আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১ ● ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ৩০ নভেম্বর ২০২১

কোচ জাতির পরিচয়

মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০১৪, বিকাল ০৫:৪৫

খগেন্দ্র হাজং

তখন ক্ষত্রিয় নিধনকারী পরশুরামের ভয়ে হাজো অঞ্চলের কোচেরা হাজো নগর ত্যাগ করে মেঘালয়ের পশ্চিমে বারো হাজারীতে এসে আশ্রয় নেয়। আরেক লোক কাহিনীতে পাওয়া যায়- কোচদের ধারণা ও বিশ্বাস তাদের আদি পিতা রাজা হাজো প্রথমে বড়বোন মুকদীকে বিয়ে করেন, মুকদী মারা গেলে তার ছোট বোন কুন্তীকে বিয়ে করেন। ওই হাজো রাজার বংশাতিবংশ বর্তমান বাংলাদেশে বসবাসরত সকল কোচ সম্প্রদায়। কারণ হাজো বংশের লোকেরাই অর্থাৎ কোচেরাই পরশুরামের ভয়ে হাজো অঞ্চল ত্যাগ করেন। হাজো অঞ্চল ত্যাগ করে প্রথমে সোনাপুর তারপর তিতিলী হাচেং (তেতুলবালি) স্থানে অবস্থান করেন। তিতিলী হাচেং জায়গায় জীবন ধারণ কষ্টসাধ্য হওয়ায় সে স্থান ত্যাগ করে, খাসী পাহাড়ের কুসুমবালা নামক স্থানে কিছু দিনের জন্য বসবাস করেন। সেখান থেকে কোচেরা গারো পাহাড়ে প্রবেশ করেন। এবং রং জেং নামক স্থানে কিছুদিন অবস্থান করেন। রংজেং ত্যাগ করে বর্তমান মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিম সমভূমি জায়গায় অবস্থান করেন। সেখানেই কোচদের এক পরাক্রমশালী নেতার নেতৃত্বে একটি কোচ রাজ্য গড়ে ওঠে। সেই রাজ্যটি পরবর্তীতে কোচ বিহার নামে পরিচিতি লাভ করে।

