Templates by BIGtheme NET
আজ- বুধবার, ২৫ নভেম্বর, ২০২০ :: ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ :: সময়- ২ : ৪৯ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / দুই যুগের দুই মীর কাসেম: পরিণতিও কি প্রায় অভিন্ন?

দুই যুগের দুই মীর কাসেম: পরিণতিও কি প্রায় অভিন্ন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

Prof abdul gaffar বাংলার ইতিহাসে অতীতে এবং বর্তমানে দুই মীর কাসেমের আবির্ভাব দেখা যায়। দু’জনেই বিশ্বাসঘাতক এবং দু’জনের পরিণতিই প্রায় অভিন্ন। একজনের মৃতদেহ দিল্লির রাস্তায় অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির লাশ হিসেবে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আরেকজনকে শনিবার রাতে ঢাকার অনতিদূরের এক কারাগারে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। দুই মীর কাসেমের চরিত্রে একটু ভিন্নতা ছিল। অতীতের মীর কাসেম বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, কিন্তু দেশদ্রোহী ছিলেন না। ক্ষমতালোভ তাকে বিশ্বাসঘাতকে পরিণত করেছিল। তিনি তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করে গেছেন। বর্তমানের মীর কাসেম শুধু বিশ্বাসঘাতক নন, দেশদ্রোহী এবং ঘাতক চরিত্রের ছিলেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আদালতের বিচারে তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছে।

দুশ’ বছর আগের নবাবী বাংলায় মীর কাসেম ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার একজন বিশ্বস্ত সেনাপতি। অন্যদিকে তিনি ছিলেন সিপাহশালার বা প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের জামাতা। শ্বশুর মীর জাফর যখন ইংরেজ ক্লাইভের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র করেন, তখন মীর কাসেম তাতে জড়িয়ে পড়েন। শ্বশুর-জামাইয়ের চক্রান্তে সিরাজ পলাশীর যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুর্শিদাবাদের অদূরে ভগবানগোলায় গিয়ে সপরিবারে আশ্রয় নেন। মীর কাসেম সসৈন্যে সেখানে গিয়ে তাকে ধরে আনেন এবং অন্ধকার কারাকক্ষে সিরাজকে হত্যা করা হয়।

এই ইতিহাস সবারই জানা। তবু এ যুগের যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া প্রসঙ্গে পুরনো নজির আবার টানছি। নবাব সিরাজকে হত্যার পর ইংরেজদের হাতের পুতুল হিসেবে মীর জাফর হন নবাব এবং মীর কাসেম হন প্রধান সেনাপতি। কিছুদিন পর মীর জাফরকে বরখাস্ত করে ক্লাইভ মীর কাসেমকে নবাব পদে বসান। নবাব পদে বসে মীর কাসেম বুঝতে পারেন, তার কোনো ক্ষমতা নেই। সিরাজের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তিনি বাংলার স্বাধীনতা বিকিয়ে দিয়েছেন। তিনি সিদ্ধান্ত নেন এর প্রতিকার করবেন।

মীর জাফরের ষড়যন্ত্রের যারা সঙ্গি ছিলেন, সেই জগৎ শেঠ, রায় চাঁদ, ইয়ার লতিফকে তিনি একদিন গঙ্গা নদীতে নৌবিহারে আমন্ত্রণ জানান এবং নৌকাডুবি ঘটিয়ে সবাইকে হত্যা করেন। অতঃপর ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। কিন্তু বক্সারের যুদ্ধে তিনি ইংরেজদের কাছে পরাজিত হন এবং আত্মগোপন করেন। বহুকাল তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সবাই ধরে নিয়েছিল হয় তিনি যুদ্ধে নিহত হয়েছেন অথবা নিখোঁজ হয়ে গেছেন। বহুকাল পর দিল্লির রাজপথে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। এই লাশ মীর কাসেমের বলে কেউ কেউ শনাক্ত করেন। তখনও দিল্লিতে দুর্বল অবস্থান সত্ত্বেও মোগল সম্রাট ক্ষমতায় টিকে ছিলেন।

