নিউজ ডেস্ক: ডিসেম্বরের শুরুতে তফসিল আর ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ভোটের সময় ধরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ বা পথ নকশা ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
রোডম্যাপ পেয়ে বিএনপিসহ তাদের সমমনা জোটের নেতারা যখন স্বস্তি প্রকাশ করছেন, তখন পুরোপুরি ভিন্নমত ও প্রকাশ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, জুলাই বিপ্লবীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলাম আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
সংস্কার ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার আগে নির্বাচনের পথ নকশাকে অপরিপক্ব ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখছেন তারা। জামায়াত-এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে রোডম্যাপ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে হবে।
রোডম্যাপ ঘোষণায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলছেন, যারা নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে, তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে তার ক্ষতি সংশ্লিষ্টদেরই হবে। গতকাল শুক্রবার এক অনুষ্ঠানে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন হবেই। এর কোন বিকল্প নেই। আজকে যদি নির্বাচন বন্ধ করা হয় বা নির্বাচন না হয় তাহলে এই জাতি প্রচন্ড রকমের ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার আশঙ্কা অনেক বাড়বে। তিনি বলেন, আপনারা মনে রাখবেন দেশে একটা ষড়যন্ত্র চলছে। ষড়যন্ত্রটা হচ্ছে দেশে মধ্যপন্থা রাজনীতি, উদারপন্থি রাজনীতি, উদারপন্থি গণতন্ত্র সরিয়ে দিয়ে একটা উগ্রবাদের রাজনীতিকে নিয়ে আসা বাংলাদেশে। এটা বাংলাদেশের জন্য চরম ক্ষতিকর হবে।
গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী’ আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছে, তাদেরই কেউ কেউ এখন নির্বাচন নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। যার জন্য আমরা তর্ক করছি, বিতর্ক করছি, সংস্কারের জন্য আলাপ-আলোচনা করছি, কিন্তু নির্বাচন নিয়ে দুই-একটা পক্ষ ধোঁয়াশা সৃষ্টি করছে। তিনি বলেন, আজকে কোথাও কোথাও কথা বলতে শুনলাম, কোনো কোনো রাজনৈতিক দল, নির্বাচন কমিশন যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে, তার মধ্য দিয়ে নাকি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে বাধা সৃষ্টি হবে অথবা নির্বাচন ভন্ডুল করার নাকি একটা পাঁয়তারা হবে। আমরা সেভাবে কেন দেখব? বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র করে কোন লাভ নেই। ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন হবে, কেউ ঠেকাতে পারবেনা।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েব আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। এই রোডম্যাপ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভন্ডুল করার নীল নকশা। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য কিছু বিষয় সুরাহা হওয়া খুবই জরুরি। এরমধ্যে জুলাই চার্টারকে আইনগত ভিত্তি দিতে হবে; এবং এর ভিত্তিতেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিতে হবে। কিন্তু সেগুলো না করেই নির্বাচনের যে পথ নকশা ঘোষণা করা হয়েছে সেটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ভন্ডুল করার নীল নকশা বলে আমি মনে করি। আমরা এটা হতে দেব না। আমরা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করবো, জুলাই চার্টার ও পিআর এর মাধ্যমে নির্বাচন হতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আবিদ বলেছেন, আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশের আগেই সরকার সংস্কারবিষয়ক পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জনের রোডম্যাপ প্রকাশ করবে। কিন্তু হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, অজানা কারণে ঐকমত্য কমিশনের পরবর্তী দফার বৈঠক পেছানো হয়েছে এবং এখনও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার উপায় নির্ধারণ হয়নি। জুলাই সনদ চূড়ান্ত না করে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল।
পুরোনো বন্দোবস্তের নির্বাচনী রোডম্যাপ জুলাইকে অস্বীকার করার নামান্তর বলে মন্তব্য করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এক বিবৃতিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, জাতি সংবিধান, রাজনৈতিক সংস্কৃতিসহ সামগ্রিক সংস্কারের জন্য অধীর অপেক্ষা করছে। সংস্কারের জন্য নানা কার্যক্রম হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সংস্কারের সকল চেষ্টাই এখন কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে। মৌলিক সংস্কারের সামান্যতমও বাস্তবায়ন হয় নাই। তাই অন্য যেকোনো রোডম্যাপের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ দিতে হবে। আতাউর রহমান আরো বলেন, নির্বাচনের রোডম্যাপ দিয়েছেন; ভালো। এখন দ্রুততার সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষই ব্যর্থ হবে, আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তা হতে দেবে না।
নির্বাচন জুলাই সনদের অধীনে করার দাবি জানিয়ে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, নির্বাচনের তারিখ যদি পিছিয়েও দেওয়া হয়, তাতেও দলটির কোনো আপত্তি থাকবে না। ফুয়াদ বলেন, দায়সারা নির্বাচন করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে কমিশন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশন নির্বাচন করাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। ইসি বা নির্বাচনী কর্মকর্তার কারো ভালো করার অভিজ্ঞতা নেই। অথচ এসব ঠিক না করে নির্বাচন করলে সামনের নির্বাচন হবে ইতিহাসের সুষ্ঠু কিন্তু একতরফা।
তবে নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে দলগুলোর মধ্যে যখন নানা মত তখন রোডম্যাপ ঘোষণা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে নির্বাচন কমিশনের রোডম্যাপ ঘোষণা কীভাবে দেখছেন- এমন প্রশ্ন করা হলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আমি পুরোপুরি উদ্বিগ্ন। কারণ নির্বাচন কোন পদ্ধতিতে হবে তা নিয়েও মতবিরোধ আছে। যেসব দল মাঠে আছে তারাই তো এক কাতারে আসেননি। আপনি কীভাবে নির্বাচন করবেন? তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা আছে। সেটা মোকাবিলার করার মতো মানসিকভাবে প্রশাসন কতটা প্রস্তুত সেটা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত।