Templates by BIGtheme NET
আজ- মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২০ :: ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ :: সময়- ১২ : ০৭ অপরাহ্ন
Home / খোলা কলাম / পিএসসি পরীক্ষা বাতিল করে ওদের শৈশব ফিরিয়ে দিন

পিএসসি পরীক্ষা বাতিল করে ওদের শৈশব ফিরিয়ে দিন

ফাহমিদুল হক

fahmidul-haq-editedশিক্ষাবিদ এবং লেখক ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বিগত ৫ ডিসেম্বর, ২০১৪ তারিখে পত্রিকায় লিখেছিলেন, “আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির কিছু কিছু ঘোড়া, পিএসসি পরীক্ষা, জেএসসি পরীক্ষা মরে গেছে। শুধু তাই নয়, মৃতদেহ থেকে রীতিমতো দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করেছে। এখন যত দ্রুত সম্ভব এগুলোকে কবর দিতে হবে!”

তার এই লেখার বিপরীতে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ৯ ডিসেম্বর লিখেছিলেন, “যেহেতু এরকম একজন ব্যক্তিত্ব এই পরীক্ষা দুটোকে মৃত-পচা-দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে বলে আখ্যায়িত করেছেন, তখন আমরা নিশ্চয়ই শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের দিয়ে তদন্ত করে এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ করে করণীয় নির্ধারণ করব”। শিক্ষামন্ত্রীর কাছে বিনীত জিজ্ঞাসা, তদন্ত কতদূর এগুলো? সঠিক তথ্য সংগ্রহপর্ব কী শেষ হয়েছে? পিএসসি কী বন্ধ হচ্ছে? কবে হচ্ছে? আমরা তো মনে করি এটা আজই বন্ধ হওয়া দরকার। এই পরীক্ষাটি বাংলাদেশের সব শিশুর শৈশব হত্যা করছে।

জেএসসি থাকতে পারে, যেমনটি শিক্ষানীতিতে আছে, সেক্ষেত্রে এসএসসি থাকবে না, এইচএসসি থাকবে আগের মতোই। তো, যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে আপনি প্রশংসিত হয়েছিলেন, মাননীয় মন্ত্রী, সেই শিক্ষানীতিতে তো পিএসসি ছিল না। তাহলে ২০০৯ সালে ঝরে পড়ার হার গুনতে অথবা অন্যকোনও বিচিত্র কারণে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের জন্য এতবড় একটা পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা হলো, এটা থেকে গেল কেন?

আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, জেএসসি থাকতে পারে, যেমনটি শিক্ষানীতিতে আছে, সেক্ষেত্রে এসএসসি থাকবে না, এইচএসসি থাকবে আগের মতোই। তো, যে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে আপনি প্রশংসিত হয়েছিলেন, মাননীয় মন্ত্রী, সেই শিক্ষানীতিতে তো পিএসসি ছিল না। তাহলে ২০০৯ সালে ঝরে পড়ার হার গুনতে অথবা অন্যকোনও বিচিত্র কারণে পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের জন্য এতবড় একটা পাবলিক পরীক্ষার আয়োজন করা হলো, এটা থেকে গেল কেন? কেন প্রশ্নফাঁসের আরও একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করা হলো? প্রশ্নফাঁস করে দুর্বৃত্তরা, অসৎ উপায়ে অর্থকড়ি কামাবার জন্য। কিন্তু প্রশ্নফাঁসের এ কোন নতুন রূপ দেখছি আজ? এ তো দুর্বৃত্তের কর্ম নয়! নানান বৈধ পথে প্রশ্নকে বা তার কিছু অংশকে সহজলভ্য করা হচ্ছে, কখনও কখনও শিক্ষকদের ব্যবহার করা হচ্ছে বৈধ শিথিলতার কর্মসূচিতে – তা পরীক্ষার হলে বলে দেওয়া থেকে শুরু করে খাতায় উচ্চ নম্বর দেওয়া পর্যন্ত।

‘রাজশাহী পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত’ লিখতে গিয়ে কেউ যদি ‘পদ্দা’ লিখে, তবে তাকে পূর্ণমান দিতে হবে। অংকের উত্তর না মিললেও, ফর্মুলা ঠিক থাকলে নম্বর দিতে হবে। এভাবে পাঠদান চলে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করার অবকাশ আছে। কিন্তু তাদের পা‌‌‌সের হার বাড়িয়ে দিয়ে, উচ্চহারে জিপিএ ফাইভ পাইয়ে দিয়ে কোন উন্নয়ন হচ্ছে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী?

