Templates by BIGtheme NET
আজ- রবিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২০ :: ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ :: সময়- ৭ : ০৯ পুর্বাহ্ন
Home / খোলা কলাম / ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’

‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

Prof abdul gaffarকুড়িগ্রামের কবরে এখন সৈয়দ শামসুল হক শায়িত। প্রায় একই সময়ে তিনজন সাহিত্যিক বন্ধুকে হারালাম। লন্ডনে মারা গেছেন ডা. মাসুদ আহমদ, একজন প্রথিতযশা নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক। নিউইয়র্কে মারা গেছেন শহীদ কাদরী। পঞ্চাশের দশকের একজন শক্তিশালী কবি। আর ঢাকায় মারা গেলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। সৈয়দ হক আমার সমবয়সী ছিলেন। বাকি দু’জন একটু কম বয়সের।

আমার বয়সও আশি-ঊর্ধ্ব। একজন কবির ভাষায়, ‘তৈরি করে রেখেছি ভাই মনটা/বিদায় নেব বাজলে ছুটির ঘণ্টা।’ আমার ছুটির ঘণ্টা কখন বাজবে জানি না। কিন্তু পরপর এই তিন বন্ধুর মৃত্যু আমাকে বিচলিত করেছে। খুব শিগগিরই হয়তো আমারও ছুটির ঘণ্টা বাজবে সে কথা ভেবে বিচলিত হইনি। আমাকে বিচলিত করেছে একসঙ্গে তিন বন্ধু বিয়োগের শোক। অন্যদিকে একটি চিন্তা। চিন্তাটি হল, আমাদের মুক্তমননের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যেসব ব্যক্তিত্ব চলে যাচ্ছেন, তাদের শূন্যস্থান আর পূর্ণ হচ্ছে না। ফলে একটা বন্ধ্যত্ব না দেখা দেয় আমাদের সমাজ-মানসে। যদি দেখা দেয়, তাহলে এই শূন্যস্থান পূর্ণ করবে পশ্চাৎমুখী চিন্তা এবং উগ্র ধর্মান্ধতা।

লন্ডনে গত শনিবার (১ অক্টোবর) সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে অনুষ্ঠিত শোকসভায় এই আশংকাটাই প্রকাশ করেছেন ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, ‘সৈয়দ হক পরিণত বয়সেই চলে গেলেও এটা আমাদের একটা বড় দুঃখ। কিন্তু তারও চেয়ে বড় দুঃখের কথা হল, এই যে যারা চলে যাচ্ছেন, তাদের শূন্যস্থান কেউ পূর্ণ করছেন না। সমাজের এই বন্ধ্যত্ব তো বাঞ্ছনীয় নয়। কল্যাণকরও নয়। এটা যে কেবল বাংলাদেশের বেলাতে সত্য তা নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের জন্যই এখন সত্য।’

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের এই কথাটি নির্মম বাস্তব। বিশ্ব এখন বিজ্ঞানে, প্রযুক্তিতে, চিন্তায় ও মননে দ্রুত এগিয়ে চলছে, কিন্তু বড় মাপের মানুষ আর তৈরি হচ্ছে না। না শিল্পে, সাহিত্যে, না রাজনীতিতে। একজন মনীষী বলেছেন, ‘আমরা জ্ঞানে-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাচ্ছি, কিন্তু মানবতাবোধে পিছিয়ে যাচ্ছি। মানবতাবোধবিহীন বিজ্ঞান মানবসমাজের জন্য ভয়ংকর ধ্বংসাÍক শক্তি। বিজ্ঞানী আইনস্টাইন আণবিক শক্তি দিয়ে বোমা বানাতে রাজি হননি। কিন্তু তার পরবর্তী বিজ্ঞানীরা সেই বোমা বানিয়ে আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছে। সেই পরমাণুশক্তি মানবকল্যাণের কাজে না লেগে প্রথমেই মানবতার বিরুদ্ধে ভয়ংকর অপরাধের কাজে লেগেছে। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে লাখ লাখ নিরপরাধ নর-নারী হত্যা করা হয়েছে।

