আর্কাইভ  সোমবার ● ৩ অক্টোবর ২০২২ ● ১৮ আশ্বিন ১৪২৯
আর্কাইভ   সোমবার ● ৩ অক্টোবর ২০২২
 
 
শিরোনাম: পাঁচ দিনের ছুটির কবলে প্রশাসন       এলপিজি গ্যাসের দাম কমল       রংপুর মেডিকেলের উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালসহ ৩ কর্মকর্তাকে বদলি       ঘোড়াঘাটের সাবেক ইউএনওকে হত্যাচেষ্টার রায় ৪ অক্টোবর       রংপুরে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন      

বদলে যাচ্ছে পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি, বই

বুধবার, ১ জুন ২০২২, সকাল ০৯:১৩

ডেস্ক: আসছে জানুয়ারি থেকে বিদ্যালয়ে বদলে যাচ্ছে পড়াশোনার প্রচলিত পদ্ধতি। বদলাবে পাঠ্যসূচি, পাঠ্যবই এমনকি পরীক্ষা পদ্ধতিও। কারণ, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে জানুয়ারিতে। শিক্ষার্থীদের ওপর কমবে পরীক্ষার চাপ। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান ও পাঠের ভিত্তিতে প্রয়োগমূলক কাজের মধ্য দিয়ে করা হবে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন। নতুন শিক্ষাক্রমের আঙ্গিকে বর্তমানে নতুন পাঠ্যবই লেখার কাজ চলছে। যেটুকু লেখা হয়েছে তা নিয়ে ক্লাসরুমে পাইলটিং হচ্ছে। বছরের প্রথম দিনে তিনটি শ্রেণির শিক্ষার্থীরা হাতে পাবে নতুন শিক্ষাক্রমের বই।

ছাত্রছাত্রীরা সপ্তাহে একদিনের পরিবর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাবে শুক্র ও শনিবার দুই দিনের ছুটি। নতুন শিক্ষাক্রমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোমলমতি শিশুদের কোনো পরীক্ষা দিতে হবে না। এর পরিবর্তে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে তাদের। নতুন শিক্ষাক্রমে পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষাগুলো রাখা হয়নি। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক- এই গ্রুপ বিভাজন রাখা হয়নি। শুধু দশম শ্রেণির পাঠ্যসূচির ভিত্তিতে মাধ্যমিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ভিন্ন দুটি পাবলিক পরীক্ষায় বসতে হবে ছাত্রছাত্রীদের।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম গতকাল মঙ্গলবার বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন হবে ধাপে ধাপে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত, ২০২৪ সালে দ্বিতীয়, তৃতীয় ও অষ্টম এবং ২০২৫ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের সব শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম কার্যকর হবে। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতেও নতুন কারিকুলাম চালু হবে। তিনি জানান, প্রথম শ্রেণির সব বই লেখার কাজ শেষ। ষষ্ঠ শ্রেণির বইয়ের পাইলটিং চলছে। নতুন বই দেওয়ার জন্য আমরা আগামী শিক্ষাবর্ষের প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পাঠ্যবই মুদ্রণের দরপত্র আহ্বান এক মাস পিছিয়ে দিয়েছি। এ সময়ের মধ্যে বই লেখার কাজ শেষ হয়ে যাবে।

জানা গেছে, পরীক্ষা কমিয়ে নতুন শিক্ষাক্রমে ক্লাসরুমে 'দক্ষতাভিত্তিক ধারাবাহিক মূল্যায়ন' চালু হতে যাচ্ছে। প্রতি বিষয়ে পূর্ণমান ১০০ নম্বর থাকলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় বিষয় ও শ্রেণিভেদে ৪০ থেকে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। বাকি নম্বরের শিখনকালীন মূল্যায়ন করবেন শিক্ষকরা। নতুন এ পদ্ধতি চালুর জন্য খোলনলচে বদলে ফেলা হচ্ছে বিদ্যমান শিক্ষাক্রম। নতুন শিক্ষাক্রমের আলোকে লেখা চলছে নতুন পাঠ্যবই।

