে রয়েছে কাব্যবিনোদের সোনালী স্মৃতি। জসিম উদ্দিন যখন রংপুরের বদরগঞ্জে এসেছিলেন, সে সময় তিনি জসিম উদ্দিনের সফর সঙ্গী ছিলেন। দুরাত কাটিয়েছেন একান্ত নিভৃতে। শরৎ চন্দ্রসহ অনেক গুণীমানুষের সাহচার্য পেয়েছেন এ শতবর্ষী কবি।
এ অঞ্চলের মানুষের সৌভাগ্য যে এ মাটিতে জম্ম নিয়েছিলেন কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ। তার কাব্যে যেমন ফুটে উঠে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রাণান্তকর চেষ্টা, তেমনি শিশুদের প্রতি মমত্মবোধের প্রতিচ্ছবি। কবি সারাজীবন থেকেছেন বঞ্চিতদের সারিতে। সরকার তথা সমাজের উচ্চ শ্রেণীর কাছে হয়েছেন তিনি চরমভাবে উপেক্ষিত। এ অঞ্চলের মানুষ হওয়ার অপরাধে সরকার প্রদত্ত ভাতাও বন্ধ হয়ে গেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফখরুদ্দিন আহদের আমল থেকে। মহা জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কবি ভেবেছিলে এবার হয়ত সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় একটু সদয় হবেন। কিন্তু মহাজোট সরকারের চার বছরেও তার ভাগ্যে জুটেনি ভাতা। শতবর্ষ পার হলেও তার ভাগ্যে জোটেনি মাথা গোঁজার জন্য এক শতক জমি। মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় ছিল তার। কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ অতি আধুনিকতার যুগে ছন্দের ছন্দ মালা গেঁথে কাব্যকে শাসন করছে বলেই কি তার অপরাধ! বাংলার প্রাচীন ধারাকে কলমের ডগায় ধরে রেখেছেন বলেই কি তিনি তথাকথিত রাজধানী কবি জাতকের কাছে উপেক্ষিত। উগ্র আধুনিকতার ট্রেনের যাত্রী হতে পারেননি বলেই কি তার অপরাধ। রুবাইয়াত ফার্সী কবিদের রচনা স্টাইল থেকে বাংলাদেশে কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদই সর্ব প্রথম বাংলায় রুবাইয়াত প্রবর্তন করেছেন। অথচ উত্তরবঙ্গের কবি বলেই তাকে কোনঠাসা করে রাখা হয়েছে। তিনি কি রুবাইয়াতের ক্ষেত্রেও এ দেশের বরেণ্য কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেতে পারেন না? পেতে পারেন না একুশে পদক অথবা রাষ্ট্রীয় কোন মর্যাদা? আমার মনে হয় বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কি আদৌ জানেন বাংলা ভাষায় প্রথম রুবাইয়াত রচনা হয়েছে রংপুরের কবির কলম থেকে। তার রচিত ‘রুবাইয়াত-ই-নূর’ গ্রন্থে উঠে এসেছে, দেশপ্রেম ধার্মিকতা, তৌহিদী চেতনা, সমাজের হতাশা, প্রবঞ্চনা, শঠতা, মিথ্যা, ভাগ্যলিপিসহ অনেক কিছুই। তার পরে কেন এ কবির মূল্যায়ন হলো না। এ প্রশ্নের জবাব একদিন হয়তো পাওয়া যাবে। কিন্তু সেদিন আমরা কবিকে পাবো না। তিনি হয়তো তখন পরপারে পাড়ি জমাবেন। এদেশের অপসংস্কৃতি রোধে ১৯৮৭ সালে কবি প্রতিষ্ঠা করেন ছান্দসিক সাহিত্য সংস্কৃতি গোষ্ঠী। হাঁটি হাঁটি পা পা করে সংগঠনটি দুযুগ পার করেছে। সাপ্তাহিক আসরসহ বিভিন্ন দিবস ও বিশিষ্ট জনদের জম্ম-মৃত্যু বার্ষিকী পালন করেছে। এছাড়া গুণীজনদেরকে পদক বিতরণ করে আসছে।

কবি নূরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ এর ‍মৃত্যুতে উত্তরবাংলা পরিবার গভীর ভাবে শোকাহত।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful