Today: 24 Jun 2017 - 09:27:01 am

আজ ঐতিহাসিক রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস

Published on Tuesday, March 28, 2017 at 7:51 am

রিয়াদ আনোয়ার শুভ

১৯৭১ এর ৩ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ কিশোর শংকুর রক্তে রঞ্জিত হয় রংপুরের মাটি। তেমনি বাংলার মাটিতে প্রথম পাক সেনা হত্যার ঘটনাও রংপুরেই ঘটে। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা করেন ৭১’র ২৬ মার্চ আর পাকিস্তান সেনা বাহিনীর ট্যাংক ডিভিশনের পাঞ্জাবী ক্যাপ্টেন আব্বাসীসহ তিন জন জওয়ানকে হত্যার মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার যুদ্ধ আরম্ভ করে রংপুর জেলার সদর উপজেলার সাতগাড়া ইউনিয়নের দামোদরপুর সাধারণ, অনাহারী, জীর্ণশীর্ণ মানুষ। রচিত হয় ইতিহাস। দিনটি ছিল ২৪ মার্চ ১৯৭১। তাই ২৪ মার্চ শুধু রংপুর নয়, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন।

১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে রংপুরের ইতিহাসের এক অনন্য দিন। ১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই নিসবেতগঞ্জের বাঁশহাটির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “বাঁশহাটির বাঁশের লাঠি নিয়ে তৈরি থেকো। ছয় দফা নয়, এক দফা প্রতিষ্ঠার খবর পাবে।” সেই খবর তাঁরা পেয়েছিলেন ২৬ মার্চ । ২৮ মার্চ সাধারণ জনগণ তীর-ধনুক, বাঁশের লাঠি, দা, কুড়াল নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে আক্রমণ করে। সবার মুখে ছিল গগনবিদারী স্লোগান “এস ভাই অস্ত্র ধর, ক্যান্টনমেন্ট দখল কর।” অসম সেই লড়াইয়ে সেদিন পাক বাহিনীর ছোঁড়া মেশিন গানের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন আনুমানিক প্রায় দুই শতাধিক লোক। ২৮ মার্চের স্মরণে এবং সেই সব বীর শহীদদের সম্মান জানিয়ে রংপুর শহরের প্রবেশদ্বার হিসেবে খ্যাত মডার্ন মোড়ে শুধুমাত্র একটি স্মৃতিস্তম্ভ “অর্জন” নির্মাণ করা হয়েছে। এই দিনে কত জন শহীদ হয়েছেন সে সম্পর্কে কোন অনুসন্ধানই আজ পর্যন্ত শুরু হলো না, অথচ আমরা পার হয়ে এলাম ৪৩ টি বছর।

ঐতিহাসিক এই ঘেরাও আন্দোলনের অন্যতম প্রধান সংগঠক ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শেখ আমজাদ হোসেন। তাঁর মুখেই শোনা যাক বাঁশের লাঠি আর তীর-ধনুক নিয়ে পাক হায়েনাদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের সেই বীরত্ব গাথা :

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বাঁশের লাঠি আর তীর-ধনুক নিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের আবাসস্থল ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণের ঘটনা বোধকরি পৃথিবীর ইতিহাসে অবাক করে দেওয়ার মতোই একটি ঘটনা। আর এমনি এক ঘটনাই সেদিন ঘটিয়েছিলেন রংপুরের বীর জনতা। একাত্তরের ২৮ মার্চ রংপুরের বীর জনতার পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সেদিনের সেই ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ অভিযান যদি সফল হতো, তা হলে হয়তো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আজ অন্যভাবে লেখা হতো। মুক্তিযুদ্ধে রংপুরের মানুষের সেই বীরত্ব গাথা কাহিনী দেশ ছেড়ে বহির্বিশ্বের মানুষেরও রোম শিউরে ওঠার মতো বিষয়।

