আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১ ● ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১

লালমনিরহাটে ধু-ধু বালু চরে তরমুজের বাম্পার ফলন

বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল ২০২১, দুপুর ০২:০০

লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম কুঠিবাড়ি চরের কৃষকরা ধরলা নদীর বালু চরে চাষ করেছেন সুস্বাদু ও রসালো তরমুজ। এসব তরমুজ দেশের অন্যান্য অঞ্চালের তুলনায় বেশি রসালো ও মিষ্টি বলে বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

তরমুজ চাষীরা জানান, ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন এ গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে চলা ধরলা নদীর ভাঙ্গনে অসংখ্য পরিবার হারিয়েছে ভিটেমাটি ও ফসলি জমি। নদীর কড়াল গ্রাসে জীবিকার একমাত্র মাধ্যম ফসলি জমিটুকুও বালু চরে পরিনত হয়ে অনাবাদী হওয়ায় অনেক কৃষক পথে বসে গেছেন। বর্ষাকালে তাদের জমির ওপর নৌকা চললেও শুস্ক মৌসুমে বালু চরে পরিনত হয়।

জীবিকার তাগিদে শুস্ক মৌসুমে সেই তপ্ত বালু চরে প্রায় এক দশক পূর্বে পরীক্ষামূলকঃ তরমুজ চাষ শুরু করেন স্থানীয় কৃষকরা। বাম্পার ফলনের পাশাপাশি বেশ মুনাফা পাওয়ায় দিন দিন বাড়ছে চরাঞ্চলে তরমুজ চাষীর সংখ্যাও। চলতি বছর ওই গ্রামের ৩৭ জন চাষী প্রায় লক্ষাধিক চারা রোপন করেছেন।

জীবিকার তাগিদে সীমান্তবর্তী এ গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এক সময় মাদক-গরুসহ বিভিন্ন চোরাচালানে জড়িয়ে পড়েছিল। কয়েক বছর ধরে প্রশাসনের সাঁড়াশি অভিযানে অনেকেই অন্ধকার এ জগত থেকে ফিরে এসে কৃষি কাজে আত্মনিয়োগ করেছেন। ফলাচ্ছেন রসালো ফল তরমুজ, কুমড়াসহ বিভিন্ন কাচাঁ তরাকরী ও সবজি।

ফলে, এক সময়ের মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত কুটিবাড়ি এখন সবজি গ্রামের খ্যাতি পেয়েছে। চরঞ্চালের জমির মালিকরা ধু-ধু বালু চরে চাষ করছেন তরমুজ ও মিষ্টি কুমড়া।

কুঠিবাড়ি গ্রামের তরমুজ চাষী বেলাল হোসেন বলেন, কার্ত্তিক মাসে নদীর পানি শুকিয়ে গেলে সারিবদ্ধ ভাবে গর্ত করে জৈব সার দিয়ে তরমুজের বীজ রোপন করতে হয়। এরপর, নিয়মিত সেচ ও সার দিতে হয়। এতে চারা বড় হয়ে বালুচরে বিচরন করে। প্রয়োজন শুধু দৈনিক দুই/তিনবার সেচ দিয়ে তপ্ত বালুতে গাছের শিকড় ভিজিয়ে রাখা।

এ জন্য জমির এক পাশে শ্যালো মেশিন বসিয়ে পলিথিনের পাইপের সাহায্যে চারা গাছে পানি দেন তারা। পোকার আক্রমন হলে কীটনাশক ব্যাবহার করতে হয়। এভাবে ৪-৫ মাস পরিচর্যা করলে পাওয়া যায় কাঙ্খিত রসালো সুস্বাদু ফল তরমুজ।

তিনি বলেন, চলতি মৌসুমে ৭০ হাজার টাকা খরচে ৩ হাজার ৫০০ চারা লাগিয়েছেন। আবহাওয়াও অনুকূলে ছিলো। তরমুজ বিক্রি শুরু হয়ে গেছে। আশা করা যাচ্ছে এবার প্রায় দুইলাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেত পারব।

একই গ্রামের চাষী তৈয়ব আলী বলেন, তার ১ হাজার ৮০০ চারা রোপন করতে খরচ পড়েছে প্রায় ৩৭ হাজার টাকা। প্রতিটি চারায় নুন্যতম ০৪ থেকে ০৬টি ফল হয়েছে। এখানকার এক একটি তরমুজ ওজনে ০৭ থেকে ১০ কেজি পর্যন্ত হয়। প্রতি পিস তরমুজ গত বছর ক্ষেতেই ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গত বছর শিলাবৃষ্টিতে কিছুটা নষ্ট হলেও ৭০ হাজার টাকা আয় হয়েছে। এ বছরও লক্ষাধিক টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।

তরমুজ চাষী সহিদুল হক বলেন, বালুতে পা রাখা কষ্টকর। সেই তপ্ত বালুতে গাছের শিকড় ভিজিয়ে রাখতে দৈনিক দুই থেকে তিনবার করে পানি দিতে হয়। পানির খরচই অনেক বেশি। দেশের অন্যসব অঞ্চালের চেয়ে এ চরের তরমুজ বেশি রসালো ও সুস্বাদু হওয়ায় বিক্রিতে কোনো ঝামেলা নেই। পাইকাররা শহর থেকে এসে ক্ষেতেই টাকা বুঝে দিয়ে তাদের তরমুজ ক্রয় করে দেশের বিভিন্ন জেলা শহরে পাঠিয়ে দেন। চলতি মৌসুমে তরমুজ ক্ষেতে পোকার আক্রমন হয়েছিল। বালাইনাশক দিয়েও কিছু চারা রক্ষা করতে পেরেছেন বলেও জানান ওই চাষী।

কুঠিবাড়ি গ্রামের তরমুজ চাষী আবু হানিফ বলেন, এ জেলার অন্য কোথাও তরমুজ চাষ হয় না। তাই স্থানীয় বাজারে এর বীজ পাওয়া যায় না। গ্রামের চাষীরা সবাই মিলে একজনকে ঢাকায় পাঠিয়ে ভাল মানের তরমুজ বীজ সংগ্রহ করেন। তরমুজ বিক্রির সময়ও নিজেরা বিভিন্ন বাজার যাচাই করে তরমুজের মূল্য নির্ধারন করে সম্মিলিত ভাবে নির্দিষ্ট মূল্যে জমিতেই পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বর্তমান করোনা মহামারী সমস্যার কারনে পরিবহণ খরচ বেশি হওয়ায় কিছুটা কম মূল্যে তাদের পণ্য বিক্রি করতে হয় বলেও দাবী করেন তিনি।

লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসান অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক কৃষিবিদ মোঃ শামসুজ্জামান বলেন, লালমনিরহাট জেলার তিস্তা, ধরলাসহ বিভিন্ন নদীর চর গুলো কিভাবে কাজে লাগানো যায় এ ব্যাপারে কৃষি অফিস চরাঞ্চলের চাষিদের সাথে আলোচনা করা হয়। সেই আলোচনার প্রেক্ষিতে এসব চরে প্রথমে মিষ্টি কুমড়া আবাদ করে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া যায়। পরে পরিক্ষা মুলক ভাবে আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের ভারতীয় সীমান্ত সংলগ্ন গ্রাম কুঠিবাড়ি চরের কৃষকরা রসালো ফল তরমুজ আবাদ করে লাভবান হলে গত দুই বছর থেকে এই তরমুজ চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে ওই এলাকার প্রায় ৫০ জন কৃষক এখন তরমুজ চাষ করছেন।

মন্তব্য করুন


Link copied