প্রাচীন কালে কোচ বিহারের নাম ছিল বধুপুর। পরবর্তীতে কোচ বিহার থেকেই বিভিন্ন সময় কোচেরা নানা দিকে দলে দলে বিভক্ত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ধারণা করা হয় মূল কোচের বিভিন্ন দল শেরপুর ও ময়মনসিংহে কোচ, ভাওয়ার জয়দেবপুর ও গাজীপুরে বর্মন, মান্দাই, বংশী, ময়মনসিংহ ও সুনামগঞ্জে হাজং, বানাই, ইত্যাদি নাম ধারণ করে বসবাস করতে থাকে। সে কারণে ইতিহাসে কোচেরা বিরাট স্থান দখল করে আছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহে জেলার প্রায় সকল ইতিহাস ও কীর্তিচিহ্নের সংগে কোচদের স্মৃতি অঙ্গাঅঙ্গীভাবে জড়িত। যেমন, ময়মনসিংহের পশ্চিমাংশর যোগী গোফা, ফলদা, নালুয়া, নরিল্লা, সুসং দুর্গাপুর প্রভৃতি স্থানের সকল অট্টলিকা, দেবালয় ও মঠ ইত্যাদি পুরার্কীতি ও ঐতিহাসিক স্থান একান্তভাবেই কোচ রাজাদের সাথে জড়িত। এছাড়া শেরপুরের ঝিনাইগাতী নদীর তীরে রাজা হরিশচন্দ্র বা ভগীরথের বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ধন বাড়ীতে ধনপৎ রাজার কীর্তি চিহ্ন, বানার নদীর তীরে আনু হাদিতে আনু রাজার পরিখা ও বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, ঘাটাইলের হোড় রাজার বাড়ির ধ্বংসাবশেষ, রাজ গোলা বাড়ীতে, রাজা যশোধরের বাড়ির জমকালোচিহ্ন ইত্যাদি এককালের ময়মনসিংহবাসী কোচদের ব্যাপক প্রভাব, প্রতিপত্তি ও রাজ্য শাসনের সাক্ষ্য বহন করে। তারপরেও ময়মনসিংহ অঞ্চলের অসংখ্য গ্রাম, গঞ্জ ও বিশালাকার পরিত্যক্ত দীঘি-পুকুর ও পরিত্যক্ত জন বসতির সংগে কোচদের নাম ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। ময়মনসিংহের শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সম্পদ ময়মনসিংহ গীতিকা ও পূর্ববঙ্গ গীতিকায় প্রচুর মাত্রায় কোচদের নাম ও ইতিহাস উল্লেখ পাওয়া যায়।  খন্ডখন্ড ভাবেও পৌরাণিক গ্রন্থে বহু কোচ শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। যেমন যোগীনিতন্ত্রম, পিঠমালা, ব্রক্ষবৈর্বত পুরান, বায়ু, মৎস, হরিবংশ, ব্রক্ষান্ড, মহাভারত-এ সমস্ত গ্রন্থে কোচ শব্দ পাওয়া যায়। যোগীনি শাস্ত্রে উল্লেখ আছে ক্ষত্রীয় নিধনকারী পরশু রামের ভয়ে যে সকল ক্ষত্রগণ সংকোচ অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন, সেই সংকোচ থেকে "কোচ" শব্দের উৎপত্তি। কোচবিহার ইতিহাসেও কোচ আদিবাসীদের বিক্ষিপ্তভাবে তথ্য জানা যায়। নেত্রকোণা জেলার মদনপুরের মদন কোচকে বশীভূত করেই হযরত শাহ সুলতান রুমী মদনপুরে নিজের প্রভাব বিস্তারে সমর্থ হয়েছিলেন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী মদনা কোচের দুই বোন নন্দীনী ও চান্দিনী নামে দু"টো রাজ্য ছিল। যথাক্রমে নন্দীপুর ও চন্দনকান্দিতে। এ দু"টো স্থানের নামটিও দুই বোনের নামের অনুসারে হয়েছিল। গৌরীপুরের বোকাই কোচ বা বোকাই নগরের বোকাই কোচ এবং গড়জরীপার দলিপ কোচ সে তো রীতিমত ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব। ভাষাচার্য গ্রীয়ার্সন সাহেব কোচদের ৬টি শাখা বা  দলের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলো যথাক্রমে ১. সাতপারি, ২. চাপ্রা, ৩. দশগাইয়া বা বানাই, ৪. তিনটিকিয়া ৫. হরিগাইয়া, ৬. ওয়ানাং। আসামের লোকগণনা প্রতিবেদনে ৬টি শাখার বা দলের কথা উল্লেখ থাকলেও প্রতিবেদনে কিন্তু হরিগাইয়া ও সাত পাইরাকে অভিন্ন বলা হয়েছে। এছাড়া মিঃ স্টেপল্টন সাহেব কোচদের আরও ২টি "দিয়াগা" ও "মারগান"  শাখার কথা উল্লেখ করেছেন। দুইটি শাখা বা দলের কথা যোগ করলে শাখার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮টি। এছাড়াও কুনপানি, সাথারি, মাসান্তি ইত্যাদির শাখার উল্লেখ পাওয়া য়ায়। সংখ্যা ৮ কিংবা ১১ যাই হোক না কেন কোচ সম্প্রদায় যে অনেকগুলো শাখা বা দলে বিভক্ত তাতে সন্দেহ নেই। অপরদিকে প্রতিটি শাখা বা দল আসলে আলাদা আলাদা কোনো বা ট্রাইব তাতেও সন্দেহের অবকাশ নেই। কোচদের এ সমস্ত শাখাগুলো গারো শাখার অনুরূপ যাহা হিন্দু বর্ণাশ্রম সমাজের নিরিখে এক একটি স্বতন্ত্র জাত বা বর্ণ। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়: বানাইরা কোচদের একটি শাখা হয়েও স্বতন্ত্র কোম বা জাত। এ সমস্ত শাখাগুলোকে কোচেরা ভাগ বলে অভিহিত করে। আবার প্রত্যেক শাখা বা ভাগের রয়েছে অনেকগুলো করে গোত্র। এ সমস্ত গোত্রগুলোকে কোচেরা হাজংদের মত নিকনী বলে অভিহিত করে। কোচদের এই রূপ গোত্র বা নিকনীর সংখ্যা প্রায় শতাধিক। এখানে কিছু সংখ্যক নিকনীর নাম উল্লেখ করা হলো-

১. কামা, ২. রানজে, ৩. মাজি, ৪. কারে, ৫. পিড়া, ৬. বালা, ৭. হানসুর দাহেং, ৯. দলফা, ১০. রাংসা, ১১. কারো ১২. বাসার ১৩. গিরি ১৪.স্কু ১৫. দাসু ১৬. কাশ্যপ ১৭. মেথুন ১৮. স্নাল ১৯. চিসিম ২. নাফাক ২১. রিচিল ২২. দফো ২৩. চিরান ২৪. হাজং ২৫. আ রেং ২৬. বক ২৭. নাবরা ২৮. তারেকোনা ২৯. বেতাছিং ৩০. ওয়ানং ৩১. দাংগু ৩২. জাজার ৩৩. কাংক্যালা ৩৪. দংচা ৩৫. হাছুনপাড়া ৩৬. দাহাপাড়া ৩৭. হাক্রা ৩৮. বানাই ৩৯. দাম্বুক ৪০. লং ক্রে ৪১. চিকু ৪২. তাকু ৪৩. তিকুমান্দা ৪৪. বান্দা ৪৫. তি ঘাউ ৪৬. কা দ্রাং ৪৭. হাচাম ৪৮. মুরং ৪৯. হাকক ৫০. নাবা ইত্যাদি। কোচদের মধ্যে সত্রোতে বা একই নিকনীতে বিবাহ নিষিদ্ধ। তাছাড়া নিকনীর বাইরেও চাচাত, মামাত, মেসতুত, ভাই বোনদের মদ্যে বিহা নিষিদ্ধ। কোচেরা বর্তমানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা মেনে চললেও ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকল সন্তান মায়ের নিকনীভুক্ত হয়। এই বিধানটি হাজংদের নিকনী প্রথা এবং গাড়োদের মাচং বিধানের মতই কার্যকর। তবে এ ব্যবস্থার মধ্যে একটা সুষ্ঠ বৈপরীত্য বিদ্যমান। কেননা একই সংগে মায়ের নিকনী ভুক্ত এবং পিতৃ সম্পত্তির অধিকারী পুত্র হলে প্রত্যেক পুরুষেরই সম্পত্তির মালিকানা এক নিকনী থেকে অন্য নিকনীতে চলে যায়। তাই কোচদের পিতৃতান্ত্রিকতার উত্তরণের প্রথম দিকে প্রত্যেক ছেলেদেরকে শাশুড়ীর বাড়িতে ঘরজামাই হিসাবে আসতে হতো। মাত্র ৭০ বছর পূর্বকালেও ঘরজামাই প্রথা তিন টিকিয়া কোচ সমাজে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। বর্তমানে কোচদের মধ্যে নিকনী প্রথা কেবল বিবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং ঘরজামাই প্রথা ব্যাপকভাবে নিহিত। তবে বিবাহকালে যৌতুক দিয়ে কন্যা বিবাহ দেওয়া এখনো ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বলতে গেলে এ প্রথা উত্তর উত্তর আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বুকানন হ্যামিল্টন বলেছেন- "মাত্র একশত বছর পূর্বপর্যন্ত গারো পাহাড়ের পানি কোচদের মধ্যে পুরো মাতৃতান্ত্রিকতার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল।" কোচ সমাজ বা কোচ সম্প্রদায়ের মধ্যে তিন টিকিয়া কোচেরা অন্যান্য কোচদের তুলনায় সামাজিক মর্যা দায় সর্ব নিম্ন বলে ধারণা করা হয়। অথচ তিনটিকিয়া কোচেরাই তাদের আদি পরিচয়ের সামাজিক বিধি বিধান, ভাষা, সংস্কৃতি প্রথা রীতিনীতি অদ্যাবধি বিরূপ পরিস্থিতিতেও বহন করে চলেছে। তাদের কেন তিনটিকিয়া কোচ বলা হয়। তার ব্যাখা হলো এই- পূর্বে তারা তিন টুকরা কাপড় শরীরে জড়িয়ে পরিধান করতো। প্রথমত : এরা গারোদের মত এক টুকরা কাপড় হাঁটুর নিম্নভাগ থেকে কোমর পর্যন্ত প্যাঁচিয়ে পরে। দ্বিতীয় আরেক টুকরা কাপড় বক্ষস্থল থেকে কোমর পর্যন্ত প্যাঁচিয়ে রাখে। তৃতীয় আরেক টুকরা কাপড় মাথায় ঘোমটার মত ঢেকে রাখে। ভাষা বিশেষজ্ঞরা গোয়ালপাড়া ও ঢাকার কোচদের ভাষার কয়েকটি নমুনা পর্যা লোচনা করে কোচদের ভাষাকে বাংলা অথবা অসমীয়া ভাষার সংমিশ্রণ বলে মত প্রকাশ করেছিলেন। মেজর প্লে-ফেয়ার গারোদের আত্তং ও রুগা উপভাষার সাথ তিনটিকিয়া কোচ ভাষার সাদৃশ্য লক্ষ্য করেছিলেন। তবে পরবর্তী গবেষণায় কোচদের স্বতন্ত্র ভাষার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিন্তু কোচদের আলাদা অথবা স্বতন্ত্র ভাষা বর্তমানে বিলুপ্তির পথে। কোচদের ভাষাকে কেই কেই গারো ভাষার সাক্ষাত সহোদরা বলে মনে করেন। এ বিষয়ে একটি লোকশ্রুতি রয়েছে। সোমেশ্বরী উপত্যকার গারো লোকশ্রুতি অনুযায়ী দেশ ত্যাগী ১২টি কোচ পরিবারের সংগে গারো পাহাড়ের সিজু অঞ্চলের গারোদের বৈবাহিক সংমিশ্রণের ফলে আত্তং গারোদের উদ্ভব। সেকারণে আত্তং গারো দলের কথ্য ভাষার সংগে কোচ ভাষার অনেক সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মেন আত্তং গারোরা ভাতকে "মাই" বলে। তদ্রুপ কোচেরাও ভাতকে "মাই" বলে। এরূপ বহু শব্দ রয়েছে যা আত্তং ও কোচ ভাষার সাথে মিলে যায়।

 লেখক : কার্যকরী সভাপতি, আদিবাসী ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

মন্তব্য করুন


Link copied