Templates by BIGtheme NET
আজ- সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২০ :: ৬ আশ্বিন ১৪২৭ :: সময়- ৯ : ১৪ অপরাহ্ন
Home / টপ নিউজ / মুষ্ঠির চালে সমম্বিত ফুড ব্যাংক

মুষ্ঠির চালে সমম্বিত ফুড ব্যাংক

আজহারুল আজাদ জুয়েল

IMG_2918 copyরেজিনা, সুলতানা, মারুফা, সেলিনা, তহুরা, বেবি আরা’রা হলেন শিবকুড়ি গ্রামের গৃহবধূ। আর সব গ্রামের গৃহবধুরা যেমন, তাঁরাও তাই। তাঁরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠেন, ঘর-বারান্দা-আঙ্গিনা ঝার দেন, গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগী ছেড়ে দেন, বাড়ির বাইরে তাড়িয়ে নেন, গোবরগুলো বাইরে ফেলে আসেন, তারপর রান্না করেন, স্বামী-সন্তানদের খাওয়ান, নিজেরা খান। এভাবে তারা তাদের নিত্যকর্ম সারেন আর সব সাধারণ গৃহবধূদের মত।
কিন্তু এইসব কাজের বাইরে আরেকটি কাজ করেন তারা, যা তাদেরকে অন্য গৃহবধূদের চেয়ে একটু ভিন্নতা এনে দিয়েছে। স্বামীদের কাছে সম্মানিত হচ্ছে এবং পরিবারে ও সমাজে নিজেকে ক্ষমতায়িত করেছে। তারা নৈমিত্তিক কাজের ফাঁকে প্রতিদিন এক মুষ্ঠি করে চাল সংগ্রহ করছেন। ব্যক্তিগত সংগ্রহের এই চাল প্রতি ১৫ দিন অন্তর “সমন্বিত ফুড ব্যাংক” এ জমা করছেন। চাল জমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টির পাশাপাশি নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন।

শিবকুড়ি গ্রামটি দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলাধীন পুনট্টি ইউনিয়নের একটি বিশেষ গ্রাম। এখানকার নারীরা পল্লীশ্রী নামের একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠণের সহযোগিতায় বিভিন্ন ইস্যুতে সচেতন হয়েছেন এবং নারী ক্লাব গঠণের মাধ্যমে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ফুড ব্যাংকে চাল জমা রেখে খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টিতে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখা তাদের সচেতনতার একটি বহিঃপ্রকাশ।

‘ইরি লাগানোর সময় আমাদের অভাব থাকে। চাউলের সংকট থাকে। তখন ফুড ব্যাংকে জমানো চাউল নিয়ে নিজের প্রয়োজন মেটাই।’ জানালেন শিবকুড়ি নারী ক্লাব সদস্য সুলতানা রাজিয়া।

দুই সন্তানের জননী সুলতানার স্বামী মমতাজ আলী হলেন একজন সাধারণ কৃষক। যিনি নিজেও তার স্ত্রীর সাথে মুষ্ঠির চাল ফুড ব্যাংকে নিয়মিত জমা করে আসছেন। মমতাজ জানালেন, আগে তাদের আর্থিক অবস্থা ভাল ছিল না। ঘর-বাড়ি ভাঙ্গা ছিল। এখন অবস্থা বদলেছে। আগের মত দুঃখ, কষ্ট তাদের নেই।

পল্লীশ্রীর সহযোগিতায় গড়ে ওঠা এই নারী ক্লাবে সদস্য রয়েছেন ৩৮ জন। যারা রেজিনার মত নিজেদের বাড়িতে মুষ্ঠির চাল সংগ্রহ করে ১৫ দিন অন্তর সমন্¦িত ফুড ব্যাংকে জমা দিচ্ছেন। ১৮ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে সফল নারী রেজিনার সাথে আলাপ হয় তাঁর শিবকুড়ির বাড়িতে। তিনি বলেন, আমরা ইংরেজী মাসের ৫ হতে ১০ তারিখের মধ্যে আমাদের মুষ্ঠির চাল ফুড ব্যাংকে জমা করে দেই।

ক্লাবের আরেক সদস্য বেবি আরা (৩৫) বলেন, চাল জমা দেয়া হয় ওজন করে। জন প্রতি ১৫ দিনে ১ কেজি, এক মাসে ২ কেজি করে চাল জমা হয়। ১৫ দিনে কারো কারো মুষ্ঠির চাল ১ কেজির বেশি হয়ে যায়। তখন অতিরিক্ত চাল ফেরত দিয়ে শুধু ১ কেজি রাখা হয়। আবার কারো চাল ১ কেজির চেয়ে কম হলে তাকে আরো চাল দিয়ে ১ কেজি পুরণ করে দিতে বলা হয়।

হিসাবে যেন গোলমাল না হয়, সেই জন্য এই ব্যবস্থা বলে জানালেন সেলিনা বেগম, নারী ক্লাবের আরেক সদস্য।

ভাতের চাল ঝারা, বাছার পর এক মুষ্ঠি চাল আলাদাভাবে তুলে রাখা বাংলাদেশের গৃহবধূদের একটি প্রাচীন সংস্কৃতি। এই পদ্ধতিতে চাল সংগ্রহের পর বিপদের সময় কাজে লাগানোর প্রথাটি সাম্প্রতিক কালে প্রায় উঠে গেছে। কিন্তু এই প্রথা নারীর ক্ষমতায়ন বৃদ্ধিতে সহায়ক বলে মনে করছে পল্লীশ্রী। সংগঠণটি নারীর ক্ষমতায়নে কাজ করছে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে। তাদের একটি কর্মসূচির নাম ‘নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সুযোগ সৃষ্টি প্রকল্প।’ এই প্রকল্পের আওতায় গ্রহণ করা হয় সমন্বিত ফুড ব্যাংক কর্মসূচি।

পল্লীশ্রীর নির্বাহি পরিচালক শামীম আরা বেগম বলেন, এক সময় উত্তরবঙ্গের দরিদ্র মানুষ চরম খাদ্য সংকটে থাকত। সংকট মোকাবেলার জন্য অনেকে শ্রম ও ফসল আগাম বিক্রি করে দিত। কেউ কেউ জমি বর্গা দিত। এর সাথে মহাজনি প্রভাব, নারী নির্যাতনের বিষয়গুলি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত থাকত। এই প্রেক্ষাপটে আমরা তখন ভাবি যে, মহিলাদের মুষ্ঠির চাল সংগ্রহের পদ্ধতিকে যদি সাংগঠনিক রুপ দেয়া যায়, তাহলে তাদের ক্ষমতায়নে এবং মহাজনি দৌরাত্ব দূরীকরণে তা গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে পারবে। আমাদের এই ভাবনা ১৯৯৩ সালে পুনট্টি ইউনিয়নের চকমুসা গ্রামে রুপালী নারী দলের সদস্যদের মাঝে শেয়ার করি। মুষ্ঠির চাল সমন্বিত ভাবে জমা করার বিষয় নিয়ে রুপালী নারী দলের সদস্যরা আলোচনা করেন। তারা একমত হলে তাদেরকে সহায়তা করতে আমরা রাজি হই। চকমুসার উদ্যোগ পরে ‘নারীর ক্ষমতায়নে সুযোগ সৃষ্টি প্রকল্প’র মাধ্যমে পল্লীশ্রীর অন্যান্য কর্ম এলাকাতেও ছড়িয়ে দেই।

শামীম আরার মতে, বর্তমানে খাদ্য সংকট তখনকার মত প্রকট না হলেও নারীর ক্ষমতয়নে এই কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায়নি।
‘নারীর ক্ষমতায়নে সুযোগ সৃষ্টি প্রকল্প এর প্রকল্প সমন্বয়কারী মোঃ সেলিম রেজা বলেন, পল্লীশ্রী নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষে সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে ব্রেড ফর দ্যা ওয়ার্ল্ড- জার্মানী’র সহায়তায় সমন্বিত ফুড ব্যাংক কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এর উদ্দেশ্য হলো; কমিউনিটি পর্যায়ে খাদ্য সংরক্ষণ ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংকটকালীন সময়ে অতি দরিদ্র মানুষের খাদ্য ঘাটতি পুরণ করা, দাদন ব্যবসায়ী ও মহাজনদের হাত হতে অতি দরিদ্রদের সম্পদ রক্ষা ও বৃদ্ধি করা, আগাম শ্রম ও ফসল বিক্রি বন্ধ করা, এবং নারী নির্যাতন হ্রাস করা।

