আর্কাইভ  শনিবার ● ১৩ এপ্রিল ২০২৪ ● ৩০ চৈত্র ১৪৩০
আর্কাইভ   শনিবার ● ১৩ এপ্রিল ২০২৪
 width=
 
 width=
 
শিরোনাম: পঞ্চগড়ে দুই মোটরসাইকেল সংঘর্ষ, নিহতের সংখ্যা বেড়ে চার       পঞ্চগড়ে দুই মোটরসাইকেলের মুখোঁমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৪       পঞ্চগড়ে প্রেমিকের হাতে প্রেমিকা খুন!       নাথান বমের স্ত্রীকে বান্দরবান থেকে লালমনিরহাটে বদলি       দিনাজপুরে ৬ লাখ মুসল্লি’র সমাগমে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সর্ববৃহৎ ঈদ জামাত      

 width=
 

আজ ঐতিহাসিক রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস

বৃহস্পতিবার, ২৮ মার্চ ২০২৪, দুপুর ১১:১৫

ডেস্ক: আজ ঐতিহাসিক ২৮ মার্চ, রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রংপুরের বীর-জনতার অবিস্মরণীয় দিন। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের অনুপ্রেরণা ও স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্যদিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে দেশ স্বাধীনের লক্ষ্যে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন রংপুরের মুক্তিকামী মানুষ। অস্ত্র ছাড়াই তীর-ধনুক হাতে নিয়ে লড়াই শুরু করেছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে।

সেদিন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মুক্তিকামী ওরাঁও, সাঁওতাল আদিবাসীরা লাঠি, তীর-ধনুক নিয়ে আক্রমণ করে সৃষ্টি করে অনন্য এক ইতিহাস। সেদিন দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ শহিদ; আহত হন অগণিত মানুষ। তবে কেউই পাননি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। শহীদ পরিবার ও আহত ব্যক্তিদের রাখে না কেউ খোঁজ। অনেক আহত ব্যক্তি পঙ্গুত্ববরণ করে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

স্বাধীনতার পর থেকে রংপুরবাসী ঐতিহাসিক এই দিনটি ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস হিসেবে পালন করে এলেও ৫২ বছরেও মেলেনি এর স্বীকৃতি। অথচ বাঁশের লাঠি, তীর-ধনুক নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করার নজির বিশ্বে আর কোনো দেশে নেই। এটি ছিল বিরল সাহসিকতার ঘটনা।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একাধিক গ্রন্থ, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগেই পাকিস্তান সরকারের শাসন, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল রংপুরের মানুষ। এজন্য একাত্তরের ৩ মার্চ রংপুরের পাকিস্থানবিরোধী মিছিলে শংকু সমজদার নামে এক পাঁচ বছর শিশু গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যু হয়। স্বাধীনতার গণআন্দোলন সংগ্রামের প্রথম ‌‘শিশু শহীদ’ বলা হয় শংকুকে। তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে উঠে আসে রংপুরের নাম। সেই ভাষণের পর রংপুরের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

এরইমধ্যে ২৪ মার্চ নগরীর নিসবেতগঞ্জ এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর একটি জিপ গাড়িতে হামলা করে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে আব্বাসী নামে এক সেনা সদস্যকে দা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন স্থানীয় শাহেদ আলী নামে একজন মাংস বিক্রেতা। এ নিয়ে গোটা শহরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ক্রোধে ফেটে পড়ে। রংপুরের স্বাধীনতাকামী মানুষও ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

এরপর ২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য সিদ্ধান্ত নিয়ে গোপনে প্রচার করা হয় কৌশল। এই সিদ্ধান্তে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের প্রচারে মেলে অভূতপূর্ব সাড়া। এদিন (২৮ মার্চ) রংপুরের সদর, গঙ্গাচড়া, বদরগঞ্জ, মিঠাপুকুর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্র, কৃষক, দিনমজুরসহ বিভিন্ন ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব পেশার মানুষ দা, কোদাল, কুড়াল, বর্শা, বল্লম হাতে নিসবেতগঞ্জ এলাকায় একত্র হন। বিশেষ করে আদিবাসী সাঁওতালরা তীর-ধনুক হাতে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে আসেন। নৃগোষ্ঠী ওঁরাও, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের তীরন্দাজরা এই আক্রমণে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বেলা ১১টার দিকে হাজার হাজার মানুষ ক্যান্টনমেন্টের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মেশিনগান দিয়ে গুলি ছোড়ে। এতে মাত্র ৫ মিনিটে এলাকাটি স্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকে মাঠে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা লাশগুলো একখানে জড়ো করে পুড়িয়ে ফেলা হয়। তখনও যেসব মানুষ বেঁচে ছিলেন তাদের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে অমানবিকভাবে হত্যা করা হয়। সেদিন থেকেই দিনটি ‘ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে রংপুরে।

