আর্কাইভ  রবিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২১ ● ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   রবিবার ● ৫ ডিসেম্বর ২০২১

ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ; শিশু আজমিরের চোখ অন্ধ হয়ে গেল

রবিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২১, বিকাল ০৭:০৯

স্টাফ রিপোর্টার, নীলফামারী॥ পাঁচ বছরের শিশু আজমীরের চোখে এখন কালো চশমা। ফুটফুটে মেধাবী এই শিশুটির একটি চোখ অকালেই অন্ধ হয়ে যাবে তা কেউ মেনে নিতে পারছেনা। ঘটনার পর শিশু আজমীরের কর্নিয়া অপারেশন করা হয়েছিল রাজধানীর ফার্মগেটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে। বাবা মায়ের আশা ছিল ছেলেটি ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবে। কিন্তু ফলোআপ চিকিৎসা করাতে গিয়ে চিকিৎসকরা জানিয়ে দিল ডান চোখে নাকি কিছুই দেখতে পারবেনা আজমীর। নীলফামারীর ডোমার উপজেলার আমবাড়ি গ্রামের নিজস্ব মাছের হ্যাচারি ব্যবসায়ী মারুফ ইসলামের ছোট ছেলে আজমীর। বুকফাটা কান্না বাবা ও মা এর। আর শিশু আজমীর এখনও বুঝতে পারেনি সে ডানচোখ দিয়ে আর কোনদিন কিছু দেখতে পাবেনা। এখন তার বাম চোখটিই একমাত্র ভরসা। এই পাঁচ বছর বয়সী আজমীরের বাবা মারুফ ইসলাম আজ রবিবার(১৭ অক্টোবর/২০২১) জানালেন, ছেলেকে লিখাপড়ায় মানুষের মতো মানুষ করতে নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরে স্টেশনের কাছেই পুরাতন মুন্সীপাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়েছিলেন। সৈয়দপুরে নামী স্কুলে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে তার লিখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছিলেন। চলতি বছরের কোরবানীর ঈদে ডোমরের গ্রামের বাড়িতে স্ত্রী সন্তান সহ ঈদ উদযাপন করেন। এরপর ১৫ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় খুলনাগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনে ডোমার থেকে সৈয়দপুর ফিরছিলেন। স্টেশনে পৌঁছাতে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি ছিল। ট্রেনে জানালার পাশে বসে ছিল আজমির। সৈয়দপুর রেলস্টেশনের হোম সিগন্যালের কাছে হঠাৎ বাইরে থেকে আসা পাথর তার ডান চোখে আঘাত করে। ছেলের চোখ ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। এ অবস্থায় সৈয়দপুর স্টেশনে নেমে রেলওয়ে পুলিশের এএসআই প্রভাষ কুমারের সহায়তায় দ্রুত সৈয়দপুর ১০০ শয্যা হাসপাতালে নিয়ে যাই। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মকর্তা ডা. মো. রবিউল ইসলাম দ্রুত শিশুটিকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। ওই হাসপাতালের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. রাশেদুল ইসলাম মাওলার শরণাপন্ন হলে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। পরের দিন ১৬ আগষ্ট রাজধানীর ফার্মগেটের ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে ছেলেকে নিয়ে যাই। সেখানে ১৭ আগষ্ট আজমীরের চোখের (কর্নিয়া) অস্ত্রোপচার করা হয়েছিল। এরপরেও ছেলের দৃষ্টিশক্তি আস্তে আস্তে কমতে থাকে। শনিবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর ইসলামীয়া চক্ষু হাসপাতালে ফলোআপ চিকিৎসা করাতে যাই। সেখানকার চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. কামরুল হাসান সোহেলের তত্ত্বাবধানে পাঁচ থেকে ছয়জন ডাক্তার ছেলের চোখের আলট্রাসনোগ্রামসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করলেন। চোখের সামনে ডাক্তার আঙুল দেখালেন, কয়টা আঙুল কিন্তু ছেলে তা বলতে পারল না। ছবিও দেখতে