পল্লীশ্রী চকমুসার নারী সদস্যদের চাল সংগ্রহের জন্য একটি খাদ্য গোলা দেয়। নিজ নিজ বাড়িতে জমানো চাল ১৫ দিন অন্তর এই বাক্সে বা ব্যাংকে জমা দেয় সদস্যরা। সকল সদস্যের সমপরিমান চালে ব্যাংক ভর্তি হয়ে গেলে ৪০ কেজি রেখে বাকি চাল বিক্রি করে দেয়া হয়। বিক্রি হওয়া চালের টাকা পরে সদস্যদের মাঝে বন্টন করা হয়।

চকমুসায় কর্মসূচি সফল হওয়ার পর দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এ পর্যন্ত ২৫টি ফুড ব্যাংক গড়ে উটেছে। এর মধ্যে চিরিরবন্দরের শিবকুড়ি,ব্রম্মপুর, বাসুদেবপুর, অমরপুরে ৪টি, কাহারোলের বনড়া, পৌরিয়া, দৌলতপুর, রামচন্দ্রপুরে ৪টি, বিরলের ঢেলপীর, ভগবানপুর, কাশিডাঙ্গা, দামাইলে ৪টি, ফুলবাড়ির সূর্যপাড়া, জামাদানী, মোক্তারপুর, পাকাপান গ্রামে ৪টি, বীরগঞ্জের চকমহাদেব, ব্রাম্মনভিটা, মাঝবোয়াল ও চৌপুকুরিয়ায় ৪টি এবং সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর, সব্জীবাগান, গোয়ালপাড়া,বড়মনিপুর ও মিয়াজিপাড়ায় ৫টি সমন্বিত ফুড ব্যাংক রয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সুযোগ সৃষ্টি প্রকল্পের- চঙডঊচ এর প্রোগ্রাম ফ্যাসিলিটেটর শাহীন আখতার জানালেন, বর্তমানে ২৫টি সমন্বিত ফুড ব্যাংকে ১ হাজার ৮০ কেজি চাল মজুদ রয়েছে। এই মজুদ সার্বক্ষণিকভাবে রাখা হয় যেন সদস্যরা খাদ্য সংকটে পড়লেই মজুদ থেকে প্রয়োজনীয় চাল নিতে পারেন।

তিনি জানালেন যে, সাধারনত প্রতিটি ফুড ব্যাংকে ৪০ কেজি চাল মজুদ রেখে অতিরিক্ত চাল বিক্রি করে দেয়া হয়। চাল বিক্রির টাকা সঞ্চয়ে রেখে যার যখন প্রয়োজন তিনি তার টাকা তুলে নিয়ে প্রয়োজন মত কাজে লাগাতে পারেন।

চিরিরবন্দরের সমন্বিত ফুড ব্যাংক কর্মসূচির গুরুত্বপুর্ণ একটি গ্রাম হলো খেরকাটি। এর সদস্যরা মুষ্ঠির চালের টাকায় অনেক সম্পদের মালিক হয়েছেন। মুষ্ঠির চাল বিক্রির টাকা দিয়ে জ্যোসনা, সায়মা, মনজুয়ারা, আনোয়ারা, মনোয়ারা, নূরজাহান গাই-বাছুর ও গরু কিনেছেন, ধনবালা, সুমিতা, আয়শা, সামিয়া, রোকেয়া, রাজিয়া, হালিমা, বিলকিস , তাহেরা, মামনি, পারুল, ফাতেমা, শাহিনা ছাগল ও ভেড়া কিনেছেন। মৌসুমী ও সোমেনা কিনেছেন স্বর্ণের দুল। ফজিলা, খাদিজা ও রুবিনা কিনেছেন ঘরের দরজা। মমিনা কিনেছেন মেলামাইনের গামলা।