একাত্তরের ২৫ মার্চের ভয়াল রাতের কথা স্মরণ হলে এখনো গায়ের লোম শিউরে ওঠে। রাত ১০টায় ক্যান্টনমেন্ট থেকে শুরু হলো গোলাগুলি। স্টেশনের বাবুপাড়া থেকে শুরু করে সারা শহরেই গুলি। গোলাগুলির শব্দে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত। বাতাসে বারুদের গন্ধ। কামানের মুখ থেকে বের হওয়া আগুনের ফুলকিতে আকাশ লাল। ভয়াল গ্রাসে সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। বিশেষ করে ক্যান্টনমেন্ট সংলগ্ন ভগী, ধাপ, রামপুরা, পার্বতীপুর, বখতিয়ারপুর, নিসবেতগঞ্জ, পীরজাবাদের বাড়িঘর ফাঁকা হয়ে গেল। জীবনের ভয়ে সাধারণ মানুষ নদীর ধারে ও ক্ষেত-খামারে আশ্রয় নিলেন। আমার বাড়িতেও কেউ ছিলেন না। আমি একা সাহসে ভর করে বাড়িঘর পাহারা দিলাম। প্রভাতে বেশ কিছু অঞ্চল থেকে হতাহতের খবর পাওয়া গেল।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মাত্র কয়েক দিনের মাথায় ২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ে আমি ছিলাম নেতৃত্ব পর্যায়ে। গোপন বার্তা আসলো ২৮ মার্চ রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে হবে। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে পশ্চিমারা নেই, বাইরে গেছে; কিন্তু ট্রেনিংয়ের নামে তারা বাঙালিদের খতম করার ষড়যন্ত্র করছে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করে সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে হবে এবং অস্ত্র কেড়ে নিতে হবে। ক্যান্টনমেন্টে বাঙালি সৈন্যরা অস্ত্র সারেন্ডার করে জনতার কাতারে শামিল হবে। সূচনা হবে মুক্তিযুদ্ধের।

রানিপুকুরের কাছে বলদিপুকুর আদিবাসী সাঁওতালদের গ্রাম। বলদিপুকুরের আব্দুল গণি(বর্তমানে রংপুরের সিনিয়র আইনজীবী এ্যাডঃ আব্দুল গনি) সাঁওতাল নেতাদের ঘেরাও সম্পর্কে আলোচনা করে তীর-ধনুক নিয়ে আসার ব্যবস্থা করলেন।

২৮ মার্চ সকালে আমি আর ইয়াসিন আলী নিসবেতগঞ্জ ঘাঘট ব্রিজের তেমাথায় দাঁড়ালাম। লোকজন আসবে কি আসবে না এ রকম একটা সন্দেহে আমার মনে উদ্রেক হয়েছিল। একটি অজানা আশঙ্কায় বুকের ভেতরটা দুর দুর করে কাঁপছিল। দেখতে দেখতে ১০টা বেজে গেল। রাস্তায় লোকজন দেখা যাচ্ছে। তারপর অভাবনীয় ঘটনা ঘটে গেল। পশ্চিম থেকে হাজার হাজার মানুষ মিছিল করে আসছেন। সবার হাতে বাঁশের লাঠি, ছোরা, বল্লম, কুড়াল, দুই-চারটা তীর-ধনুকও দেখা গেল।

সবার মুখে গগনবিদারী স্লোগান ‘এস ভাই অস্ত্র ধর, ক্যান্টনমেন্ট দখল কর। 'মিছিলের সম্মুখে কমরেড ছয়ের উদ্দিন। তার পরই এল মজিবর মাস্টারের নেতৃত্বে এক বিরাট মিছিল। ভুরাঘাট, বড়বাড়ী হয়ে লোকজন আসা শুরু হলো। খবর পেলাম, বলদিপুকুর থেকে আব্দুল গণির নেতৃত্বে সাঁওতাল বাহিনী তীর-ধনুক নিয়ে রওনা হয়েছে। রানিপুকুরের রূপসী বালারহাট, গোপালপুর সব জায়গা থেকেই লোকজন ছুটে আসছেন। পাগলাপীরের লোকজন লাহিড়ীর হাট হয়ে আসছেন। তাঁদের সঙ্গে যোগ হয়েছে বলরাম ও আব্দুল কুদ্দুসের বাহিনী। এ ছাড়া ঐতিহাসিক ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও অভিযানে তৎকালীন ছাত্রনেতা অলোক সরকার, রফিকুল ইসলাম গোলাপ, আবুল মনসুর আহমেদ সর্বাত্মক জড়িত ছিলেন।