সেদিন ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনের পশ্চিম এলাকার দায়িত্বে ছিলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক মজিবর রহমান মাস্টার। তিনি সেদিনের দুঃসাহসিক স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘২৬ মার্চ বিকেলে বদরগঞ্জে শ্যামপুর সুগার মিলগেটে শ্রমিক-জনতা নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের মিটিং হয়। মিটিংয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য ২৮ মার্চ দিনক্ষণ ঠিক করি। আমাকে দায়িত্ব হয়েছিলো ক্যান্টনমেন্টের পশ্চিম এলাকার। শহীদ ছাত্রনেতা মুখতার এলাহী, রফিকুল ইসলাম গোলাপ ছাত্রদের নিয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ২৮ তারিখে লোহানীপাড়ার সাঁওতালসহ বদরগঞ্জের ২০ থেকে ২৫ হাজার মানুষ নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে আসি। অ্যাডভোকেট গণি বলদীপুকুরের সাঁওতাল ও জনতাদের নিয়ে, তৈয়বুর রহমান শহরের লোকদের নিয়ে নিসবেতগঞ্জের ঘাঘট নদীর কাছে আসেন।

তিনি বলেন, “তখন আমাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। আমাদের অস্ত্র ছিল ‘জয় বাংলা, জয়-বঙ্গবন্ধু, বীর বাঙ্গালী অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো, তোমার দেশ, আমার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’। তারা দল-বল নিয়ে উপশহরের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলে গুলিবর্ষণ শুরু করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। যখন কাছাকাছি যাই তখন বুঝতে পারি ক্যান্টনমেন্ট থেকে ট্যাংক বাহিনী বের হয়ে আমাদের ওপর গুলিবর্ষণ করছে।”

প্রত্যক্ষদর্শী ও সেসময় রংপুর ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ২৯ ক্যাভেলরি রেজিমেন্টের মেজর নাসির উদ্দিন তার ‘যুদ্ধে যুদ্ধে স্বাধীনতা’ গ্রন্থে সেদিনের বর্ণনায় লিখেছেন- ‘যে দৃশ্য আমি দেখলাম, তা চমকে যাওয়ার মতোই। দক্ষিণ দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ সারি বেঁধে এগিয়ে আসছে সেনা ছাউনির দিকে। তাদের প্রত্যেকের হাতেই দা-কাঁচি, তীর-ধনুক, বর্শা, বল্লমের মতো অতি সাধারণ সব অস্ত্র। বেশ বোঝা যাচ্ছিল এরা সবাই স্থানীয়। সারি বাঁধা মানুষ পিঁপড়ার মতো লাঠিসোঁটা বল্লম হাতে ক্রমেই এগিয়ে আসছে ক্যান্টনমেন্টের দিকে। এ সময় ক্যান্টনমেন্ট থেকে গোটা দশেক জিপ বেরিয়ে আসে এবং মিছিল লক্ষ্য করে শুরু হয় একটানা মেশিনগানের গুলি বর্ষণ। মাত্র পাঁচ মিনিটে চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার লাশ পড়ে থাকে মাঠে।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মাঠের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে টেনে-হিঁচড়ে এনে এক জায়গায় জড়ো করা হলো পুড়িয়ে ফেলার জন্য। কিন্তু তখনও যারা বেঁচে ছিলেন তাদের গোঙানিতে বিরক্ত হয়ে উঠেছিল পাঞ্জাবি জান্তারা। এ অবস্থাকে আয়ত্তে আনার জন্য বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে চিরতরে তাদের থামিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল।’

তিনি তাই বইয়ে বর্ণনা করেছেন, ‘আহতদের আর্তনাদে গোটা এলাকার আকাশ বাতাস যেন ভারি হয়ে উঠল। সেদিন সন্ধ্যার আগেই ৫০০ থেকে ৬০০ মরদেহ পেট্রোল ঢেলে জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে আগুন। এ আগুন অন্য যেকোনো আগুনের চেয়ে অনেক বেশি লাল। অনেক বেশি দহন করে এই বহ্নিশিখা। খুব কাছ থেকেই সেই আগুন আমি দেখছি। দেখছি, কেমন করে জ্বলছে স্বাধীনতাপ্রিয় অসহায় মানব সন্তান।’

২৮ মার্চ ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়ে শহিদ হন রাণীপুকুর ইউনিয়নের দৌলত নূরপুর গ্রামের আয়নাল হক। তার স্ত্রী রওশনা বেগম জানান, বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তার স্বামী। পরদিন কয়েকজন প্রতিবেশী কাঁধে করে আয়নালের লাশ বাড়িতে নিয়ে আসে।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে মৃত্যুবরণ করলেও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিটুকুও মেলেনি। এতো অভাব অনটনের মধ্যদিয়ে গেলেও কখনও কেউই খোঁজ রাখেনি।’

একই ইউনিয়নের নাসিরাবাদ গ্রামের মনছুর আলী ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করতে গিয়ে পাকসেনাদের গুলিতে পঙ্গুত্ববরণ করেন। বর্তমানে অন্যের ওপর নির্ভর করে চলছে তার সংসার। মনছুর আলী বলেন, ‘দেশকে হানাদারমুক্ত করতে পাকসেনাদের ঘাঁটি দখল করতে ক্যান্টনমেন্ট গিয়েছিলাম। আমাদের হাতে ছিল তীর-ধনুক আর বুকে ছিল দেশ স্বাধীন করার মনোবল। গুলিবিদ্ধ হয়ে আমি সেখান থেকে কোনো রকমে জীবন নিয়ে ফিরে আসি। সেদিন অনেকে শহিদ হয়েছিল। এখন আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার মতো কেউ নেই। স্বাধীনতার এতো বছর হয়ে গেল তবুও স্বীকৃতি মিলল না।’

ঐতিহাসিক ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও আন্দোলনে মূল সংগঠকের দায়িত্ব পালন করেন সেই সময়ের আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এমপি সিদ্দিক হোসেন (প্রয়াত)। এ ছাড়া এ আন্দোলনে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে রয়েছেন, নুরুল হক এমপিএ (প্রয়াত), আবদুল গণি (প্রয়াত), ইসাহাক চৌধুরী (শহীদ), আলতাফ হোসেন (প্রয়াত), শেখ আমজাদ (প্রয়াত), তৈয়বুর রহমান (প্রয়াত), মজিবর রহমান মাস্টার, হামিদুজ্জামান (প্রয়াত), এমপিএ, গাজী রহমান এমপিএ (প্রয়াত), নুরুল ইসলাম (প্রয়াত), মজিবর রহমান মতি মিয়া (প্রয়াত), গোলাম কিবরিয়া (প্রয়াত), ডা. আফতাব তালুকদার (প্রয়াত), লোকমান উদ্দিন ঠিকাদার (প্রয়াত), সাংবাদিক নোয়েজস হোসেন খোকা (প্রয়াত), আবদুল মান্নান খলিফা (প্রয়াত), শেখ আমজাদ হোসেন (প্রয়াত) প্রমুখ।

প্রতি বছর এই দিনে রংপুর জেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পালিত হয় ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস। রংপুরবাসী এই দিনে ‘রক্ত গৌরব’ স্মৃতিস্তম্ভের পাদদেশে সাহসী বীর বাঙালি শহিদদের ফুল দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে। ২৮ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ তথা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে এটাই ছিল মুখোমুখি প্রথম যুদ্ধ। কিন্তু সেদিনের শত শত দেশপ্রেমী জনতার আত্মত্যাগের স্বীকৃতি আজও না মেলায় ক্ষোভ আছে জনমনে।

শুধুমাত্র প্রতি বছর ২৮ মার্চ এলে কিছু অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে বীর শহিদদের আত্মত্যাগ। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে যেন অতিদ্রুতই স্বীকৃতি মেলে এমনটাই প্রত্যাশা শহিদ পরিবারগুলোর।

মন্তব্য করুন


 

Link copied