আর্কাইভ  শনিবার ● ৪ ডিসেম্বর ২০২১ ● ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
আর্কাইভ   শনিবার ● ৪ ডিসেম্বর ২০২১

তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরে কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন

বৃহস্পতিবার, ১ এপ্রিল ২০২১, দুপুর ০১:১৬

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: তিস্তা নদীর বুকে জেগে উঠা নতুন নতুন চরে বিভিন্ন শাক সবজি ফলিয়ে পাল্টে যাচ্ছে তিস্তা চরাঞ্চলের সাধারণ কৃষকদের জীবনযাত্রার মান। সবজি চাষ করে হাজারো কৃষক তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন এনেছে ।

যেখানে অভাব আর অনটন ছিল নিত্য সঙ্গী, সেই তিস্তা চরাঞ্চলের মানুষগুলো তাদের জীবনযাত্রার মান পাল্টে ফেলেছে জেগে ওঠা চরের জমিতে সবজিসহ বিভিন্ন ফসল চাষ করে। এখানে উৎপাদিত শাকসবজি অনেকটাই কীটনাশকমুক্ত হওয়ায় এর চাহিদাও ব্যাপক বলে জানায় স্থানীয় কৃষক।

তাছাড়াও লালমনিরহাট জেলার তিস্তা তীরবর্তী চরাচঞ্চল বালাপাড়া, কুটিরপাড় বাঁধসহ জেলার ৫টি উপজেলায় অন্তত শতাধিক চরাঞ্চলে ও গ্রামগুলোতে মিষ্টি কুমড়া, লাল শাক, কলমি শাকসহ বিভিন্ন ধরনের শাক সবজির ব্যাপক আবাদ হয়েছে। স্বল্প খরচে তিস্তায় জেগে উঠা চরাঞ্চলে সেচ পাম্প বসিয়ে, তা দিয়ে পানির ব্যবস্থা করে এসব ফসল চাষাবাদ করছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষক মোকসেদ আলী বলেন, সেচের সময় পানির অভাবে ফসল ফলাতে সমস্যা হচ্ছে অনেক। আমরা স্যালো মেশিন ব্যবহার করে পানির অভাব পূরণ করে থাকি তবুও পরিপূর্ণভাবে পানির চাহিদা মেটাতে পারছি না। এই তিস্তা নদীর পানি উপর নির্ভর করে থাকে আমাদের ফসল। তাই সরকার যদি তিস্তা নদীর পানির ব্যবস্থা করতো তাহলে আমরা তিস্তা চরাঞ্চলের কৃষক অনেক বেশি উপকৃত হতাম। তিস্তার চরের জমিতে চাষ করতে অনেক কষ্ট হলেও উৎপাদিত ফলন বিক্রি করে প্রচুর পরিমাণ লাভ হয়। চর এলাকাতে ফসল ভালো হয়, তবে আমরা বিশেষ পদ্ধতিতে জমি চাষ করছি। তিস্তা নদীর চরে আমরা আলুসহ অনেক ধরনের সবজি চাষ করি।

কৃষকেরা বলছে, চরাঞ্চলের জমি অসমতল ও বালির পরিমাণ বেশি হওয়ায় ইরি-বোরোর পরিবর্তে ছয়-সাত ধরনের ফসল চাষ করা যায়। চরের জমিতে আখ চাষের পর লাল শাক, পাট, কলমি শাক চাষ করেন। এসব সবজি রোপণের ১৫ দিন পর বাদাম, মরিচ, ঢেঁড়স ও পুঁই শাকের বীজ বপন করেন। এক মাসের মধ্যে সবজি বাজারে বিক্রি করা হয়। পরে বাদাম, বেগুন, মরিচ, ঢেঁড়স ও পুঁইশাক বাজারজাত করে আয় করেন।

চর গোকুন্ডার কৃষক ফয়জার আলী বলেন, আমার যেটুকু জমি ছিল তা তিস্তার পেটে চলে গেছে। এ কারণে প্রতি বছর এই সময় তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠা চরে জৈব সার ব্যবহার করে আলু, শিম, করলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বাদাম চাষ করি। ফলন ভালো হওয়ায় আমরা পরিবার নিয়ে ভালোভাবে দিন কাটাতে পারি।

গোকুন্ডা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা স্বপন বলেন,, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তাকে ঘিরে যে প্রকল্প ও পদক্ষেপ নিয়েছেন তা যদি কোনদিন বাস্তবায়ন হয় তাহলে একেবারেই পাল্টে যাবে তিস্তার মানুষের জীবনযাত্রার মান।

শহীদ আবুল কাশেম মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ,মোহাম্মদ মোর্তজা হোসেন মিঠু বলেন, আমি অবসর পেলেই তিস্তার চরাঞ্চলে যাই। তিস্তা চর অঞ্চলের মানুষগুলোর সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলি। কিন্তু আমি আগে যা দেখেছি তার থেকে অনেক বেশি পরিবর্তন হয়েছে তাদের মধ্যে। যেখানে চরাঞ্চলের মানুষগুলোর অভাব আর অনটন নিত্য দিনের সঙ্গী ছিল ঠিক সেখানেই জেগে ওঠা নতুন নতুন চরের জমিতে শাক সবজি চাষ করে এখন পাল্টে যাচ্ছে তাদের জীবনযাত্রা।

তিস্তার চরাঞ্চল কালীগঞ্জের চর বৈরাতি গ্রামের মমিনুল আনোয়ারা কৃষক দম্পত্তি বলেন, বাপ-দাদার ভিটে-মাটি সব তিস্তার হিংস্র স্রোতে বিলীন হয়েছে। গোয়াল ভরা গরু আর গোলা ভরা ধান ছিল আমাদের। বর্তমানে কিছুই নেই। যা আছে সবই ধু ধু বালুর চর। সংসার চালাতে কনকনে শীত উপেক্ষা করেই এই বালু চরে পানি সেচ দিয়ে ভুট্টা, রসুন, পেঁয়াজ ও আলুর চাষাবাদ করছি।

একই চরের আফজাল হোসেন বলেন, একসময় জমি-জিরাত সবই ছিল। তিস্তা তা কেড়ে নিয়েছে। শীত মৌসমে পানি কমে যাওয়ায় সেই বসত-ভিটার জায়গা আবার জেগে উঠেছে। আর সেই বসত-ভিটায় এখন তাংকু (তামাক) আবাদ করছি। তাংকু বিক্রি করে সারা বছর সংসারের খরচ চালাবো।

তিস্তার চরের চাষাবাদ নিয়ে আশাবাদী লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক শামীম আশরাফ। তিনি বলেন, এ বছর চরাঞ্চলে ৮ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। কম খরচে লাভবান হওয়ায় গত বছরের তুলনায় এ বছর তিস্তার জেগে ওঠা নতুন নতুন চরে শাক সবজির আবাদ হয়েছে অনেক বেশি। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োজনের তুলনায় তেমন ভাবে ব্যাবহার না করে তার পরিবর্তে চাষিরা জৈব সার ব্যবহার করায় আলু, সিম, করলা, লাউ, মিষ্টি কুমড়া, বাদামসহ বিভিন্ন সবজির বাম্পার ফলন ফলেছে।

তিনি আরও বলেন, চরের জমিতে পানির যে লেভেল আছে, তাতে সেচ দেয়ার সময় কিছুটা সমস্যা হয়। চরাঞ্চলের এ জমিকে কাজে লাগাতে আমরা চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে আসছি। আশা করছি, তিস্তার চরে উৎপাদিত সবজি কিছুটা হলেও চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে।

মন্তব্য করুন


Link copied