আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ১৬ আগস্ট ২০২২ ● ১ ভাদ্র ১৪২৯
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ১৬ আগস্ট ২০২২
 
PMBA

রংপুর মেডিকেল: যেখানে মরেও শান্তি নেই

শনিবার, ২ জুলাই ২০২২, দুপুর ১০:৩০

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বাইরে স্ট্রেচারে পড়ে আছে জেলার পীরগঞ্জের আবুল কাশেমের বাবার লাশ। তিনি কাঁদছেন। তবুও হাত বাড়িয়ে তাঁর কাছে বকশিশ চাচ্ছেন আয়া। লাশ নিতে অ্যাম্বুলেন্স চালক দাবি করছেন মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া, প্রায় ৪ হাজার টাকা। লাশটি ফুলতে শুরু করেছে। পদে পদে বাধা পেরিয়ে কী করে বাবার লাশ বের করবেন- এই চিন্তায় কাশেমের চোখে জল। শেষমেশ আয়াকে ২০০ ও চালককে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় রাজি করিয়ে তাঁরা মুক্তি পান।

বাবার লাশ নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে বসা কাশেম বললেন, 'নরক থেকে বের হলাম। মরেও শান্তি পাননি আমার বাবা। আসার পর থেকে পদে পদে খরচ করেছি। তার পরও চিকিৎসার অভাবে মারা গেলেন বাবা। শেষে তাঁর লাশ নিয়েও শুরু হলো বাণিজ্য। তাঁরা কতটা নিষ্ঠুর তা এখানে না এলে বুঝতেই পারতাম না। চিকিৎসার এই স্থানটি তারা কলঙ্কিত করেছে।' কাশেমের বাবাকে নিয়ে হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি গত ২৩ জুনের।

সরেজমিন দেখা গেছে, এই হাসপাতালে কার্যত কোনো চিকিৎসাসেবা নেই। পুরো ব্যবস্থাটাই নিয়ন্ত্রণ করে দালাল চক্র। চরম অব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এখানে দুর্নীতিও লাগাম ছাড়া।

হাসপাতালের লাশ-বাণিজ্যের স্থানটির পাশেই সর্দার অফিস। পেছন দিয়ে একটু এগিয়ে গেলে নতুন রোগী ভর্তির কাউন্টার। এখানে হলুদ জ্যাকেট পরে দাঁড়িয়ে আছেন ৯-১০ যুবক। প্রত্যেকের হাতে ট্রলি। এখানে প্রতি ২ মিনিটে একজন করে রোগী আসছেন। তাঁদের বাইরে দাঁড় করিয়ে জ্যাকেটধারী ছুটছেন কাউন্টারে। নাম ও রোগ লেখানোর পর্ব শেষ করে ভর্তি ফি ৩০ টাকার স্থলে নিচ্ছেন ২০০ টাকা। কেউ টাকা দিতে না চাইলে রোগীকে ফেলে রাখা হচ্ছে বাইরেই। মিটমাট হলেই কেবল স্ট্রেচারে তোলা হচ্ছে রোগীকে। গন্তব্যে নিয়ে দিতে হচ্ছে আরও ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

পাশের উপজেলা গঙ্গাচড়া থেকে আসা আজমেরি বেগমকে ট্রলিতে করে নেওয়া হচ্ছে মেডিসিন ওয়ার্ডে। তাঁর পিছু নিয়ে দেখা গেল, ট্রলিম্যান ওয়ার্ডের মেঝেতে নামিয়ে দিয়েই দাবিমতো নিলেন ২০০ টাকা। কিছুক্ষণ পর ডিউটি ডাক্তার এসে রোগী দেখে একটি স্লিপে নানা রকম টেস্টের (পরীক্ষা) তালিকা ধরিয়ে দেন। এ সময় ডাক্তারের পাশে উপস্থিত হন বেশ কিছু অপরিচিত দালাল। কোনো অনুমতি ছাড়াই তাঁরা রোগীর শরীর থেকে নিয়ে নেন রক্তের নমুনা। বলা হলো, 'এখন ১ হাজার দেন, বাকি ৩ হাজার দেবেন রিপোর্ট হাতে নিয়ে।'

রোগীর সঙ্গে থাকা এক স্বজন জানতে চাইলেন কী পরীক্ষা? কেন করাতে হবে?- এসবের কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু বলা হলো, 'যা বলছি দেন। ডাক্তার চলে গেলে এই রিপোর্টও দেখাতে পারবেন না।' নিরুপায় হয়ে তাঁদের দেওয়া হলো আগাম ১ হাজার টাকা।