মুষ্ঠির চালের টাকায় কেউ কেউ স্বামী, সন্তানের চিকিৎসা খরচ চালিয়েছেন। এরকম কয়েকজন হলেন জ্যোসনা, জাহেদা। সন্তানের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন নুরবানু। চালের টাকা ব্যবসায় খাটিয়েছেন খাদিজা। এভাবে মুষ্ঠির চাল বিক্রির টাকা বহুমুখি কাজে ব্যবহার করেছেন সমন্বিত ফুড ব্যাংক বা নারী ক্লাবের সদস্যরা। মনজুয়ারার ১৬ হাজার টাকায় কেনা আড়িয়া এবং মনোয়ারার ১২ হাজার টাকায় কেনা গাভীন গরু এখন আরো বড় ও তাজা হয়েছে। মনজু বলেন, মুষ্ঠির চাল আগেও জমাতাম। কিন্তু গরু কিনতে পারিনি। তখন অল্প কয়েক কেজি চাল জমা হলেই তা সংসারের কাজে লাগিয়েছি। কিন্তু ফুড ব্যাংকে চাল জমিয়ে টাকার অংক বড় করতে পেরেছি এবং গরু কিনেছি। এর ফলে আম্রা মধ্যে সাহস এসেছে যে, মুষ্ঠির চালে হয়তো আরো মূল্যবান কিছু নিতে পারব।

চকমুসায় সমন্বিত ফুড ব্যাংক কর্মসূচি চালু হয়েছে ২১ বছর আগে। কিন্তু শিবকুড়ি গ্রামে চালু হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এখানে নারীদের পাশপাশি কয়েকজন পুরুষও এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। এরা হলেন সুলতানা রাজিয়ার স্বামী মমতাজ আলী, মারুফ বেগমের স্বামী সাইফুল ইসলাম, সেলিনা বেগমের স্বামী আব্দুল কাদের, মোছাঃ বেগমের স্বামী বেলাল হোসেন, সারাবান তহুরার স্বামী জহুরুল ইসলাম এবং রেজিনা ইয়াসমিনের স্বামী কামরুজ্জামান।

পুরুষ সদস্যদের কাছে প্রশ্ন ছিল, মুষ্ঠির চালে আপনি কেন?

উত্তরে কামরুজ্জামান বলেন, আমার স্ত্রী মাসে ২ কেজি করে চাল ফুড ব্যাংকে রাখায় বিপদের সময় যথেষ্ট উপকার পাইছিলাম। আমি ভাবি, আমার নামেও যদি চাল জমা করতে পারি, তাইলে দুই নামে আমাদের অনেক চাল জমবে। ঐ চাল বড় কাজে লাগাতে পারব ভেবে আমি মুষ্ঠিরচালে যোগ দিয়েছি।

অন্যদের বক্তব্যও একই রকম। স্ত্রীদের চাল সংগ্রহের এই পদ্ধতিকে তারা সমর্থন করেন। তাই সংসারের উন্নয়নের স্বার্থে তারা নিজেরাও এর সাথে যুক্ত হয়েছেন বলে জানালেন।

দিনাজপুর জেলায় সমন্বিত ফুড ব্যাংক কর্মসূচি একটি আলোচিত এবং নন্দিত কর্মসূচি। নারীদের ক্ষমতায়ন ও খাদ্য নিরাপত্ত সৃষ্টিতে এই কর্মসূচি যাত্রা করলেও এখন অনেক স্থানে পুরুষেরাও এর সাথে যুক্ত হয়ে স্ত্রীদের উৎসাহিত করছেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট
ইমেইল- [email protected]

Social Media Sharing

ăn dặm kiểu NhậtResponsive WordPress Themenhà cấp 4 nông thônthời trang trẻ emgiày cao gótshop giày nữdownload wordpress pluginsmẫu biệt thự đẹpepichouseáo sơ mi nữhouse beautiful