Templates by BIGtheme NET
আজ- বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর, ২০২০ :: ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ :: সময়- ৮ : ০২ অপরাহ্ন
Home / খোলা কলাম / যত বড় পাঁঠা তত বড় আসন!

যত বড় পাঁঠা তত বড় আসন!

চিররঞ্জন সরকার

chiroronjonআমাদের সমাজের মূল্যবোধগুলো খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখনকার চালু অ্যাটিচুড-ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রাফ অ্যান্ড টাফ’, আর বাংলায় ‘যত বড় পাঁঠা তত বড় আসন’। সুবোধ, শান্ত অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জেনারেশন এখন সমাজ থেকে উধাও।

এখন ঘাড়ত্যাড়া, টেটিয়া, একরোখা, রাগি মানুষরা সমাজে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের প্রধান আদর্শ ও লক্ষ্য হচ্ছে, ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’। অন্য কারো জন্য নয়, নিজেদের বৈষয়িক স্বার্থসিদ্ধির জন্য লড়ো এবং প্রয়োজনে মরো।

ব্রিটিশের আমলে কথাটি ছিল ডিভাইড অ্যান্ড রুল। আর এখন হয়েছে ভাগ কর, দখল কর, যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা ধরে রাখ। গায়ের জোরে শাসন কর। একটা বেপরোয়া ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ সবখানে। গো টা পৃথিবী কাঁসার বাসনের মতো ঝনঝন করে বাজছে। চামার-কামার, সুশীল, মন্ত্রী, জঙ্গি-সবাই ষণ্ডা-গুণ্ডার মত আচরণ করছে।

মিনিমাম টলারেন্সি নেই। কেবল হুমকি-ধমকি, অশ্লীল গালাগাল। এরা বীর। এদের থিম হলো, মারো শালা। সপাটে মারো, স-ডাঁটে মারো। ঘ্যাঁক কামড়ে দেওয়াই এখন স্মার্টনেসের ঝলমল পতাকা। মানুষও এখন অভদ্রতার তুমুল ফ্যান।

আর দেশে দেশে ‘অবতারের’ মত দেখা দিয়েছে ডাকসাইটে সব ‘নেতা’। ব্রেক নেই, বেল নেই, নিয়মনীতি-শিষ্টাচারের বালাই নেই। আছে শুধু হুঙ্কার, ক্ষেপিয়ে দেয়া, চটিয়ে দেয়ার কৌশল। ভারতে মোদী, ইজরায়েলে নেতানিয়াহু, তুরস্কে এরদোয়ান, পোল্যান্ডে দুদা, ফিলিপিন্সে রদরিগো দুতের্তে, রাশিয়ায় পুতিন-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পৃথিবী জুড়ে এত জন কট্টর ‘জাতীয়তাবাদী’ ‘অবতার’কে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির তখতে বসে থাকতে বোধ হয় আমরা আগে দেখিনি।

অবশ্য পরিস্থিতির চাপে যেখানে আঙ সান সু চি রোহিঙ্গাদের বার্মিজ বলে মেনে নিতে অস্বীকার করছেন বা অ্যাঞ্জেলা মার্কেল জার্মানি তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সিরিয়ান শরণার্থীদের নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তুরস্ককে কোটি কোটি ইউরো দান করছেন, সেখানে মেনে নেওয়া ভালো যে আলো ক্রমে নিভে আসছে। নভেম্বরে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন রাষ্ট্রপতি হলেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়!

এই ‘অবতার’রা যে জাতীয়তাবাদের কথা শোনান তা দেশবাসীকে নয়, দেশকে ভালো রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। দেশ নামক বিমূর্ত ধারণাটিকে দেশবাসীর মাথায় গেঁথে দেওয়ার জন্য এমন দিনের গল্প শোনায় যেখানে ইতিহাস, পুরাণ আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। তারা ধর্মকে বর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন। অতি-জাতীয়তাবাদের একটি প্যাটার্ন বুনে দিয়ে তারা সমস্যাকে ধর্মের প্রিজমে দেখতে চান।

প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে রাশিয়ার সেনাবাহিনী সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের রাজনৈতিক বিরোধীদের ধ্বংস করার কাজে সহায়তা করছে। কিন্তু পুতিন ঠিক কত জন শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছেন নিজের দেশে? ক্রিমিয়ার দখল পেতে ইউক্রেনের উপর আগ্রাসন তিনি চালিয়েছেন, তারপরও সমীক্ষা বলছে, রাশিয়ার প্রায় শতকরা ৭০ ভাগ মানুষ পুতিনের আগ্রাসনকে সমর্থন করেছেন।

