আর্কাইভ  বুধবার ● ১২ জুন ২০২৪ ● ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
আর্কাইভ   বুধবার ● ১২ জুন ২০২৪
 width=
 
 width=
 
শিরোনাম: অনুমোদন না থাকায় অবশেষে সিলগালা হলো সৈয়দপুরের ফাইলেরিয়া হাসপাতাল॥সরিয়ে নেওয়া হলো রোগী       ঠাকুরগাঁওয়ে বিমানবন্দর ও মেডিকেল কলেজের দাবিতে মানববন্ধন       কুড়িগ্রামে ইউপি চেয়ারম্যান আটক       তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কাছে ঋণ চেয়েছি: প্রধানমন্ত্রী       হাতীবান্ধায় ব্যবসায়ীকে পথরোধ করে ছিনতাইয়ের চেষ্টা; দুই পুলিশ সদস্য প্রত্যাহার      

 width=
 

পাঁচ টুকরো জাপা, সুখে নেই কেউ

সোমবার, ২২ মে ২০২৩, সকাল ০৭:৪৬

ডেস্ক: ক্ষমতাসীন থাকাকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আওয়ামী লীগ-বিএনপিসহ আরও কয়েকটি দল থেকে নেতাদের বাগিয়ে গঠন করেছিলেন জাতীয় পার্টি। সেই জাতীয় পার্টি এখন পাঁচ ভাগে বিভক্ত। মূলধারা এরশাদপন্থি অংশের চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও প্রধান পৃষ্টপোষক বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে দলটিতে প্রায়ই বিরোধ প্রকাশ পাচ্ছে। তাদের নেতৃত্বে আলাদা দুটি বলয় রয়েছে। জাতীয় পার্টি নামে এখন মাঠে সক্রিয় দল আছে খণ্ডিত পাঁচটি দল। এর মধ্যে চারটির নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধন আছে।

এরশাদের পতনের পর থেকে বেশ কয়েকবার ভাঙন ধরে দলটিতে। এর মধ্যে তিনটি ভাঙন ছিল বড় ধরনের, তারা দল থেকে বেরিয়ে একই নামে আবার দল করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও কিছু নেতা দলছুট হয়েছেন, একাধিকবার ছোট ছোট ভাঙনের মুখে পড়েছিল দলটি। তবে দলটির কোনো অংশেই যেন সুখ নেই, রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থানও শক্ত করতে পারেনি। ভাঙা-গড়া ও আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে লেজুরবৃত্তি করার মধ্যেই জাতীয় পার্টির কার্যক্রম অনেকটা সীমাবদ্ধ থাকছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, বড় ভাঙনগুলো হয়েছিল মূলত বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে। কখনও আওয়ামী লীগ-বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে আবার কখনও ভেঙেছে মন্ত্রী হওয়া নিয়ে। এরশাদের নেতৃত্বাধীন এই অংশটি মূল জাতীয় পার্টি হিসেবে পরিচিত। নির্বাচন কমিশনে এ দলটি নিবন্ধিত লাঙল প্রতীক নিয়ে। এ ছাড়া আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জেপি) নিবন্ধিত বাই সাইকেল প্রতীক নিয়ে, নাজিউর রহমান মঞ্জুর জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নিবন্ধিত গরুর গাড়ি প্রতীক নিয়ে। আর ২০১৪ দশম নির্বাচনের আগে এরশাদের দলে আরেক দফা ভাঙন ধরিয়ে নতুন জাতীয় পার্টি করেন কাজী জাফর আহমদ। এর বাইরে কাঁঠাল প্রতীকে তাসমিনা মতিনের নামেও জাতীয় পার্টির নিবন্ধন আছে। জাতীয় পার্টির নেতা এম এ মতিনের নেতৃত্বে এই অংশটি আলাদা হয়েছিল।

জাতীয় পার্টিতে দফায় দফায় ভাঙন: অনুসন্ধানে জানা যায়, এরশাদের জাতীয় পার্টিতে প্রথম বড় ধরনের ভাঙন ধরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বের হয়ে আলাদা জাতীয় পার্টি ঘোষণা করলে। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের সময় জাতীয় পার্টি প্রথমে তাদের সমর্থন দিলেও পরে চারদলীয় জোটে চলে যায়। সেসময়ের যোগাযোগ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন।

এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে আরেক দফা ভাঙন ধরে। সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জু জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠন করে এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হয়ে নির্বাচনে যায়। বর্তমানে এই অংশের নেতৃত্বে আছেন আন্দালিব রহমান। এই অংশটির ভেতরও আরেকটি ভাঙন আছে। মন্ত্রিত্ব নিয়ে ঝামেলার একপর্যায়ে এম এ মতিন আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এক এগারোর সময়ও জাতীয় পার্টি দুটি অংশে বিভক্ত হয়েছিল, পরে অবশ্য এ দুটি অংশই এরশাদের নেতৃত্বে এক হয়ে যায়।

সর্বশেষ এরশাদের জাতীয় পার্টিতে ভাঙন ধরান এরশাদের পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী জাফর আহমেদ। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে কাজী জাফর এরশাদকে ছেড়ে আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করে যোগ দেন বিএনপি-জোটে। ২০১৩ সালের ২০ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দলের বিশেষ কাউন্সিলের মাধ্যমে নতুন জাতীয় পার্টির ঘোষণা দেন কাজী জাফর। একই সঙ্গে তিনি এরশাদকে বহিষ্কারেরও ঘোষণা দেন।