পাশের বেডে শুয়ে আছেন মরিয়ম খাতুন নামে একজন গৃহবধূ। নতুন রোগীর স্বজনকে তিনি বললেন, এখানে আসার পর সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করে দালাল চক্র। তারাই ফোন করে তাদের নিজেদের অ্যাম্বুলেন্স ও ম্যানেজ করা ডাক্তার নিয়ে আসে। দালালচক্র রোগীকে তুলে নেয় অ্যাম্বুলেন্সে। শরীর থেকে সংগ্রহ করে নেয় রক্ত। নিয়ে যায় তাদের পরিচিত ক্লিনিকে। তারপর টেস্ট করে তিন গুণ ফি আদায় করে।

পরীক্ষা হয় না পরীক্ষাগারে: এখানে পরীক্ষাগার কার্যত অচল। রংপুরের পাশে গাইবান্ধা থেকে এসেছেন উম্মে কুলসুম। জানালেন লিভারের সমস্যার জন্য সপ্তাহখানে আগে এসেছেন তিনি। রমেক হাসপাতাল মোড়ে গাড়ি থেকে নামলে কয়েকজন তাঁকে ভালো চিকিৎসকের কথা বলে একটা চেম্বারে নিয়ে যায়। বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে তারা আদায় করে প্রায় ৮ হাজার টাকা। পরীক্ষার প্রতিবেদন নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি কিছু ওষুধ লিখে দেন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, দালালরা তাঁকে নিয়ে প্রতারণা করেছে। আসলে লিভারের কোনো পরীক্ষাই করেনি তারা।

লাশেই বাণিজ্য কোটি কোটি টাকার: হাসপাতালের লাশ পরিবহন চক্রের প্রতিদিনের আয় ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা।  অল্প দূরত্বেই ৬ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকায় যেতে বাধ্য করা হয়। বাইরের কোনো গাড়ি এখানে প্রবেশের সুযোগ নেই। তথ্য বলছে, স্বাভাবিক সময়ে দৈনিক এই হাসপাতালে ২৫ থেকে ৩০ জন রোগী মারা যান। সেই হিসাবে প্রতিদিন ২ থেকে আড়াই লাখ টাকা মৃতদের স্বজনের কাছে থেকেই আদায় করা হয়।

ময়লার স্তূপ: এই হাসপাতালে প্রতিদিন অন্তত দেড় হাজার রোগী থাকেন। চিকিৎসক, নার্স, রোগীসহ হাসপাতালের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ও মেডিকেল বর্জ্য জমা হয় এখানে। হাসপাতালের নতুন ভবনের সামনে, সাইকেল গ্যারেজের বিপরীতে, পূর্ব গেটের প্রবেশমুখসহ হাসপাতাল চত্বরজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে ময়লা-আবর্জনা। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকাসহ সচেতনতার অভাবে সেখানে প্রতিনিয়ত খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলছেন রোগীর স্বজনরা। আর হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরাও ফেলছেন মেডিকেল বর্জ্যসহ নানা আবর্জনা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুর মহানগর সভাপতি অধ্যক্ষ ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, নির্দিষ্ট জায়গায় মেডিকেল বর্জ্যসহ ময়লা-আবর্জনা ফেলার ব্যবস্থা করা হলে আমরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে বাঁচতে পারতাম। সবার সুস্থতার কথা চিন্তা করে হাসপাতালের চারপাশ দ্রুত পরিস্কার করতে হবে।

হিমঘর অচল, কাজ করে না যন্ত্রপাতি: লাশ রাখার হিমঘরে ফ্রিজে মোট ৩০টি লাশ রাখার কথা। এই ফ্রিজগুলোর সবই নষ্ট। তিন বছরেরও বেশি সময় নষ্ট হয়ে পড়ে আছে রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের দুটি সিটিস্ক্যান মেশিন। ফলে হাসপাতালের বাইরে পরীক্ষা করাতে বেশি টাকা এবং দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের।

হাসপাতালে সিটিস্ক্যানে পরীক্ষার ধরন বিশেষে সর্বনিম্ন ২ থেকে ৪ হাজার টাকা নেওয়া হতো। একই ধরনের পরীক্ষা বাইরে করালে ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।

হাসপাতালের রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. নাজমুন নাহার বলেন, তিন বছর ধরে মেশিনটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সিটিস্ক্যান মেশিনটি খুবই জরুরি। রোগীদের ভোগান্তি হচ্ছে। বিভিন্ন ওয়ার্ডের গুরুতর অসুস্থ রোগীদের বাইরে নিয়ে যেতে হচ্ছে স্বজনদের।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য: রমেক হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. আরশাদ হোসেন বলেন, বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট স্থান আছে। এর পরও অনিয়ম হলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বলেন, তিনি এক মাসেরও কম সময় ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর চেষ্টা আছে সব অনিয়ম বন্ধ করে হাসপাতালকে একটি দালাল ও দুর্নীতিমুক্ত সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার। তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, তবে কতটুকু সম্ভব হবে তা বলা যাচ্ছে না। তথ্যসূত্র-সমকাল

মন্তব্য করুন


Link copied