আমার মেয়ে বাংলা পরীক্ষা দিয়ে এসে বললো, জয়নুলের প্রশ্ন যে আসবে বন্ধুরা সবাই আগে থেকে জানতো। জয়নুলের সেই প্রশ্ন, যা নাকি ‘সৃজনশীল’ অংশের অন্তর্ভুক্ত, তা সহজলভ্য করে দেওয়ার মানে হলো, সেই অপেক্ষাকৃত কঠিন অংশটি যেন শিশুরা সহজে উত্তর দিতে পারে। এবং তারা সবাই পাস করে যায়। যেন প্রচুর জিপিএ ফাইভ পায়। এইতো? এটা কোন ধরনের সৃজনশীলতার চর্চা? যে বিষয়টি অনুশীলন করা হয়েছে স্কুলে স্কুলে, সেটিকেই সহজলভ্য করে দেওয়ার পর সৃজনশীলতার কতটুকু অবশিষ্ট থাকে? ওদিকে ‘সৃজনশীল গাইডবই’ বেরিয়ে গেছে। এ তো সম্পূর্ণ অসৃজনশীল পদ্ধতিতে সৃজনশীলতার চর্চা!
আমাদের চেনা, আত্মীয়দের মধ্যে অনেকেই স্কুলশিক্ষক আছেন। তাদের কাছ থেকে তো আমরা সব জেনে যাচ্ছি, কী কী নির্দেশনা তাদের দেওয়া হয়। ‘রাজশাহী পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত’ লিখতে গিয়ে কেউ যদি ‘পদ্দা’ লিখে, তবে তাকে পূর্ণমান দিতে হবে। অংকের উত্তর না মিললেও, ফর্মুলা ঠিক থাকলে নম্বর দিতে হবে। এভাবে পাঠদান চলে কিনা তা নিয়ে বিতর্ক করার অবকাশ আছে। কিন্তু তাদের পা‌‌‌সের হার বাড়িয়ে দিয়ে, উচ্চহারে জিপিএ ফাইভ পাইয়ে দিয়ে কোন উন্নয়ন হচ্ছে মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী? কোন দাতার কোন শর্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে এইসব তুঘলকী কাণ্ড ঘটে চলেছে? কোন ‘ডেভেলপমেন্ট গোল’ অর্জন করতে গিয়ে সব বরবাদ হয়ে যাচ্ছে?

আমাদের জিডিপি বাড়ছে, আমরা খুশি। কিন্তু আমাদের জিপিএ বাড়লে তো আমরা খুশি হতে পারছি না। বরং আমরা খুবই শঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ যে, প্রাথমিক শিক্ষায় যা ঘটে চলেছে, তাতে পড়াশোনা, পরীক্ষা সম্পর্কে খুব ভুল ধারণা নিয়ে শিশুরা বড় হচ্ছে। নিজের অতিমূল্যায়িত নম্বরের ফাঁদে পড়ে সে নিজের সম্পর্কেও ভুল জানছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় তাই পাস করতে পারছে না অনেক জিপিএ ফাইভ অর্জনকারী।

অভিভাবকদের কাছে অনুরোধ, আপনার শিশুকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে দিন। প্রত্যেক শিশুর জন্যই অপেক্ষা করে সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ বিনষ্ট হতে পারে যথাযথ পরিচর্যা ও দিকনির্দেশনার অভাবে।

আমরা জানি, প্রশ্নফাঁস নিয়ে সব অভিভাবকের আপত্তি আছে। কিন্তু পিএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনেকেরই আপত্তি নেই। অনেকেই মনে করেন, দুষ্টু-বেয়াড়া বাচ্চাদের পড়াশুনায় আটকে রাখার সর্বোত্তম পন্থা হলো ঘন ঘন পরীক্ষা নেওয়া। সেটা যদি বড় পাবলিক পরীক্ষা হয়, তবে তো আরও ভালো! কিন্তু অভিভাবকদের এই অংশটিও ভ্রান্তিতে পড়ে আছেন। অভিভাবকদের কাছে অনুরোধ, আপনার শিশুকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে দিন। প্রত্যেক শিশুর জন্যই অপেক্ষা করে সুন্দর ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ বিনষ্ট হতে পারে যথাযথ পরিচর্যা ও দিকনির্দেশনার অভাবে। আবার অতি-পরিচর্যাও তার মানসিক প্রবৃদ্ধি রুখে দিতে পারে।

