আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২১ ● ১১ কার্তিক ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২১

রাজশাহী মেডিক্যালের করোনা ইউনিটে ১৩ দিনে ১০১ মৃত্যু

শনিবার, ৫ জুন ২০২১, বিকাল ০৫:০৫

রাজশাহী: রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের করোনা ইউনিটে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও আট জনের মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার (৪ জুন) সকাল ৮টা থেকে শনিবার (৫ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত তারা মারা যান। এ নিয়ে গত ২৪ মে থেকে ১৩ দিনে ১০১ জন মারা গেলেন। তাদের মধ্যে ৬০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ছিলেন।

বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের উপপরিচালক সাইফুল ফেরদৌস জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া আরও আট রোগীর মধ্যে চার জন করোনাভাইরাস পজিটিভ ছিল। আর বাকিরা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃতদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঁচ জন ও রাজশাহীর তিন জন। শনিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২২৪ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছেন ১৬ জন। এর মধ্যে রাজশাহীর ১০, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৫ ও নওগাঁর একজন রয়েছেন। এছাড়া একই সময় সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১৮ জন বাড়ি ফিরেছেন।

রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে একদিনের ব্যবধানে করোনাভাইরাস শনাক্তের হার বেড়েছে। শুক্রবার রাতে রাজশাহীর দুটি ল্যাবে নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। এতে দেখা গেছে, আগের দিনের চেয়ে শুক্রবার প্রায় দিগুণ বেড়ে রাজশাহীতে করোনা শনাক্তের হার ছিল ৪৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ দিন শনাক্তের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৬১ দশমিক ৮৭ শতাংশ। যা বৃহস্পতিবার রাজশাহীতে ছিল ২৬ শতাংশ আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৫৩ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

রাজশাহী হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস জানান, শুক্রবার রাজশাহীর দুটি ল্যাবে ৪৫৫ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৪৭ জনের করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহীর ২৬৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১৩১ জনের পজিটিভ এসেছে। এছাড়াও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৮১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ১১২ জনের করোনাভাইরাস পজিটিভ এসেছে এবং নাটোরের নয় জনের নমুনা পরীক্ষা করে চার জনের দেহে শনাক্ত হয়েছে।

এদিকে করোনাভাইরাসের থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে রাজশাহী অঞ্চল। কোনও ভাবেই করোনার বিস্তার কমানো যাচ্ছে না। বিভাগে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ জন রোগী শনাক্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরে রোগীর সংখ্যা বাড়ছেই। পরিস্থিতি সামাল দিতে চাঁপাইবাবগঞ্জে চলছে দুই সপ্তাহের আঞ্চলিক লকডাউন। সেই জেলায় করোনার ভারতীয় ধরনও শনাক্ত হয়েছে। এ কারণে ঝুঁকিতে থাকা নওগাঁতেও আঞ্চলিক লকডাউন দেওয়া হয়েছে। রাজশাহীতে চলাচলের ওপর আরোপ করা হয়েছে নতুন বিধিনিষেধ। প্রশাসনের নির্দেশে গত বৃহস্পতিবার থেকে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে নগরীতে দোকানপাট বন্ধ করা হচ্ছে। তারপরও রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও নওগাঁয় পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। সংক্রমণ বাড়ছেই। এসব জেলার রোগীরা চিকিৎসার জন্য রামেক হাসপাতালে ছুটে আসছেন। কিন্তু শয্যা সংকটে সব রোগীকে ভর্তি নিতে পারছে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। শুধু অক্সিজেনের স্যাচুরেশন যাদের কমেছে, কেবল তারাই হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন। তারপর এ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন রোগী মারা যাচ্ছেন।

প্রতিদিন এত বিপুল পরিমাণ রোগীর চিকিৎসা দেওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চিকিৎসার জন্য রোগীদের জায়গা সংকুলানই একটি বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। সংক্রমণ না কমলে কয়েকদিনের মধ্যে এ সমস্যা প্রকট হতে পারে। এ নিয়ে ভাবনায় পড়েছেন স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা। সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে, তা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন তারা।