সম্প্রতি আমাকে এক প্রবীণ মার্কিন সাংবাদিক দুঃখ করে বলেছেন, ‘আমেরিকা এখন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি। কিন্তু লিঙ্কন, রুজভেল্ট বা আদনাই স্টিভেনসনের মতো রাজনৈতিক নেতা আর জন্ম দিতে পারছে না। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক ‘অর্ধপাগলের’ দেশের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আর তাকে নিয়েই আমাকে লেখালেখি করতে হচ্ছে। সাংবাদিক জীবনে চার্চিল, রুজভেল্ট, স্ট্যালিনকে নিয়ে লেখালেখি করেছি। সেজন্য গর্ববোধ করেছি। আজ ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে লিখি। মনে হয় এটা আমারই অধঃপতন।

এই মার্কিন সাংবাদিকের ক্ষেদোক্তি শুনে নিজের মনের ক্ষেদটাও উপলব্ধি করেছি। আমার সাংবাদিক জীবনের সূচনায় শেরেবাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিয়ে লেখালেখি করেছি। কখনও তাদের পক্ষে, কখনও তাদের বিরুদ্ধে। তাদের সান্নিধ্যও পেয়েছি। এখন এই পরিণত বয়সে আমাকে প্রায় নিয়ত লেখালেখি করতে হয় এমন সব ব্যক্তিদের নিয়ে, যাদের মধ্যে তারেক রহমানও আছেন। এর আগেই সাংবাদিকতার পেশা থেকে বিদায় নিলে হয়তো ভালো করতাম।

আমার সাংবাদিক গুরু দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার একদিনের একটি কথা মনে পড়ে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মারা গেছেন। মানিক ভাই শোকসন্তপ্ত চিত্তে ইত্তেফাক অফিসে বসে আছেন। আমরা সম্পাদকীয় বিভাগের কয়েকজন তার কাছে বসে আছি। হঠাৎ তিনি বলে উঠলেন, আমি আর রাজনৈতিক মঞ্চ (তার রাজনৈতিক কলাম) লিখব না। শহীদ সাহেব মারা গেছেন। এখন রাজনীতিতে গুণ্ডাপাণ্ডাদের রাজত্ব। তাদের নিয়ে লিখে নিজের পতন ঘটাব নাকি?

মানিক ভাইকে আমাদের কেউ একজন স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, মওলানা ভাসানী এখনও বেঁচে আছেন, শেখ মুজিব এখনও বেঁচে আছেন। মানিক মিয়া একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেছিলেন, ‘মওলানা আর সেই মওলানা নেই (মওলানা ভাসানীর রাজনীতি তিনি তখন সমর্থন করতেন না), তবে শেখ মুজিব আছে। আওয়ামী লীগের আর সব নেতা তো এখন ড্রয়িংরুম পলিটিশিয়ান। শেখ মুজিব বয়সে তরুণ হলেও এখন আমাদের শেষ ভরসা। যে ক’দিন বেঁচে আছি, এই ভরসা মনে রেখেই লিখতে হবে।’

ঠিক একই রকম কথা শুনেছি প্রয়াত হওয়ার আগে সৈয়দ শামসুল হকের মুখে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আসার পর একদিন তাকে দেখতে গেছি; কথা প্রসঙ্গে সৈয়দ হক বললেন, গাফ্ফার আমাদের বয়স হয়েছে। মরতে হবে সেজন্য দুঃখ নেই। কিন্তু আরও কিছুদিন বাঁচতে ইচ্ছে করছে শেখ হাসিনাকে সমর্থন দেয়ার জন্য। আমাদের সব বাতিই নিভে গেছে। কিন্তু একটি নিবু নিবু বাতি এখনও টিকে আছে। সেটি শেখ হাসিনা। এই বাতি নিভে গেলে শুধু রাজনীতির ক্ষেত্রে অন্ধকার নামবে না, বাঙালির হাজার বছরের লোকসভ্যতা ও সংস্কৃতিরও বিনাশ ঘটবে। আফগানিস্তানে ও ইরাকে দেখিসনি বর্বর ধর্মান্ধরা কীভাবে হাজার বছরের সভ্যতার নিদর্শনগুলো ধ্বংস করেছে?

কথাটা বলেই সৈয়দ হক রবীন্দ্রনাথের চার লাইনের একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন :

‘কে লইবে মোর কার্য কহে সন্ধ্যারবি

শুনিয়া জগৎ রহে নিরুত্তর ছবি।

মাটির প্রদীপ ছিল সে কহিল স্বামী

আমার যেটুকু সাধ্য করিব তা আমি।’

সৈয়দ হক বলেছিলেন, এই মাটির প্রদীপের দায়িত্বটি গ্রহণ করেছেন শেখ হাসিনা। আমাদের দেশে কত বড় বড় নেতা আছেন, জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি আছেন। কিন্তু কেউ বাঙালিকে, তার লোকায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতিকে তালেবানি থাবা থেকে বাঁচাতে এগিয়ে আসার সাহস দেখাননি। শেখ হাসিনা জীবনবাজি রেখে সেই সাহস দেখিয়েছেন। আর এই সাহসের জোরেই তিনি বাংলাদেশের মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হয়েছেন। আমি মাঝে মাঝে শংকিত হয়ে ভাবি, তার সহসা কিছু হলে এই শূন্যস্থান পূর্ণ করবে কে? আমি কাউকে দেখি না।

এই উপলব্ধি থেকেই সৈয়দ হক মৃত্যুশয্যায় শুয়েও শেখ হাসিনার জন্মদিন নিয়ে গান রচনা করেছেন। তিনিও আজ চলে গেলেন। আমি ভাবছি তার শূন্যস্থান পূর্ণ করবে কে? আমাদের মুক্তমনা সংস্কৃতির অঙ্গন তো কেবল ব্যক্তিত্বশূন্য হচ্ছে, তা তো আর পূর্ণ হচ্ছে না। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদাররা এই শূন্যতাই সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ওই বছর একবার মার্চ মাসে, আরেকবার ডিসেম্বর মাসে নির্মম বুদ্ধিজীবী হত্যা দ্বারা তারা বাংলাদেশকে মেধাশূন্য একটি আত্মবিস্মৃত জাতিতে পরিণত করতে চেয়েছিল। তারা যে এই উদ্দেশ্য পূরণে কিছুটা হলেও সফল হয়নি তা নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বটে; কিন্তু এই স্বাধীনতাকে অর্থবহ করে তোলার জন্য যে মুক্তমননের বুদ্ধিজীবীদের সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার ছিল, দেশ তা থেকে বঞ্চিত হয়। তাদের শূন্যস্থানও তেমন পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না। দু-একজন যারা বেঁচেছিলেন, তারাও একে একে বিদায় নিয়েছেন। তাদের স্থানে দেশে একটি নতুন সুশীলসমাজ গড়ে উঠেছে, যাদের অধিকাংশই চরিত্রে সুবিধাবাদী। ফলে বাংলাদেশে মুক্তমননের বদলে ধর্মোন্মদনার প্রসার ঘটছে বেশি।

সৈয়দ হকের মৃত্যু তাই একটি সাধারণ মৃত্যু নয়, আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গনে এটা এক বিরাট শূন্যতা। এক্ষেত্রে একটিই মাত্র সান্ত্বনা, তার সৃষ্টিসম্ভার এখনও রয়ে গেছে, থাকবে। হয়তো দেশের মানুষ দিশা হারালে তার সৃষ্টিসম্ভার থেকেই ডাক আসবে- ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই?’

লন্ডন, ২ অক্টোবর, রোববার, ২০১৬

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful