আর্কাইভ  শুক্রবার ● ১ জুলাই ২০২২ ● ১৭ আষাঢ় ১৪২৯
আর্কাইভ   শুক্রবার ● ১ জুলাই ২০২২
PMBA
PMBA

“রংপুরের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি” একটি প্রশংসনীয় গবেষণাকর্ম

শনিবার, ২৫ মার্চ ২০১৭, বিকাল ০৫:৩৯

অধ্যাপক মুহম্মদ আলীম উদ্দীন

অপরূপ নৈসর্গিক শোভাম-িত নদীমাতৃক এবং মূলত কৃষিনির্ভর এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুদীর্ঘ কালের পথ-পরিক্রমায় উদ্ভব ও বিকাশ লাভ করেছে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বৈচিত্রময় লোকসংস্কৃতি।

লোকসংস্কৃতির একটি বিশিষ্ট ও সবচেয়ে সমৃদ্ধ ধারা হচ্ছে লোকসাহিত্য। আমাদের লোকসাহিত্য-সংস্কৃতি তথা সামগ্রিকভাবে লোক-ঐতিহ্যের ভা-ার অত্যন্ত ঋদ্ধ।

লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির মাধ্যমে ফুটে ওঠে জাতির সামগ্রিক আত্মপরিচয়। জাতীয় জীবনের ইচ্ছা ও প্রত্যাশাকে প্রকাশ করার ক্ষমতা রাখে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি । জাতির সমগ্র মানস-প্রবণতা, জীবনধারা, সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য অনুধাবনের জন্যে তাই লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

লোকসংস্কৃতি লোকজ্ঞানের আধার, শুভবোধ ও মঙ্গলচেতনার ধারক। তা আমাদের উদ্বুদ্ধ করে সম্মিলন চেতনা ও যৌথচেতনার অভিমুখে। লোকসংস্কৃতি লালন করে সমাজের সাধারণ মানুষের সৃজনকুশলতা, দেয় সৃজনের আনন্দ। তা লোকমানসকে নান্দনিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে, পরিচালিত করে নান্দনিক উৎকর্ষমুখীনতার দিকে। যার প্রকাশ ঘটে লোকসাহিত্যের নানা উপাদানের মধ্যে। সুতরাং দেশ ও জাতির অগ্রগতি ও সম্ভাবনার কথা ভাবতে গেলে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির কথা অবশ্যই ভাবতে হবে।

লোকসংস্কৃতি আমাদের দেশব্রতী করে, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা জাগায়। লোকসংস্কৃতির মধ্য দিয়ে একটি জাতির সুদীর্ঘকালের সামাজিক ইতিহাস, সমাজিক বিবর্তনের ধারা, সমাজ-মানস ও সমাজদর্শন ইত্যাদিকে অনুধাবন ও উদ্ঘাটন করা সম্ভব। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে উজ্জীবিত করে রাখতে এবং স্বাধীনতার স্বপ্নকে অর্থবহ করে তুলতে তথা বাংলাদেশের উদার অসাম্প্রদায়িক কল্যাণমুখী পথযাত্রায় অগ্রগতির রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারে আমাদের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি । কিন্তু সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে আধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার দ্রুত প্রসার এবং নাগরিক সংস্কৃতির দোর্দ- দাপটে আমাদের ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতির অনেক মূল্যবান উপাদানই আজ কালের গর্ভে বিলুপ্ত হতে চলেছে। এগুলোকে বিলুপ্তির কবল থেকে রক্ষার পাশাপাশি লোকসংস্কৃতির বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য এগুলোর লালন, প্রচার, প্রসার এবং সংগ্রহ ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ অনেক প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তা পেরিয়ে এখন নতুন সম্ভাবনা ও পালাবদলের দ্বারপ্রান্তে এসে উপনীত। এ উত্তরণ প্রক্রিয়ায় জাতির আত্মপরিচয়ের স্বরূপ সন্ধান এবং তার গৌরবময় ঐতিহ্যের আলোকে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির ভূমিকা এবং এর চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। রংপুর অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির বেলাতেও এ কথা সমানভাবে প্রযোজ্য। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রাচীন জনপদ ‘রংপুর’। এই রংপুর অঞ্চলের সংস্কৃতির ধারা মূলত: লোকসংস্কৃতিভিত্তিক এবং তা অত্যন্ত প্রাচীন ও হিরন্ময় ঐতিহ্যম-িত । কিন্তু এ অঞ্চলের বিশাল ও বৈচিত্রময় লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির লালন, প্রচার, প্রসার এবং সংগ্রহ ও সংরক্ষণের লক্ষ্য নিয়ে গবেষণামূলক কাজ খুব বেশি হয়নি। আলোচ্য গ্রন্থের প্রণেতা আনওয়ারুল ইসলাম রাজু লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি একজন নিবেদিত প্রাণ ব্যাক্তি। এ বিষয়ে তার গভীর আগ্রহ ও অনুরাগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি রংপুর অঞ্চলের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবত একজন অনুসন্ধিৎসু ও নিষ্ঠাবান গবেষকের মত কাজ করে চলেছেন। এর প্রমাণ মেলে ইতোপূর্বে দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন গ্রন্থ, পত্র-পত্রিকা ও গবেষণা জার্ণালে প্রকাশিত এবং সভা-সেমিনারে উপস্থাপিত তাঁর অনেক প্রবন্ধ-নিবন্ধের মধ্যে। ‘রংপুরের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থটি তার দীর্ঘ অনুসন্ধান ও গবেষণার ফসল। মূল বিষয়কে পরিস্ফুটিত করে তোলার জন্য প্রথাসিদ্ধ গবেষণাপত্রের মতই এ গ্রন্থে তার ক্ষেত্র-পরিসীমার ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক, পরিবেশ ও প্রতিবেশগত পরিচয়কে সুবিন্যস্তভাবে তুলে ধরেছেন। আলোচনার বিষয়গুলোকেও বিভিন্ন অধ্যায়ে ভাগ করে প্রামাণিক তথ্য, উদাহরণ, ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ এবং প্রয়োজনীয় তথ্যসূত্রসহ উপস্থাপন করেছেন। যা অনুসন্ধিৎসু পাঠকের পিপাসা-পূরণে সহায়তা করবে নি:সন্দেহে। আকর্ষণীয় কভারে মোড়ানো ২১২ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে ১২টি অধ্যায়ে নি¤œরূপে বিষয়গুলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১. প্রথম অধ্যায়: সংস্কৃতি, লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য ২. দ্বিতীয় অধ্যায়: রংপুরের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ পরিচয় ৩. তৃতীয় অধ্যায়: জনগোষ্ঠী, ভাষা, ধর্ম, জীবন-জীবিকা, খাদ্যাভাস, বাসস্থান, পোষাক-পরিচ্ছদ ৪. চতুর্থ অধ্যায়: রংপুরের লোকসংস্কৃতি ও লোকসাহিত্য ৫. পঞ্চম অধ্যায়: ভাওয়াইয়া ৬. ষষ্ঠ অধ্যায়: পালাগান ৭. সপ্তম অধ্যায়: মেয়েলী গীত ৮.অষ্টম অধ্যায়: বিবিধলোকসঙ্গীত ৯. নবম অধ্যায়: রংপুরের লোকছড়া ১০.দশম অধ্যায়: রংপুরের প্রবাদ-প্রবচন ১১.একাদশ অধ্যায়: রংপুরের ছিলকা ১২.দ্বাদশ অধ্যায়: বচন, খনার বচন ও অন্যান্য

লেখকের এমন একটি মননশীল সৃজন অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। তার এই প্রয়াসকে আমি অভিনন্দন জানাই।

লেখক : বিশিস্ট সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান, বাংলা বিভাগ, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর।

মন্তব্য করুন


Link copied