শুধু পুতিনের রাশিয়া বা পোল্যান্ড বা তুরস্ক নয়, গোটা ইউরোপ জুড়েই অতি রক্ষণশীল, উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলগুলি মানুষের সমর্থন পাচ্ছে-ফ্রান্স, হল্যান্ড কি স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশগুলিতে দশ থেকে বিশ শতাংশ ভোট এই উগ্রবাদীদের দখলে। সিরিয়া এবং আফ্রিকার শরণার্থী সমস্যা অবশ্যই ইউরোপের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে-মার্কেলের মতো তুলনায় উদারপন্থী নেতাদের ওপরে আর ভরসা রাখতে পারছেন না তাঁরা। সব খানেই উগ্র জাতীয়তাবাদের এত বাড়বাড়ন্ত।

এর সঙ্গে অবশ্য অর্থনৈতিক টানাপড়েন আছে। তুরস্কের কথাই ধরা যাক। এক জন তুর্কি দেখছেন বুলগেরিয়া, এস্তোনিয়া কি মাল্টার মতো দেশও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাচ্ছে স্রেফ ধর্ম ও বর্ণ পরিচয়ে। এক জন পোলিশ দেখছেন একমাত্র ইউরোপীয় দেশ হিসাবে মন্দার বাজারে সাফল্যের মুখ দেখলেও লভ্যাংশের সিংহভাগটা সেই চলে যাচ্ছে ইউরোপীয় সুপারপাওয়ারদের কাছেই। সার্বিয়ার মানুষরা দেখছেন শুধু রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় থাকার জন্য যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের দেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নে ঢুকতে পারছে না।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা হোক বা আইএমএফ, জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সাধারণ মানুষের কাছে এই সংস্থাগুলি যে প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছিল, তার অধিকাংশই পূর্ণ হয়নি। এমনকী উন্নত দেশগুলিতেও আর্থিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার যে খনিশ্রমিকরা ডোনাল্ড ট্রাম্পকে জেতাবেন বলে পণ করেছেন, তাঁদেরকেও কিন্তু ধোঁকার টাটি কম দেখানো হয়নি।

বিশ্বায়নের দৌলতে উন্নয়নশীল দেশগুলির মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত সমাজ অনেক কিছু পেয়েছে, ঠিকই। কিন্তু সেই এক কুমিরছানাকে বার বার দেখিয়ে উন্নত দেশগুলি তার ফায়দা তুলেছে হাজার গুণ। স্বভাবতই যে মানুষগুলির ভাগ্যে কিছুই জোটেনি, তাঁরা নিজেদের প্রাথমিক পরিচয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন। উগ্র জাতীয়তাবাদের শুরুর কথাও সেখানেই লুকিয়ে।

উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বাড়বাড়ন্তের পিছনে সাধারণ মানুষের আশাভঙ্গের এই আখ্যানটির গুরুত্ব কম নয়। তবে উগ্র জাতীয়তাবাদকে ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি আবার জাতীয়তাবাদের সঙ্গে জাতিক্রোধ মিশেল দিয়েছেন।

একজন সাধারণ ধনী ব্যক্তি থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হয়ে ওঠা ডোনাল্ড ট্রাম্প ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে যে অসংখ্য গবেষণার বিষয় হবেন, তাতে মার্কিন সমাজ-অর্থনীতির সংকট এবং বিশ্বায়িত অর্থনীতি ও রাজনীতির বিচিত্র আখ্যানের সঙ্গে আর একটি বিষয়ও থাকবে-সেটা হলো ক্রোধের স্থূল প্রকাশে জনমানসের আকর্ষণ। নাট্যরঙ্গ, বিদ্রূপ-আক্রমণের মাধ্যমে নিজেদের ক্ষোভকে দৃষ্টি-আকর্ষক করে তোলার নাছোড় বাসনা।

যে বিরাটসংখ্যক মার্কিন নাগরিক সম্প্রতি ক্ষমতাভোগী রাজনৈতিক নেতৃশ্রেণি থেকে মুখ ফিরিয়ে তথাকথিত ‘সাধারণ, অ-রাজনৈতিক’ প্রার্থী ট্রাম্পের দিকে আকৃষ্ট হয়েছেন, তাঁদের বিচারে হিলারি ওই রাজনৈতিক শ্রেণির যোগ্যতম প্রতিভূ। তিনি বিত্তবান, ‘সুবিধাভোগী’ এলিট, অস্বচ্ছতার অভিযোগে অভিযুক্ত, তাঁর মধ্যে আন্তরিকতা, বাস্তববোধ ও সততার অভাব।

এক দিকে স্ত্রী হিসাবে প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের নৈতিক স্খলন, অন্য দিকে প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ব্যর্থতা, দুই দায়ই তাঁকে বহন করতে হচ্ছে। কিন্তু নকল-গণবিচার প্রযোজনায় কেবল হিলারির রাজনৈতিক বিরোধিতা ছিল না, ছিল স্থূল হিংসা ও উন্মাদনার প্রতি অসীম অনুরাগ।

ট্রাম্পের ট্রাম্প-কার্ডটির সন্ধান এই স্থূল-ক্রোধ সংস্কৃতিতেই। প্রচারমাধ্যম দ্বারা তিনি যে বিপুল উপকৃত হয়েছেন, তাও এই সংস্কৃতির সৌজন্যে। প্রশ্ন এই যে, এত দিনের আত্মগর্বী লিবারাল গণতন্ত্রের পরিসরে এমন এক জাতিবিদ্বেষী, বিভেদ-হুঙ্কারী নায়কটির জন্মদাতা এই পু়্ঞ্জীভূত বিপুলাকার ক্রোধ এল কোত্থেকে?