ক্যান্টনমেন্টের পেছনে এখন যেখানে ‘রক্তগৌরব’ দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে সবাই সমবেত হলেন। লোকে লোকারণ্য। আমাদের হাতে বাঁশের লাঠি আর হানাদারদের হাতে আধুনিক অস্ত্র। সবাই লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে ক্যান্টনমেন্টের দিকে এগিয়ে চলল। ঐতিহাসিক বালারখাইল পার হয়ে ক্যান্টনমেন্ট মার্কেটের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই শুরু হয়ে গেল মেশিনগানের গুলি। আমার সামনেই দুই-তিনজন গুলিবিদ্ধ হলেন। তখন জনতার ছত্রভঙ্গ হওয়া শুরু হলো। আমি আর মজিবর মাস্টার ঘাঘট নদী পার হয়ে হিন্দু পাড়ায় ঢুকে গেলাম। হিন্দু পাড়ার লোকজন তখন বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন। মজিবর মাস্টারসহ আমি পশ্চিমে এগিয়ে গেলাম। ক্যান্টনমেন্ট দখলের আশা ভঙ্গ হওয়ায় আমার মানসিক অবস্থা ভীতবিহ্বল হওয়ার মতো।

পরে শুনলাম, ঘেরাও অভিযানে অনেক লোক হতাহত হয়েছেন। সুগার মিলের চিকিৎসাকেন্দ্রে অনেক আহত লোকের চিকিৎসা হচ্ছে। তাঁদের কাছে শুনলাম, ফেরার পথে নদীর পাড়ে তাঁরা অনেক লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। আমার তখন নেছার উদ্দিনের গোপন মিটিংয়ের কথা মনে হলো। ওই মিটিংয়ের খবর ওখানকার পাকিস্তানিদের সহায়তাকারী ক্যান্টনমেন্টের গোয়েন্দা বিভাগে পৌঁছে দিয়েছিল। ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য সমবেত হয়েছিল ৬০ থেকে ৭০ হাজার লোক। সবাই কৃষক, মজুর, মধ্যবিত্ত ও ছাত্র-যুবক। আমার বিশ্বাস, যদি এই ঘেরাও অভিযানের খবর ক্যান্টনমেন্টের গোয়েন্দারা না জানতে পারত, তাহলে নিশ্চয় আমরা ক্যান্টনমেন্ট দখল করে বাংলাদেশের পতাকা উড়াতে পারতাম।

পাকিস্তানপন্থীরা কেউ কেউ বলে, ওটা ছিল আমাদের হঠকারী সিদ্ধান্ত; কিন্তু আমার বিশ্বাস, জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা কখনো বিফল হয় না। ঘেরাওয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছিলেন প্রায় দুই শতাধিক লোক।

১৯৬৯ সালের ১৩ জুলাই নিসবেতগঞ্জের বাঁশহাটির বক্তব্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন,‘বাঁশহাটির বাঁশের লাঠি নিয়ে তৈরি থেকো। ছয় দফা নয়, এক দফা প্রতিষ্ঠার খবর পাবে।’ সেই খবর হয়েছিল ২৬ মার্চ। জনতার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক দফা কায়েম হয়েছিল। শত-সহস্র মানুষের বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়ে বাংলাদেশের পতাকা উড়েছিল। জন্ম নিয়েছিল স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ।

মতামত