পেল না। তারপরই চিকিৎসকেরা ঘোষণা দিলেন, তা শোনার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। আমার ছেলের সারাটা জীবন সামনে পড়ে রয়েছে। আমার ছেলের চোখটাই অন্ধ হয়ে গেল। বাসায় ফিরে আমি নিজেও বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করলাম। বাম চোখ বেঁধে মোবাইল হাতে দিলাম, ছেলে তো কিছুই দেখে না। ঘটনার পর ছেলেকে নিয়ে কত সংবাদ প্রচার হলো, অথচ ট্রেনের কেউ আমার বাড়িতে গিয়ে একবার খোঁজও নিল না, আমার ছেলের চোখটা কেমন আছে। মামলার প্রয়োজনে শুধু দুই দিন ফোন করেছিল সৈয়দপুরে ষ্টেশন মাষ্টার। তিনি আরও জানান,আজমীরের কর্নিয়া অপারেশনসহ এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে এক লাখ টাকার বেশি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ছেলেকে দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে চাইলে করাতে পারেন, তবে এতে চোখ ভালো হয়ে যাবে সে ধরনের নিশ্চয়তা দেওয়া যাচ্ছে না। তারপরেও বাবা হিসাবে দেশের বাইরে নিয়ে ছেলের চোখ পরীক্ষা করানোর চেষ্টা করবো মনের সান্তনার জন্য। আজমীরের বাবা মারুফ ইসলাম ঘটনার আকস্মিকতায় মামলা করার কথা ভাবতে পারেননি। ছেলের সুস্থতার বিষয়টি বেশি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। আজমীরের ঘটনার পরদিন ১৬ আগস্ট সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টেশনের সহকারী স্টেশন মাস্টার ময়নুল হোসেন বাদী হয়ে সৈয়দপুর রেলওয়ে থানায় (মামলা নম্বর ১) ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৪২৭ ও ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারায় পাথর নিক্ষেপে করে যাত্রীকে গুরুতর জখম এবং ট্রেনের জানালার গ্লাসের ক্ষতির বিষয়টি উল্লেখ করে মামলা করেন। মামলার আসামি অজ্ঞাতনামা। আর ট্রেনের বগির একটি জানালার গ্লাসের ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয় আনুমানিক পাঁচ হাজার টাকা। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অজ্ঞাতনামা কয়েকজনকে সৈয়দপুর জিআরপি থানা পুলিশ ধরেছিল, পরে জিজ্ঞাসাবাদের পর আবার ছেড়েও দিয়েছে পুলিশ। দিশেহারা বাবা মারুফ ইসলাম বলেন, আমি আমার ছেলের চোখের ক্ষতিপূরণ চেয়ে উচ্চ আদালতে রিট করব। সৈয়দপুর জিআরপি থানার ওসি আব্দুর রহমান বিশ্বাস জানান, আমরা জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বেশ কিছু ছেলেকে আটক করেছিলাম। তারা ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলনা বলে তদন্তে বেরিয়ে আসায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। তবে মুল হোতাদের গ্রেফতারে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। উল্লেখ যে, দেশ জুড়ে ট্রেনে পাথর ছুড়ে মারার ঘটনা নিয়ে তোলপাড় সৃস্টি করেছে। ভীতি তৈরি করছে ট্রেনের যাত্রী ও ট্রেনের কর্মীদের মাঝে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, রেলওয়েতে গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে ১১০টি। এতে ট্রেনের জানালার কাচ ভেঙেছে ১০৩টি এবং আহত হয়েছেন ২৯ জন। ১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারায় শাস্তির বিধান আছে। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের জন্য ১০ হাজার টাকা জরিমানার পাশাপাশি ১০ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের কথা বলা আছে। আর কোনো রেলযাত্রী মারা গেলে ৩০২ ধারায় ফাঁসিরও বিধান আছে। পাথর নিক্ষেপকারী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে, সে ক্ষেত্রে তার অভিভাবকের শাস্তির বিধান আছে।

মন্তব্য করুন


Link copied