নতুন কারিকুলাম চালুর প্রস্তুতি কতটুকু জানতে চাইলে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান গতকাল বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, কনটেন্ট তৈরি, নতুন পাঠ্যবই মুদ্রণ এর সবই আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। নতুন শিক্ষাক্রমে বিদ্যমান বিভিন্ন বিষয়ের নামও বদলে যাবে বলে জানান তিনি। 'পরীক্ষা পদ্ধতি কেমন হবে, সৃজনশীল পদ্ধতি থাকবে কিনা' জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষা পদ্ধতির বিষয়ে কোনো তথ্য এখন আমরা দেব না। কিছু বললেই সেই আলোকে বাজারে নোটবই গাইডবই চলে আসে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পরে সবাইকে জানাব।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পরিমার্জিত শিক্ষাক্রম অনুসারে, শিক্ষার্থীরা বিজ্ঞান নাকি অন্য কোনো শাখায় পড়বে, তা নির্ধারণ করা হবে একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে। দশম শ্রেণির আগে আর কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকছে না। শুধু দশম শ্রেণির কারিকুলামের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হবে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। ২০২৪ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও 'জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট' (জেডিসি) এবং পঞ্চম শ্রেণির প্রাইমারি এডুকেশন সার্টিফিকেট (পিইসি) পরীক্ষা আর কেন্দ্রীয়ভাবে নেওয়া হবে না। বিদ্যালয়েই বার্ষিক পরীক্ষার মতো এসব শ্রেণির মূল্যায়ন করা হবে। তবে এসব শ্রেণিতে জেএসসি, জেডিসি ও পিইসি সনদ দেওয়া হবে। আর প্রাথমিক স্তরে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত কোনো পরীক্ষায়ই থাকবে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সবাইকে অভিন্ন ১০টি বিষয় পড়তে হবে। আর একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে দুটি পাবলিক পরীক্ষা হবে, অর্থাৎ প্রতি বর্ষ শেষে হবে পাবলিক পরীক্ষা। আর এই দুই পরীক্ষার ফলের সমন্বয়ে এইচএসসির চূড়ান্ত ফল ফল প্রকাশ করা হবে। ২০২৫ সালে গিয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে নতুন শিক্ষাক্রম পুরোপুরি কার্যকর হবে।

মূল্যায়ন যেভাবে : প্রাথমিকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়েই ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে। আর চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়ে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ। আর ৪০ শতাংশ মূল্যায়ন হবে ক্লাস শেষে পরীক্ষার মাধ্যমে, যেটি সামষ্টিক মূল্যায়ন বলা হচ্ছে। ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণিতে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন হবে ৬০ শতাংশ এবং ৪০ শতাংশ হবে সামষ্টিক মূল্যায়ন। নবম ও দশম শ্রেণিতে কয়েকটি বিষয়ে শিখনকালে অর্ধেক মূল্যায়ন হবে এবং বাকি অর্ধেক সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩০ ভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন এবং ৭০ ভাগ সামষ্টিক মূল্যায়ন হবে।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে হবে অভিন্ন ১০ বিষয় :ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীকে ১০টি অভিন্ন বিষয়ে পড়ানো হবে। এরপর একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শাখা পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হবে। বর্তমানে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কিছু অভিন্ন বই পড়তে হয় এবং নবম শ্রেণিতে গিয়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা- এসব শাখায় ভাগ হয়ে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করে। প্রস্তাবিত শিক্ষাক্রম অনুযায়ী ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যে ১০টি বই পড়ানো হবে, সেগুলো হলো বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, সামাজিক বিজ্ঞান, জীবন ও জীবিকা, ধর্ম, স্বাস্থ্য শিক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। বর্তমানে এসব শ্রেণিতে ১২ থেকে ১৪টি বই পড়ানো হয়।

জানা গেছে, এর আগে প্রাথমিক, মাধ্যমিক আলাদা আলাদা শিক্ষাক্রম ছিল। একজন শিক্ষার্থী প্রাক-প্রাথমিকে ঢুকে মাধ্যমিকে যায়। এ জন্য এক স্তর থেকে আরেক স্তরে যাওয়া যেন খুব মসৃণ হয়, মাঝে যেন ছেদ না পড়ে, অন্য স্তরে গিয়ে যেন খাপ খাওয়াতে কোনো সমস্যা না হয়, সেটি নতুন শিক্ষাক্রমে নিশ্চিত করা হয়েছে।

নতুন শিক্ষাক্রমের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ফরহাদুল ইসলাম বলেন, আনন্দময় পড়াশোনা হবে। বিষয়বস্তু ও পাঠ্যপুস্তকের বোঝা ও চাপ কমানো হবে। গভীর শিখনে গুরুত্ব দেওয়া হবে। মুখস্থনির্ভরতার বিষয়টি যেন না থাকে, এর বদলে অভিজ্ঞতা ও কার্যক্রমভিত্তিক শেখাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীর দৈহিক ও মানসিক বিকাশে খেলাখুলা ও অন্যান্য কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এরপর শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের মতো সময় কাটাতে পারে। পড়াশোনার বাইরে খেলাধুলা বা অন্যান্য বিষয়ের সুযোগ কমে গেছে, এটা যেন না হয়। জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের চোখে নতুন শিক্ষাক্রম: শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। বহু বছর ধরে আমরা বলে আসছি, পরীক্ষার চাপ মুক্ত করে শিশুদের শৈশব ফিরিয়ে দিয়ে পড়াশোনাটাকে আনন্দময় করে তোলা হোক। সরকার সে প্রচেষ্টা নেওয়ায় এবার একটা আশাবাদ জেগেছে সবার মনে।

অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, দশম শ্রেণির আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা নেই- এটি খুব ভালো কথা। পঞ্চম শ্রেণির শিশুদের ওপর পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে না দেওয়ার বিষয়টি আগেও নানাভাবে বলা হয়েছে। তবে এটি আরও স্পষ্ট করা উচিত সরকারের পক্ষ থেকে।

কারিকুলাম বিশেষজ্ঞ ও জাতীয় শিক্ষানীতি (২০১০) প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, কারিকুলাম হলো শিক্ষার পথরেখা। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য উপযুক্ত হয়ে গড়ে ওঠার পথরেখা অনুসরণ খুবই জরুরি। পরীক্ষার চাপমুক্ত পড়াশোনা, জ্ঞান অর্জনটা আসলে খুব দরকার।

এনসিটিবির সদস্য (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) প্রফেসর ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান  বলেন, আগে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের জন্য পৃথক সময়ে কারিকুলাম পরিবর্তন হওয়ার কারণে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের কারিকুলামে কোনো সমন্বয় থাকত না। এবারই একসঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের কারিকুলাম পরিমার্জন করা হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি হবে না।

তিনি বলেন, প্রাথমিক স্তরের কারিকুলামের ক্ষেত্রে সময়ের চাহিদাগুলো বিবেচনায় আনা হচ্ছে। বইয়ে কাগজের নৌকার ছবি থাকলে শিক্ষার্থীদের তা শ্রেণিকক্ষেই বানিয়ে দেখাতে হবে। এতে শিশু শিক্ষার্থীর কাজের দক্ষতা বাড়বে।
নতুন কারিকুলামে পঞ্চম শ্রেণি শেষে পিইসি ও অষ্টম শ্রেণি শেষে জেএসসি পরীক্ষা রাখা হয়নি। এ বিষয়ে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক মো. মশিউজ্জামান বলেন, জাতীয় শিক্ষানীতিতেও এ দুটি পরীক্ষার কথা বলা নেই। খবর-সমকাল

মন্তব্য করুন


Link copied