শিশুদের ক্লাসের পড়াশোনার যেমন দরকার রয়েছে, স্কুল-সিলেবাসের বাইরেও চলমান যে বিচিত্র-চঞ্চল জগৎ, সন্তানদের তার সন্ধান দেওয়াও সমান দরকারি। এই দায়িত্ব অভিভাবকেরই।

শিশুদের জন্য প্রয়োজন ক্রীড়াময় ও আনন্দময় এক শৈশব। তাকে বহু পরীক্ষার চাপে ও এ-প্লাসের ইঁদুর-দৌড় থেকে যত দূরে রাখা যায় ততই মঙ্গল। যারা মনে করেন, পিএসসি পরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে, এবং যারা জিপিএ ফাইভের লক্ষ্যে সন্তানসহ নিজেরাও জান দিয়ে ফেলছেন, আমি মনে করি তারা নিজের সন্তানের ক্ষতি নিজেরাই করছেন। শিশুদের ক্লাসের পড়াশোনার যেমন দরকার রয়েছে, স্কুল-সিলেবাসের বাইরেও চলমান যে বিচিত্র-চঞ্চল জগৎ, সন্তানদের তার সন্ধান দেওয়াও সমান দরকারি। এই দায়িত্ব অভিভাবকেরই। বিশ্ব সাহিত্যের পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের রয়েছে অফুরান এক ভাণ্ডার। তার সন্ধান তাকে দিতে হবে। দেশি-বিদেশি রূপকথার গল্পগুলো হাজির করে তার কল্পনাশক্তিকে উসকে দিতে হবে। দৈনন্দিন বিজ্ঞান, পৃথিবীর ভূগোল-ইতিহাস সম্পর্কিত যে রকমারি বই-পুস্তক রয়েছে, তার সবকিছুর হদিস পাঠ্যবইতে পাওয়া যাবে না। এসব অবলম্বন করেই নির্মিত হয়েছে কত চমৎকার কাহিনী ও প্রামাণ্য চলচ্চিত্র! জিপিএ ফাইভের চাইতে শিশু বয়সে এই সিলেবাস-বহির্ভূত পাঠ কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কম্পিউটার গেমসের চাইতে মাঠের কোণে ফুটবল খেলা কিংবা গলির রাস্তায় ক্রিকেট খেলা, তার শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বেশি দরকারি। আমার সেইসব অভিভাবকদের ভর্ৎসনা করতে ইচ্ছে করে, যারা ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন নিজ সন্তানের হাতে তুলে দেন। তারা বর্তমানকে যেকোনওভাবে মোকাবেলা করে আসলে সন্তানের ভবিষ্যৎকেই বিনষ্ট করছেন। এই সন্তান নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে কেবলই পরমুখা হয়ে উৎরে যেতে চাইবে বাকি জীবন।

আমার দৃঢ় ধারণা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখন ঘোর সংকটে নিপতিত। এই সংকট আমাদের কাটিয়ে উঠতে হবে। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সেটা এমনি এমনি হবে না। এজন্য আমাদের কাজ করতে হবে, আন্দোলন করতে হবে। তাই আমরা গঠন করেছি ‘শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন’।

আমারা কয়েকটি দাবিতে কাজ করছি – পিএসসি পরীক্ষা বাতিল করতে হবে, সকল পর্যায়ে প্রশ্নফাঁস বন্ধ করতে হবে, এ-প্লাসের অতিমূল্যায়ন বন্ধ করতে হবে, শিক্ষকদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করার প্রশাসনিক-রাজনৈতিক চাপ প্রত্যাহার করতে হবে, নিম্নমানের বই-বাণিজ্য, অতিরিক্ত ফি-বাণিজ্য, ডোনেশন-বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। শিক্ষাক্ষেত্রের ঘোর সংকট কাটাতে, আমাদের শিশুদের শৈশব রক্ষা করতে, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের নিশানায় স্থিরতা আনতে দাবিগুলো দেশের সকল অভিভাবক ও সচেতন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আমরা আশা করছি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের দাবি বিবেচনায় নেবেন এবং পিএসসির মতো শৈশবহত্যাকারী পরীক্ষা প্রত্যাহার করবেন।

ফাহমিদুল হক: শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য, শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলন।

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful