আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ৪ অক্টোবর ২০২২ ● ১৯ আশ্বিন ১৪২৯
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ৪ অক্টোবর ২০২২
 
 
শিরোনাম: রংপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় ২ জন নিহত       পঞ্চগড়ে নৌডুবিতে ইজারাদার ও অদক্ষ মাঝিকে দায়ী করে প্রতিবেদন দাখিল       অপুকে ডিভোর্সের ১৪৮ দিন পর বুবলীকে বিয়ে করেন শাকিব       সয়াবিন তেলের দাম লিটারে কমল ১৪ টাকা       বিএনপির চেয়ে আওয়ামী লীগ এক ডিগ্রী বেশি- রংপুরে জিএম কাদের      

এপার-ওপারের স্বজনদের  কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত

বৃহস্পতিবার, ৩১ মার্চ ২০২২, বিকাল ০৫:০৪

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: কঠোর নিরাপত্তার জোরদার করেছিল বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বিজিবি। সাথে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ)। কোনো ভাবেই মানাতে পারছিল না দুই বাংলার স্বজনরা। এক পর্যায়ে পাহরা শিথিল করায় দুই দেশের হাজারো নারী-পুরুষ আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। আর একেকজনকে দেখতে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

বুধবার (৩০ মার্চ) স্বজনদের সাথে কুশল আর উপহার সামগ্রী বিনিময়ের মধ্য দিয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার গোড়ল ইউনিয়নের ঘোঙ্গাগাছ সীমান্তের নো-ম্যান্স ল্যান্ডে মালদহ নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয়েছে কান্নাকাটির মেলা।

তাদের মধ্যে ৮০ বছরের বৃদ্ধা নমিতা রানী। তার মেয়ে দেখেন না প্রায় ১২ বছর ধরে। দেশের মরণব্যাথী করোনা ভাইরাস আসার আগে ভিসা করেছিল। কিন্তু সেই ভিসার মেয়াদ শেষ। অভাবের কারণে আর করতে পারছিল না। দুই দেশের এমন সুযোগ করে দেয়াতে খুশি বৃদ্ধা নমিতা রানী।

শ্যামে পূজা উপলক্ষে এপার-ওপার বাংলার লাখো বাঙালির মিলন মেলায় সম্পর্কের টানের কাছে যেন হার মেনেছে কাঁটাতারের বেড়া। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিভক্তি ভুলে পাসপোর্ট-ভিসা, অবৈধ অনুপ্রবেশ, বিজিবি-বিএসএফের বাধা-সবকিছু উপেক্ষা করে বাংলাদেশ-ভারতের নারী-পুরুষ, শিশু-যুবক, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার উপচে পড়া এ ঢল শুধুই উচ্ছাস আর আবেগের। মিলন মেলায় বেশিভাগ বিলুপ্ত দেখাগেছে, বিলুপ্ত ছিটমহলের দুই বাংলায় বসবাসকৃত মানুষজনের আত্মীয়-স্বজনরা । তারাই দেখা করতেন এসেছেন, এতে দুই বাংলার হাজার হাজার পরিবার সমবেত হয়েছিল।

কুড়িগ্রাম থেকে আসা অজয় কুমার জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে মেয়ের বিয়ে দেন দিনহাটাতে। কিন্তু  অভাব আর অনটনের কারণে ভারতে গিয়ে দেখা করতে পারেনি তারা। এবার সুযোগ পেলেও কাটা তারের ব্যবধানে হাত ছোয়া হলো না। কান্না বিজরিত কন্ঠে তিনি জানান, এপারে দাঁড়িয়ে ওপারে মেয়ে ও স্বজনদের দেখা আর কথা বলার সুযোগ পেলাম। আর কিছু দিতে পারলাম না।