গত এক দশকের আর্থ-সামাজিক সংকটের মধ্যে তার সূত্র। সেই সূত্রে বিশ্বজোড়া মন্দার পাশেই স্থান করবে সে দেশের ওয়াল স্ট্রিট-তন্ত্রের বিপর্যয়। বৃহৎ পুঁজির সঙ্কোচনের দাম ক্রমে প্রাত্যহিক জীবনকে দিতে হয়েছে। নীল-কলার শ্রমিকের প্রকৃত আয় কমেছে, চাকরির সুযোগ ও ক্ষেত্র সঙ্কুচিত হয়েছে।

সামরিক অভিযানের জন্য রাজস্বের উপর প্রবল চাপ পড়েছে। সামাজিক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম ও বাজেট ছোট হয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত করদাতারা দিনের হিসেব মেটাতে না পেরে খাবি খাচ্ছেন। ট্রাম্পের সমর্থকরা তাই প্রধানত দরিদ্র শ্বেতাঙ্গ পুরুষ। ২৮ শতাংশ নারীর পাশে ৪৭ শতাংশ পুরুষ, এবং ৫০,০০০ ডলারের নীচে রোজগার এমন নাগরিকদের ৫০ শতাংশ ট্রাম্পের পক্ষে আছেন।

অর্থনৈতিক সংকট যে কত দ্রুত সামাজিক ও রাজনৈতিক রক্ষণশীলতায় পরিণত হয়, সম্প্রতি ব্রিটেন প্রমাণ করেছে। অভিবাসী সমাজের বিরুদ্ধে খেপে উঠলেই যেন সব সংকটের সহজ চটজলদি সমাধান মিলতে পারে। ট্রাম্পের অভিবাসী-বিরোধিতার প্রবল উদ্গার তাই দেশজোড়া জনপ্রিয়তা কুড়োতে সফল।

অর্থাৎ আমেরিকার ট্রাম্প-অভ্যুত্থান ব্রিটেনের ব্রেক্সিট আন্দোলনেরই নামান্তর। ইতিমধ্যে একের পর এক সন্ত্রাসের ঘটনায় কখনও ইসলামি জঙ্গি, কখনও ক্রুদ্ধ কৃষ্ণাঙ্গ বন্দুকবাজদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত ক্রোধাগ্নিতে ইন্ধন পড়ছে। বহুবিভক্ত রিপাবলিকানরা কিন্তু একটি বিষয়ে সঙ্ঘবদ্ধ: বন্দুকের অধিকার। এটা মোটেই কল্পনা নয় যে সে দিন ক্লিভল্যান্ডে প্রধান ভূমিকায় ছিলেন বন্দুক-লবি’র ধারক-বাহকরা। পেছনের দিকের একটি বন্ধ বন্দুকঘরের দিকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়োচ্ছেন তাঁরা: সেই দৌড়ে গতি যোগাচ্ছেন অধিনায়ক ট্রাম্প।

আর বিশ্ববাসী সেই উন্মত্ত দৌড় হা-করে চেয়ে দেখছেন আর হাততালি দিয়ে উৎসাহ দিচ্ছেন। কারণ? এখন অশিষ্টতা উদ্‌যাপনের যুগ। অশ্লীল আত্মবিজ্ঞাপনকে এখন বলে মার্কেটিং, অন্যকে অনর্গল অপমান করার প্রবণতাকে বলে সপ্রতিভতা, হিংসা ও আঘাত করবার অভ্যাসকে বলে আগ্রাসন।

কেবল রাজনীতি নয়, ক্রীড়া নয়, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই, সকল নম্রতা নিয়ম রীতি নীতি ভুলে, আদিম দখল-মানসিকতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া এখন নীতি। অন্য দিকে ভালোমানুষও দেখছে, তার হাত থেকে অ-ভালোরা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে চাকরি সম্মান প্রেম যৌনতা পিজা, লজেন্স।

নিজেকে তার নিয়ত বিপন্ন মনে হতে থাকে, এক সময় আত্মসন্দেহ, এমনকী আত্মঘৃণার দিকেও সে ঢলে পড়ে। নীতি-নৈতিকতাহীন জয়ীদের অট্টহাসি তার মর্মে এসে আছড়ায় ও বস্তুগত ব্যর্থতার দায় তার ঘাড়ে ভূতের মত চেপে বসে। ফলে ‘পাঁঠা’দের প্রতি সেও নমনীয় হয়ে উঠে। ফলে পাঁঠারা আরও বড় আসনে অধিষ্ঠিত হয়!

চিররঞ্জন সরকার : লেখক, কলামিস্ট।
chiroranjan@gmail.com

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful