Templates by BIGtheme NET
আজ- সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ::৫ আশ্বিন ১৪২৮ :: সময়- ৬ : ০১ অপরাহ্ন
Home / খোলা কলাম / আমার মৃতদেহ সৎকার করবে কে? (প্রেক্ষিত লালমনিরহাট জেলা)

আমার মৃতদেহ সৎকার করবে কে? (প্রেক্ষিত লালমনিরহাট জেলা)

জেএম সাধন
গত কিছুদিন থেকে করোনা আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা বেড়েছে সারা দেশে। করোনার ২য় ঢেউয়ে শুধু শহরাঞ্চল নয়, গ্রাম গঞ্জেও মৃত্যু বেড়েছে। সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে ও মাস্ক ব্যাবহার করেও অনেকেই বিভিন্নভাবে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। শেষ ১০ দিনে রংপুর অঞ্চলের একাধিক ঘটনা আমাকে বিচলিত করে তুলেছে। দেখাগেছে বাড়ির উঠানে লাশ পড়ে আছে, কিন্তু গ্রামের কেউ সৎকারের জন্য করোনার ভয়ে এগিয়ে আসছেন না। কারণ তাদের সুরক্ষা সামগ্রী নেই সৎকার করার জন্য। একজনের মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন পরিবার, তার উপরে সৎকার করা নিয়ে দুঃচিন্তা। এ যেন মরার উপর খাড়ার ঘা। বিশেষকরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে এ অবস্থা বেশি ভয়াবহ। আমি একজন সনাতন ধর্মের অনুসারী হিসেবে নিশ্চয় ভাবিয়ে তোলার বিষয়। কাল যদি আমার করোনায় মৃত্যু ঘটে তাহলে আমার মৃতদেহ সৎকার করবে কে?

গ্রাম গঞ্জের মানুষ তুলনামূলক কম সচেতন। সরকার কঠোর লকডাউন দেয়ার পরেও কারণে অকারণে বাড়ির বাইরে বের হচ্ছেন। প্রশাসন যথেষ্ট সজাগ থাকার পরও সামাল দিতে পুরোপুরি হিমসিম খাচ্ছেন।বৃহস্পতিবার রংপুর মহা নগরীর এক ট্রাফিক পুলিশ সাংবাদিকের কাছে ভিডিও সাক্ষাতকারে অশোভনভাবে সরাসরি বলেই ফেলেছেন ‘রংপুরের মানুষ মূর্খ’। ঢালাওভাবে এভাবে মূর্খ বলায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে যথেষ্ট সমালোচনা চলছে।

কেস-স্টাডি ১: গত ২৬ জুন লালমনিরহাট সদর উপজেলার মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক রমেশ চন্দ্র রায় (৬১) করোনা আক্রান্ত হয়ে রংপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকালে পরলোক গমন করেন (দিব্যান্ লোকান্ স্বগচ্ছতু)। ওইদিন রাতে তার লাশ রংপুর থেকে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের লোকজন লাশ-বাহী গাড়ি থেকে মৃতদেহ নামিয়ে বাড়ির উঠানে শুইয়ে রাখেন। রাতেই শ্মশানে নিয়ে দাহ করার জন্য আশেপাশের বাড়ির লোকজনকে ডাকলেও সাড়া মেলেনি। খবর পেয়ে দ্রুত ছুটে আসেন জনদরদী নেতা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মো: কামরুজ্জামান সুজন। তার নিজস্ব কয়েক জন ও পাশের গ্রামের ৪ জন মুসলিম যুবকের সহায়তায় রাত আড়াইটার দিকে পরিবার ও কয়েকজন নিকট আত্মীয়সহ লাশ দাহ করার জন্য কাশিপুর গ্রামের শ্মশানে নিয়ে যান। ধর্মীয় আচার পালনের জন্য পুরোহিতকে ডাকলেও তিনি শ্মশানে যাননি। পরে মোবাইল ফোনে মন্ত্রউচ্চারণ করিয়ে দেন মুখাগ্নির জন্য। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের প্রচেষ্টায় দাহ সুসম্পন্ন হয়। এমন জননেতা বর্তমান সময়ে সত্যি বিরল যা প্রশংসাযোগ্য।
এদিকে ছবিসহ এই খবর প্রকাশ করে লালমনিরহাট থেকে প্রকাশিত একটি অনলাইন পত্রিকা। যার শিরোনাম ছিলো “লালমনিরহাটে করোনা আক্রান্তের ‘মৃতদেহ’ রেখে পালাল গ্রামবাসী!” যে খবরটি ইতিমধ্যে ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ও ভাইরাল হয়ে গিয়েছে। শিরোনামের মধ্যেই মৃত রমেশ চন্দ্র রায়ের গ্রামবাসীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে। সাংবাদিকতার নৈতিকতা বহির্ভূত এমন শিরোনাম ওই অনলাইন পত্রিকার ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণ করে। কারণ ‘পালাল’ শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Ran away’ ক্যামব্রিজ অভিধান অনুসারে যার অর্থ “to leave a place or person secretly and suddenly”। অর্থাৎ, কেউ যখন চুপিসারে কোন স্থান ত্যাগ করে তখন সেটাকে ‘পলায়ন’ বা ‘পালিয়ে যাওয়া’ বলে। আর ওই সংবাদের ‘পালাল’ হচ্ছে পালানো বা পালিয়ে যাওয়া শব্দের প্রতিরূপ। বিস্তারিত সংবাদে বলা হয়েছে কোন প্রতিবেশী এগিয়ে যাননি। মানে কোন প্রতিবেশী উপস্থিত হননি। যারা উপস্থিতই হয়নি, তাদের ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া শব্দটি নিশ্চয় অবান্তর। পাঠক স্বভাবতই প্রশ্ন করতে পারেন, এ সংবাদটি নিয়ে এত আলোচনা কেন? আসলে গ্রামবাসীকে তাচ্ছিল্য করে প্রকাশ করা ওই খবরের পরে বিশেষ শ্রেণির কিছু বক ধার্মিক শুকে শুকে ধর্মের গন্ধ খুঁজে বের করেছেন। তারা অনেকেই বিভিন্ন কমেন্টে একটি ধর্মের উদারতা, সনাতনীদের ভীরুতা প্রভৃতি না না বিষয়কে টেনে হিঁচড়ে ব্যবচ্ছেদ করেছেন। যদিও আমার ধারনা- নিশ্চয় উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সাহেব ধর্মীয় উদারতা দেখাতে হিন্দুর মৃতদেহ দাহ করাতে যাননি। নিশ্চয় তিনি প্রথমত, একজন মানুষ হিসেবে মানুষের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। দ্বিতীয়ত, যেহেতু তিনি একজন জনপ্রতিনিধি তাই সাধারণ জনগণ এগিয়ে না গেলেও তিনি গিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। তৃতীয়ত, যেহেতু মৃত ব্যক্তি তার রাজনৈতিক দলের একনিষ্ঠ কর্মী তাই দলীয় নেতা হিসেবে ছুটে গেছেন। সর্বোপরি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মধ্যে পরোপকারী মন আছে এবং বিবেকের তাড়না থেকে তিনি সাহায্য করেছেন। কিন্তু তার এই উদারতাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন অনেকেই। রাতে নিয়ে আসা মৃতদেহ সৎকারের জন্য সকাল হওয়া পর্যন্তও অপেক্ষা করা হয়নি যে, গ্রামের মানুষ সৎকারে এগিয়ে আসবেন। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এমন আপদকালীন পরিস্থিতিতে করনীয় কর্তব্য বুঝে ওঠার আগেই সব সুসম্পন্ন হয়েছে চেয়ারম্যান মো: কামরুজ্জামান সুজনের সহায়তায়। তা সত্যেও ওই অনলাইন পত্রিকাটির সংবাদ শিরোনাম সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য মনঃপীড়া দায়ক।