বৃদ্ধ প্রতাপ চন্দ্র রায় (৭৫) তার ছেলে বিষ্ণু চন্দ্র রায়ের (৪৮) সাথে এসেছিলেন তার মেয়ে নারায়নী রানীর (৪৫) সাথে দেখা করার জন্য। নারায়নী বিয়ে করে ভারতে বসবাস করছেন। চার বছর মেয়ের সাথে দেখা হলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন প্রতাপ চন্দ্র। তার মেয়ে নারায়নীও কান্নায় বেঙ্গে পড়েন। বাবা-মেয়ে একে অপরের গলা জড়াজড়ি করে বেশ কিচুক্ষন কান্নাকাটি করেন। সেই সাথে তাদের আত্মীয় স্বজনরাও কান্নায় মেতে উঠেন।

প্রতাপ চন্দ্র রায় বলেন,’ আমার শরীরের অবস্থা ভালো নেই। যেকোন সময় মারা যেতে পারি। তাই মরার আগে মেয়ে নারায়নীকে দেখার জন্য সীমান্তে কান্নাতাটির মেলায় আসেন।’ ‘আমি মেয়েকে কিছু খাবার উপজার দিয়েছি। মেয়েও আমার জন্য খাবার এনেছিল,’ তিনি বলেন। ‘আমাদের পাসপোর্ট করার সামর্থ্য না থাকায় সীমান্তে কান্নাকাটির মেলায় আসি ভারতীয় আত্মী-স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্য,’ তিনি বলেন।

প্রতাপের মেয়ে নারায়ল রানী (৪৫) বলেন, প্রায় ২৮-২৯ বছর আগে ভারতীয় নাগরিকের সাথে তার বিয়ে হয়। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার সিতাই থানার গোবিন্দপাড়া গ্রামে বসবাস করছেন। চার বছর তিনি তার বাবা সহ বাংলাদেশি আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা করার সুযোগ পেলেন। ‘বাবা খুব অসুস্থ্য। তাকে দেখে আমি কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি,’ তিনি জানান। ‘আমি অসুস্থ্য বাবা ও বাংলাদেশি আত্মীয স্বজনের জন্য কিছু উপহার এনেছিলাম। বাংলাদেশি আত্মীয়-স্বজনরাও আমাদের উপহার দিয়েছেন,’ তিনি বলেন।

ভারতীয় নাগরিক সুরেশ চন্দ্র রায় বলেন, আমার অসংখ্য আপনজন বাংলাদেশে বসবাস করছেন। ভারতেও আমার অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছেন। আপনজনদের ছেড়ে কষ্টে বসবাস করছি। অনেক দিনপর দাদাসহ বাংলাদেশি আত্মীয় স্বজনদের দেখা হওয়ায় আমি খুশি হয়েছি। মাঝে মধ্যে এই ব্যবস্থা করলে গরীব মানুষ গুলোর সুবিধা হয়।

সীমান্তে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও ভারতীয়রা বলেন, উভয় দেশের নাগরিক মালদহ নদীতে পুণ্য স্নান করেন। বিমেষ করে ভারতীয় নাগরিকরা কাটাতারের বেড়ার পাশে ভেরভেরি এলাকায় গঙ্গাপুজা করার পর মালদহ নদীতে পুণ্য স্নান করে থাকেন। করোনা মহামারীর কারনে গেল দুই বছর সীমান্ত মেলাটি বন্ধ থাকায় এবছর দর্শনার্থীদের ভিড় ছিলো উপচেপড়া।

গোড়ল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আমিন বলেন, দুই দেশের  মিলন মেলায় লালমনিরহাটসহ পাশের জেলা রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার বিভিন্ন স্থান থেকে কয়েক হাজার বাংলাদেশি এসেছিল। অধিকাংশ মানুষ এসেছিলেন ভারতে বসবাসরত আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করার জন্য। উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে মেলাটি শান্তিপুর্ণভাবে হয়েছে। কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই বিকেল ৫টায় পযর্ন্ত সীমান্তে মালদহ নদীর তীরে ভীড় ছিলো মানুষজনের। পরে সন্ধ্যায় ভারতীয় বিএসএফ’র সদস্যরা সরিয়ে দেন সবাইকে।

মন্তব্য করুন


Link copied