আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২১ ● ১১ কার্তিক ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ২৬ অক্টোবর ২০২১

সাত খুনের দায় স্বীকার নূর হোসেনের

মঙ্গলবার, ১৭ জুন ২০১৪, দুপুর ১২:১৪

Nur-Hossainনারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুনে নিজের সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছেন কলকাতায় গ্রেফতার নূর হোসেন। তবে ওই হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় একজন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্মতি ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের ছক সম্পর্কে ওই ব্যক্তিকে অবহিত করা হয়েছিল। বাস্তবায়নের পর তাকে দেশ ছাড়ার ব্যাপারেও পরামর্শ দিয়েছিলেন ওই ব্যক্তি। এ ছাড়া অর্থ সংকটের আগেই বিশ্বকাপ ফুটবলের জুয়ায় জড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নূর হোসেন। কলকাতার বাগুইহাটি থানায় রিমান্ডে থাকা নূর হোসেন এসব তথ্য দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

অন্যদিকে নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠি বিশেষ নোট দিয়ে পাঠানো হয়েছে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনে।

কলকাতার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইন্টারপোলের রেড নোটিসের কারণে অবৈধ অনুপ্রবেশ ছাড়াও রোমহর্ষক ওই সাত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে নূর হোসেনকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। নূর হোসেনসহ বাকিদের রাতভর জেরা করে বিধাননগর কমিশনারেটের অ্যান্টি টেররিস্ট সেল (এটিসি) এবং বাগুইহাটি থানা পুলিশ। তবে শুরুর দিকে মুখ খুলছিলেন না নূর হোসেন। পরবর্তীতে হত্যাকাণ্ডে নূরের জড়িত থাকার সব ধরনের প্রমাণ বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের কাছে রয়েছে, এমন কথা বলার পর কিছুটা ভড়কে যান তিনি। একপর্যায়ে কিছু কথা বলতে থাকেন। কেবল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে নয়, সরকারের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ব্যক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করেন নূর। তাদের নিয়মিতভাবে বখরাও দিতেন। তবে ঘটনার পর তাদের কোনো সহায়তা পাননি তিনি।

সূত্র আরও জানায়, স্থানীয় ওই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে নিহত নজরুলের হত্যাকাণ্ডের কিছু দিন আগে সম্পর্কের অবনতি হয়েছিল। ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতেই তিনি নূর হোসেনের মাধ্যমে নজরুলকে খুন করিয়েছিলেন। এ ছাড়া নূর হোসেনের সঙ্গে নিহত নজরুলের পূর্বশত্রুতা ছিল।

নূর হোসেনের কাছ থেকে আদায় করা তথ্যের ভিত্তিতে কলকাতায় বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানরত বাংলাদেশি ছয়জনকে খুঁজে বের করতে তাকে সঙ্গে নিয়ে রাতেই বিমানবন্দর-সংলগ্ন প্রতিটি পানশালাতেই তল্লাশি চালানো হয়। কৈখালির মতো জায়গায় নূর হোসেনের ডেরা বাঁধার পেছনে কোনো প্রভাবশালী মহল আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিধাননগর কমিশনারেটের আ্যাসিসটেন্ট কমিশনার অব পুলিশ (এসিপি) অনীশ সরকারের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, 'বিষয়টি নিয়ে তার কিছু জানা নেই। তবে এ ব্যাপারে সংবাদ মাধ্যমের কাছে কিছু বলা যাবে না'।

বেটিং চক্রে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন নূর! : হাতের অর্থ অনেকটাই শেষ হয়ে আসছিল নূরের। তবে এর আগেই পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে অর্থ রোজগারের জন্য বিশ্বকাপ ফুটবলের বেটিং চক্রে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। শীর্ষ সন্ত্রাসী আশিকের পরামর্শে এ নিয়ে কলকাতার রাজারহাট ও তার আশপাশের বেশ কয়েকজন দাগি অপরাধীর সঙ্গে সম্পর্কও গড়েছিলেন বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।

এ ছাড়া বারাসাত আদালতে মামলার জব্দ তালিকায় বাগুইহাটি থানার মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, নূর হোসেনের কাছ থেকে ২০০০ বাংলাদেশি টাকা এবং ১০০০ ভারতীয় রুপি ও তিনটি নোকিয়া ফোন উদ্ধার করা হয়। তার সহযোগী ওহিদুজ্জামানের কাছ থেকে ৫০০ ভারতীয় রুপি এবং একটি স্যামসং ফোন এবং খান সুমনের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি সিম্ফনি ফোন ও ২০৯০ ভারতীয় রুপি। এ ছাড়াও তাদের কাছ থেকে আরও উদ্ধার করা হয়েছে অতিরিক্ত নয়টি ভারতীয় সিমকার্ড।

সূত্রে খবর, এই অল্প রুপিতে আর বেশি দিন চলা যাবে না বুঝেই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন শুরু করেছিলেন নূর হোসেন। উপলক্ষ ছিল অতি দ্রুত কীভাবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ উপার্জন করা যায়। কারণ কলকাতায় এসেই প্রতিদিন পানশালায় মদ, জুয়ার আসর চালাতে গিয়েও প্রচুর অর্থ বেরিয়ে যাচ্ছিল তাদের। সর্বোপরি নিজের দেশ ছেড়ে বিমানবন্দর-সংলগ্ন কৈখালির মতো জায়গায় মাসের পর মাস ১৫ থেকে ২০ হাজার রুপি দিয়ে বাসা ভাড়া করে থাকা সম্ভব ছিল না। দেশে তার অবৈধ অর্থের উৎস বালুমহাল, ট্রাকস্ট্যান্ড এবং মাদক ব্যবসা সব কিছু বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আবার বৈধভাবে আয় করা অর্থগুলোও তিনি আনতে পারছিলেন না আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিশেষ নজরদারির কারণে। সব মিলিয়ে বেশ কিছুটা মানসিক চাপেও ছিলেন নূর হোসেন। তাই আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য ভারতীয় সিমকার্ডও জোগাড় করেছিলেন তিনি। দ্রুত অর্থ উপার্জনের সেরা উপায় হিসেবে তাদের হাতে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টের বিকল্প ছিল না।