অন্যদিকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কর্তৃক মৃত রমেশ চন্দ্র রায়ের মৃতদেহ দাহ করা নিয়ে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বড় দুটি সংগঠনের বিরুদ্ধে। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদযাপন পরিষদের লালমনিরহাট শাখা করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ সৎকারের জন্য পৃথক দুটি কমিটি গঠন ও অনুমোদন দেন ২১ জুন। এমনকি খাতা-কলম সর্বস্ব নামধারী ওই সৎকার কমিটির একাধিক স্বেচ্ছাসেবকের বাড়ি মৃত রমেশ চন্দ্রের একই এলাকায়। নামধারী কমিটির এক সদস্য মৃত ব্যক্তির নিকট প্রতিবেশী। তারা ২৬ জুন রাতে খবর পেয়েও হাত-পা গুটিয়ে ছিলেন। কমিটি আছে কিন্তু কার্যক্রম নেই, এ লজ্জা রাখার জায়গা নেই।

কেস-স্টাডি ২: লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ থানার বুড়ির হাটের পাশের গ্রামে সিলেট ফেরত এক করোনা রোগী একদিন পর গত ১ জুলাই মৃত্যু বরন করেন (দ্যিবান্ লোকান্ স্বগচ্ছতু)। সেখানেও মৃতদেহ সৎকারের জন্য কেউ এগিয়ে যাননি করোনা আক্রান্তের ভয়ে। এই ব্যাপারে ভয়কে জয় করে শুধু সাহস দেখিয়ে এগিয়ে গেলেই চলে না। তার জন্য দরকার সুরক্ষা সামগ্রী ও প্রশিক্ষণ। যার কোনটিই ছিলোনা ওই গ্রামের কারো। উপজেলায় গত বছর করোনা আক্রান্ত মৃতদেহ সৎকারের একটি কমিটি গঠন করা হলেও বর্তমানে নতুন করে কমিটি তৈরির কথা ভাবছেন পূজা উদযাপন পরিষদ নেতৃবৃন্দ। এদিকে কারো সাড়া না পেয়ে বাড়ির ৪ জন পুরুষ সদস্য অন্যের সহায়তা ছাড়া নিজেরাই মৃতদেহ নিকটস্থ শ্মশানে নিয়ে যান এবং দাহকার্য সম্পন্ন করেন। এখন তারা ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইনে আছেন।

করোনা মহামারীতে সরকার টেস্টিং কিট, ভ্যাকসিন, চিকিৎসা সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে। এসবের পাশাপাশি আক্রান্ত সনাতনীদের মৃতদেহ যথাযথ ধর্মীয় রীতিতে অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরী। উপজেলা ও জেলা প্রশাসন এসব নাম সর্বস্ব সৎকার কমিটিকে বাদ দিয়ে প্রকৃত স্বেচ্ছাসেবকদের মেডিকেল অফিসার কর্তৃক প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা প্রদান করা সময়ের দাবি। সেই সাথে সৎকার টীমের সকলের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য দরকারি সামগ্রী প্রদান এবং ৯৯৯ এর সাথে তাদের সমন্বয় করা আশু প্রয়োজন। তাহলে হয়ত মরে যাওয়ার আগে এই দুঃচিন্তা থাকবে না যে, আমার মৃতদেহ নিয়ে বিপাকে পড়বে না আমার শোকার্ত পরিবার।

লেখক: সাবেক বার্তা সম্পাদক ‘দৈনিক বাহের সংবাদ’, রংপুর।
তারিখ: ০৩-০৭-২০২১

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful