আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১ ● ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১

সহপাঠীদের বিয়ে; ক্লাসে একা হয়ে গেল নবম শ্রেণির নার্গিস!

বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, রাত ১০:১৮

নার্গিস আক্ষেপ করে বলে- এখন শুধু আমিই বাকি রয়েছি। ক্লাসজুড়ে আমি শুধু একা। কারও সঙ্গে কোনো কিছু শেয়ার করতে পারি না। তাই মন খারাপ করেই ক্লাস করতে হচ্ছে। বান্ধবীদের বিয়ের কথা জানতে পেরে নিজেরই কান্না পাচ্ছে। নিজের মধ্যেও শঙ্কা কাজ করছে। আমার শেষ পরিণতি কী হবে তাও অজানা। সে বলে- আমি আমার বাবা-মাকে অনুরোধ করেছি। আমাকে যেন হঠাৎ করে বিয়ে না দেয়। আমি পড়াশোনা শেষ করে একটি চাকরি করে নিজের অবস্থা তৈরি করেই বিয়ে করব। এর আগে নয়। কেননা নিজে স্বাবলম্বী না হয়ে অন্যের কাছে বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।

সরেজমিন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারডোব উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়- এই বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্রী নার্গিস নাহার। সে শ্রেণির ছেলে সহপাঠীদের সঙ্গে একটি ব্রেঞ্চে একাই পাঠদানে অংশ নিয়েছে। আনন্দমাখা মুখে সবাই যখন ক্লাস করে তখন নার্গিস নাহারের চোখেমুখে অদৃশ্য আতঙ্ত কাজ করছে। হাজারও দুশ্চিন্তায় হাসিমুখে ভরে ওঠে নার্গিসের মুখে মলিনতা। কীভাবে করবে স্বপ্ন পূরণ? কেননা এই শ্রেণিতে ৯ জন ছাত্রীর মধ্যে ৮ জনই বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। করোনার দেড় বছরে বিদ্যালয়ের নার্গিস নাহার বাদে যেসব ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে তারা হলো- নুরবানু খাতুন, নাজমা খাতুন, স্বপ্না খাতুন, হেলেনা খাতুন, চম্পা খাতুন, লুৎফা খাতুন, চাঁদনী খাতুন এবং আরফিনা খাতুন।

এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলে রহমান বলেন, আমার বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ২২৫ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৬৩ জন ছাত্রী। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মেয়ে এবং ৭০ শতাংশ ছাত্র বিদ্যালয়ে উপস্থিত হচ্ছে। বাকিদের খোঁজখবর নিতে শিক্ষকদের নিয়ে একটি টিম গঠন করা হয়েছে। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিদ্যালয়ে না আসার প্রকৃত কারণ তুলে ধরবেন।

প্রাথমিক তথ্যমতে, বিয়ে হয়েছে ১৮ জন ছাত্রীর। এর মধ্যে বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির চারজন ছাত্রীর মধ্যে জেসমিন ছাড়া বাকি তিনজনেরই বাল্যবিয়ে হয়ে গেছে। নবম শ্রেণিতে ৯ জনের মধ্যে নার্গিস ছাড়া ৮ জনের বিয়ে হয়েছে, এছাড়াও ষষ্ঠ শ্রেণির একজন, সপ্তম শ্রেণির দুইজন, অষ্টম শ্রেণির চারজনের বাল্যবিয়ে দেয়া হয়েছে বলে জানা যায়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আব্দুল মজিদ চৌধুরী বলেন, নবম শ্রেণিতে ৩৬ জন ছাত্রছাত্রী। এর মধ্যে ৯ জন ছাত্রী আর ২৭ জন ছাত্র। বর্তমানে স্কুল খোলার পর বাল্যবিয়ের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে; যা খুবই দুঃখজনক। তারপরও আমরা চেষ্টা করছি মেয়েদের পড়ালেখামুখী করতে।

এই এলাকার বাসিন্দা নাজিম আলী বলেন, মেয়ে লোকের ফুট ভাসলে (১২-১৩ বছরে) বিয়ে দিতে হয়। আমাদের সরকার কী কবাইছে জানে ২১, ২২, ২৩, ১৮, ১৯, ২০ বছর হলে কে নিবে মেয়েকে? কেউ নিবে নয়। মেয়ে যত বড় হবে- দুই, আড়াই, তিন, পাঁচ লাখ টাকা ডিমান্ড হবে। মেয়ের একটু বয়স হলেই কয় এক লাখে হবার নয়, হাত-পায়ের সোনা দেয়া নাগবে। সেজন্য প্রত্যন্ত এলাকার মেয়েদের অল্প বয়সেই বিয়ে দেয় বাবা-মা এমন দাবি তাদের।

একই এলাকার বাসিন্দা বুলবুলি বেগম বলেন, তাড়াতাড়ি বিয়ে দেই হামরা গরিব মানুষ। মেয়ে ছইল যত বড় হইব তত ডিমান্ড হার বাড়ব। মেয়ে যদি মেট্রিক পাশ করাই তাইলে ছেলে নেয়া লাগবো ইন্টার পাশ। সেই সামর্থ্য যদি হামরা করবার না পারি সেজন্য ছোটতে মেয়ের বিয়ে দেই।

একই এলাকার আহাম্মদ আলী বলেন, বাল্যবিয়ে তো এলাকায় হয় না। মেয়েপক্ষ আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেয় গোপনে। কেউ এক ইউনিয়ন থেকে অন্য ইউনিয়ন, আবার কেউ উপজেলা থেকে অন্য উপজেলায় নিয়ে গিয়ে বিয়ে দেয়। বিয়ের কথা সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ না করে ১৫ দিন, এক মাস পর প্রকাশ করে বাবা-মা।

ইউনিয়নের ৪নং ইউপি সদস্য বাহিনুর রহমান বলেন, জেলা সদর হলেও ধরলা নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন এই ওয়ার্ড। এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় প্রশাসনের লোকজনকে বেগ পেতে হয়। এছাড়াও যারা বিয়ে দেন তারা গোপনে এসব বাল্যবিয়ে দেন অন্যত্র। এজন্য আমাদের কাছে সংবাদ আসে না।

মন্তব্য করুন


Link copied