রামেক হাসপাতালে মোট শয্যার সংখ্যা এক হাজার ২০০টি। এর মধ্যে ২৩২টি শয্যা করা হয়েছে শুধুমাত্র কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায়। এজন্য বার্ন ইউনিটসহ কয়েকটি ওয়ার্ডকে করোনা ইউনিট করা হয়েছে। তারপরও জায়গা সংকুলান সম্ভব হচ্ছে না। নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) শয্যার জন্য রোগীদের মাঝে হাহাকার দেখা দিয়েছে। মাত্র ১৫টি আইসিইউ শয্যা রয়েছে রামেক হাসপাতালে। আইসিইউ না পেয়ে রোগীরা মারা যাচ্ছেন।

এদিকে রামেক হাসপাতালে জায়গা শেষ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সদর হাসপাতাল চালুর চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে বিভাগীয় কমিশনার ড. হুমায়ুন কবীর সদর হাসপাতাল পরিদর্শন করতে যান। এ সময় তার সঙ্গে রামেক হাসপাতালের পরিচালকসহ গণপূর্ত অধিদফতরের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন। এই হাসপাতালটি এবার চালু হতে পারে।

রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, ‘রামেক হাসপাতাল ছাড়া রাজশাহীতে আর কোনও হাসপাতালের ওয়ার্ডে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই। থাকলে সেটাকে করোনার চিকিৎসার জন্য ব্যবহার করা যেত। তাই সব রোগীর চাপ রামেক হাসপাতালে। রাজশাহী ও খুলনা বিভাগের রোগীরা এখানে আসছেন চিকিৎসা নিতে। এখন জায়গা সংকুলানই বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।’

তিনি জানান, রাজশাহী সদর হাসপাতালটি চালু করা গেলে রামেক হাসপাতালের কয়েকটি ওয়ার্ড সেখানে স্থানান্তর করা যাবে। তাহলে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বাড়ানো যাবে। সদর হাসপাতালে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ লাইন নেই বলে সেখানে করোনার চিকিৎসা হবে না। সর্বশেষ রামেক হাসপাতালের এক নম্বর ওয়ার্ডটিকে করোনা ওয়ার্ড করার চেষ্টা চলছে। এখন সাধারণ রোগী অন্যত্র না সরালে রামেক হাসপাতালে করোনা ওয়ার্ড বৃদ্ধি করা সম্ভব নয়।

তিনি আরও জানান, রামেক হাসপাতালে কোভিডের চিকিৎসায় চিকিৎসকেরও সংকট আছে। তাদের চাহিদার ভিত্তিতে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দফতর ১৫ জন চিকিৎসককে এখানে দিয়েছেন। তবে তারা এখনও আগের কর্মস্থলে আছেন। দ্রুত হয়তো তারা চলে আসবেন। কিন্তু নার্সের সংকটের সমাধান হচ্ছে না।

এদিকে রামেক হাসপাতালে আরও করোনা রোগী ভর্তি করা হলে সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহও বাড়াতে হবে। এ জন্য ২০ হাজার লিটার লিকুইড অক্সিজেন ধারণ ক্ষমতার আরেকটি অক্সিজেন সিলিন্ডার বসানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এখন যে সিলিন্ডার আছে সেটিতেও ২০ হাজার লিটার লিকুইড অক্সিজেন রাখা যায়। লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড এই সিলিন্ডারে অক্সিজেন দিয়ে যায়। আরেকটি সিলিন্ডার বসাতে এই প্রতিষ্ঠানটিকেই বলা হয়েছে।

রামেক হাসপাতাল পরিচালক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী জানান, রোগী বাড়ায় আরও একটি ওয়ার্ড যুক্ত করা হচ্ছে। আর বাড়ানো হচ্ছে শয্যা। করোনার সব ওয়ার্ডের পাশে বারান্দায় কিছু বেড যুক্ত করেছি। চিকিৎসক ও দায়িত্বদের নিয়ে কাজের বিষয়ে নানান পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্য করুন


Link copied