সূত্র আরও জানায়, গত বৃহস্পতিবার কৈখালি-সংলগ্ন এলাকায় একটি পানশালাতে মদ খেতে গিয়েই যত বিপত্তি ঘটে। জানা যায়, রুপি নিয়ে পানশালা কর্তৃপক্ষের মধ্যে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন নূর হোসেনসহ তিনজন। এরপরই পানশালা কর্তৃপক্ষ গোটা ঘটনাটি পুলিশকে জানায়। পুলিশও তাদের ওপর নজরদারি শুরু করে। অবশেষে গত শনিবার রাতে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। রবিবার নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম এবং খান সুমনকে উত্তর চবি্বশ পরগনার বারাসাত আদালতে তোলা হলে আট দিনের পুলিশ রিমান্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়।

এদিকে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় অভিযুক্ত নূর হোসেন পুলিশি জেরার কাছে নিজের কৃতকর্মের দোষ স্বীকার করেছেন বলে জানা গেছে।

মুঠোফোন কললিস্ট পরীক্ষা হচ্ছে : নূর হোসেনের মোবাইল কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখছে বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ। গত শনিবার নূর হোসেন ও তার দুই সহযোগী ওয়াহিদুজ্জামান সেলিম ও খান সুমনকে গ্রেফতারের পর তাদের কাছ থেকে ভারতীয় রুপি এবং বাংলাদেশি টাকা উদ্ধারের পাশাপাশি নয়টি ভারতীয় মোবাইল সিমকার্ড, দুটি বাংলাদেশি সিমকার্ড এবং বেশ কয়েকটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়। নূর হোসেনের কাছে পাওয়া যায় তিনটি নোকিয়া মুঠোফোন। এরপরই মুঠোফোন এবং একাধিক ভারতীয় সিমকার্ডের বিষয়ে গ্রেফতারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। একই সঙ্গে পুলিশ জানতে চাইছে কত দিন ধরে তারা কৈখালিতে বাসা ভাড়া করে আছেন? এই কয়দিন কাদের কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন? বাংলাদেশি অপরাধীদের এখানে কারা এখানে আশ্রয় দেন তাও জানতে তৎপর হয়ে উঠেছে বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ।

এদিকে কলকাতা বিমানবন্দর-সংলগ্ন কৈখালির ইন্দ্রপ্রস্থ কমপ্লেঙ্রে এ/১১১ ব্লকের পঞ্চম তলার ৫০৩ নম্বর ঘরের মালিক সীমা সিংয়ের খোঁজে হন্নে হয়ে তল্লাশি অভিযান চালাচ্ছে পুলিশ। তবে তার বিরুদ্ধে এখনো কোনো মামলা হয়নি বলে জানা গেছে।

গতকাল সরেজমিন ইন্দ্রপ্রস্থ ভবনে ঢুকে দেখা যায় পিনপতন নীরবতা। গণমাধ্যমের কর্মী বলে পরিচয় দেওয়ার পর থেকেই ওই বহুতল আবাসনের নিরাপত্তারক্ষী থেকে শুরু করে আশপাশের ফ্ল্যাটগুলোর বাসিন্দারাও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে রাজি হননি। কেউ কেউ আবার গণমাধ্যমের সামনে মুখ খোলাকে 'ক্রিমিনাল অফেন্স' বলেও আখ্যা দিয়েছেন। যদিও অনেক অনুরোধের পর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সীমা সিংয়ের পাশের একটি ফ্ল্যাটের এক বাসিন্দা জানান, গণমাধ্যমেই বাংলাদেশি ব্যক্তির গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। তিনি বলেন, ওই বাড়ির প্রকৃত মালিক সীমা সিংকে তিনি কখনো দেখেননি। মূলত দালালের মাধ্যমে সীমা সিং তার ওই ফ্ল্যাটটি ভাড়া দিতে বলে জানা গেছে।

বিশেষ করে ওই বাসিন্দা আরও জানান, এর আগেও ওই ফ্ল্যাটটিতে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তার অভিযোগ, আরএনএস নামে একটি বেসরকারি সংস্থা এই আবাসনটির নিরাপত্তার দেখভালের দায়িত্বে থাকলেও নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো নয়।

ফিরিয়ে আনতে মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ : কলকাতায় আটক হওয়া নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। সন্ধ্যায় সেই চিঠি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ নোট দিয়ে পাঠানো হয়েছে নয়াদিল্লির বাংলাদেশ হাইকমিশন ও কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশনে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেছেন, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সাধারণভাবে যে সময়ের প্রয়োজন হয় তার চেয়ে দ্রুততর ভিত্তিতে করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় তাকে ফিরিয়ে আনা হবে তা ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পরই স্পষ্টভাবে জানানো সম্ভব হবে।

মন্তব্য করুন


Link copied