এদিকে ২০২২ সালের আগস্ট থেকে প্রকাশ্যে জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের সঙ্গে পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয়েছে। সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে দলের নেতাকর্মীরাও কার্যত দুই ধারায় বিভক্ত। পার্টির নেতৃত্বের কোন্দল মেটাতে কয়েক দফা সমঝোতা বৈঠক হলেও সংকট রয়েই গেছে। বসে নেই এরশাদের তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী বিদিশা সিদ্দীকও। তিনিও এরশাদের বারিধারার বাসা প্রেসিডেন্ট পার্কে ছেলে এরিখের সঙ্গে থেকে দলবঞ্চিত নেতাদের নিয়ে নিজেকে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছেন।

বারবার ভাঙন হয়েছে এই দলে। তা ছাড়া অনেক বছর মহাজোটের রাজনীতি বা গৃহপালিত বিরোধী দলের ভ‚মিকাকে ভালো চোখে দেখেননি পার্টির বেশিরভাগ নেতাকর্মী। সব মিলিয়ে জনসমর্থন নেমে গিয়ে ঠেকেছে তলানিতে। বর্তমানে জাপার ২৬ জন সংসদ সদস্য থাকলেও তা মহাজোটের সঙ্গে আপসের মাধ্যমে। ২০১৯ সালের ১৪ জুন এরশাদের মৃত্যুর পর বিরোধী দলের নেতা বানানো হয় রওশনকে। যদিও অনেকে একে গৃহপালিত বিরোধীদল বলেও কটাক্ষ করেন।

বিবাদ-বিরোধের ভেড়াজালেই জাতীয় পার্টি: আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাপার মূল ধারাকে পাশ কাটিয়ে রওশনের অনুসারীরা গেল রমজান মাসে ইফতার পার্টির আয়োজন করে। মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর গুলশানে ইমান্যুয়েলস কনভেনশন হলে আয়োজন করা হয় ইফতার মাহফিল ও আলোচনা সভার। সেই সভায় বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ্’র পাঠানো আমন্ত্রণপরে ভিত্তিতে অনুষ্ঠানে রওশন এরশাদ প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। রওশন এরশাদের নাম ব্যবহার করা হলেও মূলত এর নেপথ্যে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন জাপার যুগ্ম-মহাসচিব ও রওশনপুত্র সাদ এরশাদ এমপি। কার্যত সাদকে ঘিরেই জাপার নামে পৃথক এই বলয়টি তৎপরতা চালাচ্ছে।

থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় রওশন এরশাদ হঠাৎ গতবছরের ৩০ সেপ্টেম্বর এক চিঠির মাধ্যমে জাপার দশম জাতীয় কাউন্সিল ডাকেন। গতবছরের ২৬ নভেম্বর এই কাউন্সিল হওয়ার কথা ছিল। পরদিনই (১ অক্টোবর) ‘দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদ সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না’- এমন কারণ দেখিয়ে তার পরিবর্তে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা করার জন্য স্পীকারকে চিঠি দেন। সেই চিঠি এখনও কার্যকর হয়নি।

অন্যদিকে ২০১৯ সালে দলটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট থেকে আন্দালিব রহমান পার্থের দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। বেরিয়ে যাওয়ার পর গত ২১ ফেব্রæয়ারি এই প্রথম কয়েক হাজার নেতাকর্মী নিয়ে পদযাত্রা কর্মসূচি করল দলটি। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে কামাল হোসেনের গণফোরামসহ আরও তিনটি দলকে নিয়ে বিএনপি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করলে থেকে পুরনো জোটে টানাপড়েন তৈরি হয়। এর পরও ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচন তারা একসঙ্গেই করেছিল, ভোটের ফল প্রত্যাখ্যানেও এক ছিলেন তারা। কিন্তু বিএনপি ও গণফোরাম থেকে নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার পর ২০১৯ সালের ৬ মে জোট থেকে বেরিয়ে যায় বিজেপি।

জাতীয় পার্টির জন্ম: মওদুদ আহমদের ‘গণতন্ত্র ও উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ প্রেক্ষাপট বাংলাদেশের রাজনীতি এবং সামরিক শাসন’ বই থেকে জানা যায়, ১৯৮৪ সালে এরশাদ প্রথমে ‘জনদল’ নামে একটি রাজনৈতিক দলের গোড়াপত্তন ঘটান। ৮৫ সালের প্রথম দিকে এরশাদ দুটি প্রধান বিরোধী জোটে ভাঙন ধরাতে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা কোরবান আলী ও বিএনপির সিনিয়র নেতা আবদুল হালিম চৌধুরীকে তিনি মন্ত্রিত্ব দেন। পনেরো দলীয় জোটের শরিক দল মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের একাংশ, পাঁচদলীয় জোটের শরিক ইউপি পির কাজী জাফর আহমেদ ও সিরাজুল হোসেন খানের গণতন্ত্রী দল জোট ছেড়ে এরশাদের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল থেকে আরও অনেক নেতা এরশাদের দলে যোগ দেন। নানা চড়াই উৎড়াই শেষে ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি ‘সরকারি রাজনৈতিক দল’ জাতীয় পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে।

মন্তব্য করুন


 

Link copied