এ যুগের মীর কাসেম জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা ছিলেন। একাত্তরে ছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যার সঙ্গী, একজন দেশদ্রোহী, ঘাতক এবং বিশ্বাসঘাতক। অতীতের মীর কাসেমের মনে দেশপ্রেম ছিল এবং পলাশীর যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা এবং সিরাজ হত্যার জন্য তার অনুতাপ হয়েছিল। বর্তমানের মীর কাসেমের মনে কিছুমাত্র দেশপ্রেম ছিল না এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা, গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী হত্যা, নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনে অংশগ্রহণ ইত্যাদি কোনো অপরাধের জন্যই তার মনে কোনো অনুতাপ জন্মেনি, কখনও অনুতাপ প্রকাশ করেননি। বরং বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও এই স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সাফল্যগুলো ধ্বংস করার জন্য নতুন নতুন চক্রান্তে জড়িত হন।

জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী শীর্ষ নেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচাইতে ধনশালী। এ ধনের উৎস মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল রাজা-বাদশাদের পেট্রোডলার বলে গুজব রটে। এই অভিযোগও ওঠে, জামায়াতের সব ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের রাজনীতির তিনিই ছিলেন অর্থের প্রধান জোগানদাতা। এই উদ্দেশ্যেই তিনি ব্যাংক, ইনসিওরেন্স কোম্পানি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানেও এগিয়ে গিয়েছিলেন। খবর প্রকাশিত হয় তিনি ২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ে শক্তিশালী আন্তর্জাতিক লবি তৈরি করেছিলেন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকানো এবং এই বিচার ও দণ্ডদানের বিরুদ্ধে অসত্য প্রচারণা দ্বারা বিশ্বজনমত বিভ্রান্ত ও প্রভাবিত করার জন্য। এ কাজে ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক বিগ মিডিয়া এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ও পার্লামেন্টারিয়ানদের পর্যন্ত তিনি কিনে ফেলেছিলেন।

বাংলাদেশের ভেতরেও তিনি সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী ও আইনজীবীদের একাংশের মধ্যে অর্থবৃষ্টি দ্বারা একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বৈধতা ও স্বচ্ছতা সম্পর্কে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য একটি শক্তিশালী চক্র সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন। গুজবটা কতটা সঠিক জানি না, তবে বাংলাদেশে এটা অনেকের মুখে মুখে ‘চাউর’ হয়ে গেছে যে, মীর কাসেম দেশের এক বিখ্যাত আইনজীবীর আপাতদৃষ্টিতে ‘প্রগতিশীল’ জামাতাকে মাসিক মোটা অর্থের বিনিময়ে দেশে এবং বিদেশে তার প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জনমত তৈরি করে এই বিচার বানচাল করার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। জামাতাও কথা দিয়েছিলেন তিনি তা পারবেন। তিনি চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে মীর কাসেমের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে এই জামাতার বর্তমান সম্পর্ক নাকি তেমন ভালো নয়।

মানিকগঞ্জের গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে মীর কাসেমের সমাধি হোক তাও স্থানীয় জনগণ চায়নি। তারা এ ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়েছে। মীর কাসেমের জানাজায় তার পরিবারের মুষ্টিমেয় লোক ছাড়া আর কেউ আসেনি। আরেক যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় তবু পাকিস্তানের সঙ্গে তুরস্ক তার প্রতিবাদ জানিয়েছিল। মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় সেই তুরস্কও প্রতিবাদ জানানো থেকে সরে গেছে। ঢাকায় নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, ‘এটা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমাদের কিছু বলার নেই।’

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল যখন নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়, তখন সারা বিশ্বে যেমন তাদের জন্য কেউ এক ফোঁটা অশ্র“ বিসর্জন করেনি, তেমনি বাংলাদেশে একাত্তরের শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের প্রাণদণ্ড হওয়ায় কেউ অশ্র“পাত করছে না। একমাত্র দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশে একাত্তরের বর্বর গণহত্যার জন্য দায়ী পাকিস্তান। তাদের দুঃখ প্রকাশের কারণ আছে। একাত্তরে বাংলাদেশে তাদের এই গণহত্যায় সহযোগী ছিল এই জামায়াতি কোলাবরেটরেরা।

বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড হওয়ার পর পাকিস্তানের বর্তমান আচরণই প্রমাণ করে এই বাংলাদেশী জামায়াতিরা পাকিস্তানের বর্বরতার সহায়ক শক্তি ছিল। একথা পাকিস্তানের একটি উর্দু পত্রিকা ‘দৈনিক পাকিস্তান’ হয়তো নিজেদের অজান্তে এই বলে স্বীকার করে ফেলেছে, ‘পাকিস্তানের মিত্র হিসেবে এবং একাত্তরে পাকিস্তানকে সহায়তা দানের জন্যই বাংলাদেশে জামায়াতি নেতাদের বিচার ও দণ্ড দেয়া হচ্ছে।’ সত্যের ঢাক আপনিই বাজে।

বাংলাদেশে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ব্যাপারে প্রতিবাদ জানিয়ে পাকিস্তান সরকার শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারেই নাক গলায়নি; এই বিচার ও দণ্ডদান সম্পর্কে একটি জঘন্য মিথ্যা প্রচারও করেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘একাত্তরের যুদ্ধের পর ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যে চুক্তি হয় সেই চুক্তি অনুসারে যুদ্ধাপরাধে কারও বিচার হবে না বলা হয়েছিল।’ এটি একটি ডাহা মিথ্যা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর সিমলায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে শীর্ষ বৈঠক হয়, তাতে যুদ্ধবন্দিদের বিচার না করে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল। যুদ্ধবন্দি (Prisoner of war) এবং যুদ্ধাপরাধী (war criminals) এই দুটি কথার মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য আছে।

একাত্তর সালে বাংলাদেশে যুদ্ধবন্দি ছিল পাকিস্তানের ৯০ হাজারের বেশি সৈন্য। সিমলা চুক্তিতে তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। বিনিময়ে পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশের নাগরিক ও ৪০ হাজার সৈন্যকে দেশে ফেরত পাঠানে হবে এই শর্ত ছিল। বাংলাদেশে বাংলাদেশী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা হবে না এমন চুক্তি বাংলাদেশ করেনি। তাছাড়া সিমলা চুক্তি হয়েছিল ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে। সিমলা সম্মেলনে বাংলাদেশের যথার্থ কোনো প্রতিনিধিত্ব ছিল না। তবু উপমহাদেশের বৃহত্তর শান্তির স্বার্থে বাংলাদেশ এই চুক্তির মমার্থ মেনে নিয়েছিল। কিন্তু নৈতিকতার বিচার-বিবেচনায় এই চুক্তি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা বাংলাদেশের উপর বর্তায় কি? তাছাড়া এই চুক্তিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না এমন কথা পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কোথায় পেলেন?

এ যুগের কাসেমও তার কৃতকর্মের জন্য যথার্থ শাস্তি পেয়েছেন। তাতে মানবতা কলংকমুক্ত হল। এই দণ্ডদানের বিরুদ্ধে জামায়াত বাংলাদেশে হরতাল ডেকেছিল। সেই হরতালে কেউ যোগ দেয়নি। তাতে জামায়াতের লজ্জা নেই। যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সময় তারা হরতাল ডাকে এবং লোক হাসায়। টিকটিকি মারা গেলেও তার লেজ লাফায়, এই প্রবাদটি বাংলাদেশে জামায়াত সত্য প্রমাণ করেছে।

সর্বোচ্চ আদালতে মীর কাসেমের মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল থাকার রায় ঘোষিত হওয়ার পর লন্ডনেও জামায়াতিরা আলতাফ আলী পার্কে একটি প্রতিবাদ সমাবেশ করার চেষ্টা করেছিল। তাতে মানুষ জমতো না, যদি যুক্তরাজ্য বিএনপির নেতাকর্মীরা এতে সামিল না হতেন। বিএনপি মুখে বলছে, তারা জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে নেই। কিন্তু তাদের কাজে ও কর্মে ধরা পড়ে তারা এখনও জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের আত্মীয়।

হাসিনা সরকারের একটা বড় কৃতিত্ব, তারা শুধু জাতির জনকের হত্যাকারীদের নয়, বাংলাদেশের ঘাতক দালাল চক্র এবং ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডদানের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘকালের কলংকমুক্ত হল। আর কোনো কারণে না হোক, ’৭১-এর বর্বর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদানের জন্য শেখ হাসিনা ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

লন্ডন, ৪ সেপ্টেম্বর, রবিবার ২০১৬

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful